২৪৭: আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যু ও তার প্রতিক্রিয়া!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

ইসলামের ইতিহাসে আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল এক অতি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তিনি ছিলেন মদিনার খাযরাজ গোত্রের প্রধান, এক অত্যন্ত সাহসী ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন এক বিশিষ্ট আনসার, যিনি মুহাম্মদের মদিনা হিজরতের পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন ও তাঁকে ও তাঁর হিজরতকারী অনুসারীদের (মুহাজির) সাহায্য করেছিলেন। আদি উৎসের এক বর্ণনায় জানা যায়, মুহাম্মদের মদিনায় হিজরতের (সেপ্টেম্বর, ৬২২ সাল) মাস চারেক আগে, জিলহজ মাসে (মে-জুন, ৬২২ সাল) সংঘটিত ‘দ্বিতীয় আকাবা শপথ’ প্রাক্কালে তিনি তাঁর গোত্রের লোকদের সাথে “কাবায় তীর্থযাত্রায়” অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেই ‘শপথ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী’ তাঁর ও অন্যান্য গোত্রের ৭২ জন (৭০জন পুরুষ ও দুই জন মহিলা) লোকদের একজন ছিলেন না। জানা যায়, পরবর্তীতে যখন কুরাইশরা তাঁর কাছে এসে তাঁর গোত্রের ‘শপথকারী’ লোকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন, তখন তিনি তাঁদের বলেছিলেন, “এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; আমার লোকেরা এ বিষয়ে আমার সাথে পরামর্শ না করে এমনতর সিদ্ধান্ত নেওয়ার লোক নয় (‘This is a weighty matters; My people are not men to make a decision without consulting me in such a matter’)।” [1]

আবদুল্লাহ বিন উবাই ছিলেন মদিনার সেই খাযরাজ নেতা, যিনি মুহাম্মদের অমানুষিক নৃশংস’ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে “সর্বপ্রথম” প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করার সৎসাহস দেখিয়েছিলেন; যার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে বদর যুদ্ধের প্রায় দুই সপ্তাহ পর ৬২৪ সালের মার্চ মাসে মদিনার ‘বানু কেইনুকা গোত্রের’ প্রায় সাত শত লোক (পর্ব ৫১) এবং ওহুদ যুদ্ধের মাস পাঁচেক পর ৬২৫ সালে অগাস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে মদিনার ‘বানু নাদির গোত্রের’ লোকেরা প্রাণে বাঁচতে পেরেছিল (পর্ব: ৫২পর্ব: ৭৫)! তিনি ছিলেন সেই লোক, যাকে বানু আল-মুসতালিক হামলার প্রাক্কালে (ডিসেম্বর, ৬২৭ – জানুয়ারি, ৬২৮ সাল) তাঁর নিজ পুত্র আবদুল্লাহ মুহাম্মদের কাছে এই অনুমতি চেয়েছিলেন যে, সে যেনো তার নিজ পিতা আবদুল্লাহ বিন উবাই-কে হত্যা করতে পারে (পর্ব: ৯৭-৯৯)! তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তিত্ব, যিনি মদিনায় মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের যাবতীয় বিরুদ্ধাচরণ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও মুহাম্মদের বহু সিদ্ধান্তের সাথে একমত ছিলেন না। যে কারণে স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাকে ‘মুনাফিক উপাধিতে’ ভূষিত করেছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে আবদুল্লাহ বিন উবাই “মুনাফিক” নামেই সুবিখ্যাত!

আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, তাবুক যুদ্ধ থেকে মুহাম্মদের মদিনায় প্রত্যাবর্তনের মাস দুই পরে, হিজরি ৯ সালের জিলকদ মাসে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ, ৬৩১ সাল) আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যু হয়। আদি উৎসে তাঁর মৃত্যুকালের যে ঘটনা-প্রবাহের বর্ণনা আল-ওয়াকিদি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, তা হলো নিম্নরূপ।

আল-ওয়াকিদির বর্ণনা (৭৪৭-৮২৩ সাল) বর্ণনা: [2]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৪৬) পর:

‘তারা বলেছে: ‛আব্দুল্লাহ বিন উবাই শাওয়ালের অবশিষ্ট রাত্রিগুলো অসুস্থ ছিল। সে জিলকদ মাসে ইন্তেকাল করে ও তাঁর অসুস্থতা বিশ রাত্রি যাবত স্থায়ী ছিল। তার অসুস্থতার সময় আল্লাহর নবী তাকে দেখতে যেতেন ও যখন তার মৃত্যুর দিন উপস্থিত হয়, আল্লাহর নবী তার মৃত্যুর সময়টি-তে তাকে দেখতে যান।

তিনি বলেন, “আমি তোমাকে ইহুদীদের ভালবাসা থেকে নিষেধ করেছিলাম।” আব্দুল্লাহ বিন উবাই জবাবে বলে, “তাদের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য হলো সাদ বিন জুরারা ও সে কোন কাজে আসে নাই।” অতঃপর ইবনে উবাই বলে, “হে আল্লাহর নবী, এটা দোষারোপের উপযুক্ত সময় নয়। এটি মৃত্যু। আমি যদি মারা যাই, উপস্থিত থাকবেন ও আমাকে ধৌত করাবেন ও আপনার জামাটি আমাকে মোড়ানোর জন্য দেবেন।” নবী তাকে তাঁর উপরেরটি [জামাটি] প্রদান করেন, কারণ তিনি দু’টি জামা পরিধান করে ছিলেন; কিন্তু ইবনে উবাই বলে, “আপনার চামড়ার সাথে যেটি আছে, সেটি।” তাই নবী তাঁর চামড়ার সাথের জামাটি খুলে ফেলেন ও তাকে তা প্রদান করেন। অতঃপর ইবনে উবাই বলে, “আমার জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করবেন!”

সে বলেছে: জাবির বিন আবদুল্লাহ অন্য এক কাহিনী বর্ণনা করেছে। সে বলেছে: ইবনে উবাইয়ের মৃত্যুর পর আল্লাহর নবী তার কবরের নিকট আসেন ও তাকে বের করে আনার নির্দেশ দেন। তিনি তার মুখটি অনাবৃত করেন ও তার উপর তাঁর থুথু ছিটিয়ে দেন। অতঃপর তিনি তাঁর হাঁটুতে ভর দিয়ে তাকে তাঁর জামাটি পরিয়ে দেন – তিনি দুটি জামা পরিধান করেছিলেন; তিনি তাকে তার চামড়ার পাশের পোশাকটি পরিয়ে দিয়েছিলেন।

প্রথম উপাখ্যানটি আমাদের কাছে নিশ্চিত করা হয়েছে: সেটি হলো, আল্লাহর নবী তাকে ধৌত করার সময় ও তাকে মোড়ানোর সময় উপস্থিত হোন। অতঃপর তাকে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার (Funeral) স্থানটি-তে নিয়ে যাওয়া হয় ও আল্লাহর নবী সামনে এগিয়ে আসেন ও তার জন্য দোয়া করেন।

তিনি যখন উঠে দাঁড়ান, উমর ইবনে আল-খাত্তাব লাফিয়ে উঠে বলে, “হে আল্লাহর নবী, আপনি কি ইবনে উবাইয়ের জন্য দোয়া করছেন, যেখানে সে এই দিন অমুক অমুক ও এই দিনে অমুক অমুক বলেছে?” অতঃপর সে তার কথার পুনরাবৃত্তি করে। নবী হাস্য করেন ও বলেন, “হে ওমর, আমার পিছনে থাকো!” অতঃপর উমর যখন তাঁর বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করে, তিনি বলেন, “নিশ্চিতই আমার এক বিকল্প ছিল ও আমি তা বেছে নিয়েছি। আমি যদি জানতাম যে তার ক্ষমার জন্য সত্তর বারেরও বেশি প্রার্থনা করলে তার ক্ষমাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে, তবে আমি তার চেয়ে বেশী করতাম; কারণ আল্লাহ বলেছে:

“তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর আর না কর। যদি তুমি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমাপ্রার্থনা কর, তথাপি কখনোই তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না (৯:৮০)।”

