২৩৭: তাবুক যুদ্ধ-১০: ‘যুদ্ধ নয়, আগ্রাসন’ – মুহাম্মদের ভাষণ!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসের প্রায় সকল মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই বর্ণনায় যা আমরা নিশ্চিত রূপে জানি, তা হলো, নবী মুহাম্মদ যে গুজবটি-কে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করে তাবুক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন, তা ছিল “একেবারেই ভিত্তিহীন ও ডাহামিথ্যে!” যার সরল অর্থ হলো এটি কোন যুদ্ধ ছিল না, ছিল আগ্রাসন! অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বহু আগ্রাসী আক্রমণের আর একটি উদাহরণ।

আদি উৎসে আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) বর্ণনায় এই বিষয়টি অত্যন্ত বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট। আল-ওয়াকিদির বর্ণনা মতে, নবী মুহাম্মদ তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে ‘তাবুকে’ আসার পর তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশ্যে এক ভাষণ (খুতবা) দান করেছিলেন। মুহাম্মদের এই ভাষণটি ছিল অতুলনীয়; বহু উপদেশ ও নীতি-বাক্য সমৃদ্ধ। অতঃপর তিনি রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস ও এই “গুজবটি” সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন।

আল-ওয়াকিদির বিস্তারিত বর্ণনা: [1]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৩৫) পর:

‘তারা বলেছে: আল্লাহর নবী তাবুকে আগমন করেন ও সেখানে বিশ-রাত্রি অবস্থান করেন। তিনি দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। সেই সময় হিরাক্লিয়াস ‘হিমসে (Ḥimṣ)’ অবস্থান করছিল [পর্ব: ১৬৫]।

উকবা বিন আমির বলতো: আমরা আল্লাহর নবীর সাথে তাবুকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি ও হঠাৎ তা থেকে এক রাত দূরবর্তী স্থানে এসে পৌঁছই। আল্লাহর নবী ঘুমাতে যান ও তাঁর বর্শায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি জেগে উঠেন না। আল্লাহর নবী বলেন, “হে বেলাল, তুমি কি আজ রাতে আমাদের উপর নজর রাখতে পারলে না?” বেলাল বলে, “ঘুম আমাকে পেয়ে বসেছিল ও আপনার সাথে যা ঘটেছে, আমার সাথেও তাই ঘটেছে!”

সে বলেছে: আল্লাহর নবী সেই জায়গা থেকে বেশি দূর অগ্রসর না হয়ে ভোরের আগে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। অতঃপর তিনি আদায় করেন ফজরের নামাজ। অতঃপর তিনি তাঁর দিনের অবশিষ্ট সময় ও রাত্রিকালে দ্রুত যাত্রা করেন ও সকালে তাবুকে এসে পৌঁছেন। তিনি লোকদের জড়ো করেন ও আল্লাহর প্রশংসা আদায় ও তার [আল্লাহর] গুণকীর্তন করেন, যা তার প্রাপ্য।

অতঃপর তিনি বলেন:
“নিশ্চিতই মতবাদ বা প্রথাগুলোর (Traditions) মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যটি হলো আল্লাহর কিতাব। বিনয়ী কথা বন্ধনকে শক্ত করে। সর্বোত্তম সম্প্রদায় হলো ইব্রাহীমের সম্প্রদায়; সর্বোত্তম রীতি (practices) হলো মুহাম্মদের রীতি। ভাষণের (utterances) মধ্যে সবচেয়ে মহান হলো আল্লাহর নাম স্মরণ। কাহিনীগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো এই কুরআন।

