২৫৩: সুরা তাওবাহর ‘চূড়ান্ত নির্দেশ ও শিক্ষার’ প্রেক্ষাপট!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

আদি উৎসে মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-ওয়াকিদি, আল-তাবারী, ইমাম বুখারী প্রমুখ আদি মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর ‘তাবুক অভিযান থেকে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন হিজরি ৯ সালের রমজান মাসে। অতঃপর ঐ মাসেই বানু থাকিফ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ; জিলকদ মাসে আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যু ও অতঃপর জিলহজ্জ মাসে (মার্চ-এপ্রিল, ৬৩১) নবী মুহাম্মদের মক্কা বিজয় পরবর্তী প্রথম হজ্জ। এই হজ্জে নবী মুহাম্মদ নিজে অংশগ্রহণ করেন নাই। তিনি আবু বকর-কে প্রতিনিধি নিযুক্ত করে কিছু অনুসারী সহকারে এই হজ্জে প্রেরণ করেন (পর্ব: ২২৮-২৪৮)

আবু বকর তাঁর দলবল নিয়ে রওনা হওয়ার পর মুহাম্মদ ‘আল্লাহর নামে’ সুরা তাওবাহর প্রথম ৩০-৪০টি বাণী অবতীর্ণ করেন। অতঃপর তিনি আলী ইবনে আবু তালিব-কে এই নির্দেশ প্রদান করেন যে সে যেন এই হজ্জে অংশগ্রহণ করে ও আরাফার ময়দানে উপস্থিত লোকদের সামনে তাঁর এই অমানুষিক ও নৃশংস “চূড়ান্ত নির্দেশগুলো” পড়ে শোনান।

ইসলাম বিশ্বাসী ‘তথাকথিত মোডারেট (ইসলামে কোন কোমল, মোডারেট বা উগ্রবাদী শ্রেণী বিভাগ নেই; ইসলাম একটিই, তা হলো নবী মুহাম্মদের ইসলাম)’ পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা যে দাবীটি প্রায়ই করে থাকেন, তা হলো, নবী মুহাম্মদ ‘সুরা তাওবাহর প্রথমাংশের’ এই চূড়ান্ত নির্দেশগুলো জারী করেছিলেন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে। তাঁদের এই দাবীটি যে “ডাহা মিথ্যা”, তা আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এ বিশয়ে আংশিক আলোচনা “সুরা তাওবাহ-প্রথমাংশ: চূড়ান্ত নির্দেশ ‘তাদের হত্যা কর’ ও চূড়ান্ত শিক্ষা ‘তারা অপবিত্র’” পর্ব দু’টিতে করা হয়েছে (পর্ব: ২৪৯-২৫০)। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায় এ বিশয়ের সবিস্তার আলোচনা অপরিহার্য। আদি উৎসের বর্ণনায় ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ খ্রিস্টাব্দ) বর্ণনা: [1] [2] [3]
(আল-ওয়াকিদি ও আল-তাবারীর বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ।)
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৫২) পর:

‘আল্লাহর নবী রমজান মাসের বাকি অংশ, শাওয়াল ও জিলকদ মাস সেখানে অবস্থান করেন। অতঃপর হিজরি ৯ সালে মুশরিকরা যখন তাদের তীর্থস্থানগুলোতে অবস্থান করছিল, তিনি আবু বকর-কে প্রতিনিধি করে মুসলমানদের কে হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। আবু বকর ও মুসলমানগণ যথাযথ রওনা হয়।

আল্লাহর নবী ও মুশরিকদের মধ্যে যে চুক্তি ছিল তা ভঙ্গ করার অনুমতি দিয়ে যা নাজিল হয়েছিল, তা হলো, যারা কাবায় আগমন করেছে তাদের কাউকেই সেখান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত নয় ও পবিত্র মাসে [জিলকদ, জিলহজ্জ, মহরম ও রজব মাস] তাদের কারও ভীত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

এটি ছিল তাঁর ও মুশরিকদের মধ্যে এক সাধারণ চুক্তি; ইতোমধ্যে আল্লাহর নবী ও আরব উপজাতি-গুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট মেয়াদের বিশেষ চুক্তি ছিল।