কথিত আছে: প্রকৃতপক্ষে তিনি বলেছেন, “আমি সত্তর ছাড়িয়ে যাবো।” আল্লাহর নবী দোয়া করেন ও তাঁর মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ‘আল-বারা’র এই আয়াতটি নাযিল হয়:

“আর তাদের মধ্য থেকে কারো মৃত্যু হলে তার উপর কখনও নামায পড়বেন না এবং তার কবরে দাঁড়াবেন না (৯:৮৪)।” [3]

(ইমাম বুখারীর বর্ণনা [ভলুম ৬, বই ৬০, হাদিস নম্বর ১৯২]: ‘ইবনে আব্বাস হইতে বর্ণিত: আবদুল্লাহ ইবনে উবাই যখন ইন্তেকাল করেন, তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ আল্লাহর নবীর কাছে এসে এই অনুরোধ করে যে তিনি যেন তাঁর জামাটি তাকে দেন, যাতে সে তা দিয়ে তার পিতার কাফন আবৃত করতে পারে। তিনি তাকে তা প্রদান করেন ও অতঃপর আবদুল্লাহ নবীকে অনুরোধ করে যে তিনি যেন তার (তার পিতার) জানাজার নামাজ পড়ান। আল্লাহর নবী তার জানাজার নামাজের জন্য উঠে দাঁড়ান, কিন্তু উমর উঠে দাঁড়ায় ও সে পোশাকটি টেনে ধরে ও বলে, — [বাঁকি বর্ণনা আল-ওয়াকিদির উপরে বর্ণিত বর্ণনারই অনুরূপ])। [4]

কেউ কেউ বলেছে যে এই আয়াতটি [৯:৮৪] নাযিল হওয়ার পর তিনি এ বিশয়ে পদক্ষেপ নেন। আল্লাহর নবী জানতেন যে এই আয়াতগুলি মুনাফিকদের (মুনাফিকুন) সম্পর্কে। তিনি তাদের মৃত লোকদের জন্য আর কোন দোয়া করেন নাই।

মুজামমি বিন জারিয়া যা বর্ণনা করতো, তা হলো: আমি আল্লাহর নবীকে আর কখনোই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় (Funeral) এগিয়ে আসতে দেখি নাই; তিনি সেই সময়ের পরে আর যান নাই। অতঃপর তারা রওনা হয় যতক্ষণ না তারা ইবনে উবাইয়ের কবরে গিয়ে পৌঁছে। তাকে এক খাটুলিতে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যাতে নুবায়তের পরিবারের মৃতদেহগুলো বহন করা হতো।

আনাস বিন মালিক যা বর্ণনা করতো, তা হলো: আমি ইবনে উবাইকে খাটুলির উপর দেখেছি, উচ্চতার কারণে তার পা খাটুলি থেকে বের হয়ে আসছিল।

উম্মে উমারা যা বর্ণনা করতো, তা হলো:

আমরা উবাইয়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দেখেছি, আউস ও খাযরাজের গোত্রের কোনো মহিলাই আবদুল্লাহর কন্যা জামিলার বাড়ি যাওয়া থেকে দূরে থাকে নাই। সে বলছিল, “ওয়া জাবালাহ! আমার বিশাল অবলম্বন, আমার নিকট আশ্রয়।”

কেউ এটাকে নিষেধ করে নাই ও এর জন্য তার কোন দোষ খুঁজে পায় নাই। তারা বলেছে: নিশ্চয়ই এটি হয়তো কবরে তার কাছে গিয়ে পৌঁছেছে।

আমর বিন উমাইয়া আল-দামরি যা বলতো, তা হলো:

নিশ্চয়ই আমরা তার খাটুলির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারি নাই।

