হৃদয়ে শেফালির প্রেম জাগানিয়া উস্কানি সয়ে সয়ে চন্দ্রনাথের চূড়ায়

ভোর পাঁচটায় যখন বাস থেকে নামি সীতাকুণ্ড বাসস্ট্যান্ডে, তখন আর কোনো মানুষ নেই, একা আমি এক নিঃসঙ্গ পর্যটক অন্ধকারে দাঁড়িয়ে; কেবল সীতাকুণ্ডে নয়, এই গ্রহেই আমি এক নিঃসঙ্গ পর্যটক! সীতাকুণ্ডে এই প্রথমবার, মহাসড়ক থেকে পূর্বদিকের ঢালের দিকে একটা ইটের রাস্তা নেমে গেছে, অনলাইন থেকে যতটুকু জেনেছি তাতে মনে হয় এই রাস্তাটিই বাজারের ভেতরে চলে গেছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকি- সীতাকুণ্ড তো আর পাঁচটা সাধারণ উপজেলা নয়, বিখ্যাত পর্যটন এলাকা, সারাবছর প্রচুর পর্যটক আসে, তাহলে এখানে এমন অন্ধকার কেন? কোনো যাত্রী ছাউনি নেই কেন? গভীররাতে এবং ভোররাতে এখানে পর্যটক নামে বাস থেকে, তাদের নিরাপত্তায় নিরাপত্তাকর্মীও থাকা উচিত, কিছুই নেই। এখানে ছিনতাইকারী এসে অনায়াসে পর্যটকদের জিনিসপত্র লুটেপুটে নিতে পারে! এরই মধ্যে কয়েকটা বাস এসে থামলে আরো পর্যটক নামে। তারা সদলবলে, কেবল দুজন আলাদা, সেই দুজনের সঙ্গে আলাপ হয়, তারাও সীতাকুণ্ডে প্রথম এসেছে, বাড়ি ঢাকার কেরানীগঞ্জ।

আমি একলা মানুষ, প্রায় নির্বান্ধব, কিন্তু ঘুরে বেড়াবার প্রচণ্ড বাতিক, সঙ্গত কারণেই ব্যাগপত্র ঘুছিয়ে একাই বেরিয়ে পড়ি। পর্যটন এলাকায় যাবার পর কখনো কখনো দু-একজন পর্যটকের সঙ্গ পাওয়া যায়, এখানে যেমন পেলাম।

তিনজনে পূর্বদিকের ইটের রাস্তায় নেমে একটু এগোতেই দেখি ডানদিকে একটা টয়লেটের সামনে একজন মানুষ বসে আছে, পর্যটকেরা এখানেই প্রাতঃকৃত্য সারেন। একটু এগিয়ে দেখলাম অন্য অনেক জায়গার মতোই যথারীতি নোংরা টয়লেট, শুনেছি মন্দিরের ওদিকে টয়লেট আছে, সদ্য পরিচিত দুই সহযা্ত্রীকে সে-কথা জানাতেই তারাও আর এখানকার টয়লেটের প্রতি আগ্রহ দেখায় না।

আমি ঢাকা থেকেই ফোনে হোটেল নেবার চেষ্টা করেছিলাম, ভেবেছিলাম হোটেলে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে ফ্রেশ হয়ে তারপর চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাব; কিন্তু বেলা দশটা-এগারোটার আগে কোনো হোটেল ফাঁকা হবে না।

সঙ্গী দুজন নাস্তা করার আগ্রহ প্রকাশ করে, একটা সিএনজি নেই, প্রথমে কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করবো, তারপর চন্দ্রনাথ পাহাড়ের দিকে যাব, কিন্তু এই ভোরবেলায় রেস্টুরেন্ট খোলেনি। সিএনজি চালক আমাদেরকে একটা ছোট্ট হোটেলে নিয়ে যায়; নেমে দেখি- রুটি, সবজী, ডিম পাওয়া আছে। কিন্তু তারপর যা দেখি তাতে আমার খাবারের রুচি নষ্ট হয়ে যায়, যে লোক রুটি বানাচ্ছে তার মুখে বিড়ি, রুটি বেলছে আর মাঝে মাঝে বিড়িতে টান দিচ্ছে! অগত্যা রুটি খাবার আশা ত্যাগ করে কলা-বিস্কুট খাবার সিদ্ধান্ত নেই আমরা, সিএনজি চালকের তথ্যমতে যা পাহাড়ের পাদদেশের দোকানগুলোতে পাওয়া যাবে।