অতঃপর এ সম্পর্কে এবং তাবুক অভিযানে যে সমস্ত মুনাফিকরা তাঁর কাছ থেকে পিছিয়ে ছিল তাদের সম্পর্কে ও তারা যা বলেছিল, সে সম্পর্কে ওহী নাজিল হয়; যেখানে আল্লাহ পিছনে পড়ে থাকা লোকদের গোপন অভিসন্ধি-গুলো উন্মোচন করে দেয়। আমরা তাদের কিছু লোকের নাম জানি, অন্যদের আমরা জানি না।—–‘

হাকিম বিন হাকিম আববাদ বিন হুনায়েফ < আবু জাফর মুহাম্মদ বিন আলী হইতে [প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে] আমাকে বর্ণনা করেছে যে, আবু বকর-কে প্রতিনিধি নিযুক্ত করে হজ্জে পাঠানোর পর যখন এই ওহী নাজিল হয়, কেউ একজন অনুরোধ করে যে তিনি যেন আবু বকরের কাছে খবরটি পাঠান। তিনি বলেন,

“আমার নিজের পরিবারের লোক ব্যতীত কেউ এটি আমার কাছ থেকে অন্য লোকের কাছে হস্তান্তর করবে না।”

অতঃপর তিনি আলীকে ডেকে পাঠান ও বলেন:
‘”এই ওহীটির” শুরু থেকে এই অংশটি নাও ও কোরবানির দিন যখন তারা মিনায় সমবেত হবে তখন তুমি এটি তাদের কাছে ঘোষণা করো। কোন অবিশ্বাসী জান্নাতে প্রবেশ করবে না ও এ বছরের পর কোন মুশরিক তীর্থযাত্রা করতে পারবে না এবং কোন উলঙ্গ ব্যক্তি মন্দির (কাবা) প্রদক্ষিণ করবে না। আল্লাহর নবীর সাথে যাদের চুক্তি আছে, তা (শুধুমাত্র) তার নির্ধারিত সময়ের জন্য।’”

আল্লাহর নবীর কান-কাটা উটটি তে চড়ে আলী এগিয়ে যায় ও পথে আবু বকরকে ধরে ফেলে। আবু বকর তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করে যে সে কী তাদেরকে নির্দেশ দিতে এসেছে নাকি তাদেরকে তা পৌঁছে দিতে এসেছে। সে বলে, ”তাদেরকে তা পৌঁছে দিতে।”

তারা একসাথে যাত্রা করে ও আবু বকর হজ্জটি পরিচালনা করে। ঐ বছর আরবরা তাই পালন করছিল যা তারা জাহিলিয়া যুগে (heathen period) করতো। যখন কোরবানির দিনটি আসে, আলী উঠে দাঁড়ায় ও আল্লাহর নবী তাকে যা বলার নির্দেশ দিয়েছিলেন তা সে ঘোষণা করে এবং এই ঘোষণার তারিখ থেকে লোকদের চার মাস সময় দেয়, যাতে তারা নিরাপদ স্থানে বা তাদের এলাকায় ফিরে যেতে পারে।

অতঃপর কোন চুক্তি বা সন্ধিচুক্তি বলবত থাকবে না; ব্যতিক্রম শুধুমাত্র সেটি যাদের সাথে আল্লাহর নবীর নির্দিষ্ট মেয়াদের কোন চুক্তি আছে, তা সে সেটির মেয়াদ পর্যন্ত বলবত রাখতে পারবে।

ঐ বছরের পর কোনো মুশরিকই তীর্থযাত্রায় অংশগ্রহণ করে নাই বা উলঙ্গ অবস্থায় কাবা ঘর প্রদক্ষিণ করে নাই। অতঃপর তারা দু’জন আল্লাহর নবীর কাছে ফিরে যায়। এই ওহীটি ছিল মুশরিকদের ব্যাপারে যারা সাধারণ চুক্তি-তে আবদ্ধ ছিল ও যারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবকাশ পেয়েছিল।’ —–

আল-তাবারীর (৮৩৯-৯২৩ সাল) অতিরিক্ত বর্ণনা: [2]
(আংশিক আলোচনা ইতোমধ্যেই করা হয়েছে [পর্ব: ২৪৯], আলোচনার বাঁকি অংশ)

‘মুহাম্মদ বিন আল-হুসায়েন <আহমদ বিন আল-মুফাদদাল <আসবাত < আল-সুদদি -৫৩৬ হইতে [প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে] এক বর্ণনা পেয়েছি: [4] [5] [6]

