২৪৪: তাবুক যুদ্ধ-১৭: ‘মোজেজা প্রদর্শন’- এগারোটি!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

ধর্মশাস্ত্রের প্রায় প্রতিটি ধর্মগ্রন্থই “অবৈজ্ঞানিক ও উদ্ভট” অলৌকিক কিসসা কাহিনী সমৃদ্ধ। ইসলাম ধর্মের ‘কুরআন সিরাত ও হাদিস’ গ্রন্থগুলো ও এর ব্যতিক্রম নয়। ‘কুরআনের’ অসংখ্য অবৈজ্ঞানিক ও উদ্ভট অলৌকিক কিসসা কাহিনীর (মোজেজা) আলোচনা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে (পর্ব: ১৭ ও ২৩-২৫)। ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসে “সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ সিরাত গ্রন্থের” লেখক মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ও পরবর্তী সিরাত লেখক আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় আমারা জানতে পারি, তাবুক অভিযানের প্রাক্কালে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এগারো-টি ‘মোজেজা’ প্রদর্শন করেছিলেন। মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনায় চারটি ও আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় অতিরিক্ত আরও সাত-টি। আদি উৎসের বর্ণনায় সেই অলৌকিক কিসসা কাহিনীগুলো ছিল নিম্নরূপ।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ খ্রিস্টাব্দ) বর্ণনা:
(আল-ওয়াকিদি ও আল-তাবারীর বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ।)
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৪৩) পর:

মোজেজা এক: ‘হঠাৎই মেঘের আগমন ও প্রচুর বৃষ্টিপাত!’ [1] [2] [3]

‘আল্লাহর নবী আল-হিজর (যাকে প্রায়ই মাদাইন সালিহ বলা হয়) অতিক্রম করার প্রাক্কালে যাত্রা বিরতি দেন ও লোকেরা সেটির কূপে পানি দেখতে পায়। তারা যখন যাত্রা করে, আল্লাহ নবী তাদের-কে বলেন, “এর কোন পানিই পান করো না কিংবা ওযুর জন্য ব্যবহার করো না। তোমারা যদি এটি ময়দার তাল (dough) তৈরির কাজে ব্যবহার করে থাকো, তবে তা উটগুলোকে খাওয়ায়ে দিও; তোমারা এর কিছুই খেও না। তোমাদের কেউ যেন কোন সঙ্গী ব্যতিরেকে রাতে বাহিরে না যায়।” লোকদের-কে যা বলা হয়েছিল তারা তাই করে, ব্যতিক্রম শুধু বানু সাঈদা গোত্রের দুজন লোক: তাদের একজন বাহিরে বের হয়েছিল মল-মূত্র ত্যাগ করতে ও অপরজন তার নিজের একটা উট খুঁজতে। প্রথম জন তার রাস্তায় আধা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে ও দ্বিতীয়জন বাতাসের প্রকোপে দুই তাঈ পাহাড়ের উপর নিক্ষিপ্ত হয়। এই বিষয়টি আল্লাহর নবীকে জানানো হয় ও লোকদের মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে তিনি তাদের-কে একা বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। অতঃপর তিনি যে লোকটি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল তার জন্য দোয়া করেন ও সে সুস্থ হয়ে যায়; তাঈ গোত্রের এক লোক অন্য লোকটি-কে মদিনায় আল্লাহর নবীর কাছে নিয়ে আসে।

এই উপাখ্যানটি আবদুল্লাহ বিন আবু বকর হইতে বর্ণিত, আব্বাস বিন সাহল বিন সা’দ আল-সাইদির কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে। আবদুল্লাহ আমাকে বলেছে যে আব্বাস তাকে বলেছিল যে তারা ছিল কারা, কিন্তু তা গোপনীয়। তাই সে আমার কাছে তাদের নামগুলো প্রকাশ করে নাই। সকালে যখন লোকদের কাছে কোন পানি ছিল না, তারা আল্লাহর নবীর কাছে এসে অভিযোগ করে। তাই তিনি দোয়া করেন। অতঃপর আল্লাহ এক মেঘের আগমন ঘটায় ও অতঃপর এত বৃষ্টিপাত হয় যে তারা সন্তুষ্ট হয় ও তাদের প্রয়োজন মত তা তারা বহন করে নিয়ে যায়।

আসিম বিন উমর বিন কাতাদাহ < মাহমুদ বিন লাবিদ <বানু আবদুল-আশাল গোত্রের লোকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে যা বলেছে, তা হলো, সে মাহমুদকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “লোকেরা কি তাদের ভিতরে অবস্থানকারী মুনাফিকদের চিনতো?” সে জবাবে বলেছিল যে লোকেরা জানতো যে তার ভাই, তার বাবা, তার চাচা ও তার পরিবারে লোকদের মধ্যে মুনাফেকি বিদ্যমান, তথাপি তারা একে অপরের বিশয়-টি গোপন রাখতো।”

অতঃপর মাহমুদ বলেছিল: আমার উপজাতির কিছু লোক আমাকে এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছে যার ভণ্ডামো ছিল কুখ্যাত। আল্লাহর নবী যেখানেই যেতেন সেখানেই সে যাত্রা করতো (আল-ওয়াকিদি: ‘সে ছিল আউস বিন কায়েযি; আর কিছু লোক বলে, যায়েদ বিন আল-লুসায়েত।’)। যখন ‘আল-হিজরের ঘটনাটি ঘটে’ ও আল্লাহর নবী দোয়া করেন যেমনটি তিনি করতেন ও অতঃপর আল্লাহ এক মেঘ প্রেরণ করে যা থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হয়; তারা বলেছে, ‘আমরা তখন তার কাছে এই বলতে বলতে যাই, “ধিক্ তোমাকে! এরপর তোমার আরও কিছু কি বলার আছে?”’ সে জবাবে বলে, “এটি ছিল এক ক্ষণস্থায়ী মেঘ!” [পর্ব: ২৩২]