সেই মুনাফিকরা তাকে আয়ত্ত করে নিয়েছিল ও তারা ইসলাম ঘোষণা করছিল। তারা ছিল বানু কেইনুকা গোত্রের মুনাফিক (ভণ্ড), আর তাদের অন্যরা ছিল: সা’দ বিন হুনায়েফ, যায়েদ বিন আল-লুসায়েত, সালামা বিন আল-হুমাম, নুমান বিন আবি আমির, রাফি বিন হারমালা, মালিক বিন আবি নওফল, দাইস ও সুয়ায়েদ। তারা ছিল মুনাফিকদের মধ্যে নিকৃষ্টতম। তারাই তাকে দ্রুত নীচে নামিয়ে দিয়েছিল। তার পুত্র আবদুল্লাহ তাদের সাক্ষাত কে সবচেয়ে বেশী অপছন্দ করতো। তার [আবদুল্লাহ বিন উবাই] পেটে ছিল অসুস্থতা, তাই তার ছেলে তাদেরকে বাহিরে রেখে দিয়েছিল। ইবনে উবাই বলেছিল, “আমাকে তাদের নিকটে নিও না;” সে আরও বলেছিল, “আল্লাহর কসম, তোমরা আমার কাছে তৃষ্ণার্তের পানির চেয়েও বেশী প্রিয়।” তখন তারা বলেছিল, “আমরা যদি আমাদের প্রাণ ও সন্তান ও সম্পদ দিয়ে তোমাকে মুক্তি দিতে পারতাম!”

তারা যখন তার কবরের সামনে এসে থেমেছিল, তখন আল্লাহর নবী দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারা তার কবরে নামার জন্য ভিড় করছিল, দাইসের নাকে আঘাত না লাগা পর্যন্ত তাদের কোলাহল বৃদ্ধি পেয়েছিল। দাইসের নাক থেকে রক্তপাত শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত উবাদা বিন আল-সামিত তাদেরকে হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল, এই বলে, “আল্লাহর নবীর সামনে তোমাদের কণ্ঠস্বর নিচু করো!” দাইস কবরে নামতে চেয়েছিল, কিন্তু তাকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

অতঃপর যখন অনুগ্রহ প্রাপ্ত ও ইসলামে দীক্ষিত লোকেরা দেখতে পায় যে আল্লাহর নবী তার সামনে দাঁড়িয়ে তার জন্য দোয়া করছেন ও অংশগ্রহণ করেছেন, তখন তারা নেমে আসে। তার পুত্র আবদুল্লাহ তার কবরে নেমে আসে, অতঃপর আরও নেমে আসে সাদ বিন উবাদা আল-সামিত ও আউস বিন খাওলি, তারা আবদুল্লাহর কাছে এসে থামে। নবীর বিশিষ্ট সাহাবীগণ এবং আউস ও খাযরাজ গোত্রের প্রবীণরা নবীর সাথে দাঁড়ানো অবস্থায় ইবনে উবাইয়ের লাশ কবরে নামিয়ে দেয়। মুজামমি বিন জারিয়া দাবি করেছে যে, সে দেখেছে, আল্লাহর নবী তাঁর হাত দিয়ে তাদের সাথে তাকে নামিয়ে দিয়েছিলেন। অতঃপর তাকে দাফন করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কবরের কাছে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি তার পুত্রকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, অতঃপর প্রস্থান করেছিলেন।’ —–

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

>>> আদি উৎসে আল-ওয়াকিদির উপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিশয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো, আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যুকালে মদিনার অসংখ্য মানুষ তাঁর ‘অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়’ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। ‘বানু কেইনুকা গোত্রকে উচ্ছেদ ও তাঁদের সম্পত্তি লুটের (মার্চ ২৭, ৬২৪ সাল)’ পর থেকে গত সাতটি বছর মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের যাবতীয় নেতিবাচক প্রচারণা সত্বেও তাঁরা তাঁকে ও তাঁর পরিবারের লোকদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন।

অন্যদিকে মুহাম্মদ অনুসারীরা যখন দেখতে পায় যে, নবী মুহাম্মদ স্বয়ং তাঁর জানাজায় অংশগ্রহণ করে তাঁর জন্য দোয়া করেছেন, তখন তারাও সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।

আল-ওয়াকিদির বর্ণনা মতে,

“তিনি এই কাজটি করেছিলেন আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের অনুরোধে।”

আর ইমাম বুখারীর বর্ণনা মতে,

“তিনি তা করেছিলেন তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ বিন আবদুল্লাহর অনুরোধে।”

