২৪০: তাবুক যুদ্ধ-১৩: ‘নবী মুহাম্মদ-কে হত্যা চেষ্টা’ – আবারও!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসে মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর মৃত্যু হয়েছিল যয়নাব বিনতে আল-হারিথ নামের এক ইহুদি মহিলা প্রদত্ত খাবারে মেশানো বিষের প্রতিক্রিয়ায়! যা তিনি মৃত্যুকালে নিজেই স্বীকার করেছিলেন (পর্ব: ১৪৫)! মদিনা অবস্থানকালীন সময়ে, তাবুক অভিযানের পূর্ব পর্যন্ত তাঁকে তিনবার হত্যা চেষ্টা করা হয়েছিল! তাবুক অভিযান শেষে প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে তাঁকে আবারও হত্যার পরিকল্পনা করা হয়; যে হত্যার পরিকল্পনাকারীরা ছিলেন “তাঁরই অনুসারীরা!” ইসলামের ইতিহাসের আদি উৎসে, বিভিন্ন উৎসের রেফারেন্সে, আল-ওয়াকিদি এই ঘটনাটির বিস্তারিত ও প্রাণবন্ত বর্ণনা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। তাঁর বর্ণনায় ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:

আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) বর্ণনা: [1]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৩৯) পর:

‘তারা বলেছে: আল্লাহর নবী যখন কোন এক রাস্তায় ছিলেন, তখন মুনাফিকদের কিছু লোক তাঁকে প্রতারিত করে রাস্তাটির খাড়া ঢালু স্থান থেকে তাঁকে ফেলে দেওয়ার চক্রান্ত করেছিল। আল্লাহর নবী যখন সেই খাড়া গিরিপথে এসে পৌঁছেন, তারা তাঁর সাথে সেই গিরিপথ দিয়ে যেতে চায়, কিন্তু আল্লাহর নবীকে তাদের সম্পর্কে খবরটি জানানো হয়। তিনি লোকদের বলেন, “বাতন আল-ওয়াদি যাওয়ার রাস্তাটি ধরো, কারণ নিশ্চিতই তা বেশী সহজ ও বেশী চত্তড়া।” তাই লোকজন বাতন আল-ওয়াদি যাওয়ার পথটি নেয়, আর আল্লাহর নবী নেন সেই গিরিপথের (আকাবা) রাস্তাটি।

তিনি আম্মার বিন ইয়াসির-কে তাঁর উটটির দুই পাশের জিন-সংলগ্ন পা-দানিটি (রেকাব) ধরে সম্মুখে থেকে ও হুদাইফা বিন আল-ইয়ামান কে পিছন থেকে পরিচালনা করার নির্দেশ দেন। আল্লাহর নবী যখন গিরিপথটি দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখন তিনি হঠাৎ লুকিয়ে থাকা লোকদের কাছ থেকে আওয়াজ শুনতে পান। আল্লাহর নবী ক্রোধান্বিত হোন ও তিনি হুদাইফা-কে এই নির্দেশ দেন যে সে যেন তাদের-কে ফেরত পাঠায়। হুদাইফা তাদের ফেরত পাঠায় ও তারা আল্লাহর নবীর ক্রোধ প্রত্যক্ষ করে। সে তার হাতের এক লাঠি দ্বারা তাদের মাদী উটগুলোর মুখমণ্ডলগুলোতে আঘাত করা শুরু করে। মুসলমানদের প্রতিপক্ষ লোকেরা ধারণা করে যে আল্লাহর নবী তাদের প্রতারণা-টি ধরে ফেলেছেন, অত:পর তারা দ্রুত গিরিপথটি থেকে নেমে আসে ও মুসলমানদের সাথে মিশে যায়।

হুদাইফা অগ্রসর হয় যতক্ষণে না সে আল্লাহর নবীর নিকটে আসে ও তাঁকে দ্রুত পরিচালনা করে। গিরিপথটি থেকে বের হয়ে আসার পর আল্লাহর নবী লোকজনদের (না’স) কাছে নেমে আসেন। নবী বলেন, “হে হুদাইফা, তুমি যে অশ্বারোহীদের ফিরিয়ে দিয়েছো তাদের কাউকে কী তুমি চিনতে (দেখতে) পেরেছ?” সে জবাবে বলে, “হে আল্লাহর নবী, আমি অমুক ও অমুকের পশুগুলো চিনি, অমুক ও অমুক। কিন্তু লোকেরা ছিল অবগুণ্ঠিত অবস্থায় ও রাতের অন্ধকারজনিত কারণে আমি তাদের চিনতে পারি নাই।”