মোজেজা দুই: ‘আল্লাহ কর্তৃক নবীকে হারানো উটের সন্ধান দান!’
এ বিশয়ের আলোচনা ‘মুনাফিকদের সংখ্যা ও উপস্থিতি’ পর্বে (পর্ব: ২৩২) করা হয়েছে।

মোজেজা তিন: ‘আবু যর গিফারী সম্বন্ধে নবীর উক্তি সত্য প্রমাণিত!’
এ বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা ‘আবু যর আল-গিফারীর পরিণতি’ পর্বে (পর্ব: ২৩৫) করা হয়েছে।

মোজেজা চার: ‘পাথর থেকে পানির ফোয়ারা নির্গত!’ [4] [5] [6]

‘যাত্রা পথে পানির উৎস ছিল, যা এক পাথর থেকে বের হচ্ছিল ও যা দুই কিংবা তিনজন আরোহীর জন্য ছিল যথেষ্ট। এটি ছিল এক উপত্যকায়, যা মুশাক্কাক (আল-তাবারী: ‘অর্থাৎ, ফাটল, খাঁজ কাটা’) নামে অভিহিত। (আল-ওয়াকিদি: ‘আল্লাহর নবী প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন ও হঠাৎ তিনি নিজেকে তাবুক ও ওয়াদি আল-নাকা নামক এক উপত্যকার মাঝখানে দেখতে পান, যেখানে এক পাথর ছিল, যার নীচ থেকে দুই বা তিনজন আরোহীর জন্য যথেষ্ট পানি প্রবাহিত হচ্ছিল’)। আল্লাহর নবী এই আদেশ করেন যে, যদি কেউ তাঁর আগে সেখানে গিয়ে পৌঁছে, তবে সে যেন তাঁর আসার পূর্ব পর্যন্ত সেখান থেকে কোন পানি না নেয়।

কিছু সংখ্যক আনুগত্যহীন লোক (মুনাফিক) প্রথমেই সেখানে যায় ও তা থেকে পানি তুলে নেয়। (আল-ওয়াকিদি: ‘মুনাফিকদের মধ্যে চার জন তাঁর আগেই সেখানে যায়। তারা হলো: মুয়াত্তিব বিন কুশায়ের, বানু আমর বিন আউফ গোত্রের মিত্র আল-হারিথ বিন বিন ইয়াযিদ আল-তাঈ, ওয়াদিয়া বিন থাবিত ও যায়েদ বিন আল-লুসায়েত।’) আল্লাহর নবী সেখানে পৌঁছার পর থামেন ও দেখেন যে সেখানে কোন পানি নেই। তিনি জিজ্ঞাসা করেন যে কারা প্রথমে সেখানে গিয়েছিল; তাঁকে তাদের নামগুলো জানানো হয়। তিনি চিৎকার করে বলেন, “আমি কি আমার না আসা পর্যন্ত তোমাদের-কে এখান থেকে পানি নিতে নিষেধ করি নাই?” অতঃপর তিনি তাদের অভিশাপ দেন ও তাদের উপর আল্লাহর প্রতিশোধ বর্ষণের আহ্বান জানান।

অতঃপর তিনি নেমে আসেন ও পাথরটির নীচে তাঁর হাতটি রাখেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর হাতে পানি প্রবাহিত হতে থাকে। অতঃপর তিনি পাথরটি-তে পানি ছিটিয়ে দেন ও তাঁর হাত দিয়ে তাতে ঘষা দেন ও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, যেমনটি আল্লাহ তাঁকে করাতে ইচ্ছা করেছিল। অতঃপর তা থেকে পানি ফেটে বের হয়, বজ্রধ্বনির মতো শব্দ করে – তা শুনতে পাওয়া এক ব্যক্তির বর্ণনা মতে। (আল-ওয়াকিদি: ‘মুয়াধ বিন জাবাল বলেছে, “যার হাতে আমার আত্মা তার কসম, আমি সেখান থেকে আসা এক বিকট শব্দ শুনতে পাই, যা ছিল বজ্রধ্বনির মত!”)

লোকেরা তা থেকে পানি পান করে ও তাদের প্রয়োজন মেটায়। অতঃপর আল্লাহর নবী বলেন, “যদি তোমরা বেঁচে থাকো, কিংবা তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, শুনতে পাবে যে এই উপত্যকাটি এর আশে পাশের উপত্যকাগুলোর চেয়ে বেশি উর্বর।”‘

আল-ওয়াকিদির (৭৪৭- ৮২৩ খ্রিস্টাব্দ) অতিরিক্ত বর্ণনা:

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনায় এই চার-টি উপাখ্যান ছাড়াও আল-ওয়াকিদি অতিরিক্ত আরও যে সাত-টি ‘মোজেজার’ উপাখ্যান লিপিবদ্ধ করেছেন, তা হলো এই:

মোজেজা পাঁচ: ‘ ঝরনাটি পানি পূর্ণ হয়ে গেল!’[7]

