পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থা ও বেকারত্ব

দেখতে দেখতে চলে এল বাঙালির সবচেয়ে বড়  উৎসব শারদ উৎসব! শারদ উৎসবের এই আনন্দে গোটা রাজ্য মাতোয়ারা, চারিদিকে আলো, গান, আড্ডা ও খাওয়া দাওয়ার আনন্দে এই কটা দিন সত্যিই অনবদ্য! বস্তুত আমাদের সদা ব্যস্ত জীবনে এইরকম একটি ছুটি ও নির্মল আনন্দ আমাদের নতুন করে জীবন যুদ্ধে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। বিশ্বাসী অবিশ্বাসী নির্বিশেষে এই উৎসব সকলকে আপন করে নেয় এবং জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ উৎসবে যোগদান করে এটাই হয়তো ইহার স্বার্থকতা!

কিন্তু প্রশ্ন হল শারদ উৎসব কি সব মানুষের জীবনে সমান আনন্দ আনতে পেরেছে? উৎসবের এই আনন্দের দিনে হয়তো আমরা বাস্তবতাকে কিছুদিন ভুলে থাকতে চাই কিন্তু প্রশ্ন হল সত্যিই কি আমরা শারদ উৎসব আনন্দের সঙ্গে পালন করতে পারছি? চারিদিকে একটু চেয়ে দেখলে দেখতে পাব চারিদিকে যেন শ্মশানের শান্তি বিরাজ করছে, কাজকর্ম নেই, শিল্প নেই, চাকরি নেই, শিক্ষা নেই, স্বাস্থ্য নেই, চূড়ান্ত সামাজিক অবক্ষয়ের ছাপ স্পষ্ট! অন্যদিকে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, মূল্যবোধের অবক্ষয়, চারিদিকে ঘুষ, সিন্ডিকেট ইত্যাদি চলছে! চাষি ফসলের প্রকৃত মূল্য পাচ্ছে না, শ্রমিক কাজ পাচ্ছে না অন্যদিকে শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতীদের অবস্থা ভয়াবহ, নিন্দুকেরা বলে এই আমলে ঘুস না দিলে সৎ পথে চাকরি হয় না! যাঁর নিদর্শন স্বরূপ আমরা দেখতে পাই, হাইকোর্টে এমন বহু ক্যান্ডিডেট ধরা পড়েছে যাঁদের প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতায় ছিল না, হাইকোর্ট এই বিষয়কে বিবেচনা করে জনস্বার্থ মামলা দাখিল করেছে, বস্তুত নিন্দুকেরা বলে ইহা হিমশৈলের চূড়া মাত্র!

যাইহোক বর্তমান রাজ্য সরকার চারিদিকে উন্নয়নের ঢাক্কা নিনাদ এমন বাজাচ্ছে যেন পশ্চিমবঙ্গ সত্যিই সোনার বাংলায় পরিণত হয়েছে? বস্তুত তাঁদের সপক্ষে যুক্তি হল এই রাজ্য সরকার কণ্যাশ্রী, যুবশ্রী, সবুজ সাথী, লক্ষীর ভান্ডারের মতো বহু সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প শুরু করেছে যা সমাজের প্রান্তিক মানুষের উপকারে লাগে এবং তাঁদের স্বনির্ভরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে! বস্তুত একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার একাংশ এটিকে মমতা ব্যানার্জি সরকারের মাস্টারস্টোক বলে প্রচার করতে চাইছে এখন প্রশ্ন হল এই মাস্টারস্টোকের যথার্থতা কতটা?

হ্যাঁ এটা সত্য এই পাঁচশো হাজার টাকার লক্ষীর ভান্ডারের মতো প্রকল্প দিয়ে একশ্রেণীর মানুষের ভোট লাভ সম্ভব কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠটি হল এই প্রকল্পটিই কি এই সরকারকে আমলে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান প্রেক্ষাপটের কঙ্কালসার চেহারার প্রতিচ্ছবি প্রস্ফুটিত করছে না? বস্তুত আজ পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কতটা খারাপ যেখানে সাধারণ মানুষকে পাঁচশো হাজার টাকার জন্য লাইন দিতে হয়? বস্তুত গোটা পশ্চিমবঙ্গ কি আজ ভিক্ষাশ্রীতে পরিণত হয়েছে? সাধারণ বেকার যুবক যুবতীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে তাঁদের কি তোলাবাজি, গুন্ডামি ও ভিক্ষাবৃত্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে না?