কোন কাজের সেরা অংশটি হলো এর ফলাফল। উদ্ভাবন (innovations) হলো মন্দ; সর্বোত্তম দিকনির্দেশনা (guidance) হলো নবীদের নির্দেশনা। মহৎ মৃত্যু হল শহীদের মৃত্যু। ভ্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিহীন তারাই যারা হেদায়েতের পর ভুল করে। সেরা কাজগুলি হলো সেগুলি, যা দরকারি। সর্বোত্তম নির্দেশনা হলো সেটি, যা অনুসরণ করা হয়। সবচেয়ে খারাপ অন্ধত্ব হলো হৃদয়ের অন্ধত্ব। উপরের [দানকারী] হাত নীচের [গ্রহণকারী] হাতের চেয়ে উত্তম। সামান্য হলেও যা যথেষ্ট, তা প্রাচুর্যের চেয়ে উত্তম যা বিভ্রান্ত করে; সবচেয়ে খারাপ বিষয়টি হলো মৃত্যুর দুয়ারে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করা। কিয়ামত দিবসের অনুশোচনা-টি হলো সবচেয়ে মন্দ। কিছু লোক কদাচিৎ উপস্থিত হয় জুমায় ও কিছু লোক আল্লাহর কথা বলে কুৎসিত ভাষায়; সবচেয়ে বড় পাপের একটি হল মিথ্যা কথা বলা। ধনীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হল সেই, যার হৃদয় সমৃদ্ধ। সর্বোত্তম বিধান হলো আল্লাহকে ভয় করা। সবচেয়ে বড় অপরাধের একটি হলো জবানের বরখেলাপ (lying tongue)। সর্বোত্তম সম্পদ হল আত্মা/হৃদয়ের সম্পদ।

সর্বোত্তম বিধান হলো আল্লাহ-ভীরু বিধান। চূড়ান্ত জ্ঞান হল আল্লাহ-কে ভয় করা। অন্তরে যা প্রবেশ করে তার মধ্যে সর্বোত্তমটি হলো আল্লাহর প্রতি দৃঢ়-বিশ্বাস। সন্দেহের উৎস হলো অবিশ্বাস; বিলাপের উৎস হলো ইসলাম-পূর্ব অবস্থান; অবিশ্বাসীদের অবস্থান হলো জাহান্নামের আগুনে। মাতালদের অবস্থান হলো নরকের আগুনের কেন্দ্রে। কবিতার উৎস হলো শয়তান। মদ হল পাপের সমাবেশ; শয়তান নারীদের ব্যবহার করে ফাঁদে ফেলার জন্য ।

যৌবন হলো উন্মাদনার একটি শাখা; সুদ থেকে উপার্জন হলো মন্দ; এতিমের সম্পদ থেকে উপার্জন হলো খারাপ; সুখী হলো তারাই যারা অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। হতভাগ্য হলো সে যার দুর্গতির শুরু তার মায়ের পেটে থাকা অবস্থায়। তোমাদের প্রত্যেকেরই শেষ হবে চার আধরার (adhra‛a) ছোট্ট কবরে; তার ভাগ্য নির্ধারিত হবে তার শেষের কর্ম অনুযায়ী; শেষ-কর্মগুলি হলো তোমার ভাগ্য নির্ধারক। সুদ হলো অতিরিক্ত মিথ্যা বলা; ভবিষ্যৎ হলো হাতের কাছে (জীবন সংক্ষিপ্ত)।

মুমিন-কে অপমান করা হলো দুর্নীতি। মুমিনকে হত্যা করা হলো অবিশ্বাস (disbelief)। তার মাংস ভক্ষণ (পরচর্চা করা) হলো আল্লাহর অবাধ্যতা; তার ধনসম্পদ দখল হারাম, যেমন তার রক্ত হারাম; যে মিথ্যা শপথ করে, সে আল্লাহ-অবিশ্বাসী; যে ক্ষমা করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। যে তার রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করেন; যে কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাকে ক্ষতিপূরণ দান করেন; যে গুজবে বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাকে অপদস্থ করবেন। যে ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তার পুরস্কার দ্বিগুণ করেন। যে আল্লাহর অবাধ্য হয়, আল্লাহ তাকে নির্যাতন করেন। হে আল্লাহ আমাকে ও আমার লোকদের-কে ক্ষমা করুন, হে আল্লাহ আমি আমার ও আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি,” তিনবার।’ ——-

সম্রাট হিরাক্লিয়াস ও “গুজব” এর বিষয়ে বর্ণনা:

‘সে বলেছে: নবীকে পর্যবেক্ষণ, তাঁর চলাফেরা, তাঁর বৈশিষ্ট্য, তাঁর চোখের রক্তিমতা (redness) ও তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে নবুয়তের সীলটি পর্যবেক্ষণের জন্য হিরাক্লিয়াস ‘ঘাসানদের [এক আরব রাজ্য, বাইজেন্টাইনদের মিত্র]’ এক লোককে প্রেরণ করে। সে জিজ্ঞাসা করে যে তিনি (নবী) সাদাকা গ্রহণ করেন কি না। সে নবীর অবস্থা সম্পর্কে কিছু খবরাখবর জনাতে পারে। অতঃপর সে হিরাক্লিয়াসের কাছে ফিরে আসে ও তাকে তা অভিহিত করায়। [পর্ব: ১৭১]