‘আল্লাহর নবী বলেন: ‘ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল তোমারা নিশ্চিতই আয়ান তাবুকে (Ayn Tabūk) পৌঁছাবে, তোমরা সেখানে দুপুরের আগে পৌঁছতে পারবে না। যে কেহ সেখানে আসবে, সে যেন আমি সেখানে না আসা পর্যন্ত এর কোনো পানি স্পর্শ না করে।’ মুয়াধ বিন জাবাল বলে, ‘আমাদের পৌঁছার আগে দু’জন লোক সেখানে গিয়ে পৌঁছে। ঝর্ণাটির কিছু পানি ছিল, যা দেখতে ডিমের সাদা ফেনার মত। তাই তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, “তোমরা কি কোন পানি স্পর্শ করেছো?” তারা বলে, “হ্যাঁ।” আল্লাহর নবী তাদের অপমান করেন ও তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ যা কিছু তাদের বলতে চান তা তিনি তাদের-কে বলেন।

অতঃপর তিনি তাদের সাহায্যে চামচ দিয়ে কিছু পানি তুলে নেন, একটু একটু করে, যতক্ষণে না তার পুরোটাই একটি পানির ব্যাগের ভিতরে রাখা হয়। অতঃপর নবীজী তাঁর মুখগহ্বর, মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় ধৌত করেন। অতঃপর তিনি সেই পানি পুনরায় ঝরনাটি-তে ফেলে দেন। অতঃপর ঝরনাটি অতিমাত্রায় পানি-ভর্তি হয়ে যায় ও লোকজন তাদের তৃষ্ণা মেটায়। অতঃপর আল্লাহর নবী বলেন, “হে মুয়াধ, এই স্থানটি শীঘ্রই বাগানে পরিপূর্ণ হবে ও যদি তুমি দীর্ঘজীবী হও, তুমি তা দেখতে পাবে।”‘

মোজেজা ছয়: ‘ঝুলি থেকে বের হলো অফুরন্ত খাবার!’ [8]

বানু সা’দ বিন হুদায়েম গোত্রের এক লোক বলেছে: ‘আল্লাহর নবী যখন তাবুকে তাঁর একদল সাহাবীর সাথে উপবিষ্ট ছিলেন, আমি তাঁর কাছে আসি’ – সে ছিল তাদের সপ্তম ব্যক্তি। ‘আমি দাঁড়াই ও সালাম দিই; তিনি বলেন, “বসো!” আমি বলি, “হে আল্লাহর নবী, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই ও আপনি আল্লাহর রসূল!” তিনি বলেন, “তুমি যেন সফলকাম হও!” অতঃপর তিনি বলেন, “হে বেলাল, আমাদের জন্য খাবার নিয়ে এসো!”

সে বলেছে: “বেলাল একটি মাদুর বিছিয়ে দেয়।” অতঃপর সে তার এক চামড়ার ঝুলি থেকে বের করতে থাকে; খেজুর, ময়দা, চর্বি ও পনির – যা তার হাতে আসে তাই টেনে বের করে। তারপর আল্লাহর নবী বলেন, “খাও!” আমরা খাওয়া শুরু করি যতক্ষণে না আমরা তৃপ্ত হই। আমি বলি, “হে আল্লাহর নবী এই খাবারগুলো কি আমি একাই খেয়ে ফেলতে পারি!” আল্লাহর নবী বলেন, “কাফেররা খায় সাতটি পাকস্থলীর খাতিরে; মুমিনরা খায় একটির।”

পরদিন আমি ইসলাম সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাঁর খাবারের সময়টিতে আমি তাঁর কাছে আসি। তাঁর চারপাশে ছিল দশজন লোক। তিনি বলেন, “হে বেলাল, আমাদের খাওয়াও।” সে বলেছে: সে তার হাত দিয়ে এক ব্যাগ থেকে খেজুর বের করা শুরু করে, একের পর এক মুঠোয় ভরে ভরে। সে বলে, “খাও, রাজপদের এই অধিকারীর কাছ থেকে কৃপণতার ভয় করো না।” যে থলিটি সে নিয়ে এসেছিল তার জিনিসগুলো সে ছিটিয়ে দেয় ও বলে, “আমার অনুমান এটি মুদায়ানার খেজুর।”

সে বলেছে: আল্লাহর নবী খেজুরগুলোর উপর তাঁর হাত রাখেন। অতঃপর তিনি বলেন, “আল্লাহর নামে খাও!” তাই লোকেরা খাওয়া শুরু করে ও আমিও তাদের সঙ্গে খাই। আমি খেজুর পছন্দ করি। সে বলেছে: আমি তা খেতে থাকি যতক্ষণে না আমি আর খেতে পারি না। সে বলেছে: অথচ সেগুলোর পরিমাণ একই থাকে যেমনটি বেলাল নিয়ে এসেছিল; যেন আমরা তা থেকে একটি খেজুরও খাই নাই।

সে বলেছে: অতঃপর, পরদিন আমি ফিরে আসি। আর একদল লোক রাত্রি যাপনের জন্য সেখানে ফিরে আসে। তারা ছিল দশজন, কিংবা তার চেয়ে এক বা দু’জন বেশি। আল্লাহর নবী বলেন, “হে বেলাল, আমাদের খাবার দাও!” সে ঐ বিশেষ ব্যাগটি নিয়ে আসে, আমি সেটি চিনতাম; অতঃপর সে তার জিনিসগুলো ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহর নবী তাতে তাঁর হাত রাখেন ও বলেন, “আল্লাহর নামে খাও।” আমরা তা খেয়ে ফেলি যতক্ষণে না তা শেষ হয়। অতঃপর তিনি আগের মত উঠে আসেন, জিনিসগুলো ছিটিয়ে দেওয়া হয়; তিনি অনুরূপভাবে একই কাজ তিন দিন করেন।’

মোজেজা সাত: ‘নুড়ি নিক্ষেপের পর বুদবুদিয়ে কুপের পানি বৃদ্ধি!’ [9]

