২৪৬: বানু থাকিফ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ ও তার কারণ!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সশরীরে উপস্থিত থেকে কমপক্ষে যে সাতাশটি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন, তার সর্বশেষটি হলো ‘তাবুক অভিযান।’ আর এই অভিযানের অব্যবহিত পূর্বেই তাঁর ছাব্বিশতম অভিযানটি হলো ‘আল-তায়েফ আক্রমণ।’ বানু থাকিফ গোত্রের যে সমস্ত লোকেরা হুনায়েনে সমবেত হয়েছিলেন ও মুহাম্মদের ‘অতর্কিত আগ্রাসী নৃশংস আক্রমণ (পর্ব: ২১১)’ থেকে তাঁদের জীবন নিয়ে পালাতে পেরেছিলেন, তাঁরা পালিয়ে আল-তায়েফে আশ্রয় নেই। ‘হুনায়েন হামলা (পর্ব: ২০২-২১১)‘ সম্পন্ন করার পর মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা সেখান থেকে সরাসরি আল-তায়েফ গমন করেন ও তার অধিবাসীদের ওপর আক্রমণ চালান (পর্ব: ২১২-২১৫)’! তায়েফ-বাসী তাঁদের নগরীর দুর্গের দু’টি দরজাই বন্ধ করে দেয় ও প্রাচীরের ওপার থেকে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নেয়। এই অভিযানে যারা মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় যুদ্ধ করেছিলেন, তাদের অন্যতম ছিল আল-তায়েফের ‘থাকিফ গোত্রের লোকেরা’। এই অভিযানে মুহাম্মদ বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হোন ও তাঁর মোট ১২ জন অনুসারী নিহত হয় (পর্ব: ২১৫)।

নবী মুহাম্মদ তাঁর অতর্কিত মক্কা আগ্রাসন, হুনায়েন আগ্রাসন ও আল-তায়েফ অবরোধ শেষে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন (পর্ব: ১৮৭-২২০) হিজরি ৮ সালের জিলকদ মাসের শেষে, কিংবা জিলহজ মাসের শুরুতে (মার্চ-এপ্রিল, ৬৩০সাল)। তাঁর মদিনায় প্রত্যাবর্তনের অব্যবহিত পরেই ‘উরওয়া বিন মাসুদ’ নামের আল-তায়েফের বানু থাকিফ গোত্রের এক লোক মদিনায় মুহাম্মদের কাছে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। অতঃপর যখন সে তার নিজ অঞ্চল তায়েফে প্রত্যাবর্তন করে, তখন বানু মালিক গোত্রের আউস বিন মালিক নামের এক লোক (অথবা ওহাব বিন জাবিরের গোষ্ঠীর সাথে জোটবদ্ধ এক লোক) তাকে তীর-বিদ্ধ করে হত্যা করে। এ বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা, ‘উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফির হত্যাকাণ্ড’ পর্বে (পর্ব: ২২২) করা হয়েছে।

মুহাম্মদ তাঁর ‘তাবুক অভিযান (পর্ব: ২২৮-২৪৫)’ সম্পন্ন করে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন হিজরি ৯ সালের রমজান মাসে (ডিসেম্বর, ৬৩০ সাল – জানুয়ারি, ৬৩১ সাল))। ঐ মাসেই আল-তায়েফ থেকে “সেই থাকিফ গোত্রের” পাঠানো এক প্রতিনিধি দল মদিনায় মুহাম্মদের কাছে এসে দেখা করে, মুহাম্মদের বশ্যতা স্বীকার করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ও অতঃপর তাদের প্রত্যাবর্তনের পর ‘থাকিফ গোত্রের লোকেরা’ মুহাম্মদের বশ্যতা স্বীকার করে ইসলামে দীক্ষিত হয়।

কী কারণে তাঁরা মুহাম্মদের বশ্যতা স্বীকার করে দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তা আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকরা তাঁদের ‘পূর্ণাঙ্গ’ সিরাত গ্রন্থে বিভিন্নভাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। সবচেয়ে বিস্তারিত বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন আল-ওয়াকিদি।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ খ্রিস্টাব্দ) বর্ণনা: [1] [2] [3]
(আল-ওয়াকিদি ও আল-তাবারীর বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ।)
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৪৫) পর:

‘উরওয়া-কে হত্যার পর [পর্ব-২২২] থাকিফ গোত্রর লোকেরা কয়েক মাস অপেক্ষা করে। অতঃপর তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে ও সিদ্ধান্ত নেয় যে

তারা তাদের চারপাশের আরবদের সাথে যুদ্ধ করতে পারবে না, যারা আনুগত্য-স্বীকার করেছে ও ইসলাম গ্রহণ করেছে।

ইয়াকুব বিন উতবা বিন আল-মুগীরা বিন আল-আখনাস আমাকে বলেছে যে বানু ইলাজ (Ilaj) গোত্রের আমর বিন উমাইয়া নামের এক ভাইয়ের সাথে আবদু ইয়ালিল বিন আমরের সু-সম্পর্ক ছিল না ও তারা একে অপরের সাথে কথা বলতো না। আমর ছিল সবচেয়ে ধূর্ত ব্যক্তি, সে আবদু ইয়ালিলের নিকট যায় ও তার বাসভবনে প্রবেশ করে এবং তাকে বের হয়ে তার কাছে আসার জন্য সংবাদ পাঠায়। আবদু ইয়ালিল অত্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করে এই কারণে যে আমর তার জীবন-যাত্রায় সাবধানী হওয়া সত্বেও তার কাছে আসা উচিত মনে করেছে, তাই সে বেরিয়ে আসে, এবং তাকে দেখার পর সে তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়।

আমর তাকে বলে: “আমরা এক অচলাবস্থার মধ্যে আছি। তুমি দেখেছ যে এই লোকের ব্যাপারটি কিভাবে এগিয়েছে। সমস্ত আরব ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তাদের সাথে লড়াই করার শক্তি তোমাদের নেই, সুতরাং বিষয়টি তোমারা ভেবে দেখো।” অতঃপর থাকিফরা পরামর্শ করে ও একে অপরকে বলে,

