২৪৫: তাবুক যুদ্ধ-১৮: সুরা তাওবার ‘দ্বিতীয় অংশ’- শেষ নির্দেশ!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

অধিকাংশ শিক্ষিত ইসলাম অনুশীলনকারী মুসলমানই বোধ করি অবগত আছেন যে ‘সুরা তাওবাহই’ হলো কুরআনের একমাত্র সুরা যার প্রারম্ভে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ বাকটি নেই। কিন্তু যে তথ্যটি জগতের প্রায় সকল অপণ্ডিত ইসলাম বিশ্বাসীদেরই অজানা, তা হলো: সম্পূর্ণ এই সুরাটি মুহাম্মদ দু’টি সম্পূর্ণ বিপরীত-ধর্মী প্রেক্ষাপটে নাজিল করেছিলেন। শুধু তাইই নয়, বর্তমান কুরআনে মুহাম্মদের সেই বানীগুলো সংকলিত হয়েছে সম্পূর্ণ “উল্টোভাবে!” অর্থাৎ আগে নাজিল-কৃত আয়াতগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছে সুরাটির “দ্বিতীয় অংশে”, আর পরে নাজিল-কৃত আয়াতগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছে সুরাটির “প্রথমাংশে”! এই সুরার শেষের দু’টি আয়াত (১২৮-১২৯) মক্কায় অবতীর্ণ।

আগে নাজিল-কৃত সুরা তাওবাহর দ্বিতীয় অংশের আয়াতগুলোর (আয়াত নম্বর ৩৮-১২৭) সময়কাল মোটামুটিভাবে, অক্টোবর-নভেম্বর, ৬৩০ সাল (তাবুক অভিযান: রজব, হিজরি ৯সাল) থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারি-মার্চ, ৬৩১ সাল (আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যু: জিলকদ, হিজরি ৯সাল) পর্যন্ত। এই বানীগুলো মুহাম্মদ হাজির করেছিলেন ‘তাবুক অভিযান’ ও সেখান থেকে তাঁর মদিনায় প্রত্যাবর্তনের পরের সময়টিতে। আর এর বিষয়বস্তু হলো ‘তাবুক অভিযানের’ প্রাক্কালে তাঁর আদেশ যথাযথ পালন না কারী অনুসারী মুমিন ও মুনাফিকদের উদ্দেশ্যে তাঁদের কার্যকলাপের বর্ণনা, তাঁদের-কে হুমকি-শাসানী ও ভীতি-প্রদর্শন; নির্দেশ পালনকারী অনুসারীদের পার্থিব লুটের মাল (গনিমত) ও অপার্থিব (বেহেশত) প্রলোভন; আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যু-কালীন কিছু বিশয়; ইত্যাদি। [1] [2]

আর পরে নাজিল-কৃত সুরা তাওবাহর “প্রথম অংশের” আয়াতগুলোর (আয়াত নম্বর ১-৩৭) প্রেক্ষাপট হলো সম্পূর্ণ শান্ত পরিবেশে ও তা ঘোষণা করা হয়েছিল মুহাম্মদের মক্কা বিজয়ের পর ‘প্রথম হজ’ এর প্রাক্কালে (কুরআন: ৯:৩); সম্পূর্ণ ধর্মীয় পরিবেশে। যার সময়কাল ছিল মার্চ-এপ্রিল, ৬৩১ সাল (জিলহজ, হিজরি ৯ সাল)। [3] [4]

[পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৪৪) পর]

তাবুক অভিযানের প্রাক্কালে মুহাম্মদ সুরা তাওবাহর যে আয়াত-গুলো হাজির করেছিলেন তা ছিল এই:

মুহাম্মদের ভাষায়: [5]

যা ঘটেছিল:
৯:৩৮ – “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কি হল, যখন আল্লাহর পথে বের হবার জন্যে তোমাদের বলা হয়, তখন মাটি জড়িয়ে ধর, তোমরা কি আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের উপকরণ অতি অল্প।”

>> মুহাম্মদ অনুসারীদের অনেকেই এই অভিযানে যেতে রাজী ছিলেন না!

অতঃপর হুমকি:
৯:৩৯ – “যদি বের না হও, তবে আল্লাহ তোমাদের মর্মন্তুদ আযাব দেবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। তোমরা তাঁর কোন ক্ষতি করতে পারবে না, আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।”

অতঃপর “তাকে” সাহায্যের আহ্বান ও উদাহরণ পেশ:
৯:৪০ – “যদি তোমরা তাকে (রসূলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তার সাহায্য করেছিলেন, যখন তাকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দু’জনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় সান্তনা নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি। বস্তুতঃ আল্লাহ কাফেরদের মাথা নীচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”

>> আশানুরূপ সাহায্য না পাওয়ায় আক্ষেপ! অতঃপর মক্কা থেকে মদিনায় পলায়ন কালে পথিমধ্যে কী ঘটেছিল তার উদাহরণ পেশ (বিস্তারিত: পর্ব: ৪২)। ‘আল-ওয়াকিদি: “যদি তোমরা তাকে (রসূলকে) সাহায্য না কর”, এর অর্থ হলো – মদিনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের মুনাফিকরা; “যখন তাকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল” – এর অর্থ হলো, পৌত্তলিক কুরাইশরা; “তিনি ছিলেন দু’জনের একজন” – এর অর্থ হলো, নবিজী ও আবু বকর; —“তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি” – এর অর্থ হলো, ফেরেশতারা।‘

অতঃপর যুদ্ধের উৎসাহ প্রদান:
৯:৪১ – “তোমরা বের হয়ে পড় স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জামের সাথে এবং জেহাদ কর আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ও জান দিয়ে, এটি তোমাদের জন্যে অতি উত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পার।”

কী কারণে অনুসারীরা ‘রাজী নয়’ তার বর্ণনা:
৯:৪২- “যদি আশু লাভের সম্ভাবনা থাকতো এবং যাত্রাপথও সংক্ষিপ্ত হতো, তবে তারা অবশ্যই আপনার সহযাত্রী হতো, কিন্তু তাদের নিকট যাত্রাপথ সুদীর্ঘ মনে হল। আর তারা এমনই শপথ করে বলবে, আমাদের সাধ্য থাকলে অবশ্যই তোমাদের সাথে বের হতাম, এরা নিজেরাই নিজেদের বিনষ্ট করছে, আর আল্লাহ জানেন যে, এরা মিথ্যাবাদী।”

>> অনুসারীরা জানতেন, বাইজেনটাইন সম্রাটের বিরুদ্ধে জয়লাভ ও গনিমত লাভের সম্ভাবনা (আশু লাভ) অত্যন্ত ক্ষীণ। তাই এত কষ্ট করে মদিনা থেকে ২০দিনের পথ পাড়ি দিয়ে তাবুকে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়! সে কারণেই অনুসারীদের বিভিন্ন মিথ্যা অজুহাত ও ওজর-আপত্তি।

অনুসারীদের ওজর-আপত্তি মেনে নেয়ার পর ‘আপসোস”:
৯:৪৩ – “আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, আপনি কেন তাদের অব্যাহতি দিলেন, যে পর্যন্ত না আপনার কাছে পরিষ্কার হয়ে যেত সত্যবাদীরা এবং জেনে নিতেন মিথ্যাবাদীদের।”

যুদ্ধের উৎসাহ প্রদান:
৯:৪৪ – আল্লাহ ও রোজ কেয়ামতের প্রতি যাদের ঈমান রয়েছে তারা মাল ও জান দ্বারা জেহাদ করা থেকে আপনার কাছে অব্যাহতি কামনা করবে না, আর আল্লাহ সাবধানীদের ভাল জানেন।”