‘তারা বলেছে: বানু সা’দ হুদায়েম গোত্রের একদল লোক নবীর কাছে আসে ও বলে: হে আল্লাহর রসূল, আমরা আমাদের লোকদেরকে আমাদের কূপের কাছে রেখে এসেছি; যেখানে আছে সামান্য পানি, এই কারণে যে, এটি গ্রীষ্মের উত্তাপের সময়। আমাদের ভয় এই যে, যদি আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ি তবে আমরা বিগড়ে যাব, এই কারণ যে আমাদের আশেপাশে ইসলাম এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অতএব আপনি কি আল্লাহর কাছে আমাদের কূপের পানির কথা জিজ্ঞেস করবেন? যদি তাতে পানি প্রবাহিত হয় তবে আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কোনো জাতি থাকবে না ও আমাদের ধর্মের কারণে কোনো সীমা লঙ্ঘনকারী আমাদের আশপাশ দিয়ে যাবে না।

আল্লাহর নবী বলেন, “আমাকে কিছু নুড়ি-পাথর এনে দাও।” তাই আমি তিনটি নুড়ি-পাথর নিই ও সেগুলো তাঁকে দিই। তিনি তাঁর হাত দিয়ে সেগুলি ঘষেন, অতঃপর বলেন, “এই নুড়ি-গুলো তোমাদের কূপের কাছে নিয়ে যাও ও আল্লাহর নামে সেগুলো তাতে একটা একটা করে নিক্ষেপ করো।” তাই তারা নবীর এলাকা থেকে চলে আসে ও কাজটি সম্পন্ন করে; অতঃপর বুদবুদ করে তাদের কূপটি পানিতে ভর্তি হয়ে যায়। তারা তাদের নিকটবর্তী কাফেরদের বিতাড়িত করে ও তাদের পরাজিত করে। তারা তাদের আশেপাশের ইসলামের বিরুদ্ধবাদীদের পরাজিত না করা পর্যন্ত আল্লাহর নবী মদিনায় ফিরে যান নাই।’

মোজেজা আট: ‘সাতটি খেজুর – তিন ব্যক্তি ইচ্ছামত খেয়েও কমাতে পারে না!’ [10]

‘আবি সাবরা <মুসা বিন সা’ঈদ হইতে <আল-ইরবাদ বিন সারিয়া হইতে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক আমাকে বর্ণনা করেছে যে, সে বলেছে:

যাত্রা বিরতি ও সফরের সময়টি-তে আমি আল্লাহর নবীর গেটের দায়িত্বে সংশ্লিষ্ট ছিলাম। আমরা এক রাত তাবুকে ছিলাম ও এক প্রয়োজনে বাহিরে গিয়েছিলাম। আমরা যখন আল্লাহর নবীর ঘাঁটিতে ফিরে আসি তখন তিনি ও তাঁর সঙ্গে থাকা অতিথিরা আহার সম্পন্ন করেছেন। আল্লাহর নবী তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামা বিনতে আবি উমাইয়া-কে নিয়ে যখন তাঁর তাঁবুর ভিতরে প্রবেশের আকাঙ্ক্ষা করছিলেন, তখন আমি তাঁর সামনে গিয়ে হাজির হই। তিনি বলেন, “রাত্রি থেকে তুমি কোথায় ছিলে?” তাই আমি তাঁকে তা অবহিত করাই। অতঃপর জুয়েল বিন সুরাকা ও আবদুল্লাহ বিন মুঘাফফাল হাজির হয়। অতএব আমরা ছিলাম তিনজন। আর আমরা সকলেই ছিলাম ক্ষুধার্ত। প্রকৃতপক্ষে আমরা নবীজির দ্বারস্থ ছিলাম। আল্লাহর নবী ঘরটির ভিতরে প্রবেশ করেন ও আমাদের খাওয়ার জন্য কিছু একটা খাবারের খোঁজ করেন, কিন্তু তিনি তা খুঁজে পান না।

তিনি আমাদের কাছে আসেন ও বেলাল-কে ডেকে বলেন, “হে বেলাল, তাদের জন্য কি কিছু আছে?” সে জবাবে বলে, “না, যে আপনাকে সত্য সহ প্রেরণ করেছে তার কসম, সত্যিই আমরা আমাদের ব্যাগ ও পাত্রগুলো খালি করে ফেলেছি।” তিনি বলেন, “দেখ। হয়তো তুমি কিছু খুঁজে পাবে।” তাই সে ব্যাগগুলো নিয়ে আসে ও একের পর এক সেগুলো খালি করে। [তা থেকে] একটি-দু’টি করে খেজুর পড়ে, যতক্ষণ না আমি তার দুই হাতের মাঝখানে সাতটি খেজুর দেখতে পাই। আল্লাহর নবী একটি পাত্র আনতে বলেন ও তাতে খেজুরগুলো রাখেন। অতঃপর তিনি খেজুরগুলোর উপর তাঁর হাত রাখেন ও আল্লাহ নাম উল্লেখ করেন, এবং বলেন, “খাও, আল্লাহর নামে!”