“তোমরা কি দেখছ না যে তোমাদের পশুর পালগুলো নিরাপদ নয়; বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা ছাড়া তোমরা কেউ বাইরে যেতে পারো না”

তাই তারা সবাই আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা নবীর কাছে একজন লোক পাঠাবে, যেমন তারা উরওয়াকে পাঠিয়েছিল। তারা আবদু ইয়ালিলের সাথে কথা বলে ও তার সামনে এই পরিকল্পনাটি পেশ করে; সে ছিল উরওয়ার সমবয়সী। কিন্তু সে এই কাজটি করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে, এই ভয়ে যে, সে ফিরে আসার পর তার সাথে একই ব্যবহার করা হবে যেমন-টি উরওয়ার প্রতি করা হয়েছিল। সে বলে যে যদি তারা তার সাথে কিছু লোক না পাঠায় তবে সে যাবে না। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা আল-আহলাফ গোত্রের দু’জন ও বানু মালিক গোত্রের তিনজন লোক পাঠাবে, মোট ছয়জন লোক। (আল-ওয়াকিদি: ‘কেউ কেউ বলে: প্রকৃতপক্ষে দলে ছিল কতিপয় দশজন লোক)। তারা আবদু ইয়ালিলের সাথে যে লোকগুলো পাঠায়, তারা হলো,

(আল-ওয়াকিদি: ‘উরওয়া গোত্রের মিত্রদের পক্ষ থেকে):
[১] আল-হাকাম বিন আমর বিন ওহাব বিন মুয়াত্তিব ও
[২] সুরাহবিল বিন ঘায়েলান বিন সালিমা বিন মুয়াত্তিব;

আর বানু মালিক গোত্রের মধ্য থেকে:
[৩] উসমান বিন আবুল আস বিন বিশর বিন আবদু দুহমান, বানু ইয়াসার গোত্রের এক ভাই;
[৪] আউস বিন আউফ; ও
[৫] আল-হারিথ গোত্রের এক ভাই (আল-তাবারী/আল-ওয়াকিদি: ‘নুমায়ের বিন খারাশাহ বিন রাবিয়া, বাল-হারিথ গোত্রের এক ভাই’)।

আবদু ইয়ালিল এ বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা হিসেবে তাদের-কে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা করে। সে তাদের-কে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল শুধুমাত্র এই ভয়ে যে, তার পরিণতি যেন উরওয়ার পরিণতির মতো না হয়, এবং তার ফিরে আসার পর প্রত্যেক ব্যক্তি যেন তার গোত্রের লোকদের নিরাপত্তার বিষয়ে মনোযোগী হয়।

তারা যখন মদিনার নিকটবর্তী ‘কানাত’ নামক স্থানে এসে থামে, তারা সেখানে আল- মুগীরা বিন শুবা-কে দেখতে পায়। তার পালা ছিল নবিজীর সাহাবীদের উট চরানোর, কারণ সাহাবীরা এই দায়িত্বটি পালাক্রমে গ্রহণ করেছিল। সে যখন তাদের-কে দেখতে পায়, সে থাকাফীদের কাছে উটগুলি রেখে নবীর কাছে তাদের আগমনের সুসংবাদটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য ছুটে যায়। নবীর কাছে তার পৌঁছানোর আগেই সে আবু বকরের সাক্ষাত পায় ও তাকে বলে যে, থাকিফের অশ্বারোহীরা নবীর শর্ত মেনে নিয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছে ও ইসলাম গ্রহণ করতে এসেছে,

এই শর্তে যে, যেনো তারা তাদের লোকজন, তাদের জমি-জমা ও পশুগুলোর [নিরাপত্তার] গ্যারান্টিযুক্ত একটি দলিল পেতে পারে।

আবু বকর আল-মুগীরা কে এই অনুরোধ করে যে সে যেনো তাকে এই খবরটি নবীর কাছে সর্বপ্রথম পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ দেয়, সে [মুগীরা] তাতে রাজী হয়; তাই আবু বকর ভিতরে প্রবেশ করে ও নবী-কে খবরটি জানায়। আর আল-মুগীরা সাহাবীদের সাথে পুনরায় যোগ দেয় ও উটগুলো ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

নবী-কে কীভাবে সালাম দিতে হয় তা সে [মুগীরা] তাদের শিখিয়ে দেয়, কারণ তারা পৌত্তলিকদের রীতি অনুযায়ী সালাম দেওয়ায় অভ্যস্ত ছিল। জনশ্রুতি আছে যে তারা যখন নবীর কাছে আসে, সে তখন তাঁর মসজিদের কাছে তাদের জন্য একটি তাঁবু নির্মাণ করে দেয়। তারা তাদের দলিল না পাওয়া পর্যন্ত খালিদ বিন সাঈদ বিন আল-আস তাদের ও নবীর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করে। আসলে সে ছিল সেই লোক যে এটি লিখেছিল। তারা ইসলাম গ্রহণ না করা ও তাদের দলিলটি না পাওয়া পর্যন্ত নবীর কাছ থেকে তাদের কাছে যে খাবারগুলো আসতো, তার কিছু একটা খালিদ না খাওয়া পর্যন্ত তারা তা খেতো না। [4]

তারা নবীর কাছে যে অনুরোধগুলো করেছিল তার মধ্যে একটি ছিল এই যে তিনি যেনো তিন বছরের জন্য তাদের উপাস্য ‘আল-লাত’ প্রতিমাটি (Idols) ধ্বংস না করে সেটি রেখে দেওয়ার অনুমতি প্রদান করেন। নবী তা প্রত্যাখ্যান করেন। অতঃপর তারা অনুরোধ করতেই থাকে, এক অথবা দুই বছরের জন্য; তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে তারা তাদের দেশে ফেরার পর সেটি এক মাস যাবত রেখে দেওয়ার অনুমতি চায়; কিন্তু তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময় যাবত তা রেখে দিতে রাজি হন নাই। [5]

