তালেবানদের কি এবারও বিশ্বাস করা যায় !!!

বিশটি বছর ক্ষমতা থেকে বাইরে থাকার পর ধীরে ধীরে তালেবানরা যে এত শক্তিশালী হয়ে ক্ষমতায় বসে যাবে সেটা হয়তো বর্তমান বিশ্ব কখনই চিন্তা করতে পারে নাই। এ বিষয়ে রয়টারের কাছে খুবই স্পষ্ট ভাবেই তালেবান এক নেতা ওয়াহিদুল্লাহ হাশিমি জানিয়েছেন , “এখানে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকবে না। কারণ, আমাদের দেশে এর কোনো ভিত্তি নেই। আফগানিস্তানে আমাদের কোন ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রয়োগ করা উচিত, তা নিয়ে আমরা আলোচনা করবো না। কারণ, এটি স্পষ্ট। এটা শরিয়া আইন এবং এটাই।” এ সময় তিনি জানান, একটি শাসক পরিষদ দ্বারা সরকার পরিচালিত হবে। আর সেই পরিষদের সামগ্রিক নেতৃত্বে থাকতে পারেন তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হায়বাতুল্লাহ আখন্দজাদা।

অনেকেই আমরা এখনও আশায় বুক বেধে আছি ধর্মের নাম এই ধরায় অধর্মের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাক, কিন্তু হায় দুঃখ আমাদের থেকেই গেল, কারণ এ যাত্রায় তালেবানরা বেশ কোমর বেধেই মাঠে খেলতে নেমেছে, ক্ষমতায় যাবার কিছুদিন আগেই আফগান তালেবানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক শাখার প্রধান মোল্লাহ আব্দুল গনি বারাদার চীন সফরে গিয়ে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র আপ্যায়নে সেখানে বৈঠক করেছেন। তালেবান নেতার এই সফরের চারদিন আগে আফগান পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করতে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমন্ত্রণ করেছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশীকে, চেংডু শহরে দুই মন্ত্রীর দীর্ঘ বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয় যে আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে কাজ করবে আর ঠিক এখানেই বোঝা যাচ্ছে যে কমিউনিস্ট চীন ও সুন্নী তালেবানদের সাথে নতুন সম্পর্কের সৃষ্টি। আমি বলি কি, ব্রেশ ব্রেশ ব্রেশ যখন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলের সঙ্গে বৈঠকের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে পুতিন বলেন :- “সেখানে আফগানিস্তান নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘তালিবান আফগানিস্তান দখল করেছে। এটাই বাস্তব। সেই অনুযায়ীই এগোতে হবে আমাদের। যেন তেন প্রকারে আফগানিস্তানের পতন রুখতেই হবে।’’ এ কোথায় কি প্রমাণিত হয়? তালেবানকে ক্ষমতায় রেখে আফগানিস্তানকে রক্ষা করতেই কি পুতিনের এ ধরনের বক্তব্য?

সমগ্র বিশ্ব যখন তালেবানদের শাসন ব্যবস্থাকে পর্যবেক্ষণ করছে ঠিক এ রকম মুহূর্তে বৃহিত শক্তিধর দুই রাষ্ট্র রাশিয়া ও চীন তালেবানদের পক্ষে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে যা বিশ্ব শান্তির ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে অশুভ বার্তা।
এদিকে তালেবানদের আসল রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে, তালেবান সেনারা ইতিমধ্যে সাংবাদিক, দূতাবাসে আফগান কর্মকর্তা। কিছুক্ষণ আগেই সংবাদ বেরিয়েছে একজন মহিলা চিত্র পরিচালক সাবাকে গুলি করা হয় আফগানিস্তানে, অভিনেত্রী সাবা নিজে একজন পরিচালকও বটে। শুধু পরিচালক বললে কম বলা হবে, প্রথম আফগান মহিলা পরিচালক তিনি, ২০২০ সালের ২৫ অগাস্ট কাবুল যাওয়ার পথে তাঁকে গুলি করে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি। সাবার সঙ্গে তাঁর দেহরক্ষী এবং গাড়িচালকও ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মহিলাদের অধিকার নিয়ে ছবি বানানোর ‘অপরাধেই’ আক্রান্ত হন সাবা, এমনই মনে করা হয়। ১৯৭৫ সালে জন্ম সাবার। দেশের প্রথম মহিলা প্রযোজকও তিনি। ২০০৪ সালে প্রথম ছবি ‘দ্য ল’। সাফল্য পায় সেই ছবি। তাঁর আরও একটি ছবি ‘পাসিং দ্য রেনবো’ (২০০৮) চেলসি কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন-এ দেখানো হয়েছিল ২০১০ সালে।আসলে বিগত দিনের তালিবানি শাসনে ফিরে গেল আফগানিস্তান। তাদের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার যুদ্ধে গোটা পৃথিবী আতঙ্কিত। বিশেষত সে দেশে মহিলাদের অবস্থান নিয়ে চিন্তিত বিশ্ব। মহিলাদের উপর অত্যাচারের জন্য কুখ্যাত তালিবান শাসন সঙ্গীত এবং চলচ্চিত্রের পরিপন্থী। হাজার হাজার মানুষ তাঁদের ভিটেমাটি ছেড়ে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন অন্য দেশে। এমনই ভয়াবহ কিছু ভিডিয়ো এবং ছবি ছড়িয়ে পড়েছে নেটমাধ্যমে। প্রশ্ন জাগে, মানুষই যদি না থাকে, শিল্পের কি হবে? বিশ শতকের শুরু থেকে আফগান চলচ্চিত্রের জন্ম। আমির হাবিবুল্লাহ খানের হাত ধরে প্রথম সে দেশ চলচ্চিত্রের সন্ধান পায়। কাবুলের কাছে পঘমন শহরে প্রোজেক্টরে প্রথম নির্বাক ছবি দেখানো হয়। ‘লভ অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ’ (১৯৪৬) সে দেশের প্রথম ছবি। ১৯৯০-এ গৃহযুদ্ধের সূচনা হওয়ার পর শিল্পচর্চা থমকে যায়। বহু চলচ্চিত্র নির্মাতা দেশ ছেঁড়ে ইরান বা পাকিস্তানে চলে যান। তার পর ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত চলা তালিবানি শাসনের শরিয়তি আইনের চাপে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল শিল্পচর্চা। মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিফলন ঘটবে, এমন কোনও শিল্পমাধ্যমের অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু ২০০১ সালে দেশে আমেরিকার বাহিনীর প্রবেশ ও ক্ষমতা বিস্তারের পর থেকে আফগান চলচ্চিত্র খানিক অক্সিজেন পায়। চলচ্চিত্রের নতুন যুগ হিসেবে চিহ্নিত হয় ২০০১ সাল, কিন্তু এবারের যাত্রায় তালেবানরা চলচ্চিত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিতে প্রস্তুত হয়ে আছে।

আমাদের সমাজে সম্পূর্ণ ভাবে চলচ্চিত্রের উপর আক্রমণ না হলেও বর্তমানে চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে জড়িত নারীরা বিভিন্ন ভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে, পরীমনি হচ্ছেন তার শ্রেষ্ঠ উদহারণ, আর এভাবেই চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন মুখের আবির্ভাবের পথ থেমে যাবে ঠিক এভাবেই তালেবানি কায়দায় আমাদের দেশের চলচ্চিত্র শিল্প এক অন্ধকার জগতে হারিয়ে যাবার সম্ভাবনাকে মোটেই উড়িয়ে দেয়া যায় না।

— মাহবুব আরিফ কিন্তু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 71 = 79