একটা গেটের সামনে আমরা সিএনসি থেকে নামি, সিএনজি চালক পথ দেখিয়ে ভেতরে নিয়ে যায়। তখন অন্ধকার কাটতে শুরু করেছে, ভেতরে শান বাঁধানো একটা পুকুর, বেশ কয়েকটি সিঁড়ির ধাপ, তারপর জল। পুকুড়ের পাড় দিয়ে সিএনজি চালক আমাদেরকে টয়লেটের দিকে নিয়ে যায়। সেখানে পুকুরের পাড়ে ধরাকাছা পরিহিত দুজন মানুষ; তারা দু-ভাই, একজন দাঁড়িয়ে, আরেকজন ইটের উনুনের ওপর ছোট্ট একটা সিলভারের পাতিল চাপিয়ে জ্বাল দিচ্ছেন, অর্থাৎ হব্যিষ্যান্ন রান্না করছেন। যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি সম্ভবত ছোট ভাই, আমাদেরকে নিচুস্বরে সতর্ক করেন যাতে সিএনজি চালক শুনতে না পায়- আমরা যেন ব্যাগ রেখে তিনজন একসঙ্গে যেন টয়লেটে না যাই। তারা স্থানীয় মানুষ, হয়ত অভিজ্ঞতা থেকেই তাদের এই সতর্ক বার্তা।

টয়লেট থেকে ফিরলে, দর্শনার্থীদের জন্য তৈরি হাত-মুখ ধোয়ার বেসিন দেখিয়ে দেনসেই দাঁড়িয়ে থাকা ভাই। হাত-মুখ ধুয়ে আবার দু-ভাইয়ের কাছে এসে দাঁড়াই। কথা-প্রসঙ্গে জানতে পারি তাদের মা মারা গেছেন, হবিষ্যান্ন রান্না হলে তারা পিণ্ড দান করবেন। তখন আলো ফুটে গেছে, পুকুর এবং পুকুরের পাড় পরিস্কার দেখতে পাই। পাড়ে নানা আকৃতির অনেকগুলি সমাধিমন্দির, এতক্ষণ যাকে পুকুর বলছি, এটাই সেই বিখ্যাত- ব্যাসকুণ্ড। পৌরাণিক আখ্যান মতে, ব্যাসদেব এখানে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন, তাই নাম হয়েছে- ব্যাসকুণ্ড। সেই সাড়ে তিন হাজার বছর আগে ব্যাসদেব উত্তর ভারত থেকে এখানে এসেছিলেন অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে! না কি এর পিছনে অন্য কোনো আখ্যান আছে? মনে সন্দেহ জাগা খুব স্বাভাবিক। পুকুরটি অতীতে নাকি কুণ্ড আকৃতির-ই ছিল, দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে খনন করে বড় করা হয়েছে। কিন্তু পুকুরের জল সবুজ, পাতা-প্লাস্টিকের প্যাকেট ভাসছে, দেখেই বোঝা যায় ময়লা জল, অথচ দূর-দূরান্ত থেকে পিতৃ-মাতৃহারা মানুষ এখানে পিণ্ড দিতে এসে স্নান করেন। অনেকে পূণ্য লাভের আশায় স্নান করতে আসেন। শিব চতুর্দশীতে চন্দ্রনাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে এখানে বিশাল মেলা হয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়, তাদের অনেকেই পূণ্যলাভের আশায় এখানে স্নান করেন। অথচ জলের এই হাল! স্নানার্থীদের পূণ্যলাভ অনিশ্চিত হলেও, জীবাণুলাভ নিশ্চিত! ব্যাসকুণ্ডের জল সারাবছর পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সচেতন থাকা উচিত।

ব্যাসকুণ্ডের পূর্বদিকের গাছপালার ওপর দিয়ে দূরে মেঘাচ্ছন্ন পাহাড় চোখে পড়ে, পাহাড়ের চূড়ায় একটি ঘরের উপরের অংশ আর বাতি দেখে ছোট ভাইকে জিজ্ঞেস করে জানতে পরি- ওটাই চন্দ্রনাথ পাহাড়, যার চূড়ায় মন্দির!

আবার সিএনজিতে উঠে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে এসে নামি। পাশের দোকান তখনো খোলেনি, আমরা গেট দিয়ে ঢুকে ক্রমশ উপরের দিকে ওঠা শান বাঁধানো পথ বেয়ে উঠতে থাকি, হাতের ডানদিকে পাহাড়ের খাদে এবং ওপরদিকে বেশ কয়েকটি মন্দির দেখতে পাই। সবে সকালের আলো ফুটেছে, ঝোপঝাড়ে এখনো অন্ধকারের রেশ। লতা-পাতার গন্ধ ভেসে আসে নাকে, আর শেফালি ফুলের মিষ্টি গন্ধ মোহগ্রস্ত করে তোলে। রাস্তার পাশের শেফালি গাছের ডাল কোটা দিয়ে নিচে নামিয়ে এক লোক ফুল পাড়ছেন। আমাদের দেখে বলেন, ‘এখনই যাবেন না, আরো পরে যান।’

‘ছিনতাইকারী আছে নাকি?’ জানতে চাই।

‘থাকবার তো পারেই, জীবজন্তুও আছে। এত সকালে গিয়ে কী করবেন? বিপদ হইতে কতক্ষণ! আরো বেলা বাড়ুক, তারপর যান।’

