নতুন এক সমাজ বিরোধী শক্তি বাংলাদেশে দানা বেঁধেছে।

নতুন এক সমাজ বিরোধী শক্তি বাংলাদেশে দানা বেঁধে উঠেছে দীর্ঘদিন যাবৎ, সম্ভবত ২০০৮ সালের কথা, আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই এইসব সমাজ বিরোধীদের প্রতিবাদের মুখে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছে পাঁচজন বাউলের (মরমী লোক সংগীত শিল্পী) ভাস্কর্য অপসারণ করে ফেলতে। আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সম্মুখে নির্মাণাধীন ফকির লালন শাহের ভাস্কর্যও ছিল। এই শক্তির কাছে সরকার এতটাই দুর্বল যে, এই শক্তি আমাদের স্কুল কলেজের পাঠ্য পুস্তকেও বিশাল এক পরিবর্তন আনতে সরকারকে বাধ্য করে, এসব বিষয় আজকের লেখায় আর বিশদ ভাবে আলোচনায় যাচ্ছি না। সমাজ বিরোধ শক্তি বিধর্মীদের যে কোন উপায়ে উৎখাত করে ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সমাজকে করেছে অস্থিতিশীল। ফকির লালন শাহের ভাস্কর্য অপসারণের দাবি নিয়ে এই শক্তিকে সেদিন প্রতিহত করতে পারলে আজ হাইকোর্টের ফটক থেকেও ভাস্কর্য অপসারণ করতে হতো না, এই শক্তিকে আস্কারা দেবার কারণেই সরকারী দল থেকে শুরু করে রাজনীতির প্রতিটি কোনায় শক্তি বৃদ্ধি করার সুযোগ পেয়েছে। আমরা গাছের উপরে পানি ঢেলে দেশ রক্ষার চেষ্টা করেছি বটে আর এই সমাজ বিরোধ শক্তি বাংলাদেশ নামক সজীব গাছটার গোড়াটাই কেটে দিচ্ছে। নতুন এক কালো আইন ডিজিটাল আইসিটি আইনে কখন যে তাদের ধর্মানুভূতিতে কি কারণে আঘাত লাগে তা বোঝে ওঠা দায়।
বিধর্মীদের বাসায় গিয়ে কিছু খেতে নেই, ওদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নেই কথাগুলো শুনেছি হাজার বার। সামিয়ানার নীচে, ওয়াজ মাহফিলে এমনকি কোন ধর্মীয় সমাবেশে এসব কথা শুনতে শুনতে জনসাধারণের মাইন্ড সেট যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে সে দিকটায় আমাদের নজর দেবার সময় কি এখনো আসেনি?
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানেনা সন্তরণ,
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃ মুক্তিপণ!
“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।
কাজী নজরুল ইসলামের কান্ডারী কবিতার অংশটি বেশ আবেগ দিয়েই আবৃত্তি করতে জানি, কিন্তু সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করাতে, বিয়ের কার্ড ছাপাতে এমন কি পাসপোর্ট বানতে গেলও যে জিজ্ঞাসাটা প্রথম মাথায় আসে আমাদের ধর্ম পরিচয়। হুম সেটা আবার কি? ইয়ে মানে আমি সুন্নি, সে শিয়া, উনি হিন্দু বা সে হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছে আর খোকা বেটা পুরাই নাস্তিক। আমি বলছি না ধর্ম পরিচয় দেয়াটা অন্যায় কিন্তু নিজের ধর্ম পরিচয়টাকে যদি সর্বশ্রেষ্ঠ জাহির করতেই হয় তবে মাঝেই পরিলক্ষিত হতে পারে। এদিকে ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে কেউ কেউ বুকে বোমা বেধে যখন শত শত মানুষের মাঝে ঝাঁপিয়ে পরে তখন আবার বেশ ভঙ্গি করেই চোখ মুখ বাঁকা করে বলে উঠি ছ্যা ছ্যা ছ্যা, কি এক কাণ্ড দেখেছেন ভায়া? আমাদের ধর্মে তো এসব বলা নাই। অথচ তারা কোনদিন যাচাই বাছাই করে দেখছেন না ধর্মে সেটা বলা আছে কি নাই।