‘যখন এই আয়াতগুলি (সূরা আল-বারাহর এক থেকে ৪০ নম্বর) অবতীর্ণ হয়, আল্লাহর নবী সেগুলো সহকারে আবু বকর-কে নেতা নিযুক্ত করে হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। আবু বকর যখন ধু আল-হুলাইফার অঞ্চলের আল-শাজারাহই এসে পৌঁছে, আলী তাকে অনুসরণ করে এসে উক্ত আয়াতগুলো তার কাছ থেকে গ্রহণ করে। [7]

সে-কারণে আবু বকর আল্লাহর নবীর কাছে প্রত্যাবর্তন করে ও বলে, “হে আল্লাহর নবী, আপনিই হউন আমার পিতা-মাতার সহায়! আমার সম্পর্কে কী ওহী নাজিল হয়েছে?”

তিনি জবাবে বলেন, “না; কিন্তু আমি কিংবা আমার পরিবারের কেউ ছাড়া অন্য কারও এটি ঘোষণা (কোন বিধান ঘোষণা) করা উচিত নয়। হে আবু বকর, তুমি কি খুশি নও এই কারণে যে তুমি আমার সাথে ছিলে গুহায় [কুরআন: ৯:৪০] ও তুমি আমার সঙ্গী হয়ে জলাধারের পাশে থাকবে?” সে জবাবে বলে, “হে আল্লাহর নবী, অবশ্যই হ্যাঁ,” অতঃপর সে হাজীদের প্রধান হিসাবে যাত্রা করে, যেখানে আলী নিরাপত্তার ঘোষণাটি প্রদান করে।

‘কুরবানির দিনটি-তে আলী দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে:

“এই বছরের পরে কোন মুশরিক পবিত্র মসজিদের কাছে আসবে না ও কেউ উলঙ্গ হয়ে এই ঘর (অর্থাৎ, কাবাঘর) প্রদক্ষিণ করবে না। যাদের নিজেদের ও আল্লাহর নবীর মধ্যে কোন চুক্তি আছে, তাদের চুক্তি তার মেয়াদ [শেষ হওয়া] পর্যন্ত বলবত থাকবে। এই দিনটি হলো আহার ও পানের (অর্থাৎ, অনুষ্ঠান)। আল্লাহ একমাত্র তাদেরকেই জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেবে যারা মুসলমান।”

(মুশরিকরা) বলে, “কোন প্রতিবাদ ছাড়ায় আমরা নিজেদেরকে আমাদের চুক্তি ও তোমার ও তোমার চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে মুক্ত ঘোষণা করছি।” অতঃপর মুশরিকরা পরস্পরকে দোষারোপ করতে করতে ফিরে যায় ও বলে, “তোমরা কী করবে? কুরাইশরা ইসলাম কবুল করেছে, অতএব ইসলাম গ্রহণ করাই তোমাদের জন্য উত্তম।”‘ ——

আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) বর্ণনা: [3]

‘সে বলেছে: মা’মার [ইবনে রশিদ] আমাকে <মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ, ইবনে আবি হাবিবা, ইবনে আবি সাবরা, উসামা বিন যায়েদ, হারিথা বিন আবি ইমরান ও আব্দুল হামিদ বিন জাফর, ও প্রত্যেকে, সেইসাথে অন্যরা, এই ঐতিহাসিক ঘটনাটির অংশগুলো আমাকে বর্ণনা করেছে। তারা বলেছে:

এটি সংঘটিত হয়েছিল কুরআনের বারাহ অধ্যায়টি অবতীর্ণ হওয়ার আগে। আল্লাহর নবী মুশরিকদের মধ্যে লোকদের সাথে চুক্তি করেছিলেন।

আল্লাহর নবী আবু বকরকে হজ্জের জন্য প্রতিনিধিরূপে নিযুক্ত করেন। আবু বকর তিনশত লোক সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে রওনা হয়। আল্লাহর নবী তার সাথে বিশটি কোরবানির পশুও প্রেরণ করেন। তিনি সেগুলোকে স্যান্ডেল দিয়ে সজ্জিত করেছিলেন ও তাঁর হাত দিয়ে সেগুলোর ডানদিকে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি নাজিয়া বিন জুনদুব আল-আসলামি কে সেগুলোর তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে নিযুক্ত করেন। আবু বকর পাঁচটি কুরবানির পশু চালনা করে। আবদ আল-রহমান বিন আউফও কুরবানির পশু নিয়ে হজ্জে যায়; আর একদল প্রভাবশালী লোক তাদের সাথে এই তীর্থযাত্রায় গমন করে।