লোকটির পরামর্শ মেনে নিই, তাছাড়া আমাদের খাবার কিনতে হবে, লাঠি ভাড়া নিতে হবে। রাস্তার দু-পাশে রেলিং, আমরা রেলিংয়ের ওপর বসে পড়ি। ভ্রমণের নানা গল্প হয়, কিছু ব্যক্তিগত গল্পও। ছেলে দুটো যখন প্রশ্ন করে জানতে পারে যে আমি বিয়ে করিনি, ওরা অবাক হয়। ওদের বয়স সাতাশ-আটাশ, দুজনেরই স্ত্রী-সন্তান আছে। যেখানেই ঘুরতে যাই, কারো সঙ্গে পরিচিত হলেই আমাকে স্ত্রী-সন্তান সম্পর্কিত প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়, তারপর যখন তারা জানতে পারে যে সন্তান দূরের কথা, আমি বিয়েই করিনি! তারা অবাক হয়, তারপর কেন আমি বিয়ে করিনি সেই সম্পর্কে কৌতুহলী প্রশ্ন করে। এই ছেলে দুটিও ব্যতিক্রম নয়। আমি ওদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চুপ করে থাকি। আমার কান পাখির কলকাকলিতে আর দৃষ্টি নানান রকম গাছপালায়, বাতাসে ভেসে আসা শেফালির গন্ধ হৃদয়ে উস্কানি দিয়ে প্রেম জাগাতে চায়!

দুজন মধ্যবয়সী নারী হাঁটতে হাঁটতে আমাদের সামনে দিয়ে ওপর দিকে যান, দেখেই বোঝা যায় তারা স্থানীয়, অল্প দূরে গিয়ে তারাও শেফালি ফুল কুড়োতে থাকেন, নিশ্চয় পূজার জন্য। আমরা আবার নিচে নেমে আসি, দোকান খুলেছে; দোকান থেকে বিস্কুট, কলা, জল, লাঠি ইত্যাদি নিয়ে আর ব্যাগ রেখে এবার যাত্রা শুরু করি চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ার উদ্দেশে। এরই মধ্যে আরো কয়েকটি দল এসে যাত্রা শুরু করেছে, সবাই হইচই প্রবণ যুবক। ওপর দিকে আরো কয়েকটি দোকান দেখতে পাই, কিন্তু দাম অত্যাধিক বেশি। যেহেতু ভোরে বা খুব সকালে যাত্রা করা ঝুঁকিপূর্ণ, তাই সকালে সীতাকুণ্ড বাজার থেকে দরকারী জিনিসপত্র কিনে যাত্রা করাই ভাল, আবার কখনো এলে তাই করব।

পাকা রাস্তা শেষ হয়ে মাটির রাস্তা শুরু হয়, পথ ক্রমশ চলেছে উপরের দিকে, দু-পাশে অরণ্য, কত যে গাছ, তার ক’টাই বা চিনি। একটা ছোট ছড়া পড়ে সামনে, খুব অল্প জল চুইয়ে পড়ছে, এখান থেকে একটা পথ বামে গেছে, আরেকটা ডানে। দোকানদার বলে দিয়েছে বামেরটা দিয়ে উঠতে আর ডানেরটা দিয়ে নামতে, তাতে কষ্ট কম হবে। আমরা বামের পথ ধরি, মাঝে মাঝে ইটের ভাঙাচোরা সিঁড়ি, মাঝে মাঝে মাটির পথ, বেশ খাড়া, উঠতে কষ্ট হয়, হাঁটু কাঁপে। আমার সঙ্গের দুজন কিছুটা এগিয়ে গেছে, আমি ইচ্ছে করেই পিছিয়েছি এই নিবিড় নির্জন একা উপভোগ করার জন্য, একটু করে উঁঠি আর দাঁড়িয়ে গাছপালা দেখি। ঢাকা শহরে টেলিভিশনে (চাকরিসূতে আমাকে দেখতেই হয়), রাস্তায়, বাজারে, বাসের মানুষের ভিড়ে না চাইলেও প্রতিদিন এত অর্থহীন-অপ্রয়োজনীয় কথা শুনতে হয় যে আমি ক্লান্তবোধ করি; আমার না কথা বলতে ইচ্ছে করে, না শুনতে। আর পাহাড়-অরণ্যে ঘুরতে এলে আমার কথাই বলতে ইচ্ছে করে না, যদি ব্যতিক্রম চিন্তার কিংবা স্থানীয় মানুষ না পাই। পাহাড়ে এলে আমি থম মেরে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকি আর অরণ্যের কথা শুনি!

