পশ্চিমবঙ্গের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মাননীয়া মমতা ব্যানার্জি ঘোষণা করেছেন তাঁর সরকার মাসিক পাঁচ হাজার টাকা ভাতার বিনিময়ে ইন্টার্ন নিয়োগ করবেন। প্রতি বছর ছয় হাজার এই ধরণের শিক্ষণবীশ নিয়োগ করা হবে, প্রতি বছর ইন্টার্নদের কাজের মূল্যায়ন করা হবে ভালো কাজ করলে পুনরায় পরের বছরের জন্য কাজে বহাল রাখবে।

মুখ্যমন্ত্রীর নতুন এই প্রকল্পের নাম হল ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টুডেন্টস ইন্টার্নশিপ স্কিম- 2022’। রাজ্যে স্নাতক স্তরে পাঠরত পড়ুয়া, আইটিআই, পলিটেকনিক ও সমতুল পাঠ্যক্রমের পড়ুয়াদের সরকারের কাজে ইন্টার্ন হিসাবে নিয়োগ করবে সরকার। নূন্যতম 60 শতাংশ নম্বরের সঙ্গে এ রাজ্যের বাসিন্দা পড়ুয়া এই স্কিমের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। বয়সের সর্বোচ্চ সীমা রাখা হয়েছে 40 বছর।

□ ইন্টার্নদের কাজ কি হবে?

সাংবাদিকদের মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, “যারা ইন্টার্ন হিসাবে নির্বাচিত হবেন তাদের রাজ্য সরকার, সরকার অধিগৃহীত সংস্থায় পাঠানো হবে। জেলা প্রশাসন, মহকুমা প্রশাসন ও ব্লক স্তরে তাদের কাজে লাগানো হবে।” মূলত সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে পরিচিত ঘটানো হবে এদের কাজ। মমতা ব্যানার্জি আর ও বলেছেন, “সরকারি প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়িত করা হবে তার সঙ্গে ইন্টার্নরা নিজেদের তৈরি করবে। শিখবে। সামাজিক সেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে উন্নততর মানুষ তৈরি করার লক্ষ্য থাকবে। ইন্টার্নশিপের শেষে সফলদের হাতে সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হবে এবং এটি রাজ্যের সরকারি প্রতিষ্ঠানে কার্যকরী হবে”।

□ প্রশ্ন হল সরকারি কাজে রাজ্য সরকারের হঠাৎ ইন্টার্ন নিয়োগের প্রয়োজন হল কেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে এই ইন্টার্ন নিয়োগের ফলে রাজ্য সরকারের শূন্যপদে নিয়োগের পথ কার্যত বন্ধ করার পথে নবান্ন। নিয়োগের পথে তালা দিয়ে পড়ুয়াদের ভাতার পথে ঠেলে দিচ্ছেন মমতা ব্যানার্জি সরকার। বলাইবাহুল্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এরূপ দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই বোঝা যায় রাজ্যের হাঁড়ির হাল কি! মা, মাটি, মানুষের সরকার যাঁরা দাবি করে ‘এগিয়ে বাংলা’, তাঁদের বাংলা আজ কোন দিক থেকে এগিয়ে তা এই পদক্ষেপ থেকেই বোঝা যায়! বস্তুত গত এক দশকে এ রাজ্যে শিক্ষক থেকে সরকারি শূন্য পদে নিয়োগ নেই, নিয়োগ প্রক্রিয়া বারবার আদালতে ধাক্কা খাচ্ছে, যে কটি নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে সেখানে ভুরি ভুরি দুর্নীতির অভিযোগ। আগে ও প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক ইত্যাদি নিয়োগে আদালতকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে, উচ্চ প্রাথমিকে অস্বচ্ছ নিয়োগের অভিযোগে আদালত প্যানেল বাতিল করতে বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের নিয়োগ প্রক্রিয়া ও অস্বচ্ছতার অভিযোগে আদালতের নির্দেশে বাতিল হয়! এই হচ্ছে মা, মাটি, মানুষের সরকারের উন্নয়নের নমুনা!

