একটি সেমিস্টার সাড়ে তিন মাস, ২২ টি ক্লাস ও একটি অতি অভিমানী মেয়ে……

একটি সেমিস্টার সাড়ে তিন মাস, ২২ টি ক্লাস ও একটি অতি অভিমানী মেয়ে……

২০১৩ সালে মাধ্যমিক পাশ করার
পর দেশের প্রথম শ্রেনীর
একটি কলেজে ভর্তি হলো
নবনীতা। খুবই শান্ত স্বভাবের
একটি মেয়ে। চোখে চশমা পড়ে।
দেখতে খুব কিউট। পড়ালেখায় তুখোড়।
যদিও ক্লাশে তার তেমন
একটা সাড়া পাওয়া যায় না।
ক্লাশে অমনোযোগী , কিন্তু তাও
পরীক্ষায় টপ করে সে। সবার
চোখে বিস্ময়। কলেজে তার বন্ধু
সংখ্যা একদম নেই বললেই চলে।
কারন শুধু একটাই। সে ইন্ট্রোভার্ট
টাইপের মেয়ে। চশমা ওয়ালা সব
মেয়ে মনে হয় একই চরিত্রের হয়। কেমন
যেন। এক গুয়ে। একদম চুপ চাপ। বন্ধু
বলতে তার একমাত্র সঙ্গী তার সেই
টাচ স্ক্রীন এর স্যামসাং মোবাইল।
এক মুহূর্তের জন্য যেন মোবাইলের বিরহ
সে সহ্য করতে পারে না।
ক্লাশে হোক বা ক্লাশের
বাইরে হোক। মোবাইলে তার
অঙ্গুলি চালনা দেখলেই তো থ
হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।

এতোক্ষন বলছিলাম সেই নবনীতার
বৈশিষ্ট্য। এখন দেখা যাক
পরে কি হয়………

নবনীতা যে কলেজে পড়ে,
ওখানের নিয়ম অনুযায়ী বছরে ৩
টা সেমিস্টার। প্রত্যেক
সেমিস্টারের আয়ুষ্কাল সাড়ে তিন
মাস। তার মধ্যে ২২ টি ক্লাশ
হবে প্রতিটি সেমিস্টারে।
যথারীতি, প্রথম ক্লাশের
দিনে নবনীতা সবার প্রথমে এসেই
হাজির। ক্লাশের প্রথম সিট টাতেই
সে বসলো। আস্তে আস্তে, সবাই
চলে এলো। ম্যাডাম ও এলো। প্রথম
ক্লাশের দিনে সাধারনত যা হয়, সবাই
বেশ সাজগোজ
করে আসে নিজেকে জাহির করতে।
সব ছেলেরা বেশ পার্ট নিয়ে আসে।
আর
ক্লাশে বসে বসে কয়টা মেয়ে আছে,
কয়টা ছেলে আছে,
মেয়ে গুলো দেখতে কেমন
সেটা নিয়ে গবেষনা করতে করতেই
শেষ। অপর পক্ষে, সব মেয়েরাই
সাধারনত, বেশ সাজগোজ করে আসে।
মডার্ন মেয়েরা টাইট জিন্স আর
রিবন্ড করা চুল
দোলাতে দোলাতে আসে। বেশ ভাব
নিয়ে বসে থাকে ক্লাশে। আর এক
মেয়ে অন্য মেয়েকে প্রশ্ন করে,
আজকে তুমি দাঁত মেজেছো?
তুমি কি এইবার পাস করসো?
জামাটা কোথা থেকে কিনলে
এইসব। কিন্তু সব বৈশিষ্টের
বাইরে থেকে নবনীতা কারো
সাথেই কথা বলল না। এমন
কি কারো পাশেও বসলো না। তেমন
কোনো সাজগোজ নেই।
নিজেকে জাহির করার
প্রতিযোগিতাও নেই।
সাদামাটা সাজে,
চোখে গোলাপী চশমাটা দিয়ে
হোয়াইট বোর্ডের
দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষন পর তার
আমরন সঙ্গী সেই টাচ স্ক্রীন
স্যামসাং মোবাইলটা বের
করে চ্যাট করতে থাকে। ক্লাশের সব
ছেলেই বোধ হয় বৃশ্চিক রাশির
অন্তর্ভুক্ত। আচরন দেখেই সবাই সব
মেয়ের ডাটাবেজ
তৈরী করে ফেললো।