অথচ আমাদের তথাকথিত সুশীল বুদ্ধিজীবী ও অনুপ্রাণিত সাংবাদমাধ্যম গুলি এগুলি দেখতে পাই না, তাঁদের আলোচনার মূল বিষয় হল দলবদলু নেতা, অন্য রাজ্য জয়ের ঘটনা, কোন এক প্রভাবশালী নেতার পরকীয়া প্রেম কাহিনী, কোন এক জনপ্রিয় অভিনেত্রীর সন্তানের পিতৃপরিচয়ের রসালো খবর ইত্যাদি ইত্যাদি! বস্তুত সাধারণ গরীব খেটে খাওয়া মানুষের জীবন যন্ত্রণা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকার যুবক যুবতীদের জীবন যন্ত্রণা এগুলি সংবাদমাধ্যমে খবর হয় না! একদা সংবাদমাধ্যমকে খুবই শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা হতো, এই কারণেই ইহাকে ‘গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসাবে পরিগণিত করা হত কিন্তু আজ গণতন্ত্রের এই ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ ভয়ংকর ভাবে আক্রান্ত বস্তুত এরা আজ দলদাসে পরিণত হয়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য সত্যি খুবই চিন্তার বিষয়! যাইহোক তবুও কিছু সংবাদমাধ্যম রয়েছে যাঁরা মানুষের দুঃখ দুর্দশা তুলে ধরে, আশাবাদী আগামীদিনে ও তাঁরা তাঁদের কর্তব্য একইভাবে পালন করবে এবং আমাদের গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডল রক্ষা করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে!

তবে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল বেকারত্ব। একদিকে যখন রাজনীতিই অর্থ উপার্জনের মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে তখন স্বভাবতই শিক্ষিত মানুষদের গুরুত্ব সমাজে কমে যাচ্ছে! এই কারণেই আমরা দেখতে পাই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একের পর এক দুর্নীতি যেখানে মেধার পরিবর্তে অর্থকে প্রধান্য দেওয়া হচ্ছে এরফলে আমরা পশ্চিমবঙ্গে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছি! শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড এবং শিক্ষককে বলা হয় সমাজ গড়ার কারিগর! এখন একটা শিক্ষক যে নিজে অসৎপন্থায় চাকরি পাচ্ছে সে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কিভাবে শিক্ষাদেবে সৎ হও, মানুষের মতো মানুষ হও? বস্তুত এরফলে আমাদের ছাত্র সমাজের কাছে আদর্শ শিক্ষকের বড়ই অভাব যাঁর ফলে সমাজ রসাতলে যাচ্ছে!কোন এক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব বলেছিলেন সমাজকে যদি একশো বছর পিছিয়ে দিতে হয় তাহলে তাঁর শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দাও, এটাই আজ পশ্চিমবঙ্গের অপ্রিয় বাস্তবতা! শাসক হয়তো মনে করে, “যতো বেশি জানে, তত কম মানে!” এই কারণ হেতু শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে উদগ্রীব!

যার ফলশ্রুতি হিসাবে আমরা দেখতে পাই সাম্প্রতিক ইউনেস্কোর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে ভারতে 11 লক্ষের বেশি শিক্ষক শূন্যপদ রয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গ 1 লক্ষের অধিক শিক্ষক শূন্যপদ নিয়ে শূন্যতার নিরিখে ভারতের তৃতীয় রাজ্যে পরিণত হয়েছে। বলাইবাহুল্য একদিকে যখন বেকার যুবক যুবতীরা চাকরির দাবিতে আন্দোলন করছে এবং মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি যখন নিজে 11 ই নভেম্বর, 2020 নবান্নে সাংবাদিক সম্মেলন করে ঘোষণা করেছিলেন, “2014 সালের প্রাইমারি টেট পাশ 20 হাজার চাকরি প্রার্থীর 16,500 কে খুব তাড়াতাড়ি এবং বাকিদের ধাপে ধাপে নিয়োগ করা হবে।” তখন এই বঞ্চনা কেন?