তারা নবীর সাথে সম্মুখে অগ্রসর হয় ও তাঁর পশুর পিঠের উপরের জিন থেকে কিছু একটা জিনিস পড়ে যায়। হামযা বিন আমর আল-আসলামি যা বলতো, তা হলো: আমার হাতে আলো ছিল, আমি খোঁজাখুঁজি করি ও আমরা চাবুক, দড়ি ও অনুরূপ জিনিস থেকে যা পড়ে গিয়েছিল তা সংগ্রহ করার পূর্ব পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখি। যতক্ষণে না যে জিনিসগুলো পড়ে গিয়েছিল তার সমস্তই আমরা সংগ্রহ করি। সে আল্লাহর নবীর সাথে গিরিপথে এসে যোগদান করেছিল।

যখন সকাল হয়, উসায়েদ বিন হুদায়ের তাঁকে বলে, “হে আল্লাহর নবী, গতকাল কি আপনাকে উপত্যকার রাস্তা ধরে যেতে বাধা প্রদান করেছিল? নিশ্চিতই তা গিরিপথের রাস্তাটির চেয়ে সহজ ছিল?” তিনি জবাবে বলেন: “হে আবু ইয়াহিয়া, তুমি কি জানো যে গতকাল মুনাফিকরা কী করতে চেয়েছিল ও তারা কী কারণে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিল?” তারা বলেছিল: ‘আমরা তাকে অনুসরণ করব ও যখন রাতের অন্ধকার নেমে আসবে —– তারা আমার সওয়ারি পশুর চামড়ার ফিতাগুলো কেটে দেবে ও এটিকে খোঁচা দেবে যতক্ষণে না এটি আমাকে এর পিঠের জিন থেকে ফেলে দেয়’।”

উসায়েদ বলে:

“হে আল্লাহর নবী, লোকেরা জড়ো হয়েছে ও নীচে নেমে এসেছে; সুতরাং আপনি প্রত্যেক পরিবার-কে এই আদেশ দেন যে তারা যেন এই ষড়যন্ত্রকারীকে হত্যা করে, যাতে যে তাকে হত্যা করবে সে হবে তার নিজেরই গোত্রের লোক।

যদি আপনি চান, যে আপনাকে সত্য-সহ প্রেরণ করেছে তার কসম, আমাকে তাদের সম্পর্কে অবহিত করুন ও আমি তাদের মাথাগুলো আপনার কাছে নিয়ে আসার পূর্ব পর্যন্ত আপনি চলে যাবেন না। এমনকি তারা যদি আল-নাবিত গোত্রের লোকেরাও হয় তবুও আমি আপনার জন্য যথেষ্ট; যেমনটি আপনি খাযরাজ গোত্রের অধিপতিকে আদেশ করেছিলেন ও সে তার এলাকায় আপনার জন্য ছিল যথেষ্ট। অবশ্যই এদের-কে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। হে আল্লাহর নবী, কতদিন পর্যন্ত আমরা তাদের তোষামোদ করতে থাকব? আজ তারা সংখ্যায় কম ও নতজানু, আর ইসলাম হলো প্রতিষ্ঠিত! সুতরাং, আমরা তাদের কেন রাখব?”

আল্লাহর নবী উসায়েদ-কে বলেন,

“আমি সত্যিই ঘৃণা করি যে লোকেরা বলবে, অবশ্যই মুহাম্মদ তাঁর ও মুশরিকদের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করে তার সঙ্গীদের হত্যায় হাত দিয়েছিল।”

অতঃপর সে বলে, “হে আল্লাহর নবী, ওরা সঙ্গী নয়!” আল্লাহর নবী বলেন, “তারা কি ঘোষণা করেনি ও সাক্ষ্য দেয়নি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নাই?” সে জবাবে বলে, “অবশ্যই, কিন্তু তাদের ব্যাপারে তার কোন প্রমাণ নেই!” আল্লাহর নবী বলেন, “তারা কি ঘোষণা করে নাই যে আমি আল্লাহর রসূল?” সে বলে, “অবশ্যই, কিন্তু তাদের ব্যাপারে তার কোন প্রমাণ নেই!” তিনি জবাবে বলেন, “তাদের-কে হত্যা করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে।”

