দৈনতা

মা- বাবা যাও না গিয়ে কি সব ভাতা দিচ্ছে তাঁর ফর্ম তুলে আন।

ছেলে- মা এইসব পাঁচশো, হাজার টাকার ভাতার ফর্ম তুলে কি লাভ? এতে কি আমাদের দুঃখ ঘুচবে?

মা- কিন্তু সরকার তো দিচ্ছে আমরা তুলব না কেন?

ছেলে- ভাতা দেওয়ার চেয়ে কি চাকরি দেওয়া বেশি জরুরি নয়? সরকার যদি আমাদের চাকরি দেয় তাহলে কি আমাদের ভাতার প্রয়োজন? আমরা কি ভিখারি?

মা- তোর এইসব বড় বড় কথার জন্যই তো আমাদের এই দুরবস্থা! কত বড়লোকেরা এইসব ভাতার জন্য আবেদন করছে আর আমাদের আবেদন করলেই দোষ?

ছেলে- দোষ তো বলছি না কিন্তু এই কিছু টাকা ভাতা নিয়ে কি কোন লাভ হবে? আগামী দিনে এরা বলবে টাকা নিয়েছ ভোটটা দিয়! আচ্ছা মা আমাদের ভোট কি এতই সস্তা? আমাদের মূল্য কি এতই কম?

মা- গোটা রাজ্যে সবাই আবেদন করছে আর তুই কি একা বেশি বুঝিস? তোর এই বেশি বোঝার জন্যই তো, তোর চাকরি হল না! কত করে বললাম যে যোগাযোগ কর, টাকা দিয়ে যদি চাকরি হত তাহলে এই দিন দেখতে হত না! শুধু বড় বড় কথা নীতি, আদর্শ, এসব দিয়ে কি পেট ভরবে? গোটা দুনিয়া যেখানে অসৎ সেখানে তোর সততার দাম কি রয়েছে?

ছেলে- মা তুমি টাকা কাকে দেবে? তুমি জানো কত মানুষ এই টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছে? আর আমাদের টাকা কোথায়? টাকা দিতে গিয়ে কি ভিটেমাটি বিক্রি করে পথে বসব? আর এভাবে চাকরি হবে তাঁর নিশ্চয়তা কি রয়েছে? মা পড়াশোনা শিখেছি কি অসৎ পথে পা দেব বলে? আচ্ছা মা অসৎ পথে চাকরি নিলে নিজের বিবেকের কাছে কি উত্তর দেব? ছাত্রছাত্রীদের কাছে কি করে শিক্ষা দেব সৎ হও, মানুষের মতো মানুষ হও? আর যাঁরা করে দেবে তাঁরা কি বলবে, ‘ওকে চাকরি করে দিলাম তাই তো ও করে খেতে পারছে নাহলে ও আর কি করত?’ মা এটা কি কষ্টের নয়? এটা কি আমার শিক্ষা, আমার আদর্শের বিরুদ্ধে, নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে যাওয়া নয়?

মা- তুই থাম নীতি, আদর্শ এসবের কে মূল্য দেয় রে? নীতি, আদর্শ এসব দিয়ে কি পেট চলবে, সংসারের হাড়ি চড়বে? নীতি, আদর্শ নিয়ে কে বড় হয়েছে, কি লাভ এসব কথা বলে?

ছেলে- আমি জানি বর্তমান সময়ে নীতি, আদর্শের মূল্য বড় কম কিন্তু নীতি আদর্শ না থাকলে কি মানুষের জীবন চলে? নীতি আদর্শ না থাকলে ভগৎ সিং, রাজগুরু, শুখদেব, ক্ষুদিরাম এরা দেশের জন্য প্রাণ দিত কেন? মা নীতি আদর্শের কি কোন দাম নেই?

মা- এসব রাখ ওসব কথা বইয়ের পাতায় পড়তে শুনতে ভালো লাগে, বাস্তবে এগুলির কোন দাম নেই! ভগৎ সিংয়ের ফাঁসি হওয়ার পর তাঁর মায়ের কি হল, কেউ খোঁজ রেখেছে? বটুকেশ্বর দত্তর কথা কি কেউ মনে রেখেছে? আমি হলে তো কোন দিন দেশের জন্য কিছু করতে যাব না ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম!’

ছেলে- তাহলে আদর্শ, নীতি, নৈতিকতা, শিক্ষার কি কোন মূল্য নেই?