অথচ কার্যক্ষেত্রে আমরা কি দেখি মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পর ও প্রাথমিক শিক্ষক পর্ষদ 2014 সালের মেধা তালিকায় 12 হাজার প্রার্থীর নাম প্রকাশ করে, বাকি 8 হাজার প্রার্থীকে এখনও পর্ষদ স্বীকার করেনি! অন্যদিকে উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি, যা বারবার অস্বচ্ছতার অভিযোগে আদালতের নির্দেশে বাতিল হচ্ছে! বলাইবাহুল্য এই সরকারের আমলে প্রতিটি নিয়োগ পরীক্ষাতেই অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠছে এবং আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে, যা চরম লজ্জার বিষয়!

একদিকে মাননীয়া যখন প্রধানমন্ত্রীত্বের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছেন এবং তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস যখন তা প্রচার করছে তখন প্রশ্ন হল পশ্চিমবঙ্গের এই দুরবস্থার কেন? যে মাননীয়া তাঁর রাজ্যের শিক্ষিত বেকার যুবকযুবতীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন না তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারতের উন্নতি করবেন কিভাবে? প্রতিবছর কেন লক্ষ লক্ষ কর্মপ্রার্থীদের কর্মসংস্থানের জন্য ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে হয়? যেখানে পশ্চিমবঙ্গের বেকার যুবক যুবতীরা চাকরির দাবিতে এত আন্দোলন এত সংগ্রাম করে চলেছে সেখানে পশ্চিমবঙ্গ সোনার বাংলা হয় কিভাবে? মাননীয়া যেখানে মাসে দুই কোটি টাকা খরচ করে প্লেনে চড়তে পারেন, মন্দির, মসজিদ, ক্লাব, পুজো কমিটিতে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে পারেন সেখানে বেকার যুবক যুবতীদের চাকরি দিতে পারেন না কেন? কেন সরকারি কর্মচারীদের প্রাপ্য ডি এ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে?

পৃথিবীর ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর এবং জনগণ কিন্তু সবই দেখে তাই অমেরুদণ্ডী বুদ্ধিজীবী ও অনুপ্রাণিত মিডিয়ার দ্বারা ‘বাংলার নব রূপকার’ অভিধায় ভূষিত হলেও ইতিহাস কিন্তু ক্ষমা করবে না! ইতিহাস ঠিকই তাঁর কষ্টিপাথরে বিচার করবে তিনি “বাংলার নব রূপকার না বাংলা ধ্বংসের মূল কান্ডারি” ছিলেন! হিটলারকে ও তৎকালীন জার্মান মিডিয়া ঈশ্বরের প্রতিরূপ হিসাবে তুলে ধরত কিন্তু হিটলারের কি পরিণত হয়েছিল তা বিশ্বজানে! যাইহোক মাননীয়া এখন ও সময় রয়েছে তাই যুবশ্রী, ভিক্ষাশ্রী ইত্যাদি সস্তা জনপ্রিয়তার পথে না গিয়ে বেকার যুবক যুবতীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করুন ও তাঁদের আগামীর চলার পথ প্রশস্ত করুন! না হলে এই দুর্বল, বঞ্চিত, অসহায় যুব সমাজ ঠিকই শিক্ষা দেবে শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র এবং আপনার শাসনকাল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে না ঘৃণ্যভরে লেখা থাকবে তাঁর উত্তর একমাত্র সময়ের গর্ভে নিহিত রয়েছে!

তথ্যসূত্র:-

1) গণশক্তি।

&category=0&date=2021-10-12&button=

2) Bangla Hindustantimes.

https://bangla.hindustantimes.com/bengal/districts/116-lakhs-post-vacant-for-teachers-in-school-who-will-teach-after-puja-vacation-31633794262171.html

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 13 = 22