তাঁর জানাজায় অংশগ্রহণ ও তাঁর জন্য দোয়া করার সপক্ষে মুহাম্মদের অজুহাত (কুরআন: ৯:৮০) ও তা সমাপ্ত করার তাঁর “অনুশোচনা” ও কঠোর নির্দেশ:

“আর তাদের মধ্য থেকে কারো মৃত্যু হলে তার উপর কখনও নামায পড়বেন না এবং তার কবরে দাঁড়াবেন না। তারা তো আল্লাহর প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে এবং রসূলের প্রতিও। বস্তুত: তারা না ফরমান অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছে (৯:৮৪)।”

মুহাম্মদের মনস্তত্বের এই বিষয়টি নতুন কোন বিশয় নয়, যার আলোচনা ‘সুরা তাওবার ‘দ্বিতীয় অংশ পর্বে (পর্ব: ২৪৫) করা হয়েছে। সংক্ষেপে:

‘বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে মুহাম্মদ ও তার অনুসারীরা তাদেরই “আত্মীয়-স্বজন” ৭০ জন কুরাইশকে বন্দী করে ধরে নিয়ে আসেন মদিনায়। অতঃপর এই বন্দিদের কী করা হবে এ বিষয়ে তিনি তার বিশিষ্ট অনুসারীদের সাথে পরামর্শ করেন (পর্ব ৩৬)।

আবু বকর বলে,
“হে আল্লাহর নবী, এই লোকগুলি আমাদেরই চাচাতো-মামাতো-ফুপাতো ভাই, আমাদেরই স্বগোত্রীয় ও ভাইপো-বোনপো। আমি মনে করি আপনার উচিত মুক্তি-পণের বিনিময়ে তাদের কে ছেড়ে দেয়া, তাহলে তাদের কাছ থেকে আমাদের যে উপার্জন হবে তা আমাদের শক্তিবৃদ্ধি করবে এবং সম্ভবত: আল্লাহ তদেরকে সঠিকভাবে হেদায়েত করবে যাতে তারা আমাদের সাহায্যে আসতে পারে।”

অন্যদিকে, উমর ইবনে খাত্তাব বলে:
“না, আল্লাহর কসম! আমি আবু বকরের সাথে একমত নই। আমি মনে করি যে, আপনি তাদের অমুক অমুককে আমার হাতে সোপর্দ করবেন, যাতে আমি তাদের কল্লা কাটতে পারি; আপনার উচিত হামজার ভাই-কে [আল-আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব] তার কাছে সোপর্দ করা, যাতে সে তার ভাইয়ের কল্লা কাটতে পারে এবং আকিলকে আলীর কাছে সোপর্দ করা, যাতে সে তার ভাইয়ের কল্লা কাটতে পারে। তাতে আল্লাহ জানবে যে, আমাদের অন্তরে অবিশ্বাসীদের জন্য কোনোরূপ প্রশ্রয় নেই। এই লোকগুলি তাদের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সর্দার।”

মুহাম্মদ উমরের মত পছন্দ না করে আবু বকরের মতটি পছন্দ করেন। পরদিন সকালে উমর দেখতে পান যে আবু বকরের সাথে বসে মুহাম্মদ অঝোরে কান্না করছেন। যখন উমর মুহাম্মদের কাছে তার কান্নার কারণ জানতে চান, তিনি বলেন, “এটি এই কারণে যে, বন্দীদের মুক্তির জন্য মুক্তিপণ নেয়া, আমার সামনে উপস্থাপিত হয়েছে যে, আমি যেন তাদেরকে শাস্তি প্রদান করি।” আল্লাহ নাজিল করেছে,

৮:৬৭-৬৮- “নবীর পক্ষে উচিত নয় বন্দীদিগকে নিজের কাছে রাখা, যতক্ষণ না দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটাবে। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর, অথচ আল্লাহ্ চান আখেরাত। আর আল্লাহ্ হচ্ছেন পরাক্রমশালী হেকমতওয়ালা। যদি একটি বিষয় না হত যা পূর্ব থেকেই আল্লাহ লিখে রেখেছেন, তাহলে তোমরা যা গ্রহণ করছ সেজন্য বিরাট আযাব এসে পৌছাত।”

আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের জানাজা ও তার জন্য প্রার্থনা করার পর মুহাম্মদের ‘আফসোস’ ও বদর যুদ্ধে ধৃত বন্দিদের নৃশংসভাবে হত্যা না করে তাঁদের ছেড়ে দেয়ার পর মুহাম্মদের ‘আফসোস!’ অবিশ্বাসী ও আনুগত্যহীন প্রতিপক্ষের বিষয়ে নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করার পর পরই তাঁদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের কঠোর নির্দেশ প্রদান! মুহাম্মদের চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যের সন্ধান আমরা জানতে পারি তারই রচিত ব্যক্তি-মানস জীবনী গ্রন্থ ‘কুরআন’ ও আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায়।

মুহাম্মদ ছিলেন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সার্থক কূট পলেটিশিয়ানদের একজন।

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল ওয়াকিদি ও ইমাম বুখারীর প্রাসঙ্গিক বর্ণনার মূল ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করছি:]

The relevant additional narratives of Al-Waqidi: [2]

They said: ‛Abdullah b. Ubayy was sick during the remaining nights of Shawwāl. He died in Dhū l-Qa‛da, and his sickness lasted for twenty nights. The Messenger of God visited him during his sickness, and when it was the day of his death, the Messenger of God visited him while he was dying. He said, “I forbade you from the love of the Jews.” ‛Abdullah b. Ubayy replied, “The most detestable of them was Sa‛d b. Zurāra and he was not useful.” Then Ibn Ubayy said, “O Messenger of God, it is not the right time for blame. It is death. If I die be present and wash me and give me your shirt to be wrapped in.” The Prophet gave him the one on top, for he was wearing two shirts, but Ibn Ubayy said, “The one next to your skin.” So the Prophet took off the shirt next to his skin and gave it to him. Then Ibn Ubayy said, “Pray for me and ask for my forgiveness!”

He said: Jābir b. ‛Abdullah narrates a different account. He says: After the death of Ibn Ubayy, the Messenger of God arrived at his grave and commanded that he be taken out. He revealed his face, and he sprayed his spit on him. Then he supported himself on his knees and dressed him in his shirt—he was wearing two shirts and he dressed him in what had been next to his skin. The first tradition is confirmed with us: that the Messenger of God attended his washing and his wrapping up. Then he was carried to the place of his funeral and the Messenger of God came forward and prayed for him. When he stood up, ‛Umar b. al-Khaṭṭāb jumped up and said, “O Messenger of God are you praying for Ibn Ubayy, when he had said on this day such and such and on this day such and such?” And he repeated to him his words. The Prophet smiled [Page 1058] and said, “Keep behind me, O ‛Umar!” And when ‛Umar increased against him, he said, “Indeed I had a choice, and I have chosen. If I knew that more than seventy pleas for his forgiveness would secure his forgiveness, I would exceed it because of God’s words: Whether you ask for their forgiveness or not; if you ask seventy times for their forgiveness, God will not forgive them (Q. 9:80).” It was said: Indeed he said, “I will exceed seventy.” The Messenger of God prayed and shortly after he turned away, the verses of Barā’a were revealed: You will not pray for one of them that dies nor stand at his grave (Q. 9:84). Some say that he continued to take a step when these verses were revealed. The Messenger of God knew these verses about the Hypocrites (Munāfiqūn). He did not pray over those who were dead.

Mujammi‛ b. Jāriya used to relate saying: I did not see the Messenger of God extend the funeral ever; he did not go beyond the time. Then they set out until they reached Ibn Mujammi‛ b. Jāriya used to relate saying: I did not see the Messenger of God extend the funeral ever; he did not go beyond the time. Then they set out until they reached Ibn Ubayy’s grave. He was carried on a bier upon which the dead are carried in the family of Nubayṭ. Anas b. Mālik used to relate: I saw Ibn Ubayy on the bier and his legs were sticking out from the bier because of his height. Umm ‛Umāra used to relate saying: We saw the funeral of Ubayy, and not a woman from the Aws and Khazraj stayed away from the house of ‛Abdullah b. Ubayy’s daughter, Jamῑla. She kept saying, “Wa jabalāh!” One does not forbid it nor find fault with her over it. “My mountain of support, my corner of support.” They said: Indeed it would have reached him in his grave.