কিছুদূর পর পরই পথের পাশের ঝোপের মধ্যে মাথা তুলে আছে শেফালি ফুলের গাছ, গাছ ভরা ফুল বাতাসে মিষ্টি গন্ধ বিলায়, এমন নিবিড় অরণ্যে শেফালির এমন মন মাতানো গন্ধ যে ডাকাতের হৃদয়েও প্রেম জাগাতে পারে, আর আমি তো একজন সংবেদনশীল মানুষ, কথাসাহিত্যিক। গাছগুলো নিশ্চয় কেউ লাগিয়েছে, যে-ই লাগাক তাকে ধন্যবাদ।

অক্টোবরের সূর্যের তাপ বড় নিষ্ঠুর, উদয়ের কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝাঁঝালো রোদের তাপ ছড়ায়। প্রচণ্ড গরমে আমি অনবরত ঘামতে থাকি আর গলার গামছা দিয়ে মাথা-মুখ-ঘাড় মুছি, গামছা ভিজে চপচপে হয়ে যায়, গামছা বারবার চিপে ঘাম ফেলি। আর বারবার জল খেয়ে শরীরের জলের ঘাটতি পূরণ করি।

আমি হেঁটে কেওক্রাডাং গিয়েছি, কিন্তু এত কষ্ট হয়নি। এখানে পাহাড় একটু বেশি খাড়া, মাঝে মাঝে সিঁড়ি, কিন্তু সিঁড়ি ভাঙতে আরো বেশি কষ্ট হয়, থরথর করে হাঁটু কাঁপে। কাঁপা কাঁপা হাঁটু নিয়ে খাড়া পথ বেয়ে যখন বিরুপাক্ষ মন্দিরের চাতালে উঠে হাত-পা ছড়িয়ে বসি, তখন কামারের হাপরের মতো ওঠা-নামা করছে বুক।

বিরুপাক্ষ মন্দিরটি ছোট, খয়েরি রঙের টাইলসে বাঁধানো ভিত এবং দেয়াল। দেখেই বোঝা যায় যে নিকট অতীতে মন্দিরটির সংস্কার করা হয়েছে। তবে এভাবে টাইলসে না মুড়ে আদি রূপ অক্ষত রেখে সংস্কার করা উচিত ছিল। ঐতিহ্য আধুনিকতায় মুড়ে দিলে তা বড় অশ্লীল লাগে আর জাতীর মনন ও সংস্কৃতির দেউলিয়াত্ব ফুটে ওঠে।

এখান থেকে পশ্চিমদিকে সবুজে মোড়া সীতাকুণ্ড শহর দৃষ্টিগোচর হয়, যত না ঘর-বাড়ি তার চেয়েও বেশি সবুজ। পূর্বদিকে যতদূর দুষ্টি যায় কেবলই সবুজ পাহাড়শ্রেণি চোখে মায়াঞ্জন বুলিয়ে দেয়!

এবার চন্দ্রনাথের চূড়ায় যাবার পালা, বিরুপাক্ষ মন্দিরচত্ত্বর ত্যাগ করে যাত্রা শুরু করি, একটু নিচের দিকে নেমে আবার উপরে উঠতে হয়। বামদিকে একটা টঙ ছোট্ট দোকান; এখানে জল, বিস্কুট, পেয়ারা, শসা, লেবু ইত্যাদি পাওয়া যায়। কিন্তু দাম অত্যাধিক বেশি, যদিও সীতাকুণ্ড বাজার থেকে এখানে পণ্য বয়ে আনা খুব কষ্টসাধ্য, সেই কষ্টের কথা মাথায় রেখেও দামটা অনেক বেশি এটা বলা যায়। কয়েকটা পেয়ারা কিনে খেয়ে আবার যাত্রা শুরু করি, চড়াই-উৎড়াই পথ। পথের পাশের একটা পাথুরে পাহাড়ের গায়ে বিস্তর লেখাপড়ার চিহ্ন দেখতে পাই; দেয়ালের মতো অনেকটা পাথর জুড়ে লেখা- অমুককে ভালবাসি, অমুক+তমুক ইত্যাদি! আর প্রচুর লাভ চিহ্ন! প্রেমলিপি পেরিয়ে খানিকটা খাড়া পথ উঠে আরেকটি দোকান, সামনে কয়েকটা চাঙা, ফুসফুসকে আরেকটু বিশ্রাম দিতে বসে পড়ি।

উঠে যাবার সময় ফেলে আসা ঢালু পথটার দিকে দৃষ্টি পড়তেই দেখি একজন শেতাঙ্গ বৃদ্ধ উঠে আসছেন, গায়ে হালকা প্রবাল রঙের ফতুয়া, পরনে একই রঙের লুঙ্গি হাঁটুর ওপরে উঠানো, পায়ে একই রঙের জুতো, বামহাতে লাঠি, ডানহাতে একটা স্টিলের পাত্র। মাথার মাসনে এবং মাঝখঅনে টাক, পিছনে এবং দু-পাশে সামান্য সাদা-কালো চুল। বয়স আশির অধিক বলেই মনে হয়, অথচ কী অনায়াস ভঙ্গিতে ঢাল বেয়ে হেঁটে আসছেন! এই বয়সের একজন মানুষকে এভাবে উঠে আসতে দেখে, আর এতটা খাড়া পথ বেয়ে এসেছেন ভেবে আমি বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে থাকি তাঁর দিকে! আমি তাঁর অর্ধেকেরও কম বয়সী, অথচ প্রবল বাতাসের সামনের তিতপল্লার ডগার মতো আমার পা কাঁপে, বলি দেওয়া পাঁঠার মতো ছটফট করে বুক! দোকানদার জানান যে ভদ্রলোক প্রতিদিন পূজা দিতে চন্দ্রনাথ মন্দিরে আসেন, কারো সাথে কথা বলেন না। কিন্তু আমি ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলার লোভ সংবরণ করতে পারি না। তিনি দোকানের কাছে এলে আমি তাঁর সঙ্গ নিই, উপরে উঠতে উঠতে তাঁর আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বলি, ‘হাই, হাউ আর ইউ?’
‘বালো।’
আমি আরো বিস্মিত, ‘আপনি বাংলা জানেন?’
‘কিচু কিচু জানি।’
‘কী নাম আপনার?’
‘পরমানন্দ।’
‘কতোদিন হলো বাংলাদেশে এসেছেন?’
‘২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। যাও যাও হাঁটো।’