৯:৪৫ – “নিঃসন্দেহে তারাই আপনার কাছে অব্যাহতি চায়, যারা আল্লাহ ও রোজ কেয়ামতে ঈমান রাখে না এবং তাদের অন্তর সন্দেহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, সুতরাং সন্দেহের আবর্তে তারা ঘুরপাক খেয়ে চলেছে।”

অনুসারীদের যুদ্ধে যাওয়ায় গড়িমসি:
৯:৪৬ – “আর যদি তারা বের হবার সংকল্প নিত, তবে অবশ্যই কিছু সরঞ্জাম প্রস্তুত করতো। কিন্তু তাদের উত্থান আল্লাহর পছন্দ নয়, তাই তাদের নিবৃত রাখলেন এবং আদেশ হল বসা লোকদের সাথে তোমরা বসে থাক।”

আনুগত্য-হীন” অনুসারীদের কার্যকলাপ বিষয়ে:
৯:৪৭ – “যদি তোমাদের সাথে তারা বের হত, তবে তোমাদের অনিষ্ট ছাড়া আর কিছু বৃদ্ধি করতো না, আর অশ্ব ছুটাতো তোমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশে। আর তোমাদের মাঝে রয়েছে তাদের গুপ্তচর। বস্তুতঃ আল্লাহ যালিমদের ভালভাবেই জানেন।”

৯:৪৮ – “তারা পূর্বে থেকেই বিভেদ সৃষ্টির সুযোগ সন্ধানে ছিল এবং আপনার কার্যসমূহ উল্টা-পাল্টা করে দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সত্য প্রতিশ্রুতি এসে গেল এবং জয়ী হল আল্লাহর হুকুম, যে অবস্থায় তারা মন্দবোধ করল।”

৯:৪৯ – “আর তাদের কেউ বলে, আমাকে অব্যাহতি দিন এবং পথভ্রষ্ট করবেন না। শোনে রাখ, তারা তো পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট এবং নিঃসন্দেহে জাহান্নাম এই কাফেরদের পরিবেষ্টন করে রয়েছে।”

>> “আশু-লাভের” সম্ভাবনা না থাকা (কুরআন: ৯:৪২), কিংবা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ও বিপদসংকুল পরিবেশ, কিংবা বিবেকের তাড়নায় মুহাম্মদের বহু অনুসারী যে মুহাম্মদের আবিষ্কৃত ‘জিহাদ’ নামের এই অমানবিক-নৃশংস কর্মকাণ্ডে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে জড়িত হতে চাইতেন না, বিভিন্ন অজুহাতে মুহাম্মদের এই নির্দেশ লঙ্ঘন করতেন, সে সত্যটিও কুরআন, সিরাত ও হাদিস গ্রন্থের বিভিন্ন বর্ণনায় অত্যন্ত স্পষ্ট। এই ধরণের অনুসারীদেরই মুহাম্মদ “আনুগত্য-হীন বা মোনাফেক” রূপে আখ্যায়িত করতেন। তাঁদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের যে কী পরিমাণ হুমকি-শাসানী ও ভীতি-প্রদর্শন করেছেন, তা কুরআনের অসংখ্য বাক্যে অত্যন্ত স্পষ্ট। [6]

এমনই একটি ঘটনার বর্ণনা আমরা জানতে পারি কুরআন ও আদি উৎসের প্রায় সকল মুসলিম ঐতিহাসিকদের তাবুক যুদ্ধ উপাখ্যানের বর্ণনায়। এই বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা ‘অনুসারীদের অনিচ্ছা ও নারী প্রলোভন’ পর্বে (পর্ব-২২৯) করা হয়েছে।

অতঃপর “আনুগত্য-হীন” অনুসারীদের কার্যকলাপ বিষয়ে:
৯:৫০-৫১ – “আপনার কোন কল্যাণ হলে তারা মন্দবোধ করে এবং কোন বিপদ উপস্থিত হলে তারা বলে, আমরা পূর্ব থেকেই নিজেদের কাজ সামলে নিয়েছি এবং ফিরে যায় উল্লসিত মনে। আপনি বলুন, আমাদের কাছে কিছুই পৌঁছবে না, কিন্তু যা আল্লাহ আমাদের জন্য রেখেছেন; তিনি আমাদের কার্যনির্বাহক। আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত।”

অতঃপর প্রত্যক্ষ হুমকি:
৯:৫২- “আপনি বলুন, তোমরা তো তোমাদের জন্যে দুটি কল্যাণের একটি প্রত্যাশা কর; আর আমরা প্রত্যাশায় আছি তোমাদের জন্যে যে, আল্লাহ তোমাদের আযাব দান করুন নিজের পক্ষ থেকে অথবা আমাদের হস্তে। সুতরাং তোমরা অপেক্ষা কর, আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ।”

>> ‘আল-ওয়াকিদি: “দু’টি কল্যাণের একটি” – অর্থাৎ, লুটের মাল অথবা শহিদ হিসাবে মৃত্যু বরণ। “আল্লাহ তোমাদের আযাব দান করুন নিজের পক্ষ থেকে” – অর্থাৎ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত (stroke) করা। “অথবা আমাদের হস্তে” – অর্থাৎ, আমাদের-কে তোমাদের হত্যা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে (‘we are permitted to kill you’)। [পৃষ্ঠা ৫২০]

অতঃপর তাদের-কে “নাফরমান” বলে গালাগালি:
৯:৫৩ – “আপনি বলুন, তোমরা ইচ্ছায় অর্থ ব্যয় কর বা অনিচ্ছায়, তোমাদের থেকে তা কখনো কবুল হবে না, তোমরা নাফরমানের দল।”

কী কারণে তাদের দান কবুল হবে না?
৯:৫৪ – “তাদের অর্থ ব্যয় কবুল না হওয়ার এছাড়া আর কোন কারণ নেই যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি অবিশ্বাসী, তারা নামাযে আসে অলসতার সাথে ব্যয় করে সঙ্কুচিত মনে।”

>> “একমাত্র কারণ হলো ‘তারা মুহাম্মদ-কে বিশ্বাস করে না ও তার আদেশ নিষেধ যথাযথ পালন করে না’” – এছাড়া আর কোন কারণ নেই!

“আল্লাহর ইচ্ছা” তাদের আযাবে নিপতিত রাখা:
৯:৫৫ – “সুতরাং তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন আপনাকে বিস্মিত না করে। আল্লাহর ইচ্ছা হল এগুলো দ্বারা দুনিয়ার জীবনে তাদের আযাবে নিপতিত রাখা এবং প্রাণবিয়োগ হওয়া কুফরী অবস্থায়।”

>> “আল্লাহর ইচ্ছা হল এগুলো দ্বারা দুনিয়ার জীবনে তাদের আযাবে নিপতিত রাখা!” এই অনন্ত মহাবিশ্বের স্রষ্টা-কে (যদি থাকে) নিয়ে মুহাম্মদের কী করুণ তামাসা!