তারা শুধু যা করতে চেয়েছিল তা হলো, তারা দেখানোর চেষ্টা করছিল যে তারা যেন তাকে [আল-লাত] রেখে দিয়ে তাদের ধর্মান্ধ জনগণ ও নারী ও শিশুদের কাছ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে; তারা চাচ্ছিল না যে তাদের জনগণ ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাকে [আল-লাত] ধ্বংস করে তাদের-কে ভয় দেখায়। নবী তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কিন্তু তিনি সেটি ধ্বংস করার জন্য আবু সুফিয়ান বিন হারব ও আল-মুগীরা বিন শুবা-কে পাঠিয়েছিলেন।

তারা আরও অনুরোধ করে যে তিনি যেনো তাদেরকে নামাজ থেকে অব্যাহতি দেন ও তাদের-কে যেনো নিজ হাতে তাদের উপাস্য প্রতিমাটি ভাঙতে না হয়। নবী বলেন, “আমরা তোমাদের-কে নিজ হাতে তোমাদের প্রতিমাটি ভাঙ্গা থেকে অব্যাহতি দিলাম; কিন্তু নামাজের বিষয়টি হলো এই যে, যে ধর্মে নামাজ নেই সেখানে কোন কল্যাণ নেই।” তারা বলে যে তারা সেগুলি পালন করবে, যদিও এটি তাদের জন্য অবমাননাকর।

তারা ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর নবিজী তাদের-কে তাদের দলিল (document) প্রদান করেন ও উসমান বিন আবদুল আ’স কে তাদের নেতা হিসাবে নিযুক্ত করেন, যদিও সে ছিল তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। এর কারণ ছিল এই যে, ইসলাম ও কুরআন বিষয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে সে ছিল সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী। আবু বকর নবী-কে এই বিষয়টি জানিয়েছিল।

ঈসা বিন আবদুল্লাহ বিন আতিয়া বিন সুফিয়ান বিন রাবিয়া আল-থাকাফি < প্রতিনিধিদের একজনের কাছ থেকে [প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে] আমাকে বলেছে:

আমরা মুসলমান হওয়ার পর আল্লাহর নবীর সাথে রমজানের বাকি দিনগুলো রোজা রাখি। বেলাল আমাদের কাছে নবিজীর কাছ থেকে আমাদের রাতের খাবার ও সকালের খাবার নিয়ে আসতো। ভোরের ক্ষীণ আলোকে সে আমাদের কাছে আসতো ও আমরা বলতাম, “আমরা দেখছি যে ভোর হয়ে গেছে।” সে বলতো, “আমি নবিজী-কে ভোরবেলা খাওয়া অবস্থায় রেখে এসেছি, যাতে আমি পরে সকালের খাবার তৈরি করতে পারি।” আর সে আমাদের জন্য সন্ধ্যার খাবার নিয়ে আসতো ও আমরা বলতাম, “আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সূর্য পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি,” ও সে বলতো, “নবিজীর খাওয়া শেষ না করা পর্যন্ত আমি তোমাদের কাছে আসি নাই।” অতঃপর সে থালায় হাত দিয়ে তা থেকে খাবার খেতো।

সায়েদ বিন আবু হিন্দ <মুতাররিফ বিন আবদুল্লাহ বিন আল-শাখখির <উসমান বিন আবুল আ’স হইতে [প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে] বলেছে:

নবিজী যখন আমাকে থাকিফদের কাছে পাঠিয়েছিলেন, তিনি আমাকে শেষ যে নির্দেশটি দিয়েছিলেন তা হলো লোকদের মধ্যে তাদের দুর্বলতম সদস্যদের বিশয় বিবেচনা করে নামাজ সংক্ষিপ্ত করা; কারণ তাদের মধ্যে আছে বৃদ্ধ ও যুবক, অসুস্থ ও দুর্বলরা৷

তারা যখন তাদের কাজ সম্পন্ন করে তাদের অঞ্চলে ফিরে যাওয়ার জন্য রওনা হয়, তখন নবিজী তাদের প্রতিমা-টি ধ্বংস করার জন্য আবু সুফিয়ান ও আল-মুগীরা কে প্রেরণ করেন। তারা প্রতিনিধি দলটির সাথে যাত্রা করে (আল-ওয়াকিদি: ‘আবু সুফিয়ান ও আল-মুগীরা বিন শুবা দুই বা তিন দিন অপেক্ষা করে। অতঃপর তারা যাত্রা করে’) ও তারা যখন আল-তায়েফের কাছাকাছি এসে পৌঁছে, আল-মুগীরা চায় যে আবু সুফিয়ান যেনো আগে সেখানে যায়। পরের জন [আবু সুফিয়ান] তা প্রত্যাখ্যান করে ও ধুল-হারাম নামক স্থানে তার যে জমি ছিল সেখানে অবস্থান করে। (আল-তাবারী: ‘আবু সুফিয়ান তা প্রত্যাখ্যান করে, এই বলে, ‘তুমি নিজে তোমার আত্মীয়-স্বজনের কাছে যাও।’) [6]

আল-মুগীরা [এলাকায়] প্রবেশ করে প্রতিমাটির কাছে যায় ও একটি কুড়াল দিয়ে তাতে আঘাত করে। (আল-ওয়াকিদি: ‘আল-মুগীরা প্রতিমা-টি ধ্বংস করার জন্য প্রায় দশজন লোক সঙ্গে নিয়ে যাত্রা করে। তারা যখন আল-তায়েফে এসে পৌঁছে, তখন ছিল এশার সময়; তাই তারা রাত্রিটি অপেক্ষা করে ও পরদিন সকালে প্রতিমা-টি ধ্বংস করতে যায়।’)
তার লোকেরা তার সম্মুখে এসে দাঁড়ায়, এই ভয়ে যে, উরওয়ার মতো সে ও হয়তো তীরবদ্ধ ও খুন হবে। থাকিফের মহিলারা তাদের মস্তক অনাচ্ছাদিত করে কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে আসে, বলতে থাকে:

‘ওহে আমাদের রক্ষাকর্তার জন্য করো ক্রন্দন,
কাপুরুষরা হয়তো তাকে করবে অবহেলা
যার তরবারির জন্য প্রয়োজন এক সংশোধনকারীর।’

আল-মুগীরা যখন সেটিকে কুড়াল দিয়ে আঘাত করে, আবু সুফিয়ান বলে, “তোমার জন্য দুঃখ হয়, হায়!” আল-মুঘিরা সেটি ধ্বংস করে ও তাতে যা কিছু ছিল তা ও তার মণি-মুক্তাগুলো ও সেটির সোনা-গহনা ও পুঁতিগুলো সংগ্রহ করার পর, সে আবু-সুফিয়ানের খোঁজ করে।

কারণটি ছিল: থাকিফদের প্রতিনিধি দলটি আসার আগে যখন উরওয়া-কে হত্যা করা হয়েছিল, আবু মুলায়াহ বিন উরওয়া [উরওয়ার পুত্র] ও কারিব বিন আল-আসওয়াদ [উরওয়ার ভাতিজা] আল্লাহর নবীর কাছে আসে, এই অভিপ্রায়ে যে তারা নিজেদের থাকিফদের কাছ থেকে আলাদা করে রাখবে ও তাদের সাথে কোন সম্পর্কই রাখবে না। তারা যখন মুসলমান হয়, নবিজী বলেন, “যাকে তোমাদের ইচ্ছা হয় তাকে বন্ধু-রূপে গ্রহণ করো।” তারা বলে, “আমরা আল্লাহ ও তার রসূলকে বেছে নিয়েছি।” নবিজী বলেন, “আর তোমাদের মামা আবু সুফিয়ান ইবনে হারব,” আর তারা বলে, “তথাপিও।”

আল-তায়েফের লোকেরা যখন ইসলাম গ্রহণ করে ও নবিজী প্রতিমাটি ধ্বংস করার জন্য আবু সুফিয়ান ও আল-মুগীরাকে প্রেরণ করেন, তখন আবু মুলায়াহ বিন উরওয়া [বিন মাসুদ] নবিজীর কাছে এই অনুরোধ করে যে, তার পিতা যে ঋণ রেখে গিয়েছে তা যেনো তিনি প্রতিমাটির সম্পদ থেকে পরিশোধ করেন। আল্লাহর নবী তাতে রাজী হোন। অতঃপর কারিব বিন আল-আসওয়াদ [বিন মাসুদ] তার পিতার জন্য একই অনুরোধ করে। এখানে উরওয়া ছিল আল-আসওয়াদের নিজের ভাই [তাদের পিতা ছিল মাসুদ]। নবিজী বলেন, “কিন্তু আল-আসওয়াদ তো মুশরিক অবস্থায় মারা গিয়েছে।” সে জবাবে বলে, “কিন্তু আপনি তো একজন মুসলমানের প্রতি অনুগ্রহ করবেন, একজন নিকটাত্মীয়ের প্রতি”, মানে সে নিজেই; “তার ঋণের জন্য শুধুমাত্র আমিই দায়বদ্ধ ও আমার জন্য এটি আবশ্যক।” আল্লাহর নবী আবু সুফিয়ান-কে এই নির্দেশ দেন যে প্রতিমাটির ধন-সম্পদ থেকে উরওয়া ও আসওয়াদের ঋণগুলো যেন শোধ করা হয়। অতঃপর আল-মুগীরা যখন সেটির সম্পদ সংগ্রহ করে, তখন সে আবু সুফিয়ান-কে বলে যে আল্লাহর নবী তাকে এই নির্দেশ দিয়েছেন যে সে যেনো এই ঋণগুলো সেভাবে শোধ করে, এবং সে তাই করে।

আল্লাহর নবী তাদের জন্য যে দলিল-টি লিখেছিলেন তা ছিল এই:
‘আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময় ও সহানুভূতিশীল। আল্লাহ প্রেরিত নবী মুহাম্মদের পক্ষ থেকে মুমিনদের প্রতি: ‘ওয়াজ্জের (আল-তায়েফের একটি স্থান) বাবলা গাছ ও তার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না (আল-ওয়াকিদি: ‘নিশ্চিতই, ওয়াজ্জের ঝোপঝাড় ও পশুদের ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না।’)। যে কাউকে এই কাজটি করতে দেখা যাবে, তাকে (আল-ওয়াকিদি: ‘তার খালি গায়ে’) বেত্রাঘাত করা হবে ও তার পোশাক বাজেয়াপ্ত করা হবে। সে যদি এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি করে তবে তাকে ধরে নবী মুহাম্মদের কাছে আনা হবে। এটি হলো আল্লাহর নবী মুহাম্মদের আদেশ।’ আল্লাহর নবী মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর নির্দেশে খালিদ বিন সাঈদ তা লিপিবদ্ধ করেছে; সুতরাং আল্লাহর নবী মুহাম্মদ যা আদেশ করেছেন তা ভঙ্গের পুনরাবৃত্তি করে কেউ যেন নিজের ক্ষতি সাধন না করে।’

আল-তাবারীর (৮৩৯-৯২৩ সাল) অতিরিক্ত বর্ণনা: [2]

‘এই বছর [হিজরি ৯ সাল] আল-তায়েফ অধিবাসীদের এক প্রতিনিধি দল আল্লাহর নবীর কাছে আসে। কথিত আছে যে তারা এসেছিল রমজান মাসে (ডিসেম্বর ১২, ৬৩০ – জানুয়ারি ১১, ৬৩১ সাল)।’ —

আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) অতিরিক্ত প্রাসঙ্গিক বর্ণনা: [3]