নবনীতাকে দেখেই একজনের
মনে কৌতূহল জাগে। ছেলেটির নাম
অরন্য। কি ব্যাপার? যতই দেখছে, ততই
অবাক হচ্ছে অরন্য। নবনীতার ভূত মাথার
ভেতর চেপে যায় অরন্যের। নাহ!
দেখতেই হবে মেয়েটার রহস্য কি।
পুরোটা ক্লাশে কারো সাথেই
কথা বলল না? দেখা যাক
পরবর্তী ক্লাশে কি হয়………।

দুই দিন পর আবার সেই ক্লাশ।
আবারো প্রথম সিট
টাতে এসে বসলো নবনীতা। আবার
একই ঘটনা। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত।
নবনীতা আছে মোবাইলটা নিয়ে।
জিদ চেপে যায় অরন্যের মাথায়।
কি করে এই মেয়ে মোবাইলে এতো?
বি এফ কে ম্যাসেজ পাঠায়? ২৪ ঘন্টা?
মোবাইলে গুতাগুতি এমনিতেই পেইন
লাগে অরন্যের। তার উপর একই
ক্লাশে বসে জদি এই জিনিস দের
ঘন্টা ধরে দেখতে হয়, কেমন
টা লাগে? মাঝে মাঝে খাতায় একটু
আধটু লিখতে থাকে বোর্ড থেকে।
ওমা, এই মেয়ে তো দেখি বাঁ হাতি।
হোক। তাতে কি? আবার
মোবাইলে গুতাগুতি। প্রচন্ড পেইন
লাগছে অরন্যের। কখন যে ক্লাশ শেষ
হবে, কখন এই মোবাইল বালিকার হাত
থেকে রক্ষা পাবে অরন্যের চোখ।

আজ তাদের কুইজ।
নবনীতা এখনো মোবাইলে গুতাগুতি
করছে। উফ! অরন্য নিশ্চিত, এই
মেয়েটা পড়ালেখায় ফাউ!!! -_-
সারাদিন মোবাইল নিয়ে থাকে।
ক্লাশে মনোযোগ নাই। বাসায় ও এরকম
করে মনে হয়। দূর। ফাউ
একটা মেয়ে জুটেছে এই সেকশনে।
পেইন……………

পরের দিন ম্যাডামের
কন্সাল্টিং আউয়ারে গেলো অরন্য।
গিয়ে যা দেখলো, সেটা দেখার
জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিলো না।
এতো কঠিন প্রশ্ন হয়েছিলো কুইজে।
তাও নবনীতা পেলো ২০ এ ২০…… আর
অরন্য পেলো ১৪…… মাথা নষ্ট
ম্যান……… ম্যাডামের
কাছে চুপি চুপি এসে নিশ্চই এই
মেয়ে প্রশ্ন দেখে গেছে। নাহয় এ
অসম্ভব। দেখে নেবে তাকে অরন্য এক
হাত…………………

এভাবে প্রতিটা পরীক্ষায়
নবনীতা পেতে থাকে সর্বোচ্চ
নাম্বার। নাহ……… আর
পারা গেলো না……… এই মেয়ের
মধ্যে জাদু আছে। সেমিস্টার প্রায়
শেষের দিকে। এখনো ক্লাশের
কোনো ছাত্র ছাত্রী নবনীতার
নামটি ছাড়া আর কিছুই জানে না।
ক্লাশ শেষ হওয়ার পর তাকে আর
খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার ক্লাশ শুরুর
আগে সে এসে বসে থাকে।
নবনীতাকে অরন্য যতই
দেখতে থাকে ততই অবাক হয়। কেমন
যেন একটা ঘোরের
মধ্যে বন্দী করে ফেলেছে অরন্যকে
নবনীতা।

ভালো লাগতে শুরু করে তার
নবনীতাকে। ভালো লাগাটা কেমন
যেন আরো গভীর হতে থাকে তার।
কিন্তু লাভ কি? নবনীতার
তো যে ভাব। কারো সাথে কথাই
বলে না। সেই মুডে থাকে সব সময়।
এতো কিসের দেমাগ? ফাউ যতোসব!!
মনটা কেমন অশান্ত
হয়ে থাকে অরন্যের সবসময়। ক্লাশের
বাকি বন্ধুদের আর
বুঝতে বাকি থাকে না যে, অরন্যের
আসল কাহিনীটা কি।
সবাই এক বাক্যে না করে দেয় অরন্য
কে। এই মেয়ে কারো হওয়ার নয়
রে অরন্য। এইটা আগেই বুক হয়ে গেছে।
মোবাইলে গুতাগুতি দেখে তো
বোঝা যায়।