‘তারা’ তোমাদের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত:
৯:৫৬ – “তারা আল্লাহর নামে হলফ করে বলে যে, তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত, অথচ তারা তোমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়, অবশ্য তারা তোমাদের ভয় করে।”

>> “আনুগত্য-হীনরা’ যে মুহাম্মদ ও তার অনুসারীদের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত জীবন-যাপন করতেন, তা মুহাম্মদের এই বানী-তে সুস্পষ্ট।

আবারও “আনুগত্য-হীন” অনুসারীদের কার্যকলাপ বিষয়ে:
৯:৫৬-৫৯ – “তারা কোন আশ্রয়স্থল, কোন গুহা বা মাথা গোঁজার ঠাই পেলে সেদিকে পলায়ন করবে দ্রুতগতিতে। তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা সদকা বন্টনে আপনাকে দোষারূপ করে। এর থেকে কিছু পেলে সন্তুষ্ট হয় এবং না পেলে বিক্ষুব্ধ হয়। কতই না ভাল হত, যদি তারা সন্তুষ্ট হত আল্লাহ ও তার রসূলের উপর এবং বলত, আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট, আল্লাহ আমাদের দেবেন নিজ করুণায় এবং তাঁর রসূলও, আমরা শুধু আল্লাহকেই কামনা করি।”

অতঃপর যাকাত বিষয়ে:
৯:৬০ – “যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায় কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদে হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে-ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”

>> যদি “তাঁরা” মুহাম্মদ অনুসারী হয়।

অতঃপর আত্ম-প্রশংসা ও পরোক্ষ হুমকি:
৯:৬১ – “আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ নবীকে ক্লেশ দেয়, এবং বলে, এ লোকটি তো কানসর্বস্ব। আপনি বলে দিন, কান হলেও তোমাদেরই মঙ্গলের জন্য, আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে এবং বিশ্বাস রাখে মুসলমানদের কথার উপর। বস্তুতঃ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার তাদের জন্য তিনি রহমতবিশেষ। আর যারা আল্লাহর রসূলের প্রতি কুৎসা রটনা করে, তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।”

আবারও “আনুগত্য-হীন” অনুসারীদের কার্যকলাপ বিষয়ে:
৯:৬২- “তোমাদের সামনে আল্লাহর কসম খায় যাতে তোমাদের রাযী করতে পারে। অবশ্য তারা যদি ঈমানদার হয়ে থাকে, তবে আল্লাহকে এবং তাঁর রসূলকে রাযী করা অত্যন্ত জরুরী।”

আবারও পরোক্ষ হুমকি:
৯:৬৩- “তারা কি একথা জেনে নেয়নি যে, আল্লাহর সাথে এবং তাঁর রসূলের সাথে যে মোকাবেলা করে তার জন্যে নির্ধারিত রয়েছে দোযখ; তাতে সব সময় থাকবে। এটিই হল মহা-অপমান।”

আবারও “আনুগত্য-হীন” অনুসারীদের কার্যকলাপ বিষয়ে:
৯:৬৪-৬৬- “মুনাফেকরা এ ব্যাপারে ভয় করে যে, মুসলমানদের উপর না এমন কোন সূরা নাযিল হয়, যাতে তাদের অন্তরের গোপন বিষয় অবহিত করা হবে। সুতরাং আপনি বলে দিন, ঠাট্টা-বিদ্রপ করতে থাক; আল্লাহ তা অবশ্যই প্রকাশ করবেন যার ব্যাপারে তোমরা ভয় করছ। আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছলনা কর না, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর। তোমাদের মধ্যে কোন কোন লোককে যদি আমি ক্ষমা করে দেইও, তবে অবশ্য কিছু লোককে আযাবও দেব। কারণ, তারা ছিল গোনাহগার।”

>> এই বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা মুনাফিকদের সংখ্যা ও উপস্থিতি পর্বে (পর্ব-২৩২) করা হয়েছে।

আবারও গালাগালি:
৯:৬৭ – “মুনাফেক নর-নারী সবারই গতিবিধি একরকম; শিখায় মন্দ কথা, ভাল কথা থেকে বারণ করে এবং নিজ মুঠো বন্ধ রাখে। আল্লাহকে ভুলে গেছে তার, কাজেই তিনিও তাদের ভূলে গেছেন নিঃসন্দেহে মুনাফেকরাই নাফরমান।”

হুমকি ও অভিশাপ বর্ষণ:
৯:৬৮ – “ওয়াদা করেছেন আল্লাহ, মুনাফেক পুরুষ ও মুনাফেক নারীদের এবং কাফেরদের জন্যে দোযখের আগুনের – তাতে পড়ে থাকবে সর্বদা। সেটাই তাদের জন্যে যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদের জন্যে রয়েছে স্থায়ী আযাব।”

আবারও পরোক্ষ হুমকি:
৯:৬৯-৭০ – “যেমন করে তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তোমাদের চেয়ে বেশী ছিল শক্তিতে এবং ধন-সম্পদের ও সন্তান-সন্ততির অধিকারীও ছিল বেশী; অতঃপর উপকৃত হয়েছে নিজেদের ভাগের দ্বারা আবার তোমরা ফায়দা উঠিয়েছ তোমাদের ভাগের দ্বারা-যেমন করে তোমাদের পূর্ববর্তীরা ফায়দা উঠিয়েছিল নিজেদের ভাগের দ্বারা। আর তোমরাও বলছ তাদেরই চলন অনুযায়ী। তারা ছিল সে লোক, যাদের আমলসমূহ নিঃশেষিত হয়ে গেছে দুনিয়া ও আখেরাতে। আর তারাই হয়েছে ক্ষতির সম্মুখীন। তাদের সংবাদ কি এদের কানে এসে পৌঁছায়নি, যারা ছিল তাদের পূর্বে; নূহের আ’দের ও সামুদের সম্প্রদায় এবং ইব্রাহীমের সম্প্রদায়ের এবং মাদইয়ানবাসীদের? এবং সেসব জনপদের যেগুলোকে উল্টে দেয়া হয়েছিল? তাদের কাছে এসেছিলেন তাদের নবী পরিষ্কার নির্দেশ নিয়ে। বস্তুতঃ আল্লাহ তো এমন ছিলেন না যে, তাদের উপর জুলুম করতেন, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের উপর জুলুম করতো।”

অতঃপর প্রলোভন:
৯:৭১-৭২- “আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই উপর আল্লাহ তা’আলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল, সুকৌশলী। আল্লাহ ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেনে কানন-কুঞ্জের, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় প্রস্রবণ। তারা সে গুলোরই মাঝে থাকবে। আর এসব কানন-কুঞ্জে থাকবে পরিচ্ছন্ন থাকার ঘর। বস্তুতঃ এ সমুদয়ের মাঝে সবচেয়ে বড় হল আল্লাহর সন্তুষ্টি। এটিই হল মহান কৃতকার্যতা।

অতঃপর প্রত্যক্ষ হুমকি:
৯:৭৩- “হে নবী, কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করুন এবং মুনাফেকদের সাথে তাদের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করুন। তাদের ঠিকানা হল দোযখ এবং তাহল নিকৃষ্ট ঠিকানা।”

আবারও হুমকি:
৯:৭৪ – “তারা কসম খায় যে, আমরা বলিনি, অথচ নিঃসন্দেহে তারা বলেছে কুফরী বাক্য এবং মুসলমান হবার পর অস্বীকৃতিজ্ঞাপনকারী হয়েছে। আর তারা কামনা করেছিল এমন বস্তুর যা তারা প্রাপ্ত হয়নি। আর এসব তারই পরিণতি ছিল যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূল তাদেরকে সম্পদশালী করে দিয়েছিলেন নিজের অনুগ্রহের মাধ্যমে। বস্তুতঃ এরা যদি তওবা করে নেয়, তবে তাদের জন্য মঙ্গল। আর যদি তা না মানে, তবে তাদের কে আযাব দেবেন আল্লাহ তা’আলা, বেদনাদায়ক আযাব দুনিয়া ও আখেরাতে। অতএব, বিশ্বচরাচরে তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী-সমর্থক নেই।”

ঘটনার বর্ণনা:
৯:৭৫-৭৮ – “তাদের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছে যারা আল্লাহ তা’আলার সাথে ওয়াদা করেছিল যে, তিনি যদি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ দান করেন, তবে অবশ্যই আমরা ব্যয় করব এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকব। অতঃপর যখন তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে দান করা হয়, তখন তাতে কার্পণ্য করেছে এবং কৃত ওয়াদা থেকে ফিরে গেছে তা ভেঙ্গে দিয়ে। তারপর এরই পরিণতিতে তাদের অন্তরে কপটতা স্থান করে নিয়েছে সেদিন পর্যন্ত, যেদিন তার তাঁর সাথে গিয়ে মিলবে। তা এজন্য যে, তারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা লংঘন করেছিল এবং এজন্যে যে, তারা মিথ্যা কথা বলতো। তারা কি জেনে নেয়নি যে, আল্লাহ তাদের রহস্য ও শলা-পরামর্শ সম্পর্কে অবগত এবং আল্লাহ খুব ভাল করেই জানেন সমস্ত গোপন বিষয়?