তাঁর কথা বলার আগ্রহ নেই। পাহাড় অরণ্যে এলে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করে না ঠিকই, কিন্তু এই ধরনের ব্যতিক্রম জীবন পেলে সে জীবনের গলিতে চোখ রেখে কান পাতার ইচ্ছে জাগে! আবার জানতে চাই, ‘আপনার দেশ কোথায়?’
‘এক দেশ, এক মানুষ।’

বাহ্! এ তো আমারও হৃদয়ের কথা! অপারেশনের পরের কাঁচা সেলাইয়ের মতো এত কাঁটাতারের ক্ষত, এত জাতিভেদ থাকবে কেন পৃথিবীতে! আমি প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসী নই, সৃষ্টিকর্তায়ও না। কিন্তু এই মানুষটি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী, আরো স্পষ্ট করে বললে হিন্দুধর্ম ও হিন্দুধর্মের ঈশ্বরে বিশ্বাসী। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে তিনি হিন্দু পরিবারে জন্মাননি, হিন্দুধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে জীবনের কোনো এক সময়ে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেছেন। যদি ধরেও নিই যে তাঁর ঈশ্বর আছেন, তবু তার ঈশ্বরের চেয়েও তাঁকে উদার ও মহান বলে মনে হয় আমার কাছে, কেননা তাঁর ঈশ্বর ভাবতে পারেননি- ‘এক দেশ, এক মানুষ’। তাঁর ঈশ্বর বিভেদ আর বর্ণবাদের কারিগর, যার প্রমাণ তাঁর আর আমার গায়ের রঙ!

আমি আবার বলি, ‘আপনি এখানে প্রতিদিন পূজা দিতে আসেন?’

তাঁর মুখে বিরক্তি নেই, মৃদু হেসে বললেন, ‘যাও, যাও, হাঁটো।

তিনি হয়ত কোনো মন্ত্র জপ করতে করতে পথ অতিক্রম করেন, আমার জন্য তাতে ব্যাঘাত ঘটছে, আমি আর তাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে অল্প দূরত্ব বজায় রেখে শেফালি ফুল আর পাহাড়ের নিচের দিকের ছবি তুলতে তুলতে হাঁটতে থাকি। একটি প্রশ্ন তাঁকে করতে ইচ্ছে করে- ‘এই যে পৃথিবীতে পর্যটনে এসে জীবনের এতগুলো বছর অতিবাহিত করলেন, এই অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?’

কিন্তু প্রশ্নটি আর করা হয় না, তাঁর সাথে আমার অনেক কথা বাকি রয়ে যায়, এ জীবনে হয়ত আর বলা হবে না, হয়ত দেখাও আর হবে না।

পথের ওপর হাত দুই-আড়াই দূরত্বে দুটো বিদ্যুতের খুঁটি, তিনি হাতের লাঠি দিয়ে খুঁটি দুটোতে বারি দিয়ে মন্দিরের ঘণ্টার মতো শব্দ করতে থাকেন! আহা বিশ্বাস!

আমি পা বাড়াই চন্দ্রনাথের চূড়ার দিকে। হৃদয়ে শেফালির প্রেম জাগানিয়া উস্কানি সয়ে সয়ে অবশেষে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় উঠি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১১৫৫ উঁচু ফুট চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়া, চূড়ায় স্থাপিত শিবের মন্দির। আমার মতো সাধারণ ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছাড়াও এখানে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ আসে মন্দির দর্শন এবং পূজা দিতে। মন্দিরটি কে স্থাপন করেছিলেন তা নিয়ে একাধিক ইতিহাস ও জনশ্রুতি থাকলেও এখানে গাছের সঙ্গে টাঙানো নোটিশে লেখা- ‘এই মন্দির সর্বপ্রথম ত্রিপুরার রাজা গোবিন্দ মানিক্য স্থাপন করেন’।

কৈলাস চন্দ্র সিংহ তাঁর ‘রাজমালা’ গ্রন্থেও চন্দ্রনাথ মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গোবিন্দ মানিক্যের কথা বলেছেন।