এরই সঙ্গে সঙ্গে গত এক দশকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বন্ধ করে সরকারি কাজে প্রায় 2 লক্ষ চুক্তি ভিত্তিক কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। মমতা ব্যানার্জির রাজত্বে স্থায়ী নিয়োগের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক কর্মী, সিভিক পুলিশ, ভিলেজ পুলিশ এরাই সরকারি কাজের মূল স্তম্ভ।

বস্তুত পশ্চিমবঙ্গের যুব সমাজের কাছে চরম অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ নেমে আসছে একদিকে সরকারি চাকরির নিয়োগ নেই, যে কটি নিয়োগ সম্পন্ন হচ্ছে নিন্দুকেরা বলে দুধের মধ্যে জল না জলের মধ্যে দুধ তা বোঝাই বড় কষ্টকর! অপরদিকে গত এক দশকে এই সরকারের আমলে বড় কোন শিল্প স্থাপন হয়নি, সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় সিঙ্গুর থেকে যে টাটাদের তাড়ানো হয়েছিল সেই জমিতেই আজ মাছ চাষের ভেড়ি তৈরি করা হচ্ছে! কোথায় গেল তিন ফসলি জমিতে চাষের তত্ত্ব? কোথায় গেল সরকারের চাষ যোগ্য জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবির সত্যতা?

বলাইবাহুল্য পশ্চিমবঙ্গ আজ কার্যত এক, নেই এর রাজ্যে পরিণত হয়েছে। যার চারিদিকে শুধু হাহাকার এবং আর্দনাত! তাই আমরা দেখি সামান্য মাসিক পাঁচশো ও হাজার টাকার লক্ষীর ভান্ডারের মতো প্রকল্পের জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ লাইনে দাঁড়ায়। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আজ কি দুরবস্থা যে তাঁরা পাঁচশো, হাজার টাকার জন্য ও অসহায় ভাবে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে! বলা ভালো পশ্চিমবঙ্গের জনগণ কার্যত আজ ভিখারিতে পরিণত হয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে ভিখারিতে পরিণত করার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয়, তা অবশ্যই মমতা ব্যানার্জির মা, মাটি, মানুষের সরকারের কৃতিত্ব!

পশ্চিমবঙ্গের দুরবস্থা এমনই যে, একদা যে পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশে শিল্প, সংস্কৃতিতে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ছিল এবং যে পশ্চিমবঙ্গে কাজের জন্য ভিন্ন রাজ্য থেকে মানুষ এই রাজ্যে আসত সেই পশ্চিমবঙ্গ আজ এক সস্তা শ্রম সরবরাহকারী রাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় কয়েক কোটি মানুষ কাজের সন্ধানে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে কাজের খোঁজে ভিন্ন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের এত মানুষ যে পরিযায়ী শ্রমিক তা করোনার সময় দেশব্যাপী লকডাউনেই আমরা বুঝতে পারি। যদিও এই সত্য গুলি ভন্ড বুদ্ধিজীবী ও অনুপ্রাণিত সংবাদ মাধ্যম তুলে ধরবে না।

□ প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমবঙ্গ তাহলে কোন দিক থেকে থেকে এগিয়ে?

নিন্দুকেরা বলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বর্তমানে মদ বিক্রিতে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করেছে। সেই সঙ্গে চপ শিল্প, ঢপ শিল্প, ল্যাঙ্চা হাব, কাশ ফুলের বালিশ, কাটমানি, তোলাবাজি শিল্প ইত্যাদিতে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান অর্জন করছে। সেইসঙ্গে মেলা, খেলা, ক্লাব, পুজো, ইমাম, পুরোহিতদের ভাতা ইত্যাদি দিয়ে মোচ্ছব চলছে! অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মেরুকরণে এই সরকার প্রথম সারিতে এগিয়ে রয়েছে।

□ এখন প্রশ্ন হল বর্তমান প্রজন্মের কি হবে? শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতীদের ভবিষ্যৎ এর কি হবে?

প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত শ্রেণী হল শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতীরা। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বাবা, মা কেউ লোকের বাড়ি কাজ করে, কেউ টলি চালিয়ে, কেউ মানুষের কাছে কাজ করে, তাঁদের স্বপ্নগুলিকে জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করেন! বাবা, মায়ের স্বপ্ন হল আমাদের জীবন যেমন করেই কাটুক না কেন, আমাদের সন্তানদের জীবন যেন সুন্দর হয়! তাঁরা চাকরি করবে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আমাদের দুঃখ ঘোচাবে এবং আমাদের জীবনের অন্ধকার দূরীভূত করে আমাদের জীবনে আলো এনে দেবে!