আল্লাহ “ঠাট্টা” ও করে:
৯:৭৯- “সে সমস্ত লোক যারা ভৎর্সনা-বিদ্রূপ করে সেসব মুসলমানদের প্রতি যারা মন খুলে দান-খয়রাত করে এবং তাদের প্রতি যাদের কিছুই নেই শুধুমাত্র নিজের পরিশ্রমলব্দ বস্তু ছাড়া। অতঃপর তাদের প্রতি ঠাট্টা করে। আল্লাহ তাদের প্রতি ঠাট্টা করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।”

সত্তর বার ক্ষমাপ্রার্থনা করলেও “তাদের” ক্ষমা নেই:
৯:৮০- “তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর আর না কর। যদি তুমি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমাপ্রার্থনা কর, তথাপি কখনোই তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। তা এজন্য যে, তারা আল্লাহকে এবং তাঁর রসূলকে অস্বীকার করেছে। বস্তুতঃ আল্লাহ না-ফারমানদেরকে পথ দেখান না।”

>> বিশিষ্ট মুনাফিক আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যুর পর মুহাম্মদ তার জানাজায় শরীক হয়ে ঘোষণা দেন যে, আল্লাহ তাকে যে বিকল্প (Choice) দিয়েছেন, তিনি তা গ্রহণ করেছেন। যদি তিনি জানতেন যে “সত্তর বার এর বেশী” ক্ষমাপ্রার্থনা করলে আবদুল্লাহ বিন উবাই-কে ক্ষমা করা হবে, তবে তিনি তাই করতেন।

অতঃপর ঘটনার বর্ণনা ও হুমকি:
৯:৮১-৮২ – “পেছনে থেকে যাওয়া লোকেরা আল্লাহর রসূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে থাকতে পেরে আনন্দ লাভ করেছে; আর জান ও মালের দ্বারা আল্লাহর রাহে জেহাদ করতে অপছন্দ করেছে এবং বলেছে, এই গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না। বলে দাও, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচন্ডতম। যদি তাদের বিবেচনা শক্তি থাকত। অতএব, তারা সামান্য হেসে নিক এবং তারা তাদের কৃতকর্মের বদলাতে অনেক বেশী কাঁদবে।”

৯:৮৩ – “বস্তুতঃ আল্লাহ যদি তোমাকে তাদের মধ্য থেকে কোন শ্রেণীবিশেষের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যান এবং অতঃপর তারা তোমার কাছে অভিযানে বেরোবার অনুমতি কামনা করে, তবে তুমি বলো যে, তোমরা কখনো আমার সাথে বেরোবে না এবং আমার পক্ষ হয়ে কোন শত্রুর সাথে যুদ্ধ করবে না, তোমরা তো প্রথমবারে বসে থাকা পছন্দ করেছ, কাজেই পেছনে পড়ে থাকা লোকদের সাথেই বসে থাক।”

>> এই বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা ‘অনুসারীদের অনিচ্ছা ও নারী প্রলোভন’ পর্বে (পর্ব-২২৯) করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের জানাজা কালের ঘটনা:

অতঃপর “অনুশোচনা” ও কঠোর নির্দেশ:
৯:৮৪- “আর তাদের মধ্য থেকে কারো মৃত্যু হলে তার উপর কখনও নামায পড়বেন না এবং তার কবরে দাঁড়াবেন না। তারা তো আল্লাহর প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে এবং রসূলের প্রতিও। বস্তুতঃ তারা না ফরমান অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছে।”

>> আবদুল্লাহ বিন উবায়ের মৃত্যুর পর ও তাকে কবরস্থ করার সময় মুহাম্মদ এই ৯:৮৪ বানীটি বর্ষণ করেন। মুহাম্মদ যখন তার জানাজা পড়ার জন্য দাঁড়ান, উমর বলে: “হে আল্লাহর নবী, আপনি কি তার জন্য প্রার্থনা করছেন?” মুহাম্মদ জবাবে বলেন, “উমর, আল্লাহ আমাকে যে বিকল্প দিয়েছেন, আমি তা গ্রহণ করেছি। যদি আমি জানতাম যে “সত্তর বার” এর বেশী ক্ষমাপ্রার্থনা করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন, তবে আমি তাই করতাম।” মুহাম্মদ তার জানাজা আদায় করেন ও তার জন্য প্রার্থনা করেন। অতঃপর, আবদুল্লাহ বিন উবাই-কে কবরস্থ করার পর সেখান থেকে চলে যাওয়ার আগেই মুহাম্মদ ‘আল্লাহর নামে’ এই ৯:৮৪ বাণী-টি হাজির করেন।

বিশিষ্ট মুনাফিক আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর জানাজা নামাজ পড়া ও তার জন্য দোয়া করার পর পরই সেই কৃত কর্মের জন্য মুহাম্মদের অনুশোচনা ও আপসোস; এই ধরণের কর্মকাণ্ড মুহাম্মদের চরিত্রের কোন নতুন বিষয় নয়। বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে মুহাম্মদ ও তার অনুসারীরা তাদেরই “আত্মীয়-স্বজন” ৭০ জন কুরাইশকে বন্দী করে ধরে নিয়ে আসেন মদিনায়। অতঃপর এই বন্দিদের কী করা হবে এ বিষয়ে তিনি তার বিশিষ্ট অনুসারীদের সাথে পরামর্শ করেন (বিস্তারিত: ‘বন্দীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত – কি ছিল আল্লাহ’ পছন্দ’ পর্বে [পর্ব ৩৬])। আবু বকর বলে,

“হে আল্লাহর নবী, এই লোকগুলি আমাদেরই চাচাতো-মামাতো-ফুপাতো ভাই, আমাদেরই স্বগোত্রীয় ও ভাইপো-বোনপো। আমি মনে করি আপনার উচিত মুক্তি-পণের বিনিময়ে তাদের কে ছেড়ে দেয়া, তাহলে তাদের কাছ থেকে আমাদের যে উপার্জন হবে তা আমাদের শক্তিবৃদ্ধি করবে এবং সম্ভবত: আল্লাহ তদেরকে সঠিকভাবে হেদায়েত করবে যাতে তারা আমাদের সাহায্যে আসতে পারে।”

অন্যদিকে, উমর ইবনে খাত্তাব বলে:
“না, আল্লাহর কসম! আমি আবু বকরের সাথে একমত নই। আমি মনে করি যে, আপনি তাদের অমুক অমুককে আমার হাতে সোপর্দ করবেন, যাতে আমি তাদের কল্লা কাটতে পারি; আপনার উচিত হামজার ভাই-কে [আল-আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব] তার কাছে সোপর্দ করা, যাতে সে তার ভাইয়ের কল্লা কাটতে পারে এবং আকিলকে আলীর কাছে সোপর্দ করা, যাতে সে তার ভাইয়ের কল্লা কাটতে পারে। তাতে আল্লাহ জানবে যে, আমাদের অন্তরে অবিশ্বাসীদের জন্য কোনোরূপ প্রশ্রয় নেই। এই লোকগুলি তাদের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সর্দার।”