‛Amr b. Umayya al-Ḍamrῑ used to say: Surely we tried to get near his bier, but were unable. Those Hypocrites took possession of him, and they [Page 1059] proclaimed Islam. They were Hypocrites from the Banū Qaynuqā‛ and others of them: Sa‛d b. Ḥunayf, Zayd b. al-Luṣayt, Salāma b. al-Ḥumām, Nu‛mān b. Abī ‛Āmir, Rāfi‛ b. Ḥarmala, Mālik b. Abī Nawfal, Dā‛is and Suwayd. They were the worst of the Hypocrites. They were those who ran him down. His son ‛Abdullah detested nothing more than seeing them. He had a sickness in his belly, so his son locked them out. Ibn Ubayy says, “Do not take me close to them,” adding, “You are, by God, more dear to me than water to the thirsty.” While they say, “Would that we ransomed you with our souls and the children and the property!”

When they stopped before his grave, the Messenger of God stood looking at them. They crowded to descend into his grave, their voices raised until Dā‛is’ nose was hurt. ‛Ubāda b. al-Ṣāmit tried to drive them away, saying, “Lower your voices before the Messenger of God!” until Dā‛is’ nose began to bleed. Dā‛is wanted to descend into the grave, but he was pushed away. Then men from his group, people of grace and Islam, descended when they saw the Messenger of God pray and attend to him while standing over him. His son, ‛Abdullah, descended in his grave, and Sa‛d b. ‛Ubāda b. al-Ṣāmit and Aws b. Khawlῑ also descended until they were on the same level as ‛Abdullah. The prominent companions of the Prophet and the elders of the Aws and Khazraj lowered the body of Ibn Ubayy into the grave while they stood with the Prophet. Mujammi‛ b. Jāriya claimed that he saw the Messenger of God lower him with his hand to them. Then he stood at the grave until he was buried. He comforted his son, and departed.’ —–

Volume 6, Book 60, Hadith 192 [4]

‘Narrated Ibn `Abbas: When `Abdullah bin ‘Ubai died, his son `Abdullah bin `Abdullah came to Allah’s Messenger (ﷺ) and asked him to give him his shirt in order to shroud his father in it. He gave it to him and then `Abdullah asked the Prophet (ﷺ) to offer the funeral prayer for him (his father). Allah’s Messenger (ﷺ) got up to offer the funeral prayer for him, but `Umar got up too and got hold of the garment of Allah’s Messenger (ﷺ) and said, “O Allah’s Messenger (ﷺ) Will you offer the funeral prayer for him though your Lord has forbidden you to offer the prayer for him” Allah’s Messenger (ﷺ) said, “But Allah has given me the choice by saying: ‘(Whether you) ask forgiveness for them, or do not ask forgiveness for them; even if you ask forgiveness for them seventy times..’ (9.80) so I will ask more than seventy times.” `Umar said, “But he (`Abdullah bin ‘Ubai) is a hypocrite!” However, Allah’s Messenger (ﷺ) did offer the funeral prayer for him whereupon Allah revealed: ‘And never (O Muhammad) pray for anyone of them that dies, nor stand at his grave.’ (9.84)

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] আল-তাবারী: ভলুউম ৬, ইংরেজি অনুবাদ: W. Montgomery Watt and M.V McDonald, [State university of New York press, Albany, @1988, New-York 12246, ISBN 0-88706-707-7 (pbk) পৃষ্ঠা ১৩৪ ও ১৩৭

[2] “কিতাব আল-মাগাজি”- আল-ওয়াকিদি, ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ১০৫৭-১০৬০, ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail & Abdul Kader Tayob, পৃষ্ঠা ৫১৮-৫১৯

[3] অনুরূপ বর্ণনা: সহি বুখারী, ভলুম ৬, বই ৬০, হাদিস নম্বর ১৯৩:

অনুরূপ বর্ণনা: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬২১

[4] সহি বুখারী, ভলুম ৬, বই ৬০, হাদিস নম্বর ১৯২:

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.