আমি খাই; আমি চুয়ান্নটি খেজুর খাই যা আমি গণনা করেছি ও আমার অন্য হাতে তার বিচিগুলো গণনা করেছি। আর আমার দুই সঙ্গীও তাই করেছে, যা আমি করেছি। আমরা তৃপ্ত হই ও আমাদের প্রত্যেকে পঞ্চাশটি করে খেজুর খাই। আমরা আমাদের হাতগুলো উঁচু করি ও অবাক হয়ে চেয়ে দেখি যে সেখানে ঠিক আগের মতই সাতটি খেজুর আছে।”

তিনি বলেন, “হে বেলাল, এটি তোমার ব্যাগে উঠিয়ে রাখো।” নিশ্চিতই খেজুরগুলো স্থলাভিষিক্ত হওয়া ছাড়া তা থেকে কেউই কিছু খায় নাই (Indeed one did not eat from it except the date was replaced)।

সে বলেছে: ——আল্লাহর নবী বলেন: ‘আমি যদি আমার রবের সামনে লজ্জিত না হতাম, তবে আমাদের শেষ ব্যক্তিটি মদিনায় ফিরে আসা পর্যন্ত আমরা এই খেজুরগুলো থেকে অবশ্যই খেতে পারতাম। এলাকার লোকদের মধ্য থেকে এক যুবক উপস্থিত হয়। আল্লাহর নবী তাঁর হাতে খেজুরগুলো নেন ও তার হাতে তুলে দেন। ছেলেটি সেগুলো খেয়ে চলে যায়।’

মোজেজা নয়: ‘ক্ষুধার্ত অনুসারীদের সওয়ারি পশু ভক্ষণ অনুমতি ও অতঃপর!’ [11] [12]

‘আল্লাহর নবী যখন তাবুক থেকে যাত্রার জন্য জড়ো হোন, লোকজন দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে। তারা এভাবেই চলতে থাকে যতক্ষণে না লোকেরা তাঁর কাছে আসে ও তাদের সওয়ারি পশুগুলো (ইমাম মুসলিম: ‘তাদের উটগুলো’) জবাই করে খাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। তাই তিনি তাদের অনুমতি দেন। তারা যখন তা জবাই করতে যাচ্ছিল, উমর ইবনে খাত্তাব তাদের সাথে দেখা করে ও তাদের-কে জবাই স্থগিত করতে বলে।

অতঃপর সে আল্লাহর নবীর তাঁবুর ভিতরে তাঁর সম্মুখে এসে হাজির হয় ও বলে, “আপনি কি লোকদের-কে তাদের সওয়ারী পশুগুলো জবাই করে খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন?” আল্লাহর নবী বলেন, “তারা তাদের ক্ষুধা সম্পর্কে আমার কাছে অভিযোগ করেছিল, তাই আমি তাদের-কে এই অনুমতি দিয়েছি। সৈন্যরা দুই-একটি উট জবাই করবে ও তারা পালা করে অবশিষ্ট সওয়ারি পশুর উপর সওয়ার হয়ে তাদের লোকজনদের কাছে ফিরে যাবে।”

উমর বলে, “হে আল্লাহর নবী, এটা করবেন না। লোকদের কাছে যদি তাদের সওয়ারি পশুর সংখ্যা বেশী থাকে তবে তা উত্তম, কারণ আজকাল পশুরা দুর্বল। বরং আপনি তাদের-কে তাদের বাড়তি খাদ্যগুলো নিয়ে আসতে বলুন, সেগুলো জড়ো করুন ও আল্লাহর কাছে দোয়া করুন; যেমনটি আপনি আল-হুদাইবিয়া থেকে আমাদের তাড়াহুড়া করে ফিরে আসার সময়টিতে করেছিলেন। নিশ্চিতই, মহান আল্লাহ আপনার ডাকে সাড়া দেবে!”

অতঃপর আল্লাহর নবীর বার্তাবাহক ঘোষণা করে, “যার কাছে অতিরিক্ত খাদ্য আছে, সে যেন তা নিয়ে আসে!” তিনি একটি চামড়ার মাদুর বিছিয়ে দেওয়ার আদেশ করেন। লোকেরা যথাযথ ময়দা ও যব ও খেজুর আনা শুরু করে। তা ছিল মুষ্টিমেয়; একটু আটা, বার্লি ও খেজুর। প্রত্যেক ধরনের জিনিস আলাদাভাবে নিচে রাখা হয়েছিল। প্রতিটি জিনসই ছিল খুব সামান্য। —অতঃপর আল্লাহর নবী আসেন ও ওযু করেন ও দু’ই রাকাত নামাজ আদায় করেন। অতঃপর তিনি মহান আল্লাহর কাছে খাবারে বরকত দানের জন্য প্রার্থনা করেন।

আল্লাহর নবীর চারজন সাহাবী একত্রে যে একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করতো, সেটি হলো, যারা উপস্থিত ছিল ও তাঁকে সাহায্য করেছিল, তারা হলো: [১] আবু হুরায়রা, [২] আবু হুমায়েদ আল-সায়েদি, [৩] আবু যুরা, [৪] আল-যুহাননা মাবাদ বিন খালিদ, ও [৫] সাহল বিন সা’দ আল-সায়েদ।

তারা বলেছে: অতঃপর আল্লাহর নবী ঘুরে দাঁড়ান ও তাঁর বার্তাবাহক ঘোষণা করে, “খাবারের জন্য এসো, আর এখান থেকে যা প্রয়োজন তা নিয়ে নাও।” লোকজন এগিয়ে আসে। প্রত্যেকে কমপক্ষে একটি করে পাত্র আনে ও তা ভর্তি করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে: আমি অবশ্যই এক টুকরা রুটি ও সামান্য এক মুঠো খেজুর এনে রেখেছিলাম। অতঃপর, নিশ্চিতই আমি মাদুরটি উপচে পড়া দেখেছি। আমি দুটি ব্যাগ নিয়ে এসেছিলাম ও তার একটি আমি যব দিয়ে ও অন্যটি রুটি দিয়ে ভর্তি করেছিলাম, অতঃপর আমি আমার পোশাকে করে ময়দা নিয়েছিলাম; মদিনায় পৌঁছানো পর্যন্ত তা ছিল আমাদের জন্য যথেষ্ট।