মুহাম্মদ উমরের মত পছন্দ না করে আবু বকরের মতটি পছন্দ করেন। পরদিন সকালে উমর দেখতে পান যে আবু বকরের সাথে বসে মুহাম্মদ অঝোরে কান্না করছেন। যখন উমর মুহাম্মদের কাছে তার কান্নার কারণ জানতে চান, তিনি বলেন, “এটি এই কারণে যে, বন্দীদের মুক্তির জন্য মুক্তিপণ নেয়া, আমার সামনে উপস্থাপিত হয়েছে যে, আমি যেন তাদেরকে শাস্তি প্রদান করি।” আল্লাহ নাজিল করেছে,

৮:৬৭- ৬৮- “নবীর পক্ষে উচিত নয় বন্দীদিগকে নিজের কাছে রাখা, যতক্ষণ না দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটাবে। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর, অথচ আল্লাহ্ চান আখেরাত। আর আল্লাহ্ হচ্ছেন পরাক্রমশালী হেকমতওয়ালা। যদি একটি বিষয় না হত যা পূর্ব থেকেই আল্লাহ লিখে রেখেছেন, তাহলে তোমরা যা গ্রহণ করছ সেজন্য বিরাট আযাব এসে পৌছাত।”

আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের জানাজা ও তার জন্য প্রার্থনা করার পর মুহাম্মদের ‘আফসোস’ ও বদর যুদ্ধে ধৃত বন্দিদের নৃশংসভাবে হত্যা না করে তাঁদের ছেড়ে দেয়ার পর মুহাম্মদের ‘আফসোস!’ অবিশ্বাসী ও আনুগত্যহীন প্রতিপক্ষের বিষয়ে নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করার পর পরই তাঁদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের কঠোর নির্দেশ প্রদান! মুহাম্মদের চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যের সন্ধান আমরা জানতে পারি তারই রচিত ব্যক্তি-মানস জীবনী গ্রন্থ ‘কুরআন’ ও আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায়। মুহাম্মদ ছিলেন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সার্থক কূট পলেটিশিয়ানদের একজন। যার সাক্ষ্য হলো, মুহাম্মদের এ সকল কর্ম-কাণ্ড।

“আল্লাহ চান” তারা যেন কাফেরই থাকে:
৯:৮৫ – “আর বিস্মিত হয়ো না তাদের ধন সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতির দরুন। আল্লাহ তো এই চান যে, এ সবের কারণে তাদেরকে আযাবের ভেতরে রাখবেন দুনিয়ায় এবং তাদের প্রাণ নির্গত হওয়া পর্যন্ত যেন তারা কাফেরই থাকে।”

>> মুহাম্মদের সৃষ্ট ‘আল্লাহ’ বড়ই প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ-পরায়ণ! মহাবিশ্বের বিশালতা সম্বন্ধে সামান্যতম ধারণা থাকা কোন ব্যক্তি কি সৃষ্টিকর্তা সম্বন্ধে এমন নিচু ধারণা পোষণ করতে পারেন?

আবারও বিষোদগার:
৯:৮৬-৮৭ – “আর যখন নাযিল হয় কোন সূরা যে, তোমরা ঈমান আন আল্লাহর উপর, তাঁর রসূলের সাথে একাত্ন হয়ে; তখন বিদায় কামনা করে তাদের সামর্থবান লোকেরা এবং বলে আমাদের অব্যাহতি দিন, যাতে আমরা (নিস্ক্রিয়ভাবে) বসে থাকা লোকদের সাথে থেকে যেতে পারি। তারা পেছনে পড়ে থাকা লোকদের সাথে থেকে যেতে পেরে আনন্দিত হয়েছে এবং মোহর এঁটে দেয়া হয়েছে তাদের অন্তরসমূহের উপর। বস্তুতঃ তারা বোঝে না।”

>> ৯:৪৯ বানীটির মতই ও এই বানী দু’টিও মুহাম্মদ হাজির করেছিলেন জাদ বিন কায়েস নামের এক সম্পদশালী অনুসারীর বিষয়ে। মুহাম্মদ যখন তার এই অনুসারীকে “সম্ভবত: তুমি বাইজেনটাইন নারীদের ধরে আনতে পারবে” লোভ দেখিয়ে তাবুক অভিযানে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন!” এই বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা ‘অনুসারীদের অনিচ্ছা ও নারী প্রলোভন’ পর্বে (পর্ব-২২৯) করা হয়েছে।

অতঃপর প্রলোভন:
৯:৮৮-৮৯ – “কিন্তু রসূল এবং সেসব লোক যারা ঈমান এনেছে, তাঁর সাথে তারা যুদ্ধ করেছে নিজেদের জান ও মালের দ্বারা। তাদেরই জন্য নির্ধারিত রয়েছে কল্যাণসমূহ এবং তারাই মুক্তির লক্ষ্যে উপনীত হয়েছে। আল্লাহ তাদের জন্য তৈরী করে রেখেছেন কানন-কুঞ্জ, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে প্রস্রবণ। তারা তাতে বাস করবে অনন্তকাল। এটাই হল বিরাট কৃতকার্যতা।”

অতঃপর হুমকি:
৯:৯০ – “আর ছলনাকারী বেদুঈন লোকেরা এলো, যাতে তাদের অব্যাহতি লাভ হতে পারে এবং নিবৃত্ত থাকতে পারে তাদেরই যারা আল্লাহ ও রসূলের সাথে মিথ্যা বলে ছিল। এবার তাদের উপর শীঘ্রই আসবে বেদনাদায়ক আযাব যারা কাফের।”

জিহাদ’ এর বাধ্যতা থেকে যারা মুক্ত:
৯:৯১- “দূর্বল, রুগ্ন, ব্যয়ভার বহনে অসমর্থ লোকদের জন্য কোন অপরাধ নেই, যখন তারা মনের দিক থেকে পবিত্র হবে আল্লাহ ও রসূলের সাথে। নেককারদের উপর অভিযোগের কোন পথ নেই। আর আল্লাহ হচ্ছেন ক্ষমাকারী দয়ালু।”

“অশ্রুপাত-কারী” লোকদের বিষয়ে:
৯:৯২ – “আর না আছে তাদের উপর যারা এসেছে তোমার নিকট যেন তুমি তাদের বাহন দান কর এবং তুমি বলেছ, আমার কাছে এমন কোন বস্তু নেই যে, তার উপর তোমাদের সওয়ার করাব তখন তারা ফিরে গেছে অথচ তখন তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু বইতেছিল এ দুঃখে যে, তারা এমন কোন বস্তু পাচ্ছে না যা ব্যয় করবে।”

>> তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে সাত জন মুহাম্মদ অনুসারী মুহাম্মদের কাছে এসে বলে যে, তাদের কাছে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও বাহন (mounts) নেই। তাঁরা মুহাম্মদের কাছে এসে এই আবেদন করে যে, মুহাম্মদ যেন তাদেরকে যুদ্ধে যাওয়ার নিমিত্ত ও বাহন (সওয়ারী পশু) দিয়ে সাহায্য করেন, যাতে তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে। জবাবে মুহাম্মদ যখন তাদের-কে জানান যে তার কাছে এমন কোন নিমিত্ত ও বাহন নেই যা দিয়ে তিনি তাদের সাহায্য করতে পারেন, তখন তারা বিষাদ চিত্তে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যায়। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুহাম্মদ এই ৯:৯২ বানীটি হাজির করেন। মুহাম্মদ তাঁদেরকে “অশ্রুপাত-কারী (The weepers)” নামে আখ্যায়িত করেছেন। মুহাম্মদের এই ৯:৯১-৯২ নির্দেশের সরল অর্থ হলো, দুর্বল, রুগ্ন, বৃদ্ধ ও “হত-দরিদ্র অক্ষম” ব্যক্তিরা ছাড়া অন্যান্য সকল অনুসারীদের জন্য ‘জিহাদ’ বাধ্যতামূলক। এই বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা ‘অশ্রুপাতকারী সাত ও অন্যান্য’ পর্বে (পর্ব-২৩০) করা হয়েছে।