তারা বলেছে: আমর বিন উমাইয়া ছিল বানু ইলাজ গোত্রের এক লোক। সে ছিল বেদুইনদের মধ্যে অন্যতম ধূর্ত লোক ও সে তাদের পরিত্যাগ করে এসেছিল। সে বাস্তুত্যাগী (emigrant) হয়ে আবদ ইয়ালিল বিন আমরের গোত্রে যোগ দেয়। একদিন দুপুরবেলা সে পায়ে হেঁটে আবদ ইয়ালিলের উদ্দেশ্যে গমন করে ও তার এলাকায় প্রবেশ করে।—-তাকে দেখার পর সে [আবদ ইয়ালিল] তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানায়।

আমর বলে: “আমরা এমন এক পরিস্থিতির কবলে পড়েছি যা থেকে আমাদের রেহাই নেই। নিশ্চিতই পরিস্থিতিটি হলো এই লোকটির একটি ব্যাপার, যা আমি দেখেছি। বেদুইনরা সবাই ইসলাম কবুল করেছে, তাদের উপর তোমাদের কোন ক্ষমতা নেই।

সত্যিই আমরা আমাদের এই দুর্গে অবস্থান করছি, কিন্তু আমাদের সীমান্তে আক্রমণ হলে এই দুর্গে আমাদের অবস্থা কী হবে?

আমরা আমাদের কোন লোককে আমাদের এই দুর্গ থেকে সামান্য দূরত্বেও বাহির হওয়া নিশ্চিন্ত করতে পারি না। সুতরাং, তোমাদের এই ব্যাপারটি নিয়ে ভাবো।” আবদ ইয়ালিল বলে, “আল্লাহর কসম, আমি তাই দেখেছি যা তুমি দেখেছো। যেভাবে তুমি অগ্রসর হয়েছো, আমি তা পারিনি। নিঃসন্দেহে সংকল্প ও সিদ্ধান্ত তোমার হাতে।”

সে বলেছে: থাকিফরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ও তাদের মধ্যে কেউ কেউ অন্যদের বলে,

“তোমরা কি দেখতে পাচ্ছো না যে উপত্যকাগুলি নিরাপদ নয়। তোমাদের মধ্যে কেউ স্থানান্তরিত হওয়া ছাড়া বাইরে যেও না।”

অত:পর তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ও আল্লাহর নবীর কাছে একজন বার্তাবাহক পাঠাতে চায়, ঠিক যেমন উরওয়া বিন মাসুদ নবীর কাছে গিয়েছিল। সে বলে, “তোমাদের নেতা আবদ ইয়ালিল-কে পাঠাও।” তাই তারা আবদ ইয়ালিল বিন আমর বিন হুবায়েবের সাথে কথা বলে। সে ছিল উরওয়ার সমবয়সী। সে এই কাজটি করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে যদি না তারা তার সাথে অন্য আরও লোক পাঠায়, এই ভয়ে যে, সে যখন মুসলিম হিসাবে নবীর কাছ থেকে তার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে আসবে, তারা হয়তো তার সাথে তাই করবে যা উরওয়ার সাথে করা হয়েছিল। তাই তারা তাদের মিত্রদের মধ্যে থেকে দু’জন ও বানু মালিক গোত্রের মধ্যে থেকে তিনজন লোককে একত্র করে। —-মোট ছয় জন। কেউ কেউ বলে: প্রকৃতপক্ষে এই প্রতিনিধি দলে ছিল কতিপয় দশজন লোক। তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল সুফিয়ান বিন আবদুল্লাহ।’ ——

[মদিনায় আসার পর]

‘প্রতিনিধি দলটি বেশ কয়েক দিন অবস্থান করে ও ঘন ঘন নবীর সাথে দেখা করে, আর নবী তাদের-কে ইসলামের দাওয়াত দেন। আবদ ইয়ালিল তাঁকে বলে, “আমরা আমাদের পরিবার ও লোকদের কাছে ফিরে যাওয়ার পূর্বে কি আপনার রায়টি আমাদের দিচ্ছেন?”

আল্লাহর নবী জবাবে বলেন,

“হ্যাঁ, যদি তোমরা নিজেদের ইসলামে দীক্ষিত করো তবে আমি তোমাদের রায় দেবো। যদি তা না করো, এটা কোন ব্যাপার না, অত:পর আমার ও তোমাদের মধ্যে কোন শান্তিচুক্তি (peace) নেই।”

আবদ ইয়ালিল বলে, “আপনি ব্যভিচার সম্পর্কে কি মনে করেন? প্রকৃতই, আমরা বহু দূরে বসবাসকারী অবিবাহিত পুরুষ ও আমাদের জন্য ব্যভিচার আবশ্যক।” তিনি জবাবে বলেন, “আল্লাহ মুসলমানদের জন্য যা নিষিদ্ধ করেছে, এটি হলো তার মধ্যে একটি। কারণ আল্লাহ বলেছে: “আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।” [কুরআন: ১৭:৩২] [7]

সে বলে, “আর সুদ বিশয়ে আপনি কি মনে করেন?” তিনি জবাবে বলেন, “এটি হারাম!” সে বলে, “প্রকৃতই আমাদের সমস্ত সম্পত্তি সুদ দ্বারা অর্জিত।” নবীজি উত্তর দেন, “শুধু মূলধনই তোমার সম্পত্তি। আল্লাহ বলেছে: “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক।” (কুরআন: ২:২৭৮)।

সে বলে, “আর আপনি মদ সম্পর্কে কি মনে করেন? নিশ্চিতই, এটি আমাদের আঙ্গুরের রস ও আমরা এর থেকে অব্যাহতি পেতে পারি না।” নবী জবাবে বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা নিষেধ করেছে।” অতঃপর আল্লাহর নবী এই আয়াত পাঠ করেন: হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ—” এখান থেকে এই আয়াতের শেষ পর্যন্ত। [অর্থাৎ, “হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক-যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।” (কুরআন: ৫:৯০)]

সে বলেছে: লোকেরা উঠে দাঁড়ায়, আর কেউ কেউ অন্যদের সাথে সরে যায়।। আবদ ইয়ালিল বলে: “ধিক্ তোমাদের, আমরা আমাদের লোকদের কাছে ফিরে যাবো, আর এই তিনটি কাজকে নিষেধ করবো! আল্লাহর কসম, থাকিফের লোকেরা মদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করবে না, কখনো নয়। না কখনও ব্যভিচার সম্পর্কে!”