শুধু মাত্র এইসব অন্ধত্বের কারণে আজ আমরা নিজেরা একেকজন প্রতিযোগিতা করে বাঙালিত্ব বিসর্জন দিয়ে হিন্দুস্তানী যা উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয়, আরবী, ইরাণী, তুরাণী, আফগানী হতে শুরু করেছি। হিন্দুস্তান বা হিন্দি বলয়, আরব, ইরাণ, তুরাণ, আফগানের সভ্যতা ও সংস্কৃতি নিয়ে আমার কোনই বিদ্বেষ থাকার কারণ নেই অবশ্যই তাদের নিজের সংস্কৃতি ধারাকে তারা ঠিক নিজেদের মতো সাজিয়েছে। কিন্তু কোথায় চলেছি আমরা? আমাদের ভাব দেখলে মনে হয় এখানে মানে আমাদের সংস্কৃতিতে কোনও জ্ঞানতত্ত্ব বা সভ্যতা কোন কালেই ছিলই না। ধর্মশালায় বসে ধর্মের বয়ান শুনে আকুল থেকে ব্যাকুল হয়ে যাচ্ছি অথচ ধর্ম গুরারা ঠিক যে ভাষায় ধর্মের কথা বলছেন তার এক অক্ষরও বোঝার আমাদের ক্ষমতা নেই, ধর্ম নিয়ে তাদের তর্জমার যতো অপব্যাক্ষা তা গোগ্রাসে গিলে খাচ্ছি।
ঘরের মেয়ে সন্তান বা স্ত্রী যখন কপালে টিপ ও শাড়ি পড়া চির চেনা বাঙালি নারীর চরিত্র বিসর্জন দিয়ে কক্সবাজরের সমুদ্র সৈকতে বস্তায় বন্দী হয়ে সেলফি খিচে বসে তখন স্বামী হিসেবে বেশ গর্ব করে প্রতিবেশীকে জানিয়ে দেই আমার উনি গলদা চিংড়ির ভুনা বেশ রাঁধতে জানেন ও বেশ ধার্মিক বটে, আহ স্বাদটা এখনো মুখে লেগে আছে।
শিক্ষা জ্ঞান অর্জন করতে বড় বড় পাশ না দিয়ে জ্ঞান অর্জন করাটা খুবই সহজ, কিন্তু বিষয় হচ্ছে আমরা না জেনে বুঝে অন্ধের মতো, মূর্খের মতো ভিন দেশী সংস্কৃতি অনুকরণ যাচ্ছি আর ধরে নিচ্ছি এতেই মনে হয় ধর্ম রক্ষা হয়ে গেছে। আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বিনির্মাণের ক্ষেত্রে আঁকড়ে ধরছি উত্তর ও পশ্চিম ভারত, আরব, ইরাণ, তুরাণ ও আফগানিস্তানকে। আমাদের ভাব দেখলে মনে হয় নিজেদের সংস্কৃতিতে কোনও জ্ঞানতত্ত্ব বা সভ্যতা কোন কালেই ছিলই না।
আমাদের মধ্যে সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে মৈত্রীর চর্চা করতে হবে, বিষয়টি খুবই পরিষ্কার যে ধর্মকে কখনই রাষ্ট্রের সংবিধানে সংযোজিত করা যায় না। বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি সকলের মত ও পথকে স্বীকার করার দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে হবে। ফেইসবুক, ইউ টিউব, ব্লগ লেখক, সিনেমা, সাহিত্য এসবের উপর পাহারাদার বসিয়ে রাখলেই দেশ উদ্ধার হবার সুযোগ নেই বরং বাক স্বাধীনতা রুদ্ধ হবার সম্ভাবনা থাকে।
প্রতিনিয়ত পর্যালোচনামূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে অগ্রসর হতে হবে।
বর্ণ, ধর্ম, সম্প্রদায়, ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয় ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও পার্থক্যের ঊর্ধ্বে গিয়ে রাজনৈতিক ভাবে এক ও অখণ্ড রাজনৈতিক সত্তা রূপে হাজির হবার রাজনৈতিক ইচ্ছা, অভিপ্রায় বা সংকল্প৷ এটাই মূলত ইউরোপীয় অর্থে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যায্যতা ও সিদ্ধতা লাভের ভিত্তি, আধুনিক গঠনতন্ত্রে /সংবিধানে যা বিধৃত থাকে, তা এর দ্বারাই একটি আধুনিক সমাজ তৈরি হয়। আমরা যদি এসব মূল্যবোধ বজায় রাখতে পারি তাহলেই বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে সচল থাকতে পারে।
–মাহবুব আরিফ কিন্তু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 − 53 =