সে [হিরাক্লিয়াস] তার লোকদের-কে আল্লাহর নবীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের জন্য আমন্ত্রণ জানায়, কিন্তু তারা তা এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করে যে সে আশঙ্কা করে যে তারা তার কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে যাবে। সে যেখানে ছিল সেখানেই অবস্থান করে ও নড়াচড়া করে না বা সম্মুখে অগ্রসর হয় না। [পর্ব: ১৬৭-১৬৮]।

হিরাক্লিয়াস তার অনুচরদের প্রেরণ করেছে ও তারা আল-শামের [সিরিয়া] দক্ষিণের নিকটবর্তী অঞ্চলে এসে পৌঁছেছে বলে যে খবরটি নবীর কাছে এসে পৌঁছেছিল, তা ছিল মিথ্যা। এটি না ছিল তার আকাঙ্ক্ষা, না ছিল তার অভিপ্রায়।

আল্লাহর নবী সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ আহ্বান করেন। উমর ইবনে খাত্তাব বলে, “আপনাকে যদি অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে এগিয়ে যান!” আল্লাহর নবী বলেন “আমাকে যদি এ বিষয়ে আদেশ দেওয়া হতো তাহলে আমি তোমার সাথে পরামর্শ করতাম না!”

সে বলে, “হে আল্লাহর নবী, বাইজেন্টাইনদের অনেকগুলো দল আছে, কিন্তু মুসলমানদের একটিও নেই। আপনি দেখছেন যে আপনি তাদের সন্নিকটে, আর আপনার এই নিকটবর্তী হওয়া তাদের-কে আতংকিত করে। সুতরাং এই বছর ফিরে চলুন যতক্ষণ না আপনি কোন সিদ্ধান্তে আসেন, অথবা আপনার জন্য আল্লাহ এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করে।”‘ —-

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

যে গুজবটি-কে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করে নবী মুহাম্মদ ‘তাবুক অভিযান’ পরিচালনা করেছিলেন, তা ছিল এই:

“বাইজেন্টাইনদের অনেকগুলো দল আল-শামে জড়ো করা হয়েছে ও হিরাক্লিয়াস তার সহচরদের জন্য এক বছরের রসদ সরবরাহ করেছে। লাখামিদ, জুধাম, ঘাসান ও আমিলা সম্প্রদায়ের লোকেরা তার নিকটে জড়ো হয়েছে। তারা দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হয়েছে ও তাদের নেতারা তাদের-কে ‘আল-বালকায়’ নিয়ে এসেছে, যেখানে তারা শিবির স্থাপন করেছে। হিরাক্লিয়াস তাদের পিছনে ‘হিমসে (Ḥimṣ)’ অবস্থান করছে।” (বিস্তারিত: পর্ব-২২৮)

আর আদি উৎসে আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যা অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো, তাঁর এই অজুহাতটি ছিল সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন ও ডাহা মিথ্যা; যা তিনি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, এই ভাবে:

“হিরাক্লিয়াস তার অনুচরদের পাঠিয়েছে ও তারা আল-শামের [সিরিয়া] দক্ষিণের নিকটবর্তী অঞ্চলে এসে পৌঁছেছে বলে যে খবরটি নবীর কাছে এসে পৌঁছেছিল, তা ছিল মিথ্যা। এটি না ছিল তার আকাঙ্ক্ষা, না ছিল তার অভিপ্রায়।”

তাবুকে আসার পর, নবী মুহাম্মদ স্বচক্ষে “এই সত্যটি” প্রত্যক্ষ করেছিলেন। অতঃপর তিনি তাঁর অনুসারীদের সমবেত করে যে ভাষণটি দান করেছিলেন, তা আপাত দৃষ্টিতে বহু উপদেশ ও নীতি-বাক্য সমৃদ্ধ “অতুলনীয়” একটি ভাষণ। কিন্তু, একটু মনোযোগের সাথে খেয়াল করলেই বোঝা যায় যে, তিনি এই ভাষণ-টি দান করেছিলেন তাবুক যুদ্ধে তাঁর এই চরম ব্যর্থতা আড়াল করার প্রয়োজনে। যেমন:

“–নিশ্চিতই মতবাদ বা প্রথাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যটি হলো আল্লাহর কিতাব। –সর্বোত্তম রীতি (practices) হলো মুহাম্মদের রীতি। –কাহিনীগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো এই কুরআন। —-মহৎ মৃত্যু হল শহীদের মৃত্যু। ভ্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিহীন তারাই যারা হেদায়েতের পর ভুল করে। —সর্বোত্তম বিধান হলো আল্লাহকে ভয় করা। —-সর্বোত্তম বিধান হলো আল্লাহ-ভীরু বিধান। চূড়ান্ত জ্ঞান হল আল্লাহ-কে ভয় করা। অন্তরে যা প্রবেশ করে তার মধ্যে সর্বোত্তমটি হলো আল্লাহর প্রতি দৃঢ়-বিশ্বাস। সন্দেহের উৎস হলো অবিশ্বাস; অবিশ্বাসীদের অবস্থান হলো জাহান্নামের আগুনে” – ইত্যাদি, ইত্যাদি।

এই কথাগুলোর মাধ্যমে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইনিয়ে বিনিয়ে যা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, তা হলো:

“তিনি নির্ভুল! তাঁর অনুসারীদের উচিত তাঁকে ও তাঁর আল্লাহ-কে মান্য করা; নতুবা শাস্তি অনিবার্য!”

অর্থাৎ, ওহুদ যুদ্ধের চরম ব্যর্থতার পর মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ যে কলাকৌশল অবলম্বন করেছিলেন (পর্ব: ৭০); খন্দক যুদ্ধের চরম অসহায় অবস্থায় তিনি যে কলাকৌশল অবলম্বন করেছিলেন (পর্ব: ৮১); হুদাইবিয়া সন্ধির চরম ব্যর্থতার পর তিনি যে কলাকৌশল অবলম্বন করেছিলেন (পর্ব: ১২৩); তাবুকে প্রদত্ত মুহাম্মদের এই ভাষণ সেই কলাকৌশলের অন্য আর একটি রূপ! অতঃপর, আরও সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে অনুসারীদের কাছে তাঁর পরামর্শ আহ্বান।

জগতের প্রায় সকল ইসলাম বিশ্বাসী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, নবী মুহাম্মদ ছিলেন “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী মানুষ!” তাঁদের অনেকেই আরও বিশ্বাস করেন যে, “তিনি তাঁর আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন কিছুই করেন নাই বা বলেন নাই।” এই দাবীগুলো যদি সত্য হয়, তবে:

“নবী মুহাম্মদ ও তাঁর আল্লাহ সন্দেহাতীত ভাবে জানতেন যে, ‘গুজব-টি ডাহা মিথ্যা!’ আর তা জানা থাকা সত্বেও, এই মিথ্যে অজুহাতে মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের তাবুক অভিযানে প্ররোচিত করেছিলেন; যা নিঃসন্দেহে প্রতারণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত!”

আর যদি দাবী করা হয় যে, নবী মুহাম্মদ ছিলেন পৃথিবীর সকল মানুষদের মতই “দোষ-গুন, লোভ-লালসা, ভাল-মন্দ, ভুল-শুদ্ধ” ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী একজন মানুষ মাত্র। সে ক্ষেত্রেও প্রশ্ন হলো,

“যে মানুষ-টি এমন একটি ‘গুজব-কে’ কোনরূপ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ‘অন্ধভাবে বিশ্বাস’ করে তাঁর সমালোচনা-কারী ও বিরুদ্ধবাদীদের মুনাফিক (ভণ্ড) আখ্যা দেয় ও তাঁদের-কে হুমকি-শাসানী ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে এমন একটি অভিযানে অংশগ্রহণে বাধ্য করে;

তবে সেই মানুষটি-কে কী আদৌ কোন “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তি” রূপে ভূষিত করা যায়?”