আবু বকর ধু আল-হুলাইফা নামক স্থানে এসে হাজির হয় ও ভোরবেলায় আল-আরজ নামক স্থানে না আসা পর্যন্ত অগ্রসর হয়, যেখানে হঠাৎ সে আল্লাহর নবীর উট ‘আল-কাসওয়া’-এর আওয়াজ শুনতে পায়। সে বলে, “এটি হলো ‘আল-কাসওয়া’!” অতঃপর সে লক্ষ্য করে ও দেখতে পায় যে সেটির উপর চড়ে আছে আলী বিন আবু তালিব। সে বলে, “আল্লাহর নবী কি তোমাকে এই হজ্জের প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন?”

আলী জবাবে বলে, “না, তবে তিনি আমাকে লোকদের সম্মুখে ‘বারাহ’ পাঠ করতে বলেছেন ও তাঁর সাথে চুক্তিবদ্ধ সকল লোকদের চুক্তি বাতিল করতে পাঠিয়েছেন।”

আল্লাহর নবী আবু বকরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি মুশরিকদের বিরোধিতা করতেন, আরাফার দিনটিতে আরাফায় বিশ্রাম নিতেন ও কোন জ্যামের (Jam) ভিতর থামতেন না। আবু বকর সূর্যাস্ত না যাওয়া পর্যন্ত আরাফা থেকে অগ্রসর হওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করে নাই, অতঃপর সূর্যোদয়ের আগেই সে জ্যাম ত্যাগ করেছিল।

আবু বকর মক্কায় না পৌঁছানো পর্যন্ত তার যাত্রা অব্যাহত রেখেছিল ও সে একাই এই তীর্থযাত্রার (হজ্জের) নেতৃত্ব দিয়েছিল। ‘তরবিয়াহ (tarwiyya)’ এর পূর্বে একদিন সে জোহর নামাজের পর লোকদের সম্মুখে ভাষণ দিয়েছিল। ”তরবিয়াহার’ দিনটিতে যখন সূর্য আকাশের মধ্যভাগ থেকে ঢলে পড়েছিল, তখন সে সাতবার কাবাঘর প্রদক্ষিণ করেছিল।’ ——– [8]

‘কুরবানির দিনটিতে আলী, আল-জামরায়, ‘বারাহ’ অধ্যায়টি পাঠ করেছিল ও চুক্তি-তে আবদ্ধ সকল লোকদের চুক্তি প্রত্যাহার করে নিয়েছিল৷ সে ঘোষণা করেছিল,

“নিশ্চিতই, আল্লাহর নবী বলেছেন যে এই বছরের পর কোন মুশরিক-কে মক্কায় হজ্জ করার অনুমতি দেওয়া হবে না, কিংবা তাকে উলঙ্গ অবস্থায় কাবাঘর প্রদক্ষিণ করার অনুমতি ও দেওয়া হবে না।”

আবু হুরাইরা যা বলতো, তা হলো: ‘আমি সেই দিন উপস্থিত ছিলাম’, সে বলতো: ‘এটি ছিল বৃহত্তর হজ্জের দিন ও আবু বকর কুরবানির দিন যোহরের পর তার উটের পিঠের উপর চড়ে ভাষণ দিয়েছিল। এই হজ্জের সময় আবু বকর তিন দিন ভাষণ দিয়েছিল, এর বেশী নয়: ‘তরবিয়াহার’ আগে মক্কায় যোহরের পর একদিন; আরাফায়, যোহরের আগে; এবং কুরবানির দিন মিনায়, যোহরের পর।’——

– অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ – লেখক।

>>> >>> আদি উৎসে মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-তাবারী ও আল-ওয়াকিদির উপরে বর্ণিত বর্ণনায় যা সুস্পষ্ট, তা হলো, নবী মুহাম্মদের নির্দেশে আলী ইবনে আবু তালিব ‘সুরা তাওবাহর প্রথমাংশের’ চূড়ান্ত নির্দেশগুলো ঘোষণা করেছিলেন সম্পূর্ণ শান্ত ধর্মীয় পরিবেশে, “হজ্জের দিনে”; যা আল্লাহ (মুহাম্মদ) কর্তৃক সত্যায়িত (কুরআন: ৯:৩)। [9]