লোকেরা খাবার সংগ্রহ করা শুরু করে ও তাদের শেষ ব্যক্তিটি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তা চালু রাখে। অবশেষে মাদুরটি তুলে ফেলা হয় ও এর উপর যা কিছু ছিল তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। আল্লাহর নবী দণ্ডায়মান ছিলেন। অতঃপর তিনি বলা শুরু করেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নাই ও আমি তার দাস ও তার রসূল। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, যে এটি তার মন থেকে না বলে, তাকে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউই রক্ষা করতে পারে না।”‘

মোজেজা দশ: ‘নবীর আঙ্গুলের মাঝখান থেকে পানির ফোয়ারা নির্গত!’ [13]

‘সে বলেছে: উবায়েদুল্লাহ বিন আবদ আল-আযিয ও তার ভাই আবদ আল-রহমান বিন আবদ আল-আযিয <আবদ আল-রহমান বিন আবদুল্লাহ বিন আবি সা’সা আল-মাযানি হইতে <খাললাদ বিন সুয়ায়েদ হইতে <আবু কাতাদা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে বর্ণনা করেছে যে, সে বলেছে:

আমরা যখন আল্লাহর নবীর সাথে ছিলাম, আমরা সৈন্যদের সাথে রাত্রিতে অগ্রসর হতাম। তিনি প্রত্যাবর্তন করছিলেন ও আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম। ——তারা কেবল থামছিল, কারণ লোকেরা ও ঘোড়াগুলো ছিল তৃষ্ণার্ত। আল্লাহর নবী একটি পাত্র আনতে বলেন ও পানির পাত্রে যা কিছু ছিল তা তিনি ঐ পাত্রে খালি করে দেন। অতঃপর তিনি তার উপর তাঁর আঙ্গুলগুলো রাখেন, আর তাঁর আঙ্গুলগুলোর মাঝখান থেকে পানির ফোয়ারা নির্গত হয়। লোকেরা নিকটস্থ হয় ও তারা তাদের ও তাদের ঘোড়া ও সওয়ারী পশুগুলোর তৃষ্ণা নিবারণ শেষ না করা পর্যন্ত তা থেকে পানি উপচে পড়ে।

প্রকৃতই তাদের শিবিরে ছিল বারো হাজার উট, কেউ কেউ বলে পনের হাজার উট। লোকদের সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজার ও ঘোড়ার সংখ্যা ছিল দশ হাজার। —–‘

মোজেজা এগারো: ‘এক মহিলার কাছ থেকে নিয়ে আসা পানি বহুগুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত!’ [14]

‘তাবুকে চারটি জিনিস ছিল: আল্লাহর নবী যখন মদিনায় ফিরে আসছিলেন, তখন ছিল গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপ। দুই দফায় তৃষ্ণা নিবারণের পর সৈন্যদের তৃষ্ণা ছিল খুবই ভীষণ। কিন্তু কেউ তার ঠোঁট ভেজানোর জন্যও পানি খুঁজে পাচ্ছিল না। তারা এটি নিয়ে আল্লাহর নবীর সাথে বিড়বিড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছিল। তাই তিনি উসায়েদ বিন হুদায়ের-কে গ্রীষ্মের সেই গরমের দিনে ডেকে পাঠান, সে ছিল ছদ্মবেশ-পরিহিত (অবগুণ্ঠিত) অবস্থায়। আল্লাহর নবী বলেন, “সম্ভবত তুমি আমাদের জন্য পানি খুঁজে পাবে।”

অতঃপর সে আল-হিজর ও তাবুকের মাঝখানে থাকা অবস্থায় চারিদিকে তন্নতন্ন করে খুঁজে বালিয়ার (Baliyy) এক মহিলার সাথে এক পানি বহনকারী উট দেখতে পায়। উসায়েদ তার সাথে কথা বলে ও তাকে আল্লাহর নবী সম্পর্কে অবহিত করায়। সে বলে, “এই পানি আল্লাহর নবীর কাছে নিয়ে যাও!” অতঃপর সে সেই পানি তাদের জন্য তার ও হুনাইয়া (Hunayya) যাওয়ার রাস্তার মাঝে রেখে দেয়।

উসয়েদ যখন সেই পানি নিয়ে আসে, আল্লাহর নবী সেটির বরকতের জন্য দোয়া করেন। অতঃপর তিনি বলেন, “এসো, তোমাদের তৃষ্ণা মেটাও!” অতঃপর তাদের মধ্যে এমন একজনও ছিল না, যে তৃষ্ণার্ত ছিল কিন্তু তার তৃষ্ণা নিবারণ হয় নাই৷ অতঃপর তিনি তাদের সওয়ারী পশু ও ঘোড়াগুলো-কে আনতে বলেন; তারা পান করতে থাকে যতক্ষণে না তাদের তৃষ্ণা মেটে।

কথিত আছে: প্রকৃতই আল্লাহর নবী এই নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, উসায়েদ যে পানি এনেছিল তা যেন বেদুইন প্রহরীদের পানি পানের এক বিশাল পাত্রে ঢেলে দেওয়া হয়। অতঃপর তিনি তা তাঁর হাতে তুলে নেন ও তাঁর মুখমণ্ডল ও হাত ও পা ধৌত করেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। অতঃপর তিনি তাঁর হস্তদ্বয় উপরে উঠান, তা প্রসারিত করেন ও ঘুরে দাঁড়ান। আর পাত্রটি বুদ্বুদীয়ে উঠা পানিতে ভর্তি হয়ে যায়। আল্লাহর নবী বলেন, “যোগান দাও!” অত:পর তার পানি বৃদ্ধি পায়। লোকেরা ছড়িয়ে পড়ে ও তারা এটির জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, একশত অথবা দুইশত; তারা তা পান করে। নিশ্চিতই বাটিটি তে বুদ্বুদীয়ে বের হওয়া পানির ধারা প্রবাহিত ছিল। অতঃপর আল্লাহর নবী শান্ত হোন ও ঠাণ্ডা পানি দ্বারা নিজেকে শীতল করেন।’