>>> মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে হিরাক্লিয়াসের হামলা-পরিকল্পনার দাবীটি যে একেবারেই অযৌক্তিক তার নিশ্চিত ধারণা পাওয়া যায় এই অভিযানের (নভেম্বর-ডিসেম্বর, ৬৩০ সাল) প্রায় সাতাশ মাস পূর্বে হিরাক্লিয়াসের কাছে পাঠানো মুহাম্মদের চিঠি-হুমকি (জুলাই-অগাস্ট, ৬২৮ সাল) ও সেই চিঠিটি পাওয়ার পর হিরাক্লিয়াসের প্রতিক্রিয়া ও কর্মকাণ্ড ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে। এ বিষয়ের বিশদ আলোচনা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে (পর্ব: ১৬৪-১৭১)। প্রতীয়মান হয় যে আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত বর্ণনাটি সেই বিশ্লেষণেরই সংক্ষিপ্তসার। যেমন:

“—সেই সময় হিরাক্লিয়াস ‘হিমসে (Ḥimṣ)’ অবস্থান করছিল।” [বিস্তারিত: পর্ব: ১৬৫]।

“—- নবীকে পর্যবেক্ষণ, তাঁর চলাফেরা, তাঁর বৈশিষ্ট্য, তাঁর চোখের রক্তিমতা (redness) ও তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে নবুয়তের সীলটি পর্যবেক্ষণের জন্য হিরাক্লিয়াস ‘ঘাসানদের এক লোককে প্রেরণ করে।— অতঃপর সে হিরাক্লিয়াসের কাছে ফিরে আসে ও তাকে তা অভিহিত করায়। [বিস্তারিত: পর্ব: ১৭১]

“—-সে [হিরাক্লিয়াস] তার লোকদের-কে আল্লাহর নবীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের জন্য আমন্ত্রণ জানায়, কিন্তু তারা তা এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করে যে সে আশঙ্কা করে যে তারা তার কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে যাবে। সে যেখানে ছিল সেখানেই অবস্থান করে ও নড়াচড়া বা সম্মুখে অগ্রসর হয় না।” [বিস্তারিত: পর্ব: ১৬৭-১৬৮]

আদি উৎসের এই সমস্ত বর্ণনায় আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি, মুহাম্মদের চিঠি-হুমকি পাওয়ার পর হিরাক্লিয়াস নবী মুহাম্মদের সাথে সমঝোতার বিষয়ে ছিলেন সবচেয়ে বেশী সোচ্চার। কিন্তু তা তিনি করতে পারেন নাই তাঁর উপদেষ্টা-মণ্ডলী, উচ্চ-পদস্থ কর্মচারী ও তাঁর জনগণের বাধার কারণে। অতঃপর, মুহাম্মদের শক্তিমত্তা বৃদ্ধি পেয়েছে আরও বহুগুণ। তিনি আগের যে কোন সময়ের চেয়ে আরও বেশী শক্তিশালী। তিনি মক্কা বিজয়, হুনায়েন অভিযান ও তায়েফ আগ্রাসন সমাপ্ত করে (পর্ব: ১৮৭-২২০) মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেছেন তাঁর এই তাবুক অভিযানের সাত-আট মাস আগেই (মার্চ, ৬৩০ সাল)। এমত পরিস্থিতিতে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে হিরাক্লিয়াসের হামলা-পরিকল্পনার অজুহাতটি একেবারেই হাস্যকর।

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল-ওয়াকিদির মূল ইংরেজি অনুবাদের প্রাসঙ্গিক অংশটি সংযুক্ত করছি।]

The narratives of Al-Waqidi: [1]

‘——–He said: Heraclius had sent a man from the Ghassān to observe the Prophet, his ways, his characteristics, the redness of his eyes, and the seal of prophecy between his shoulders. He asked if he (the Prophet) accepts ṣadaqa, and he learned something of the situation of the Prophet. [Page 1019] Then he returned to Heraclius and he mentioned that to him. He invited the people to believe in the Messenger of God, but they refused, until he feared they would go against his authority. He stayed where he was, and did not move or go forward. News that had reached the Prophet, about Heraclius sending his companions and getting close to the South of al-Shām, was false. He did not desire that, nor did he intend it. The Messenger of God consulted about proceeding. ‛Umar b. al-Khaṭṭāb said, “If you were commanded to march, march!” The Messenger of God said, “If I was commanded about it I would not consult you!” He said, “O Messenger of God, the Byzantines have many groups, but there is not one of Muslims. You are close to them as you see, and your closeness frightens them. So return this year until you come to a decision, or God establishes for you in that affair.”’——

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] আল-ওয়াকিদি, ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ১০১৫-১০১৭ ও ১০১৮-১০১৯; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail & Abdul Kader Tayob, পৃষ্ঠা ৪৯৭-৪৯৮ ও ৪৯৯
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

90 − 87 =