চন্দ্রনাথ চূড়ার পূর্ব, পশ্চিম, উত্তরে যত দূর চোখ যায় কেবল সবুজ পাহাড়শ্রেণি; মেঘের বদৌলতে মাঝে মাঝে আলো-ছায়ার খেলা দেখে দৃষ্টি ও মন জুড়িয়ে যায়। দক্ষিণদিকে সিঁড়ি নেমে গেছে, এটার নামার পথ। পশ্চিমদিকে অনেক নিচে সবুজে ঘেরা সীতাকুণ্ড শহর, আরো পশ্চিমে সবুজ মিলেছে সমুদ্রের সঙ্গে। দু-একটি জাহাজ চোখে পড়ে।

ঘোরাঘুরি আর ছবি তোলা শেষে যখন চন্দ্রনাথ চূড়া থেকে নামব ভাবছি, তখন দেখি মন্দিরের বারান্দায় বসে এক মনে কী যেন ভাবছেন পরমানন্দ! হয়ত প্রার্থণা করছেন। বিশ্বাস, কে যে কখন কোন বিশ্বাসের মায়াডোরে বাঁধা পড়ে তা কে জানে! কোন দূর জনপদ থেকে, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-স্বজন ফেলে, হয়ত বিলাসী জীবন ত্যাগ করে; এই যে ভিন্ন এক ভাষা-সংস্কৃতির মাঝে এসে পড়ে আছেন পরমানন্দ, তা তো বিশ্বাসের কারণেই। হয়ত পরকালে মুক্তির পথ খুঁজছেন! পরকালের কথা কে বলতে পারে, তবে ইহকালে তিনি মুক্তি পেয়েছেন। এই যে তিনি নিজের জীবনটা নিজের মতো করে অতিবাহিত বা উপভোগ করতে পারছেন; যে কাজটি করে তিনি আনন্দ পান, সেই কাজটি করতে পারছেন, আমার কাছে এটাই মানব জীবনের মুক্তি। এই মুক্তিতেই জীবনের তৃপ্তি, সুখ ও সার্থকতা। এমন মুক্তি সকলের মেলে না; জগতের বেশিরভাগ মানুষকে সমাজ, সংসার, জীবিকার জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেহ-মন নিঙড়ে অপছন্দের কাজ করে জীবন নিঃশেষ করতে হয়। সম্পদ অর্জন করতে পারলেও এ বড় যাতনাদায়ক জীবন, জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে অনেককেই হয়ত হাহাকার করতে হয়। আমিও পরমানন্দের মতো মুক্তি পেতে চাই, কিন্তু মুক্তি পাচ্ছি না, তাই আমি পরাধীন, আমি অসুখী। আমারও তো ইচ্ছে করে চাকরি-বাকরি ছেড়ে, কোনো এক জনপদে গিয়ে নির্জন জায়গায় একটা বাড়ি করি; তারপর কেবল সাহিত্যচর্চা করে, দোতারা বাজিয়ে আর ভ্রমণ করে একা শিল্পময় জীবন অতিবাহিত করি। যে জীবনের নেশায় আমি বিয়ে পর্যন্ত করছি না, তবু সে জীবন ছুঁতে পারছি না। মানিক বন্যো। পাধ্যায় আক্ষেপ করে অধ্যাপক দেবীপদ ভট্টাচার্যকে বলেছিলেন, ‘দেখো, দুটি ডালভাতের সংস্থান না রেখে বাঙলা দেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না যায়।’ আমি চাকরি ছেড়ে দিলেও সারাজীবন দুটো মাছে-ভাত খেয়ে বাঁচতে পারব যদি না অকারণ বিলাসিতা করি। তবু আমার সেই স্বপ্নের জীবন ছুঁতে পারছি না কেবল পারিবারিক চাপে। কবে যে মিলবে আমার মুক্তি!

রোদের প্রহারের পরে ঝর্ণার শীতল জলে অবগাহন

চন্দ্রনাথ পাহাড় থেকে নেমে সীতাকুণ্ড বাজারে এসে একটা রেস্টুরেন্টে নাস্তা খেয়ে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে মিরসরাইয়ের বাসে উঠি, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মিরসরাই উপজেলার নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা। বাস চলতে থাকে উত্তরদিকে, পূর্বদিকে বাড়িঘর আর সবুজ মাঠের পরে বক্ররেখার মতো পাহাড় চোখে পড়ে, চন্দ্রনাথ পাহাড়ের মন্দিরও দেখা যায়। আমরা নয়দুয়ারী বাসস্ট্যান্ডে নেমে লোকের কাছে নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা যাবার পথ-নির্দেশনা নিয়ে রাস্তা পেরিয়ে পূর্বদিকের একটা ইটের রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করি। এমন ভাঙাচোরা রাস্তা যে কোনো যানবাহন যায় না। ভয়াবহ গরম, অনরবত শরীর নিঙড়ে ঘাম বেরোতে থাকে। কিছুদূর যাবার পর ইটের অবহেলিত জৌলুসটুকুও শেষ, মাটির রাস্তা এঁকে-বেঁকে এগিয়েছে গ্রামের ভেতর দিয়ে, মাঝে মাঝেই জল-কাদা। একটা ছোট মতো বাজার, তারপর রেলগেট পেরিয়ে হাঁটতে থাকি। একটু পরপরই বাড়ি লাগোয়া ছোট ছোট হোটেল, হোটেলের লোকজন আমাদের আহ্বান জানায় খাবারের অর্ডার দিয়ে ব্যাগ রেখে যেতে, কিন্তু আমরা ঠিক করি একেবারে সীতাকুণ্ড ফিরে তারপর খাব। আমরা হাঁটি আর লোকের কাছে জিজ্ঞেস করি যে নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা কত দূর, পথ আর ফুরোয় না, বাড়ি আর গাছপালার কারণে পাহাড়ও দেখা যায় না সব জায়গা থেকে।