সুফিয়ান বিন আবদুল্লাহ বলে: “নিশ্চয়ই ঈশ্বর যা চায় তাইই সর্বোত্তম, সুতরাং ধৈর্য ধারণ করো। যারা মুহাম্মদের সাথে আছে তারা ছিল আমাদেরই মত, কিন্তু তারা ধৈর্য ধারণ করেছে ও তারা যা করতো (ব্যভিচার, ইত্যাদি) তা ছেড়ে দিয়েছে। যদিও আমরা এই লোকটিকে ভয় করি, তিনি পৃথিবীতে এসে বিজয়ী হয়েছেন, আর আমরা দেশের একটি কোণে একটি দুর্গে রয়েছি। ইসলাম আমাদের চারিপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।

আল্লাহর কসম, তিনি যদি আমাদের গতি রোধ করে দুর্গের ওপর এসে একমাস অবস্থান করেন, তাহলে আমরা অনাহারে মরে যাবো; অতএব ইসলাম ছাড়া আর কোন গত্যন্তর দেখি না। আমি মক্কা বিজয়ের অনুরূপ এমন একটি দিনকে ভয় করি!” —

[ইসলাম গ্রহণের বিনিময়ে মুহাম্মদের নিরাপত্তার দলিলটি পাওয়ার পর]

‘প্রতিনিধি দলটি আল-তায়েফ প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তারা যখন থাকিফদের নিকটবর্তী হয়, আবদ ইয়ালিল বলে, “আমি লোকদের মধ্যে থাকিফদের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল, সুতরাং তাদের কাছ থেকে বিষয়টি গোপন করো। তাদেরকে লড়াই ও যুদ্ধের ভীতি প্রদর্শন করো। তাদের জানিয়ে দিও যে, মুহাম্মদ আমাদের এমন বিষয় সম্পর্কে আদেশ করেছে যেগুলি আমাদের জন্য খুব কঠিন ও আমরা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছি। সে আমাদের-কে ব্যভিচার ও মদ হারাম করার নির্দেশ দিয়েছে ও আমাদের সম্পত্তি থেকে অতিরিক্ত সুদ গ্রহণ হ্রাস করতে ও আমাদের দেবী-প্রতিমাটি ধ্বংস করতে বলেছে।”

দলটি নিকটে আসার প্রাক্কালে থাকিফরা বের হয়ে আসে। দলটি যখন তাদের দেখতে পায়, তারা ধীরে ধীরে অগ্রসর হয় ও তাদের উটগুলো জড়ো করে। দুঃখী ও শোকার্ত মানুষের মুখগুলোর মতো তারা তাদের পোশাকে নিজেদের আড়াল করে, যাতে মনে হয় যে তারা খুশী মনে ফিরে আসেনি। থাকিফরা যখন তাদের মুখমণ্ডলে বিষাদের চিহ্ন দেখতে পায়, তাদের কেউ কেউ বলে, “তোমাদের প্রতিনিধি দলটি ভাল খবর নিয়ে আসে নাই।”

প্রতিনিধি দলটি [এলাকায়] প্রবেশ করে। তারা আল-লাত দিয়ে শুরু করে। লোকজন বলে, দলটি যখন এসেছিল: তারা এসব করেছিল। লোকেরা ভিতরে প্রবেশ করে, তারা ছিল মুসলমান, তথাপি তারা যে উদ্দেশ্যে এসেছিল তা তারা পালন করে, নিজেদের রক্ষা করে। থাকিফরা বলে যে তা ছিল এমন যেন তারা তাকে (আল-লাত) আগে কখনো দেখেনি! অতঃপর তাদের প্রত্যেকেই তার পরিবারের কাছে ফিরে যায়।

থাকিফদের লোকজন একত্রিত হয়ে তাদের কাছে আসে ও তাদের-কে জিজ্ঞাসা করে, “তোমরা কি নিয়ে ফিরে আসলে?” প্রতিনিধি দলটি নবীর কাছে এই অনুরোধ করেছিল যে উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার প্রয়োজনে তিনি যেনো তাদের-কে তাঁর সম্পর্কে বেফাঁস কথাবার্তা বলার অনুমতি দেন। তারা বলে “আমরা তোমাদের কাছে এমন এক ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছি যে হলো রুক্ষ ও অভদ্র। সে তার ব্যাপারে থেকে যা কিছু চায়, তা সে তলোয়ারের মাধ্যমে জয় করে। সে বেদুইনদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেছে ও লোকেরা তার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। ভীরুদের সন্তানরা তাদের দুর্গের ভিতরে তার ভয়ে আতঙ্কিত। হয় সে তার ধর্মের দ্বারা মুগ্ধ করে অথবা তলোয়ারের মাধ্যমে আতঙ্কিত করে। সে একটি জোরালো বিষয় নিয়ে আমাদের মুখোমুখি হয় ও তা দিয়ে সে আমাদের আতঙ্কিত করে। আমরা তা পরিত্যাগ করে তার কাছ থেকে চলে এসেছি। সে আমাদের ব্যভিচার, মদ ও সুদ নিষিদ্ধ করেছে; এবং আমাদের এই নির্দেশ দিয়েছে যে আমরা যেনো আমাদের দেবী-প্রতিমাটি ধ্বংস করি।”