মা- কি মূল্য আছে বল? আজ যাঁরা এক দলের নেতা কাল তাঁরা অন্য দলে চলে যাচ্ছে কোথায় নীতি, কোথায় আদর্শ? এই যুগে বাস্তববাদী না হলে বাঁচতে পারবি না রে!

ছেলে- কিন্তু সবাই কি আমরা হেরে যাব? আমরা সবাই মনুষ্যত্ব, নীতি, বোধ হারিয়ে ফেলব? যুগের কি হবে? দেশের কি হবে? সমাজ কি রসাতলে যাবে?

মা- তুই কি সমাজের ঠেকা নিয়ে রেখেছিস? তোর নিজের কথা ভাব। তুই তো বললি সৎ পথে চাকরি হয়ে যাবে এখন কি হল? হল তো কাঁচাকলা? তুই তো কোর্টে কেস ও করলি, কিছু হল? কোর্ট থেকে কি সঠিক বিচার পাবি? কি জানি এখন তো কোর্টের রায় দেখে ও ভয় পায়, শুনছি কোর্টের রায় ও প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে!

ছেলে- আদালতের উপর তো ভরসা রাখতে হবে, দেখা যাক আদালত কি বলে, আশাবাদী আদালত সত্যের পক্ষে রায় দেবে!

মা- যাক তুই ফর্ম তুলে আন।

ছেলে- আমার খারাপ লাগে, নিজেকে খুব হীন মনে হয়, আমরা কি ভিখারি?

বোন- এইসব বড় বড় কথা বলার জন্যই তো তোমার কিছু হয় না, গোটা রাজ্যের সবাই কি ভিখারি? সরকার টাকা দেবে আমরা নেব এতে ভিখারির কি রয়েছে? আর যদি না আন তাহলে প্রতি মাসে মাসে তুমি এই টাকা আমাদের দেবে!

ছেলে- সেটা ঠিক আছে কিন্তু ভাব সরকার যদি দুটাকা কেজি চাল, ভাতা এসব না দিয়ে চাকরি দিত তাহলে কি ভালো হত না? ভাতার চেয়ে কি চাকরি সন্মানের নয়? এই ভাতা করে করে কি আর চাকরি হবে? তুই ও তো চেষ্টা করছিস পড়াশোনা করছিস তোর ও কি চাকরি হবে? আগামী প্রজন্ম কোথায় যাবে? তাঁরা কি সব ভিখারি হবে?

বোন- কি হবে, অত কিছু জানি না! যা হয় হোক তুমি ফর্ম তুলে আন, এই বাজারে এক টাকা কে দেয়, এক টাকা ও ছাড়া যাবে না। বেশি নীতি, আদর্শ ওসব দেখাতে গেলে হাঁড়ি চড়বে না!

ছেলে- যাইহোক আমার বড্ড খারাপ লাগে, নিজেকে বড্ড ছোট মনে হয়, তুই বরং যা তোর ইচ্ছা করলে তুই ফর্ম ফিলাপ করিস। আমি এগুলি পচ্ছন্দ করি না।

বোন- সেই তো এই নীতি আদর্শ করে জীবন চলবে তো? দেখব কতদিন তুমি এমন করে চলতে পার?

ছেলে- জানি না কতদিন চলতে পারব, যতদিন সম্ভব সাধ্যমতো চলার চেষ্টা করব!

বোন- ঠিক আছে দেখা যাবে, তা সবাই কি চাকরি করবে? কত গরীব মানুষ ভাতা পাচ্ছে মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা ভালো ভালো কথা বলছে তাঁরা সবাই ভুল আর তুমি একাই ঠিক?

ছেলে- প্রশ্ন হল মানুষকে ভাতা দিতে হবে কেন? কাজের সুযোগ পেলে কি মানুষের ভাতার প্রয়োজন রয়েছে? সরকারকে দুটাকা কেজি চাল কেন দিতে হবে? সরকার মানুষকে কাজের সুযোগ দিক যাতে মানুষ তিরিশ টাকা কেজি চাল খেতে পারে! আর মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের কথা কি আর বলব তাঁরা তো এখন যতটা না সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ তাঁর চেয়ে অনেক বেশি লক্ষীর প্রতি দায়বদ্ধ! দেশ তথা সমাজ কেন রসাতলে যাবে না!

বোন- ঠিক আছে যা ইচ্ছা কর!

ছেলে- আমি মনে মনে ভাবি, ‘ভিক্ষা নয় চাকরি চাই!’ এটা ভাবা কি আমার অন্যায়?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + = 14