দু-পাশে ফসলের মাঠ, ফাঁকে ফাঁকে বাড়ি, আমরা একটা হোটেলের সামনের চাঙায় বসি জল কেনার জন্য, স্থানীয় দু-জন মানুষের সঙ্গে কথায় কথায় জানতে পারি যে এই এলাকায় কোনো টিউবয়েল নেই! পাইপ বসানো যায় না, মাটির একটু গভীরে গেলেই কেবল পাথর আর পাথর। ফলে পাহাড়ের পাদদেশের গ্রামগুলির মানুষ জল সংগ্রহ করে দু-তিন কিলোমিটার পশ্চিমের গ্রামগুলো থেকে। টিভি খুললে কিংবা পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালে আমাদের সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মুখে কেবল উন্নয়নের বয়ান শুনতে পাই, রিজার্ভ ব্যাংকে জমা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের কথা শুনতে পাই। অথচ এইসব গ্রামের মানুষের জল আনতে পাড়ি দিতে হয় দুই-তিন কিলোমিটার পথ! এটা একবিংশ শতাব্দী, না কী বৈদিকযুগের কোনো নিভৃত গ্রাম! এই গ্রামগুলিতে পাইপের মাধ্যমে জল সরবরাহ করলে রিজার্ভ ব্যাংকে জমা আমাদের ডলারে খুব বেশি টান পড়বে কী!

আমরা উঠে আবার হাঁটতে শুরু করি, এদিকটায় বাড়ি কম, দু-দিকে কৃষি জমি বেশি, পাহাড় ক্রমশ কাছে আসছে। অবশেষে রাস্তার শেষ মাথায় এসে পৌঁছাই, টিকিট ঘর থেকে টিকিট সংগ্রহ করি, জনপ্রতি বিশ টাকা করে টিকিট। এখন থেকে সামনের পথ অসমতল, আর এক-দেড় কিলোমিটার এগোলেই নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা, তারপর পাহাড়ের আরো ভেতরে আরো ওপরদিকে তিনটি ঝর্ণা আছে। এই যে আমরা পাঁচ-সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার পথ রোদে পুড়ে ঘেমে নেয়ে পায়ে হেঁটে এসেছি, এই কষ্টটা আমাদেরকে দিয়েছে আমাদের রাষ্ট্র। পর্যটন শিল্পের প্রতি এই রাষ্ট্রের কোনো মনোযোগই নেই! থাকলে কর্তৃপক্ষ এই রাস্তাটুকু পিচ ঢালাই করে দিত, সমতলে হেঁটে শক্তিক্ষয় করার কোনো মানে হয় না। এমনিতেই এখান থেকে চারটি ঝর্ণা দেখতে পাহাড়ের চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে অনেক পথ হাঁটতে হয়।

সামনে এগোতেই ছড়া, জুতো-জিন্স খুলে হাফপ্যান্ট পরি, আঁকা-বাঁকা এই ছড়াটিই চারবার পেরোতে হয়। ছড়া থেকে অল্প দূরে কয়েকটি বাড়ি, পাহাড়ের ওপরদিকে ত্রিপুরাদের একটি পাড়া আছে। জঙ্গলে ঢুকে ছড়ার মধ্য দিয়েই এগোতে থাকি, সঙ্গী দু-জন অনেকটা এগিয়ে যাওয়ায় ওদের দেখতে পাই না, স্থানীয় এক লোকের কাছে পথ-নির্দেশনা নিয়ে একা একা এগোই। এখন বর্ষাকাল নয়, তাই ছড়ায় স্রোতও খুব বেশি নয়, জল হাঁটুর নিচে। অরণ্যের মায়ায়, উঁচু উঁচু গাছের ছায়ায় ছায়ায় ছড়ার জল ভাঙি, পাথর ডিঙোই, ক্রমশ সামনে বড় বড় পাথর। আশপাশে কোনো মানুষ নেই, কেবল পাখ-পাখালির কল-কাকলি, মনে হয় রামায়ণের কালের দণ্ডকারণ্যে আছি আমি! একেবারে শেষে দু-দিকে বিশাল কয়েকটি পাথর আর গাছ নিচের দিকে এমনভাবে ঝুঁকে এসেছে যে দেখে মনে হয় প্রকৃতি দেউড়ি বানিয়ে রেখেছে মানুষকে স্বাগত জানানোর জন্য! সেই দেউড়ি পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছাই নাপিত্তাছড়া ঝর্ণার কোলে, দশ-বারটি সদ্য কৈশোর পেরোনো যুবক তখন ঝর্ণার জলে হুটোপুটি করছে!