থাকিফরা বলে, “আমরা কখনোই এটি করব না।”
প্রতিনিধি দলের লোকেরা বলে, “আমার প্রাণের কসম, আমরা যা ঘৃণা করি তা হলো সে আমাদের উপর অত্যাচার করেছে। আমরা মনে করি, সে আমাদের প্রতি ন্যায্য আচরণ করে নাই। অতএব তোমাদের অস্ত্র প্রস্তুত করো। আর তোমাদের দুর্গগুলো মেরামত করো ও যুদ্ধ মেশিনগুলো ও ম্যাঙ্গোনেলগুলো স্থাপন করো। তোমাদের দুর্গে এক বা দুই বছরের জন্য খাবার মজুত করো। সে তোমাদের দুই বছরের বেশি অবরোধ করে রাখবে না। তোমাদের দুর্গের পিছনে একটি পরিখা খনন করো। তাড়াতাড়ি করো, কারণ নিশ্চিতই তার কর্তৃত্ব বজায় আছে ও আমরা তাকে বিশ্বাস করি না।”

তারা এক বা দুই দিন যুদ্ধের বাসনা ধরে রাখে। অতঃপর আল্লাহ তাদের অন্তরে ভীতি স্থাপন করে ও তারা বলে, “তার বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনো ক্ষমতা আমাদের নেই। সে সকল বেদুইনদের তার বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেছে। অতএব তোমরা তার কাছে ফিরে যাও ও সে যা চায় তাকে দাও ও তার সাথে শান্তি-চুক্তি স্থাপন করো। আর, সে আমাদের দিকে অগ্রসর হওয়া ও তার সৈন্যদল পাঠানোর আগেই তোমাদের ও তার মধ্যে একটি দলিল লিপিবদ্ধ করো।”

প্রতিনিধি দলটি যখন দেখে যে তারা বিষয়টি মেনে নিয়েছে ও নবীকে ভয় পেয়েছে ও ইসলামে দীক্ষিত হতে চেয়েছে ও আতঙ্কের পরিবর্তে নিরাপত্তা বেছে নিয়েছে; তখন দলটি বলে, “প্রকৃতপক্ষে আমরা এটি সম্পন্ন করেছি। আমাদের যা পছন্দ করেছিলাম তা তিনি আমাদের দিয়েছেন ও আমরা যা চেয়েছিলাম তা তিনি আমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। আমরা তাকে লোকদের মধ্যে সবচেয়ে খোদাভীরু হিসাবে পেয়েছি; লোকদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু, সর্বাধিক সফলকাম, সবচেয়ে আন্তরিক, বিশ্বস্ত ও সবচেয়ে উদার। তিনি আমাদের-কে দেবী-প্রতিমাটি ধ্বংস করা থেকে মুক্তি দিয়েছেন, কারণ আমরা তাকে ধ্বংস করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেছি। আর তিনি বলেছেন, ‘আমি একজনকে পাঠাব যে এটি ধ্বংস করবে,’ এবং তিনি এমন কাউকে পাঠাবেন যে এটি ধ্বংস করবে।” —-

– অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ – লেখক।

>>> আদি উৎসে মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-তাবারী ও আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো:

“বানু থাকিফ গোত্রের লোকেরা যে কারণে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তা হলো, ‘ভীতি ও তাঁদের ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা শঙ্কা’!”

তাঁরা তাঁদের ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা শঙ্কায় এতটায় ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলেন যে তারা যে কোন শর্তে ‘মুহাম্মদের তরবারি’ থেকে বাঁচতে চেয়েছিলেন। তাঁদের এই বশ্যতা স্বীকার ও ইসলাম গ্রহণ মুহাম্মদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়; তা ছিল মুহাম্মদের অমানবিক নৃশংস অতর্কিত আক্রমণ থেকে তাঁদের ও তাঁদের পরিবার-পরিজনদের রক্ষার প্রয়োজনে!

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল ওয়াকিদির প্রাসঙ্গিক অতিরিক্ত বর্ণনার মূল ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করছি; ইবনে ইশাক ও আল তাবারীর রেফারেন্স: ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক তথ্যসূত্র এক ও দুই:]

The relevant additional narratives of Al-Waqidi: [3]

‘They said: ‛Amr b. ‛Umayya was one of the Banū ’Ilāj. He was one of the most cunning of the Bedouin and he renounced them. He was an emigrant to ‛Abd Yālīl b. ‛Amr. He went walking to ‛Abd Yālīl at noon until he entered his locality. ——- when he [Abd Yālīl] saw him he welcomed him. ‛Amr said, “An affair has alighted on us and there is no escape from it. Indeed it is an affair of this man that I saw. The Bedouin have accepted Islam, all of them, you have no power with them. Indeed we are in this fortress of ours, but what is our stay in the fortress when our borders are attacked? We do not secure one among us to go even one span from this fortress of ours. So think of your affair.” ‛Abd Yālīl said, “By God, I saw [Page 963] what you saw. I was unable to proceed in what you proceeded. Indeed the determination and the decision are in your hands.”

He said: The Thaqīf deliberated among themselves, and some of them said to the others, “Do you not see that the passes are not secure. One of you will not go out except to be removed.” So they deliberated among themselves, and they desired to send a messenger to the Messenger of God, just as ‛Urwa b. Mas‛ūd had gone out to the Prophet. He said, “Send your leader ‛Abd Yālīl” So they spoke to ‛Abd Yālīl b. ‛Amr b. Ḥubayb. He was the same age as ‛Urwa. He refused to act for he feared that when he returned to his people from the Prophet as a Muslim, they would do with him what was done with ‛Urwa, unless they sent other men with him. So they gathered two men from the allies, and three men from the Banū Mālik. —-, six in all. Some said: Indeed the party included some ten men. With them was Sufyān b. ‛Abdullah.’ —–

[After coming to Medina]

‘The Party stayed for several days, visiting the Prophet frequently, and the Prophet invited them to Islam. ‛Abd Yālīl said to him, “Are you judging us until we return to our families and our people?” The Messenger of God replied, “Yes, if you establish yourselves in Islam I will judge you. If not, it is no matter, and there is no peace between me and you.” ‛Abd Yālīl said, “What do you think of adultery? Indeed, we are single men living far away and adultery is necessary for us.” He replied, “It is among what God forbids to Muslims. For God says: Do not approach Adultery, for indeed it is a corrupt and evil way [Q. 17:32].” He said, “And what do you think of usurious interest?” He replied, “It is forbidden!” He said, “Indeed all our property is usurious.” The Prophet replied, [Page 967] “Only the principal of your property is yours. God says: O believers fear God and forgo what is still due from usury if you are believers. (Q. 2:278).” He said, “And what do you think of wine? Indeed. it is the juice of our grapes and we cannot escape from it.” The Prophet replied, “Indeed God has forbidden it.” Then the Messenger of God recited this verse:O believers, wine, idols and divining arrows … to the end of the verse.