সে বলেছে: ইয়াকুব বিন মুহাম্মদ <রুবাইয়া বিন আবদ আল-রহমান বিন আবি সায়েদ আল-খুদরি হইতে <তার পিতা হইতে <তার পিতামহ হইতে, যে বলেছে:

গিরিপথে যে লোকেরা আল্লাহর নবী-কে কামনা করেছিল, তাদের সংখ্যা ছিল তেরো জন। আল্লাহর নবী হুদাইফা ও আম্মার-কে তাদের নামগুলো বলেন।

সে বলেছে: ইবনে হাবিবা < দাউদ বিন আল-হুসায়েন হইতে < আবদুর রহমান বিন জাবির বিন আবদুল্লাহ হইতে < তার পিতা হইতে হইতে [প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে) আমাকে বলেছে, যে বলেছে:

আম্মার বিন ইয়াসির ও মুসলমানদের এক ব্যক্তি একে অপরের সাথে কিছু একটা বিষয়ে বিরোধিতা করেছিল ও তারা একে অপরকে অপমান করছিল। লোকটি যখন আম্মার-কে অপমান করার বিশয়ে প্রায় অধিকতর ভাল অবস্থানে ছিল, আম্মার বলে, “গিরিখাদে কতজন সঙ্গী ছিল?” সে বলে, “আল্লাহই জানে।”

আম্মার বলে, “তাদের সম্পর্কে তোমার যে জ্ঞান তা থেকে আমাকে জানাও!” অতঃপর লোকটি চুপ থাকে। যারা উপস্থিত ছিল তারা বলে, “তোমার সঙ্গী তোমাকে যা জিজ্ঞাসা করেছে তা তাকে স্পষ্ট করো!” নিশ্চিতই, আম্মার এমন কিছু জানতে চেয়েছিল যা তাদের কাছে গোপন ছিল। লোকটি এ সম্পর্কে কথা বলা অত্যন্ত অপছন্দ করে। লোকেরা লোকটির বিপক্ষে ছিল, অতঃপর লোকটি বলে, “আমরা বলতাম যে তারা ছিল চৌদ্দ-জন পুরুষ।” আম্মার বলে, “নিশ্চয় তুমি তাদের মধ্যে ছিলে ও তাদের সংখ্যা ছিল পনেরো জন!” লোকটি বলে, “এটিকে সহজ ভাবে নাও; আমি তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আল্লাহর কসম, আমাকে জনসমক্ষে প্রকাশ করে দিও না!”

আম্মার বলে, “আল্লাহর কসম, আমি কারও নাম বলি নাই, কিন্তু আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে সেখানে ছিল পনের জন পুরুষ। তাদের মধ্যে বারোজন ছিল আল্লাহ ও তার নবীর শত্রু, পার্থিব জীবনে ও সাক্ষী স্থাপনের দিন; যেদিন অন্যায়কারীদের কোন অজুহাতই তার কাজে লাগবে না ও তাদের জন্য থাকবে শুধুই অভিশাপ ও দুর্দশাগ্রস্ত আবাস।”

সে বলেছে: মা’মার ইবনে রাশিদ আমাকে < আল-যুহরি হইতে [প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে] বলেছে, যে বলেছে:

আল্লাহর নবী তাঁর পশু থেকে নেমে আসেন, কারণ তাঁর উটটি হাঁটু গেড়ে বসে থাকা অবস্থায় তাঁর কাছে এক ওহী নাজিল হয়েছিল। উটটি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ও এর গলায় বাঁধা দড়িটি হেঁচকা টানাটানি করছিল যতক্ষণে না হুদাইফা বিন আল-ইয়ামান সেটির কাছে আসে ও এর গলার দড়িটি ধরে আল্লাহর নবীর কাছে চালিত করে; যেখানে সে তাঁকে বসে থাকতে দেখেছিল। সে উটটি-কে হাঁটু গেড়ে বসায় ও অতঃপর সেটির সাথে বসে থাকে যতক্ষণে না নবীজী উঠে দাঁড়ান ও তার কাছে আসেন ও বলেন, “এটি কে?”