ক্লান্ত, বড্ড ক্লান্ত শরীর, পা দুটো বিশ্রাম চায়, সেই সকাল থেকে পাহাড়-সমতলে বহু পথ হেঁটেছি। এখানেই শেষ, বাকি তিনটি ঝর্ণায় আমরা যাব না, একদিনে এত হাঁটার ধকল আর নিতে পারব না। এরপর আবার যাব গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতে।

ঝর্ণাটি বেশ বড়, কিন্তু বর্ষাকাল না হওয়ায় জলধারা তীব্র নয়। চারিদিকে উঁচু পাহাড় আর গাছপালায় বেষ্টিত ছায়াচ্ছন্ন পরিবেশ, পাখ-পাখালির কিচির-মিচির শব্দ। কতকাল ধরে এই পাহাড় এমনি আছে মৌন ঋষির মত, কতকাল ধরে এই ঝর্ণা এমনি আছে চপল ঋষিকন্যার মত! যে প্রথম আবিষ্কার করেছিল এই ঝর্ণা, তার পদচিহ্ন হারিয়ে গেছে, আমাদের পদচিহ্নও হারিয়ে যাবে, অনাগত কালের আরো কত মানুষের পদচিহ্নও বিলীন হবে এখানে। জীবন অতিশয় ছোট; মন যত পারো ঘুরে নাও আর পৃথিবীর গোপন রূপ অবলোকন করো, রস আস্বাদন করো, গন্ধ উপভোগ করো! ব্যাগ রেখে জলে নেমে পড়ি। আহ্, কী শীতল জল! রোদের তীব্র প্রহার আর ক্লান্তির পরে শরীর সঁপে দিই ঝর্ণার জলে, শীতল সুখের অবগাহনে!

গুলিয়াখালির ঘাসের গালিচায় মন কেমনের বিকেল

নাপিত্তাছড়া থেকে ফিরে সীতাকুণ্ড বাজারের আল-আমিন হোটেলে খেয়ে সিএনজিতে চড়ে যাত্রা করি গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশে। বেড়িবাঁধের কাছে সিএনজি থেকে নেমে বাঁধের ওপরে উঠে দেখি সামনে চর, আবার অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। চরের ভেতরের পায়ে চলা পথ ধরে শুরু করি হাঁটা, অনেকেই হেঁটে যাচ্ছে সৈকতের দিকে, আবার অনেকে ফিরে আসছে। চরে প্রচুর সবুজ ঘাস, গরু চরছে, ছেলেরা ফুটবল খেলছে। বামদিকে কেওড়াগাছের জঙ্গলের পাশ দিয়ে আমরা হাঁটি, আরো কিছুটা এগোলেই চরের মধ্যে প্রচুর কেওড়াগাছের শ্বাসমূল, একটু দেখে সাবধানে এগোতে হয়, হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেই বিপদ। একটা খালের ওপরের ছোট্ট সাঁকো পেরিয়ে পৌঁছাই সবুজ সৈকতের কাছে, শিরা-উপশিরার মতো খাল আর সবুজ ঘাস, তারপরেই সমুদ্রের জলরাশি। জোয়ারের সময় খালগুলো জলে ভরে যায়। আমরা জোয়ারের অপেক্ষায় সবুজ ঘাসের ওপর বসে থাকি। বসেই থাকি, তীর্থের কাকে মত বসেই থাকি, জোয়ার আর আসে না। আমাদের মত আরো অনেকেই জোয়ার দেখার জন্য বসে আছে, কিন্তু সমুদ্র সদয় হচ্ছে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, সমুদ্রের দিকে হেলে পড়েছে লালচে সূর্য। আমি তিনদিনের ছুটি নিয়ে এসেছি, কিন্তু প্রচণ্ড গরম আর সহ্য হচ্ছে না। কাল আবার এই গরমে বেরতে হবে ভাবতেই অস্বস্তি লাগে, ঠিক করি আজই ঢাকা ফিরে যাব। ঢাকা ফেরার কথা ভাবতেই মন কেমন করে ওঠে, ফিরতেও ইচ্ছে করে না, তিনটে দিন প্রকৃতির মাঝে কাটাবো বলেই এসেছি। আরো অনেকগুলো স্পট ঘোরা বাকি। থাক, আবার আসব কোনো এক শীতকালে, এবার ফিরে যাই। জোয়ারের অপেক্ষায় বসে তাকিয়ে থাকি সমুদ্রের দিকে, নিঃসঙ্গ লাগে, মন কেমন করে ওঠে, কেন ওঠে আমি-ই কী তা জানি!

ঢাকা।
অক্টোবর, ২০২১

 

 

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 5