যারা অব্যাহতি পাবে না:
৯:৯৩- “অভিযোগের পথ তো তাদের ব্যাপারে রয়েছে, যারা তোমার নিকট অব্যাহতি কামনা করে অথচ তারা সম্পদশালী। যারা পেছনে পড়ে থাকা লোকদের সাথে থাকতে পেরে আনন্দিত হয়েছে। আর আল্লাহ মোহর এঁটে দিয়েছেন তাদের অন্তরসমূহে। বস্তুতঃ তারা জানতেও পারেনি।”

আবারও হুমকি এবং ‘নাফরমান’ বলে গালাগালি:
৯:৯৪ -“তুমি যখন তাদের কাছে ফিরে আসবে, তখন তারা তোমাদের নিকট ছল-ছুতা নিয়ে উপস্থিত হবে; তুমি বলো, ছল কারো না, আমি কখনো তোমাদের কথা শুনব না; আমাকে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে দিয়েছেন। আর এখন তোমাদের কর্ম আল্লাহই দেখবেন এবং তাঁর রসূল। তারপর তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে সেই গোপন ও আগোপন বিষয়ে অবগত সত্তার নিকট। তিনিই তোমাদের বাতলে দেবেন যা তোমরা করছিলে।”

৯:৯৫ – “এখন তারা তোমার সামনে আল্লাহর কসম খাবে, যখন তুমি তাদের কাছে ফিরে যাবে, যেন তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও। সুতরাং তুমি তাদের ক্ষমা কর-নিঃসন্দেহে এরা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের বদলা হিসাবে তাদের ঠিকানা হলো দোযখ।“

৯:৯৬ – “তারা তোমার সামনে কসম খাবে যাতে তুমি তাদের প্রতি রাযী হয়ে যাও। অতএব, তুমি যদি রাযী হয়ে যাও তাদের প্রতি তবু আল্লাহ তা’আলা রাযী হবেন না, এ নাফরমান লোকদের প্রতি।”

>> এই বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা মুমিনদের শাস্তি ও ভণ্ডদের মুক্তি’ পর্বে (পর্ব-২৪৩) করা হয়েছে।

অতঃপর আরব বেদুইনদের “অভিশাপ বর্ষণ”:
৯:৯৭-৯৮ – “বেদুইনরা কুফর ও মোনাফেকীতে অত্যন্ত কঠোর হয়ে থাকে এবং এরা সেসব নীতি-কানুন না শেখারই যোগ্য যা আল্লাহ তা’আলা তাঁর রসূলের উপর নাযিল করেছেন। বস্তুতঃ আল্লাহ সব কিছুই জানেন এবং তিনি অত্যন্ত কুশলী। আবার কোন কোন বেদুইন এমন ও রয়েছে যারা নিজেদের ব্যয় করাকে জরিমানা বলে গন্য করে এবং তোমার উপর কোন দুর্দিন আসে কিনা সে অপেক্ষায় থাকে। তাদেরই উপর দুর্দিন আসুক। আর আল্লাহ হচ্ছেন শ্রবণকারী, পরিজ্ঞাত।”

অতঃপর প্রলোভন:
৯:৯৯ – “আর কোন কোন বেদুইন হল তারা, যারা ঈমান আনে আল্লাহর উপর, কেয়ামত দিনের উপর এবং নিজেদের ব্যয়কে আল্লাহর নৈকট্য এবং রসূলের দোয়া লাভের উপায় বলে গণ্য করে। জেনো! তাই হল তাদের ক্ষেত্রে নৈকট্য। আল্লাহ তাদেরকে নিজের রহমতের অন্তর্ভূক্ত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুনাময়।”

প্রাথমিক হিজরতকারী মুহাজির ও আনসারদের প্রশংসা ও প্রলোভন:
৯:১০০ – “আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনছারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কানন-কুঞ্জ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা।”

আবারও হুমকি:
৯:১০১ -“আর কিছু কিছু তোমার আশ-পাশের মুনাফেক এবং কিছু লোক মদীনাবাসী কঠোর মুনাফেকীতে অনঢ়। তুমি তাদের জান না; আমি তাদের জানি। আমি তাদেরকে আযাব দান করব দু’বার, তারপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে মহান আযাবের দিকে।”

>> এই বানীটি মুহাম্মদ বর্ষণ করেছিলেন উনায়েন বিন হিসান নামের এক আরব বেদুইন ও অন্যান্য অনুসারীদের ব্যাপারে, যারা মুহাম্মদের অনুসারীদের প্রশংসা করছিল ও দেখাচ্ছিল যে তারা তাদের সাথেই আছে। একই সাথে তারা তাদের এলাকার পৌত্তলিক লোকদেরও প্রশংসা করছিল। তাদের বিরুদ্ধেই মুহাম্মদের এই বানী, “তাদেরকে আযাব দান করব দু’বার;” – দুনিয়া ও আখিরাতে।

অতঃপর, ‘বানু কুরাইজা গণহত্যার’ প্রাক্কালে এক অনুসারীর ব্যাপারে:
৯:১০২ – “আর কোন কোন লোক রয়েছে যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে, তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেককাজ ও অন্য একটি বদকাজ। শীঘ্রই আল্লাহ হয়ত তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিঃঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়।”

>> ‘বানু কুরাইজা গণহত্যার’ প্রাক্কালে আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনধির নামের এক অনুসারীর কার্যকলাপের বিষয়ে মুহাম্মদ এই বানী-টি হাজির করেন। ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:

মুহাম্মদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে মুহাম্মদ ও তার অনুসারীরা বনি কুরাইজা গোত্রের সমস্ত লোকদের দুর্গ চারিদিক থেকে ঘেরাও করে রাখেন সুদীর্ঘ ২৫ দিন! এমত অবস্থায় যখন পরিস্থিতি তাঁদের জন্য অত্যন্ত দুঃসহ হয়ে পড়ে ও যখন তাঁরা বুঝতে পারেন যে, মুহাম্মদ ও তার অনুসারীরা তাঁদেরকে শেষ না করে ফিরে যাবে না, তখন ভীত সন্ত্রস্ত বনি কুরাইজা গোত্রের লোকেরা মুহাম্মদের কাছে এই মর্মে খবর পাঠান যে, তিনি যেন বনি আমর বিন আউফ গোত্রের আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনধির কে তাদের কাছে পাঠান যেন তাঁরা তার সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাঁদের এই প্রস্তাবে মুহাম্মদ, আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনধিরকে তাঁদের কাছে পাঠান। বনি কুরাইজার এই অসহায় অবস্থা ও তাঁদের পরিবার পরিজনদের কান্না-কাটি দেখে মুহাম্মদের এই প্রতিনিধি দুঃখিত ও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি তাঁদেরকে আত্মসমর্পণের পরামর্শ দেন ও একই সাথে “তার গলার দিকে তার হাতের অঙ্গুলি নির্দেশ করে” ইশারায় জানিয়ে দেন যে তাদের ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালানো হবে। এই কর্মটি করার পরই আবু লুবাবা বলা শুরু করেন, “আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ব্যাপারে তাদেরকে মিথ্যা বলেছি।” তারপর তিনি সেখান থেকে চলে আসেন ও মুহাম্মদের কাছে প্রত্যাবর্তন না করে মসজিদের একটি থামের সাথে নিজেকে বেঁধে রাখেন ও বলেন, “আমি যা করেছি তার জন্য আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়ার পূর্বে আমি এই স্থানটি ছেড়ে যাব না।” আবু লুবাবা ছয় রাত পর্যন্ত গাছের গুঁড়ির সাথে নিজেকে বেঁধে রাখেন। তাঁর এই ঘটনার ও অনুশোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মুহাম্মদ হাজির করেন এই ৯:১০২ বানীটি। এ বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা ‘বানু কুরাইজার গণহত্যা – কী ছিল মুহাম্মদের অভিপ্রায়’ পর্বে (পর্ব- ৮৮) করা হয়েছে।