সে জবাবে বলে, “আমি হুদাইফা।”
নবিজী বলেন, “বস্তুতই, আমি তোমাকে এমন এক বিষয়ে বিশ্বাস করি যা তুমি অবশ্যই উল্লেখ করবে না। আমাকে অমুক ও অমুকের সাথে প্রার্থনা করতে নিষেধ করা হয়েছে, অমুক ও অমুক, ও অমুক ও অমুক;” একটি দল যারা ছিল এই চিহ্নিত মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর নবী তাদের বিশয়ে একমাত্র হুদাইফা ছাড়া অন্য কাউকে অবহিত করেন নাই।

আল্লাহর নবীর মৃত্যু পর, সেটি ছিল উমর ইবনে খাত্তাবের খেলাফতের সময়, হঠাৎ করেই এক ব্যক্তির মৃত্যু হয় যাকে ‛উমর ভেবেছিল যে সে ছিল সেই দলের একজন। তাই সে হুদাইফার হাত ধরে তার জানাজা নামাজ পরিচালনা করার জন্য নিয়ে যায়; উদ্দেশ্য হুদাইফা যদি তার সাথে যায় তবে ‛উমর তার জন্য দোয়া করবে। কিন্তু সে যদি তার হাত ছাড়িয়ে নেয় ও যেতে অস্বীকার করে তবে সে তার সাথে ফিরে যাবে।

সে বলেছে: ইবনে আবি সাবরা আমাকে <সুলায়মান বিন সুহায়েম হইতে < নাফি বিন জুবায়ের হইতে [প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে] বর্ণনা করেছে, যে বলেছে: আল্লাহর নবী হুদাইফা ছাড়া কাউকে জানান নাই। তারা ছিল বারো জন লোক ও তাদের মধ্যে কোন কুরাইশ ছিল না। এটি আমাদের-কে নিশ্চিত করা হয়েছে।’ —-

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

এই ঘটনাটির পূর্বে নবী মুহাম্মদ-কে হত্যার আর যে সকল পরিকল্পনাগুলো করা হয়েছিল, তার বিস্তারিত আলোচনা “হুনাইনের যুদ্ধ: নবী মুহাম্মদ-কে হত্যা চেষ্টা” পর্বে (পর্ব: ২০৪) করা হয়েছে। আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, উসায়েদ বিন হুদায়ের নামের তাঁর এক অনুসারী মুহাম্মদ-কে পরামর্শ দিচ্ছেন এই বলে:

“–আপনি প্রত্যেক পরিবার-কে এই আদেশ দেন যে তারা যেন এই ষড়যন্ত্রকারীকে হত্যা করে, যাতে যে তাকে হত্যা করবে সে হবে তার নিজেরই গোত্রের লোক।”

উসায়েদের এই পরামর্শ-টি ছিল বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে মুহাম্মদ-কে দেয়া উমর ইবনে আল-খাত্তাবের পরামর্শের মতই (পর্ব: ৩৬):

“–আমি মনে করি যে, আপনি তাদের অমুক অমুককে আমার হাতে সোপর্দ করবেন, যাতে আমি তাদের কল্লা কাটতে পারি; আপনার উচিত হামজার ভাইকে তার কাছে সোপর্দ করা, যাতে সে তার ভাইয়ের কল্লা কাটতে পারে এবং আকিলকে আলীর কাছে সোপর্দ করা, যাতে সে তার ভাইয়ের কল্লা কাটতে পারে। তাতে আল্লাহ জানবে যে, আমাদের অন্তরে অবিশ্বাসীদের জন্য কোনোরূপ প্রশ্রয় নেই।”

উসায়েদ বিন হুদায়ের আর যে উক্তিটি করেছিলেন তা হলো:

“এমনকি তারা যদি আল-নাবিত গোত্রের লোকেরাও হয় তবুও আমি আপনার জন্য যথেষ্ট, যেমনটি আপনি খাযরাজ গোত্রের অধিপতিকে আদেশ করেছিলেন ও সে তার এলাকায় আপনার জন্য ছিল যথেষ্ট।”