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) জন্মের ৪৩ বছর পরে জন্মগ্রহণকারী আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) সিরাত গ্রন্থের বর্ণনায় এইসব উদ্ভট ঘটনাগুলোর বর্ণনার পরিমাণ, ইবনে ইশাকের বর্ণিত ঘটনার চেয়ে “অতিরিক্ত আরও দুইগুণ বেশী!” চার বনাম অতিরিক্ত আরও সাত! আর ইবনে ইশাকের জন্মের ৮০ বছর পরে জন্মগ্রহণকারী মুহাম্মদ ইবনে সা’দের (৭৮৪-৮৪৫ সাল) লিখিত সিরাত (‘কিতাব আল-তাবাকাত আল-কাবির’) গ্রন্থে এইসব উদ্ভট ঘটনাগুলোর বর্ণনা অসংখ্য; আর তাঁর জন্মের ১০৬ বছর পর জন্মগ্রহণকারী ইমাম বুখারী (৮১০-৮৭০ সাল) ও তারও পরে জন্মগ্রহণকারী অন্যান্য হাদিস গ্রন্থের লেখকদের বর্ণনায় তা “নবী মুহাম্মদের পায়খানা-পেশাব ও থুথু-ঘাম মোবারকের” মোজেজা পর্যন্ত বিস্তৃত!

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হলো ‘কুরআন’। সেই কুরআনেরই পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি, অবিশ্বাসীদের বারংবার অনুরোধ ও চ্যালেঞ্জ সত্বেও নবী মুহাম্মদ তাঁদের-কে “একটি মোজেজাও” দেখাতে পারেন নাই, যার বিস্তারিত আলোচনা “মুহাম্মদের মোজেজা তত্ত্ব” পর্বে (পর্ব: ২৩-২৫) পর্বে করা হয়েছে। কুরআন পরবর্তী সিরাত ও হাদিস লেখকদের এই সকল বর্ণনার উৎস হলো ইসলামে নিবেদিত-প্রাণ মুহাম্মদ অনুসারীরা। তাঁদের এই উপাখ্যান-গুলো যে সত্য নয়, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, “কুরআন” ও তাঁর রচয়িতা নবী মুহাম্মদ নিজেই! ওপরে বর্ণিত “মোজেজা উপাখ্যানের” একটি বর্ণনাও ‘কুরআন’ সমর্থিত নয়।

তাবুক অভিযানের প্রাক্কালে স্বঘোষিত আখেরি নবী মুহাম্মদ আর যে দাবীগুলো করেছেন, আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় তার উল্লেখযোগ্য হলো: [15]

[১] ‘সাপের বেশে কুরআন শুনতে ইচ্ছুক এক জীনের আগমন!’

‘তারা বলেছে: তাদের পদযাত্রার সময় লোকেরা একটি সাপ দেখতে পায়। এর শক্তি ও চলার গতি সম্পর্কে উল্লেখ করা হয় ও লোকেরা সেখান থেকে সরে যায়। সেটি আল্লাহর নবীর সম্মুখে না পৌঁছা পর্যন্ত এগিয়ে যায়, আর তিনি তাঁর উটের পিঠের উপর দীর্ঘ সময় যাবত থেমে থাকেন। জনগণ তা পর্যবেক্ষণ করে। অতঃপর সেটি কুণ্ডলী পাকিয়ে রাস্তা থেকে সরে যায় ও কিছুক্ষণ সেখানেই থাকে। লোকেরা এগিয়ে এসে আল্লাহর নবীর সাথে যোগ দেয়, আর তিনি তাদের বলেন, “এ কে তা কি তোমারা জান?” তারা জবাবে বলে, “শুধু আল্লাহ ও তার রসূলই তা জানেন!”

তিনি বলেন, “নিশ্চয়ই এ হলো আটটি জিনের একটি দলের একজন, যারা কুরআন শুনতে চায়। এ ভেবেছিল – আল্লাহর নবী যখন তাঁর দেশে বসতি স্থাপন করবে – তখন এ তাঁকে অবশ্যই সালাম (greet) জানাবে। এই হলো সেই একজন যে তোমাদের সালাম জানাচ্ছে। সুতরাং, তোমরা তাকে সালাম করো ”

লোকেরা সকলেই বলে, “অতএব তোমার প্রতি শান্তি ও আল্লাহর আশীর্বাদ বর্ষিত হোক!” আল্লাহর নবী বলেন, “আল্লাহর উপাসকদের-কে ভালোবাসো তা সে যেই হোক না কেন।”- [অনুবাদ- লেখক।]

>>> উদ্ভট দাবী! মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

[২] ‘এক বিখ্যাত মুনাফিকের মৃত্যু কল্পে তাবুকে এক প্রবল ঝড়ের আবির্ভাব!’