ভগ্ন হৃদয় নিয়ে অবশেষে সে কনফেশন
পেইজে কনফেশন লিখে ফেলে।
কতিপয় বন্ধু ছাড়া আর কেউ
জানতে পারে না যে আসল
ক্রিমিনাল টা কে। অনেক
কষ্টে ফেইসবুকে খুঁজে পেলো এই
ললনাকে অরন্য। প্রথমে রিকুএস্ট
পাঠালো, অনেকদিন হয়ে যাওয়ায়
ম্যাসেজ পাঠালো ফেসবুকে। এর
পরের দিন দেখলো সেই মেয়ের
ফেসবুক একাউন্ট ডিয়েক্টিভেট………

বুক চাপা অভিমান নিয়ে দিন
কাটতে থাকে তার। নবনীতার
কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। এমন ভাব
করছে যেন কিছুই হয় নি তার।
কারো সাথেই কথা বলছে না। কেউ
জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলছে না। না।
বুকে পাথর বেঁধে একবার ডাক দিয়েই
দিলো নবনীতাকে অরন্য। তাও আবার
ক্লাশের মধ্যে। ক্লাশের সবাই
হা হয়ে গেলো। এই প্রথম
নবনীতাকে কারো সাথে কথা বলতে
দেখবে।

অরন্য শুধুই বলল, নবনী, তোমার
খাতা টা একটু দিবে প্লিজ?
আমি পারছি না।
ঠিক আছে,…… নাও বলেই
খাতাটা বাড়িয়ে দিলো অরন্যের
দিকে।…………………

খাতাটা পেয়ে যেন
পুরো শরীরে কারেন্ট
বয়ে গেলো অরন্যের।
খাতাটা আরেক বন্ধুকে দিয়েই চুপ
করে বসে থাকে কয়েক মিনিট অরন্য।
এরপর নবনীতার ডাকে সাড়া মিলল।
খাতাটা চাইছে সে। অবশেষে, বন্ধু
থেকে খাতা টা নিয়েই
দিয়ে দিলো অরন্য।

এরপর শেষ নবনীতার সাথে অরন্যের
শেষ দেখা হয় ফাইনাল পরীক্ষার
হলে। পাশাপাশি বসেছে দুজন।
এবারো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অনেক
কঠিন। তাও খস খশ শব্দে লিখেই
চলেছে নবনীতা। বাঁ হাতি বলে কিছু
দেখতেও পারছে না সে। হঠাত
টেবিল থেকে নবনীতার
খাতা টি পড়ে গেলো।
তুলতে পারছে না দেখে, অরন্য
নিজে থেকেই
তুলে দিলো খাতা টা। ধন্যবাদ
জ্ঞাপন না করেই আবার খস খস
করে লিখেই চলেছে খাতায়
নবনীতা। আজব মেয়ে তো!! মরুক গা।
কোন মতে পরীক্ষা শেষ
করে নবনীতার মুখ
পানে চেয়ে থাকে অরন্য।
ইনভিজিলেটর হঠাত ধমক দিয়ে ওঠে। ”
এই ছেলে, তুমি ওর খাত্রায়
কি দেখছো? লাস্ট ওয়ার্নিং।
খাতা নিয়ে নেব”

দূর শালা!
আমি তো খাতা দেখছি না। ওর
কাজল দেয়া চোখ দেখছি। কি অপরুপ।
হঠাত, নবনীতা খাতা খাতা বন্ধ
করেই জমা দেওয়ার উপক্রম নেয়। অরন্য ও
খাতা জমা দিয়ে দেয়। আজ শেষ
সুযোগ। আজ কিছু না কিছু বলতেই
হবে নবনীতাকে। ব্যাগ নিয়ে রুম
থেকে বের
হয়ে দেখে মেয়ে হাপুস…………………….
..

এই যাহ! চলে গেলো? সমস্যা নেই
মোবাইল বালিকা,
এখানে আছো যখন দেখা তো আবার হবেই………………

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 3 =