সত্যি বলতে কি শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতীদের চেয়ে অসহায় আর কেউ নেই, এরা প্রতি মুহূর্তে হীনমন্যতায় ভোগে এবং নিজের জীবন নিয়ে হতাশায় ভোগে, যাঁদের পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ানোর কথা তাঁরা আজও পরিবারের উপর নির্ভরশীল এ লজ্জা রাখবে কোথায়? তাঁদের আর্দনাত শুনবে কে?

বস্তুত শিক্ষা ও মেধার এমন অপচয় যা পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায় তা আর কোথাও দেখা গেছে কিনা সন্দেহ! বস্তুত যে রাজ্যে শিক্ষা ও মেধার সন্মান নেই সেই রাজ্য ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ও তা যথার্থ ভাবেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে! গত দুই বছর শিক্ষা ব্যবস্থাকে বন্ধ করে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াতে ব্যাপক অস্বচ্ছতার অভিযোগে রাজ্যের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত হচ্ছে! নিন্দুকেরা বলে রাজ্য সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রকে সজ্ঞানেই অবহেলা করছে আসলে, ‘যত বেশি জানে, তত কম মানে’! তাই কার্যত শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিজেদের অনুগত করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার এ এক আদর্শ ব্যবস্থা!

□ তাহলে প্রশ্ন হল উত্তরণের পথ কি?

পৃথিবীর ইতিহাস বলে যুগে যুগে অত্যাচারি শাসক তাঁর শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে মানুষের উপর চরম অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতন নামিয়ে আনে, তাঁদের পেটোয়া বুদ্ধিজীবী এবং সংবাদ মাধ্যম ও তাঁদের এই প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে। তবে ইতিহাস সাক্ষী যেখানে কোন অন্যায় হয় মানুষ ঠিকই তাঁর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং প্রতিবাদ সংগঠিত করে এবং এক্ষেত্রে ছাত্র সমাজ সবার আগে এগিয়ে আসে। ইতিহাস সাক্ষী স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ও বাংলার ছাত্র সমাজ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল এবং সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল!

বাংলার যুব সমাজ আজও মরে যাইনি! বাংলার যুব সমাজের প্রতি আবেদন আপনারা ও আপনাদের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় করতে এগিয়ে আসুন। অতীতে ও আমরা দেখি ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের অধিকার আদায় করতে সোচ্চার হয়ে কখনও তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হয় আবার কখনও তাঁরা পথে নেমে নিজেদের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করতে আন্দোলন সংগঠিত করে! বলা ভালো, ‘পথই পথ দেখায়!’ একটি সমাজ ব্যবস্থায় অন্যায় হওয়া বড় কথা নয় কিন্তু সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ সংগঠিত না হওয়া সবচেয়ে বড় অন্যায়! আমরা ও আশাবাদী আমাদের যুব সমাজ ঠিকই অন্যায়ের প্রতিবাদ সংগঠিত করবে। নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায় করবে, ন্যায় সুপ্রতিষ্ঠিত করবে ও আগামীকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা যোগাবে। আশাবাদী জাতির এই চরম তমাশাচ্ছন্ন অবস্থায় যুব সমাজ ঠিকই সঠিক পথ দেখাবে! ইতিহাস সাক্ষী অত্যাচারি শাসক ক্ষণিকের জন্য সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হলে ও জাতির রোষানল থেকে বেশি দিন রক্ষা পায় না, সময় ঠিকই তাঁর বিচার করে এবং অহংকার ও অন্যায়ের বিনাশ নিশ্চিত ভাবেই হয়! যা শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র!

তথ্যসূত্র:-

1) গণশক্তি।

http://bangla.ganashakti.co.in/Home/PopUp/?url=/admin/uploade/image_details/2022-02-01/202201312318061.jpg&category=0&date=2022-02-01&button=

http://bangla.ganashakti.co.in/Home/PopUp/?url=/admin/uploade/image_details/2022-02-01/202201312331345.jpg&category=0&date=2022-02-01&button=

শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “পশ্চিমবঙ্গের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ

    1. সহমত পোষণ করি, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি ভালো নয়, তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা যেন ভয়ংকর রকম খারাপ! আগামী দিনে কি হবে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন!

Leave a Reply

Your email address will not be published.