যাকাত বিষয়ে:
৯:১০৩ – “তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে। আর তুমি তাদের জন্য দোয়া কর, নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া তাদের জন্য সান্ত্বনা স্বরূপ। বস্তুতঃ আল্লাহ সবকিছুই শোনেন, জানেন।”

৯:১০৪ – “তারা কি একথা জানতে পারেনি যে, আল্লাহ নিজেই স্বীয় বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং যাকাত গ্রহণ করেন? বস্তুতঃ আল্লাহই তওবা কবুলকারী, করুণাময়।”

৯:১০৫ – “আর তুমি বলে দাও, তোমরা আমল করে যাও, তার পরবর্তীতে আল্লাহ দেখবেন তোমাদের কাজ এবং দেখবেন রসূল ও মুসলমানগণ। তাছাড়া তোমরা শীগ্রই প্রত্যাবর্তিত হবে তাঁর সান্নিধ্যে যিনি গোপন ও প্রকাশ্য বিষয়ে অবগত। তারপর তিনি জানিয়ে দেবেন তোমাদেরকে যা করতে।”

৯:১০৬ – “আবার অনেক লোক রয়েছে যাদের কাজকর্ম আল্লাহর নির্দেশের উপর স্থগিত রয়েছে; তিনি হয় তাদের আযাব দেবেন না হয় তাদের ক্ষমা করে দেবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ সব কিছুই জ্ঞাত, বিজ্ঞতাসম্পন্ন।”

অতঃপর, “প্রতিপক্ষের মসজিদ ধ্বংস” করার কৈফিয়ত:
৯:১০৭- “আর যারা নির্মাণ করেছে মসজিদ জিদের বশে এবং কুফরীর তাড়নায় মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ঐ লোকের জন্য ঘাটি স্বরূপ যে পূর্ব থেকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যুদ্ধ করে আসছে, আর তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, আমরা কেবল কল্যাণই চেয়েছি। পক্ষান্তরে আল্লাহ সাক্ষী যে, তারা সবাই মিথ্যুক।”

৯:১০৮ – “তুমি কখনো সেখানে দাড়াবে না, তবে যে মসজিদের ভিত্তি রাখা হয়েছে তাকওয়ার উপর প্রথম দিন থেকে, সেটিই তোমার দাঁড়াবার যোগ্য স্থান। সেখানে রয়েছে এমন লোক, যারা পবিত্রতাকে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালবাসেন।”

>> তাবুক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন-কালে কী কারণে মুহাম্মদ তার মালিক বিন দুখশাম ও মা’ন বিদ আদি নামের দুই অনুসারীকে ডেকে এনে প্রতিপক্ষের মসজিদ আগুন দিয়ে তা পুড়িয়ে ফেলার হুকুম জারী করেছিলেন, তার নির্দেশে তার এই দুই অনুসারী কী ভাবে ‘সন্ত্রাসী কায়দায়’ মাগরিব নামাজের পর মসজিদের ভিতরে লোকজন থাকা অবস্থাতেই সেখানে ঢুকে উপাসনা-রত মুসল্লিদের আহত ও মসজিদ-টি আগুন দিয়ে ধ্বংস করেছিলেন; তার বিস্তারিত আলোচনা ‘মসজিদ ধ্বংসের আদেশ -অগ্নিদগ্ধ মুসল্লি’ এবং ‘মসজিদ ধ্বংসের কারণ ও কৈফিয়ত’ পর্বে (পর্ব: ২৪১-২৪২) করা হয়েছে।

অতঃপর তাদের “জালেম” বলে গালাগালি:
৯:১০৯–১১০- “যে ব্যক্তি স্বীয় গৃহের ভিত্তি রেখেছে কোন গর্তের কিনারায় যা ধ্বসে পড়ার নিকটবর্তী এবং অতঃপর তা ওকে নিয়ে দোযখের আগুনে পতিত হয়। আর আল্লাহ জালেমদের পথ দেখান না। তাদের নির্মিত গৃহটি তাদের অন্তরে সদা সন্দেহের উদ্রেক করে যাবে যে পর্যন্ত না তাদের অন্তরগুলো চৌচির হয়ে যায়। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।”

আল্লাহর” ক্রয়-বিক্রয় ও লেন-দেন:
৯:১১১ – “আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুসলমানদের থেকে তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাহেঃ অতঃপর মারে ও মরে। তওরাত, ইঞ্জিল ও কোরআনে তিনি এ সত্য প্রতিশ্রুতিতে অবিচল। আর আল্লাহর চেয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কে অধিক? সুতরাং তোমরা আনন্দিত হও সে লেন-দেনের উপর, যা তোমরা করছ তাঁর সাথে। আর এ হল মহান সাফল্য।”

>> বিভিন্ন প্রলোভনদের মাধ্যমে মুহাম্মদ তার অনুসারীদের কীভাবে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অমানুষিক নৃশংস সহিংসতায় (‘অতঃপর মারে ও মরে’)” লেলিয়ে দিয়েছিলেন, তার সাক্ষ্য ধারণ করে আছে তার নিজেরই রচিত ‘কুরআন’! মুহাম্মদ তার অনুসারীদের শিখিয়েছেন, “ধর্মের নামে প্রতিপক্ষকে খুন করা ও নিজেকে আত্মাহুতি দেয়াই হলো, ‘মহান সাফল্য’!”

আবারও প্রলোভন:
৯:১১২ – “তারা তওবাকারী, এবাদতকারী, শোকরগোযার, (দুনিয়ার সাথে) সম্পর্কচ্ছেদ-কারী, রুকু ও সিজদা আদায়কারী, সৎকাজের আদেশ দানকারী ও মন্দ কাজ থেকে নিবৃতকারী এবং আল্লাহর দেওয়া সীমাসমূহের হেফাযতকারী। বস্তুতঃ সুসংবাদ দাও ঈমানদারদেরকে।”

“মুহাম্মদের ঘৃণা থেকে” মৃত আত্মীয়রাও রক্ষা পায় নাই:
৯:১১৩ – “নবী ও মুমিনের উচিত নয় মুশরেকদের মাগফেরাত কামনা করে, যদিও তারা আত্নীয় হোক একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা দোযখী।”

>> মুহাম্মদের মক্কা অবস্থানকালীন সময়ে, মদিনায় হিজরতের তিন বছর আগে (৬১৯ সাল) যখন তার চাচা আবু তালিব মৃত্যু বরণ করেন, তখন মুহাম্মদ তার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করেন ও বলেন, “আমি তোমার জন্য অবশ্যই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষমা প্রার্থনা করবো।” সেই একই মুহাম্মদ, মদিনায় শক্তিমান অবস্থায় তার অনুসারীদের উদ্দেশ্যে “এই শেষ নির্দেশ” জারী করেন!