‘এক প্রবল ঝড়ের আবির্ভাব তাবুক আলোড়িত করে ও আল্লাহর নবী বলেন, “এটি হলো এমন একজন মুনাফিকের মৃত্যুর জন্য যে তার মুনাফেকির জন্য বিখ্যাত।” সে বলেছে: তারা মদিনায় এসে পৌঁছে ও দেখতে পায় যে এক মুনাফিকের মৃত্যু হয়েছে, যে তার মুনাফেকির জন্য বিখ্যাত।’ –— [অনুবাদ- লেখক।]

>>> আল-ওয়াকিদি সেই মুনাফিকের কোন নাম উল্লেখ করেন নাই। নিশ্চিত রূপেই সেই বিখ্যাত মুনাফিকটি “আবদুল্লাহ বিন উবাই ছিলেন না!” কারণ, আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যু হয়েছিল হিজরি ৯ সালের জিলকদ মাসে। তাবুক অভিযান শেষে নবী মুহাম্মদের মদিনায় প্রত্যাবর্তন (রমজান, হিজরি ৯সাল) করার দুই মাস পরে।

[৩] ‘আমাকে পাঁচটি সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা আমার আগে কাউকে দেওয়া হয়নি।‘

‘আবদুল্লাহ বিন উমর যা বলতো, তা হলো: আমরা তাবুকে আল্লাহর নবীর সাথে ছিলাম। তিনি সারারাত অবস্থান ও নামাজ আদায় করেন, আর রাতের তাহাজ্জত বৃদ্ধি করেন। প্রতিবার ঘুম থেকে উঠার পর তিনি তাঁর দাঁত পরিষ্কার করতেন। যখন তিনি নামাযের জন্য দাঁড়াতেন, তখন তিনি তাঁর তাঁবুর সামনে নামাজ আদায় করতেন। লোকদের মধ্যে যারা মুসলমান তারা [সেখানে] অবস্থান করতো ও পাহারা দিতো। সেই রাতগুলোর একটিতে তিনি তাঁর নামাজ শেষ করে তাঁর আশেপাশে থাকা লোকদের কাছে আসেন। তাঁর কাজ শেষ করার পর তিনি তাঁর সঙ্গের লোকদের কাছে যান ও বলেন:

“আমাকে পাঁচটি সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা আমার আগে কাউকে দেওয়া হয়নি। এর প্রথমটি হলো আমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। আমার পূর্বে প্রত্যেক নবীই তার নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্য প্রেরিত হয়েছিল। দ্বিতীয়টি হলো: আমার প্রার্থনার জন্য পৃথিবীকে একটি পরিষ্কার স্থান করা হয়েছে। [তৃতীয়] যেখানেই নামাজের সময় হয়, আমি তায়াম্মুম করি ও নামাজ আদায় করি। আমার আগে যারা ছিল তারা গির্জা বা সিনাগগ ছাড়া প্রার্থনা করত না।

[চতুর্থ] লুটের মাল আমার জন্য হালাল (মুক্ত) করা হয়েছে ও আমি তা ব্যবহার করি। আমার পূর্ববর্তীদের জন্য এটি হারাম করা হয়েছিল।

আর পঞ্চম: এটি কি? এটি কি? এটি কি? —” তিনি তিনবার এটি বলেন। তারা বলে: “হে আল্লাহর নবী, এটি কি?” আল্লাহর নবী জবাবে বলেন, “আমাকে বলা হয়েছিল: জিজ্ঞাসা করো, কারণ প্রত্যেক নবীই জিজ্ঞাসা করেছে; এটি আপনার জন্য ও তার জন্য যে সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নাই।”‘—[অনুবাদ -লেখক]।

>>> নবী মুহাম্মদ যে “লুটের মালের স্বত্বভোগী” একজন সন্ত্রাসী নবী ছিলেন, তা নিশ্চিতরূপেই কুরআন সমর্থন করে (কুরআন: ৮:৪১, ৫৯: ৬-৮)। [16]

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬০৫-৬০৬
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী; ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ৫২-৫৫
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp
[3] অনুরূপ বর্ণনা: “কিতাব আল-মাগাজি”- আল-ওয়াকিদি, ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ১০০৬ ও ১০০৮-১০০৯; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail & Abdul Kader Tayob, পৃষ্ঠা ৪৯৩ ও ৪৯৪
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[4] Ibid মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬০৮
[5] অনুরূপ বর্ণনা: Ibid আল-তাবারী: ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ৬০
[6] অনুরূপ বর্ণনা: Ibid আল-ওয়াকিদি: পৃষ্ঠা ১০৩৯; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা ৫০৯
[7] Ibid আল-ওয়াকিদি: পৃষ্ঠা ১০১২-১০১৩; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা ৪৯৬
[8] Ibid আল-ওয়াকিদি: পৃষ্ঠা ১০১৭-১০১৮; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা ৪৯৮-৪৯৯
[9-11] Ibid ওয়াকিদি: পৃষ্ঠা ১০৩৪-১০৩৯; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা ৫০৭-৫০৯
[12] অনুরূপ বর্ণনা- সহি মুসলিম: বই ১, হাদিস নম্বর ৪২
https://quranx.com/hadith/Muslim/USC-MSA/Book-1/Hadith-42/
[13-14] Ibid ওয়াকিদি: পৃষ্ঠা ১০৪০-১০৪২; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা ৫০৯-৫১০
[15] Ibid ওয়াকিদি: পৃষ্ঠা ১০১৫ ও ১০১৯-১০২২; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা ৪৯৭ ও ৪৯৯-৫০০
[16] কুরআনের উদ্ধৃতি ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক বিতরণকৃত তরজমা থেকে নেয়া। অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। http://www.quraanshareef.org/
কুরআনের ছয়জন বিশিষ্ট ইংরেজি অনুবাদকারীর ও চৌত্রিশ-টি ভাষায় পাশাপাশি অনুবাদ: https://quran.com/ ]

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.