উসায়েদ বিন হুদায়ের ছিলেন মদিনার আল-আউস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এক মদিনা-বাসী মুহাম্মদ অনুসারী (আনসার)। আর আল-নাবিত গোত্রটি হলো আল-আউস গোত্রেরই এক শাখা। অর্থাৎ, তিনি নবী মুহাম্মদের কাছে তাঁর গোত্রের লোকদেরই “নিজ হাতে” হত্যার অনুমতি প্রার্থনা করছেন! যেমন করে তাঁর গোত্রেরই প্রয়াত: নেতা “সা’দ বিন মুয়াদ” তাঁর গোত্রের লোকদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে, মুহাম্মদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুহাম্মদ-কে সন্তুষ্ট করার অভিপ্রায়ে, তাদেরই গোত্রের সাথে জোটবদ্ধ “বানু কুরাইজা গোত্রের” লোকদের উপর বীভৎস গণহত্যা, তাঁদের সমস্ত সম্পদ লুণ্ঠন ও তাঁদের সকল শিশু ও নারীদের দাস ও যৌনদাসীরূপে ভাগাভাগি করে নেওয়ার রায় প্রদান করেছিলেন (বিস্তারিত: পর্ব ৮৯-৯০)!

এই সেই উসায়েদ বিন হুদায়ের, যিনি হুনায়েন যুদ্ধের প্রাক্কালে যখন নবী মুহাম্মদ পলায়ন-রত অবিশ্বাসীদের শিশু-সন্তানদের হত্যা করতে নিষেধ করেছিলেন, তখন মুহাম্মদের এই গুণমুগ্ধ অনুসারী “তাঁদের শিশুদের হত্যার সপক্ষে” মুহাম্মদ-কে যুক্তি দেখিয়েছিলেন এই বলে: “হে আল্লাহর নবী, নিশ্চিতই তারা মুশরিকদের সন্তান।” এ বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা “নবী মুহাম্মদের উদারতা” পর্বে (পর্ব: ২০৯) করা হয়েছে।

অন্যদিকে খাযরাজ গোত্রের অধিপতি ছিলেন আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল; যার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে মুহাম্মদের করাল গ্রাস থেকে তাঁর গোত্রের সাথে জোটবদ্ধ বানু কেউনুকা ও বানু নাদির গোত্রের লোকেরা “প্রাণে বাঁচতে পেরেছিলেন (পর্ব: ৫১-৫২)।” অসাধারণ সাহসী এই খাযরাজ নেতা ছিলেন মুহাম্মদের প্রছন্ন প্রতিপক্ষ ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি ছিলেন মুহাম্মদের প্রত্যক্ষ সমালোচনা ও আদেশ অমান্য-কারী ব্যক্তিত্ব (পর্ব: ৫৫)। যে কারণে মুহাম্মদ তাঁকে “মুনাফিক” আখ্যা দিয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে তিনি মুহাম্মদের দেওয়া এই “মুনাফিক” নামেই প্রসিদ্ধ। আবদুল্লাহ বিন উবাই তাবুক অভিযানে ও অংশগ্রহণ করেন নাই।

সুতরাং, আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি স্পষ্ট নয়, তা হলো, উসায়েদ বিন হুদায়ের কী “খাযরাজ গোত্রের অধিপতির” বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন; না কি তা ছিল “আল-আউস গোত্রের অধিপতি” – সা’দ বিন মুয়াদ।

লক্ষণীয় বিষয় এই যে, বানু কুরাইজার লোকদের বিশ্বাস ঘাতকতার প্রমাণ যেমন “শুধুই” মুহাম্মদ ও তাঁর জিবরাইল (পর্ব ৮৭)! বানু নাদির গোত্রের লোকদের বিশ্বাস ঘাতকতার প্রমাণ যেমন “শুধুই” মুহাম্মদ ও তাঁর জিবরাইল (পর্ব: ৫২ )! মক্কার কুরাইশ কর্তৃক মুহাম্মদ-কে হত্যা পরিকল্পনার দাবী যেমন “শুধুই” মুহাম্মদ ও তাঁর জিবরাইল (পর্ব: ৪২)! তেমনই উপরে বর্ণিত হত্যা পরিকল্পনার দাবী “শুধুই” মুহাম্মদ ও তাঁর জিবরাইল!

আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, তিনি উসায়েদের এর পরামর্শ-টি প্রত্যাখ্যান করছিলেন এই বলে:

“আমি সত্যিই ঘৃণা করি যে লোকেরা বলবে, অবশ্যই মুহাম্মদ তাঁর ও মুশরিকদের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করে তার সঙ্গীদের হত্যায় হাত দিয়েছিল।”

অর্থাৎ, তাঁরা মুহাম্মদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে পেরেছিলেন “ইসলাম বিশ্বাসী” হওয়ার কল্যাণে। “যদি তাঁরা অবিশ্বাসী হতো” তবে তাঁদের-কে হত্যা করার জন্য “শুধু” মুহাম্মদের (ও তাঁর জিবরাইল) দাবী ও সাক্ষ্যই ছিল যথেষ্ট! অন্য কোন সাক্ষীর কোন প্রয়োজনই ছিল না!

ইসলাম বিশ্বাসী ও ইসলাম অজ্ঞ বহু অবিশ্বাসী যে দাবীটি উত্থাপন করেন তা হলো:

“নবী মুহাম্মদ ছিলেন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায় বিচারক, কিংবা সর্বকালের সকল শ্রেষ্ঠ ন্যায় বিচারকদের একজন!”

তাঁদের এই দাবী যে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ হলো নবী মুহাম্মদের ‘স্বরচিত কুরআন’ ও আদি উৎসে ইসলামে নিবেদিত-প্রাণ বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই রচিত ‘সিরাত ও হাদিস’ গ্রন্থের অসংখ্য বর্ণনা। সেই বর্ণনায় আমরা জানতে পারি: নবী মুহাম্মদ এমন একটি বিচার ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন, যেখানে তিনি ছিলেন “নিজেই একমাত্র দাবীদার;” তাঁর সেই দাবীর তিনি “নিজেই একমাত্র সাক্ষী;” নিজের সেই দাবী ও নিজ-সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তিনি নিজেই তার বিচারক ও অতঃপর শাস্তি-দাতা!

শুধু তাইই নয়, নবী মুহাম্মদের এই বিচার ব্যবস্থায় বিচারকার্য ও তার রায় ও শাস্তি নির্ধারিত হয় “তাঁর প্রতি বিশ্বাস, কিংবা অবিশ্বাস” এর মান দণ্ডে।

মানব ইতিহাসের এমন এক বিশেষ চরিত্র-বিশিষ্ট শাসক-কে কী কোন ভাবেই “ন্যায় বিচারক” আখ্যা দেওয়া যায়? কল্পনাও কী করা যায়?

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত বর্ণনার মূল ইংরেজি অনুবাদটি সংযুক্ত করছি।]

The narratives of Al-Waqidi:

‘They said: When the Messenger of God was on some path, some of the Hypocrites deceived him about it and plotted to throw him from a steep incline in the road. When the Messenger of God reached that steep pass, they wanted to take the pass with him, but the Messenger of God was informed about them. He said to the people, “Take the path to Baṭn al-Wādῑ for indeed it is easier and wider.” So the people took the path to Baṭn al-Wādῑ and the Messenger of God took the path to the pass (‛Aqaba). He commanded ‛Ammār b. Yāsir to take the stirrup of the camel and lead it, and he commanded Ḥudhayfa b. al-Yamān to lead from behind. While the Messenger of God was marching in the pass all of a sudden he heard the noise from people who were hidden. The Messenger of God was angry and he ordered Hudhayfa to return them. Ḥudhayfa returned them, and they saw the anger of the Messenger of God. He began striking the faces of the she-camels with a staff in his hand. Muslim’s opponents thought that the Messenger of God had discovered their deceit, and they descended from the pass swiftly until they were mixed with the Muslims. Ḥudhayfa approached until he came to the Messenger of God [Page 1043] and urged him on. When the Messenger of God came out of the pass he came down to the people (nās) The Prophet said, “O Ḥudhayfa, did you know any of the riders that you returned?” He replied, “O Messenger of God I knew the beast of so and so, and so and so. But the people were veiled and I did not see them for the darkness of the night.”

They had gone forth with the Prophet and some object fell from his saddle. Ḥamza b. ‛Amr al-Aslamῑ used to say: There was light for me in my five fingers and I searched until we had gathered what fell from the whip and the rope and similar things. Until there did not remain from the object a thing but we had gathered it. He joined the Prophet in the pass.