He said: The people rose, and some retired with others. ‛Abd Yālīl said: Woe unto you, we will return to our people and forbid these three activities. By God, the Thaqīf will not be patient about wine, ever. Nor about adultery ever! Sufyān b. ‛Abdullah said, “Indeed God desires what is best, so be patient about it. Those who are with Muḥammad were like us, but they were patient and left what they used to do (adultery, etc.). Although we fear this man, he has stepped on the earth victorious, and we are in a fortress in a corner of the land. Islam is spreading around us. By God, if he stands over our fortress for a month we will die of hunger, and I do not see except Islam. I fear a day like the Conquest of Mecca!” ——‘

[After negotiation and getting document]

‘The party went out intending al-Ṭā’if. When they were close to the Thaqīf, ‛Abd Yālīl said, “I am the most knowledgeable of the people about the Thaqīf so conceal from them the affair. Frighten them with war and battle. Inform them that Muḥammad asked us about affairs that are very hard for us and we refused him. He asked us to forbid adultery and wine, and to cut excessive interest from our property, and that we destroy our goddess.” The Thaqīf came out when the party drew near. When the party saw them, they went slowly and gathered their camels. They hid in their garments like the faces of a people who were sad and grieving, and did not return happily. When the Thaqīf saw their faces in sadness and grief, some of them said, “Your party does not come with good news.”

The party entered. They began with al-Lāt. The people said, when the party came down to it: They were doing thus. The people entered, they were Muslims, but they observed what they went out for, protecting themselves. The Thaqīf said that it was as though they had never seen her (al-Lāt) before! Then everyone among them returned to his family. Men among them came together from the Thaqīf and asked them, “What did you return with?” The party had asked permission from the Prophet, and that he be indulgent of their loose talk about him. They said, “We come to you from a man who is rough and rude. He takes from his affair what he wishes and conquers with the sword. He subjugated the Bedouin and the people surrendered to him. The sons of cowards were terrified of him in their fortresses. Either he charms with his religion or frightens with the sword. [Page 970] He confronts us with a strong affair and terrifies us with it. We left it with him. He forbade us adultery, and wine, and usury; and ordered that we destroy the goddess.” The Thaqīf said, “We will not do this, ever.” The party said, “By my life, we hated that he oppressed us. We think he was not fair to us. So prepare your weapons. And repair your fortress, and establish the war machines and mangonels. Take food for a year or two into your fortress. He will not besiege you for more than two years. Dig a trench behind your fortress. Hurry that, for indeed his command remains and we do not trust him.”

They held for a day or two desiring battle. Then God placed fear in their hearts and they said, “We have no power against him. He has subjugated the Bedouin, all of them. So return to him and give him what he asks and make peace with him. And write a document between you and him before he marches to us and sends his soldiers.”

When the party saw that they had accepted the affair, and were frightened of the Prophet, and desired Islam, and chose security over fear, the party said, “Indeed we have carried it out. He gave us what we loved and stipulated for us what we desired. We found him the most God-fearing of the people; the kindest, the most reaching, the most sincere, trustworthy and most gracious of people. He left us from destroying the goddess for we refused to destroy it, and he said, ‘I will send one who will destroy it,’ and he will send some one who will destroy it.” —–

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: ISBN 0-19-636033-1; পৃষ্ঠা ৬১৪-৬১৭
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী; ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ৪২-৪৬
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp
[3] “কিতাব আল-মাগাজি”- আল-ওয়াকিদি, ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ৯৬২-৯৭৩ ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail & Abdul Kader Tayob, পৃষ্ঠা ৪৭১-৪৭৬
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[4] Ibid আল-তাবারী – নোট নম্বর ৩২৬: ‘খালিদ বিন সাঈদ বিন আল-আ’স ছিলেন উমাইয়া বংশের এক ধনী সদস্য। কিছু কিছু রেওয়ায়েত অনুসারে, তিনি ছিলেন ইসলামে ধর্মান্তরিত চতুর্থ ব্যক্তি। তিনি ছিলেন নবিজীর এক লিপিকার (Scribe)। তিনি আবু বকরের বশ্যতা স্বীকার করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেছিলেন ও ‘আলী’ কে তাঁর সমর্থন দিয়েছিলেন। তিনি হিজরি ১৩ সালে (৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ) মৃত্যু বরণ করেন।’

[5] Ibid আল-তাবারী – নোট নম্বর ৩২৭: ‘আল-লাত’ – ‘এটি ছিল প্রাচীন আরব দেবী-প্রতিমা, যার তীর্থস্থানটি ছিল আল-তায়েফের কাছে; যার প্রতীক ছিল একটি শ্বেত পাথর, যাতে সব ধরণের সাজসজ্জা ঝুলানো থাকতো।’

[6] Ibid আল-তাবারী – নোট নম্বর ৩৩২: ‘তুমি নিজে তোমার আত্মীয়-স্বজনের কাছে যাও’, আবু সুফিয়ানের এই মন্তব্যের কারণ হলো, “আল-মুগীরা নিজে ছিল আল-তায়েফের থাকিফ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।”‘

[7] কুরআনের উদ্ধৃতি ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক বিতরণকৃত তরজমা থেকে নেয়া। অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। http://www.quraanshareef.org/

শেয়ার করুনঃ

১ thought on “২৪৬: বানু থাকিফ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ ও তার কারণ!

Leave a Reply

Your email address will not be published.