অতঃপর কৈফিয়ত:
৯:১১৪- “আর ইব্রাহীম কর্তৃক স্বীয় পিতার মাগফেরাত কামনা ছিল কেবল সেই প্রতিশ্রুতির কারণে, যা তিনি তার সাথে করেছিলেন। অতঃপর যখন তাঁর কাছে একথা প্রকাশ পেল যে, সে আল্লাহর শত্রু তখন তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিলেন। নিঃসন্দেহে ইব্রাহীম ছিলেন বড় কোমল হৃদয়, সহনশীল।”

অতঃপর “কিছু খেজুরে আলাপ”:
৯:১১৫-১১৬ – “আর আল্লাহ কোন জাতিকে হেদায়েত করার পর পথভ্রষ্ট করেন না যতক্ষণ না তাদের জন্য পরিষ্কারভাবে বলে দেন সেসব বিষয় যা থেকে তাদের বেঁচে থাকা দরকার। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সব বিষয়ে ওয়াকেফহাল।নিশ্চয় আল্লাহরই জন্য আসমানসমূহ ও যমীনের সাম্রাজ্য। তিনিই জিন্দা করেন ও মৃত্যু ঘটান, আর আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের জন্য কোন সহায়ও নেই, কোন সাহায্যকারীও নেই।”

>> “আল্লাহ পরিষ্কারভাবে বলে দেন!” চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির এই যুগে আজ আমরা নিশ্চিতরূপে জানি: যারা মানসিক বিকারগ্রস্ত ও উন্মাদ, একমাত্র তারাই ‘আল্লাহর কথা’ শুনতে পান।

তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রশংসা ও প্রলোভন:
৯:১১৭ – “আল্লাহ দয়াশীল নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা কঠিন মহূর্তে নবীর সঙ্গে ছিল, যখন তাদের এক দলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি দয়াপরবশ হন তাদের প্রতি। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুনাময়।

“বিশেষ তিন জন” এর বিষয়ে:
৯:১১৮- “এবং অপর তিনজনকে যাদেরকে পেছনে রাখা হয়েছিল, যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্বেও তাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দূর্বিসহ হয়ে উঠলো; আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন আশ্রয়স্থল নেই-অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াময় করুণাশীল।”

অতঃপর, ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ‘দলে থাকার’ আহ্বান:
৯:১১৯- “হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।”

>> তাবুক অভিযানে অংশগ্রহণ না কারী লোকদের মধ্যে তিন জন ছিলেন, যারা মুনাফিক ছিলেন না। তারা হলেন কা’ব বিন মালিক, মুরারা বিন আল রাবি ও হিলাল বিন উমাইয়া। মুহাম্মদ কী শাস্তির মাধ্যমে “তাদের জন্য পৃথিবী সঙ্কুচিত করে তাদের জীবন দূর্বিসহ করে তুলেছিলেন”, এ বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা ‘মুমিনদের শাস্তি ও ভণ্ডদের মুক্তি’ (পর্ব-২৪৩) করা হয়েছে।

মুমিনদের উচিত ‘মুহাম্মদ-কে” নিজের প্রাণের চেয়েও অধিক ভালবাসা:
৯:১২০ – “মদীনাবাসী ও পাশ্ববর্তী পল্লীবাসীদের উচিত নয় রসূলুল্লাহর সঙ্গ ত্যাগ করে পেছনে থেকে যাওয়া এবং রসূলের প্রাণ থেকে নিজেদের প্রাণকে অধিক প্রিয় মনে করা। এটি এজন্য যে, আল্লাহর পথে যে তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও ক্ষুধা তাদের স্পর্শ করে এবং তাদের এমন পদক্ষেপ যা কাফেরদের মনে ক্রোধের কারণ হয় আর শত্রুদের পক্ষ থেকে তারা যা কিছু প্রাপ্ত হয়-তার প্রত্যেকটির পরিবর্তে তাদের জন্য লিখিত হয়ে নেক আমল। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সৎকর্মশীল লোকদের হক নষ্ট করেন না।”

অতঃপর প্রলোভন:
৯:১২১ – “আর তারা অল্প-বিস্তর যা কিছু ব্যয় করে, যত প্রান্তর তারা অতিক্রম করে, তা সবই তাদের নামে লেখা হয়, যেন আল্লাহ তাদের কৃতকর্মসমূহের উত্তম বিনিময় প্রদান করেন।”

৯:১২২ – “আর সমস্ত মুমিনের অভিযানে বের হওয়া সঙ্গত নয়। তাই তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে এবং সংবাদ দান করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, যেন তারা বাঁচতে পারে।”

>> এ বিশয়ের আলোচনা ‘মুমিনদের শাস্তি ও ভণ্ডদের মুক্তি’ (পর্ব-২৪৩) করা হয়েছে

অতঃপর, “যুদ্ধ ও সহিংসতা” অব্যাহত রাখার নির্দেশ:
৯:১২৩ – “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের নিকটবর্তী কাফেরদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাও এবং তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করুক আর জেনে রাখ, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন।”

‘মুশরিকদের’ বিষয়ে:
৯:১২৪-১২৬ -“আর যখন কোন সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এ সূরা তোমাদের মধ্যেকার ঈমান কতটা বৃদ্ধি করলো? অতএব যারা ঈমানদার, এ সূরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয়েছে। বস্তুতঃ যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে এটি তাদের কলুষের সাথে আরো কলুষ বৃদ্ধি করেছে এবং তারা কাফের অবস্থায়ই মৃত্যু বরণ করলো। তারা কি লক্ষ্য করে না, প্রতি বছর তারা দু’একবার বিপর্যস্ত হচ্ছে, অথচ, তারা এরপরও তওবা করে না কিংবা উপদেশ গ্রহণ করে না।”

অতঃপর, তাদের “নির্বোধ সম্প্রদায়” বলে গালাগালি:
৯:১২৭ – “আর যখনই কোন সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তারা একে অন্যের দিকে তাকায় যে, কোন মুসলমান তোমাদের দেখছে কি-না-অতঃপর সরে পড়ে। আল্লাহ ওদের অন্তরকে সত্য বিমুখ করে দিয়েছেন! নিশ্চয়ই তারা নির্বোধ সম্প্রদায়।”

পরিশেষে, “আত্ম-প্রশংসা” ও দলে যোগদানের আহ্বান (মক্কায় অবতীর্ণ):
৯:১২৮-১২৯ – “তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়। এ সত্ত্বেও যদি তারা বিমুখ হয়ে থাকে, তবে বলে দাও, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত আর কারো বন্দেগী নেই। আমি তাঁরই ভরসা করি এবং তিনিই মহান আরশের অধিপতি।”

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “কিতাব আল-মাগাজি”- আল-ওয়াকিদি, ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ১০৬০-১০৭৬, ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail & Abdul Kader Tayob, পৃষ্ঠা ৫১৯-৫২৭
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[2] অনুরূপ বর্ণনা: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: ISBN 0-19-636033-1; পৃষ্ঠা ৬২০-৬২৪
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[3] মক্কা বিজয়ের পর প্রথম হজ:
Ibid মুহাম্মদ ইবনে ইশাক পৃষ্ঠা ৬১৭-৬২০; Ibid আল-ওয়াকিদি- ভলুম ৩, পৃষ্ঠা ১০৭৭-১০৭৮, ইংরেজি অনুবাদ: পৃষ্ঠা ৫২৭-৫২৮

[4] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী; ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ৭৭-৭৯
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[5] কুরআনের উদ্ধৃতি ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক বিতরণকৃত তরজমা থেকে নেয়া। অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর: http://www.quraanshareef.org/
কুরআনের ছয়জন বিশিষ্ট ইংরেজি অনুবাদকারীর ও চৌত্রিশ-টি ভাষায় পাশাপাশি অনুবাদ: https://quran.com/ ]

[6] মুহাম্মদের বহু অনুসারী বিভিন্ন অজুহাতে ‘জিহাদ’ থেকে অব্যাহতি চাইতেন:
কুরআন: ৮:৭; ৯:৩৮; ৯:৪৯; ৪৭:২০; ৪৮:১১-১২; ইত্যাদি।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.