When it dawned Usayd b. Ḥuḍayr said to him, “O Messenger of God, what prevented you yesterday from the path of the Wādῑ? Surely it was easier than the pass?” He replied, “O Abū Yaḥyā, do you know what the Hypocrites desired yesterday, and what they worried about? They said: ‘We will follow him in the pass, and when the darkness of the night is upon … they would cut the thongs of my riding animal and they would prick it until it threw me from my saddle.” Usayd said, “O Messenger of God, the people have gathered and come down, so command every family to kill the man who plotted this so that he who kills him will be a man from his own tribe. If you wish, by Him who sent you with the truth, inform me about them, and do not depart until I bring you their heads. Even if they were in al-Nabīt I would be sufficient for you, as when you commanded the Lord of the Khazraj and he was sufficient for you in his region. Surely those should not be left. O Messenger of God, till when shall we keep flattering them? Today they are few in number and humbled, and Islam is established! [Page 1044] So why do we keep them?” The Messenger of God said to Usayd, “Indeed I detest that the people would say, surely, Muḥammad, when he concluded the war between him and the polytheists put his hand to killing his companions.” And he said, “O Messenger of God, those are not companions!” The Messenger of God said, “Did they not proclaim and testify that there is but one God?” He replied, “Of course, but there is no evidence for them!” The Messenger of God said, “Did they not proclaim that I am the Messenger of God?” He said, “Of course, but there is no evidence for them!” He replied, “I was forbidden from killing those.”

He said: Ya‛qūb b. Muḥammad from Rubayḥ b. ‛Abd al-Raḥmān b. Abī Sa‛īd al-Khudrῑ from his father from his grandfather, who said: The people of the pass who desired the Prophet were thirteen men. The Messenger of God named them to Ḥudhayfa and ‛Ammār.

He said: Ibn Abī Ḥabība related to me from Dāwud b. al-Ḥuṣayn from ‛Abd al-Raḥmān b. Jābir b. ‛Abdullah, from his father, who said: ‛Ammār b. Yāsir and a man from the Muslims contested each other about something, and they insulted each other. When the man was almost superior to ‛Ammār with insults, ‛Ammār said, “How many were the companions of the pass?” He said, “God knows.” ‛Ammār said, “Inform me from your knowledge about them!” And the man was silent. Those who were present said, “Clarify for your companion what he asked you about!” Indeed, ‛Ammār desired something that was concealed from them. The man hated to speak about it. The people were against the man, and the man said, “We used to say that they were fourteen men.” ‛Ammār said, “Surely you were among them and they numbered fifteen men!” The man said, “Take it easy; I remind you, by God, do not expose me!” ‛Ammār said, By God, I have not named one, but I testify that there were fifteen men. Twelve of them were enemies of God and His messenger [Page 1045] in the worldly life, and the day of establishing the witnesses; the day when it wil not profit wrong-doers to present excuses, and they will only have the curse and the home of misery.”

He said: Ma‛mar b Rāshid related to me from al-Zuhrῑ, who said: The Messenger of God came down from his beast, for there was a revelation to him while his camel was kneeling. The camel stood and tugged at its halter/rope until Ḥudhayfa b. al-Yamān came to it and took its halter and led it where he saw the Messenger of God seated. He knelt the camel and then sat with it until the Prophet stood up and came to him and said, “Who is this?” He replied, “I am Ḥudhayfa.” The Prophet said, “Indeed, I trust you with an affair you must not mention. I am forbidden to pray with so and so, and so and so, and so and so,” a group who were numbered among the Hypocrites. The Messenger of God did not inform anyone other than Ḥudhayfa about them. When the Prophet died, and it was the caliphate of ‛Umar b. al-Khaṭṭāb, all of a sudden a man who ‛Umar thought was from that group died. So he took Ḥudhayfa by the hand, and led him to pray over him, and if Ḥudhayfa walked with him ‛Umar would pray over him. But if he snatched his hand and refused to go, he would turn back with him. He said: Ibn Abī Sabra related to me from Sulaymān b. Suḥaym from Nāfi‛b. Jubayr, who said: The Messenger of God did not inform anyone but Ḥudhayfa. They were twelve men and there was not a Quraysh among them. This is confirmed with us.’——

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “কিতাব আল-মাগাজি”- আল-ওয়াকিদি, ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ১০৪২-১০৪৫; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail & Abdul Kader Tayob, পৃষ্ঠা ৫১০-৫১২
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 2