আদি উৎসের এই সকল বর্ণনার পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, মক্কা বিজয় পরবর্তী প্রথম হজ্জের অব্যবহিত পূর্বে, সুরা তাওবাহর প্রথমাংশ (আয়াত: ১-৪০) রচনার প্রাক্কালে, নবী মুহাম্মদ জগতের সকল অবিশ্বাসীদের “চুক্তি-ভিত্তিক” যে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছিলেন, তা হলো:

(১) চুক্তিহীন অবিশ্বাসী:
যাদের সাথে নবী মুহম্মদ কোন ধরণের চুক্তিতেই আবদ্ধ ছিলেন না।

(২) “সাধারণ” চুক্তিবদ্ধ অবিশ্বাসী:
যাদের সাথে নবী মুহম্মদ কোন না কোন চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন, কিন্তু সেই চুক্তিনামায় কোন “সুনির্দিষ্ট মেয়াদ” উল্লেখ ছিল না। নবী মুহাম্মদের রচিত জবানবন্দী কুরআন (৯:১ ও ৯:৩) সাক্ষ্য দিচ্ছে, মক্কা বিজয় পরবর্তী প্রথম হজ্জের প্রাক্কালে নবী মুহাম্মদ নিজেই এ ধরণের “সমস্ত চুক্তি” ভঙ্গ করেছিলেন! যার সরল অর্থ হলো:

“চুক্তি ভঙ্গকারী ব্যক্তিটি ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ স্বয়ং! অবিশ্বাসীরা নয়।”

(৩) “বিশেষ” চুক্তিবদ্ধ অবিশ্বাসী:
যাদের সাথে মুহম্মদ কোন না কোন চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন ও সেই চুক্তিনামায় “সুনির্দিষ্ট মেয়াদ” উল্লেখ ছিল।

মুশরিকদের বিরুদ্ধে নির্দেশ:
“অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু, যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও (৯:৫)—“;

এবং, আহলে কিতাবদের (খ্রিস্টান ও ইহুদী) বিরুদ্ধে নির্দেশ:
“তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, —যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে (কুরআন: ৯:২৯)”;

এক ও দুই নম্বর শ্রেণীভুক্ত অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের এই নির্দেশ দু’টি, মক্কা বিজয় পরবর্তী প্রথম হজ্জের প্রাক্কালে আলী ইবনে আবু তালিবের ঘোষণার পর “তৎক্ষণাতই” প্রযোজ্য। আর তিন নম্বর শ্রেণীভুক্ত অবিশ্বাসীদের প্রতি মুহাম্মদের এই নির্দেশ দু’টি (৯:৫ ও ৯:২৯) প্রযোজ্য হবে তাঁদের সেই চুক্তির “মেয়াদ উত্তীর্ণ” হওয়ার পর, যদি না তাঁরা “মুহাম্মদের বিবেচনায়” চুক্তি ভঙ্গকারী না হোন (বিস্তারিত: পর্ব-২৪৯)!

এই অমানুষিক নৃশংস নির্দেশ ও শিক্ষাগুলো “শুধুমাত্র” যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, কিংবা আক্রান্ত অবস্থায় আত্মরক্ষার প্রয়োজনে প্রযোজ্য; এমন কোন তথ্য ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসের কোথাও উল্লেখিত হয় নাই।

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ও আল ওয়াকিদির বর্ণনার প্রাসঙ্গিক বিশেষ অংশটির মূল ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করছি; তথ্যসূত্র ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক দ্রষ্টব্য।]

The relevant narratives of Muhammad Ibn Ishaq: [1]

‘The apostle remained there for the rest of the month of Ramadan and Shawwal and Dhu’l-Qada. Then he sent Abu Bakr in command of the hajj in the year 9 to enable the Muslims to perform their hajj while the polytheists were at their pilgrimage stations. Abu Bakr and the Muslims duly departed.

A discharge came down permitting the breaking of the agreement between the apostle and the polytheists that none should be kept back from the temple when he came to it, and that none need fear during the sacred month. That was a general agreement between him and the polytheists; meanwhile there were particular agreements between the apostle and the Arab tribes for specified terms. And there came down about it and about the disaffected who held back from him in the raid on Tabuk, and about what they said (revelations) in which God uncovered the secret thoughts of people who were dissembling. We know the names of some of them, of others we do not. —–‘

Hakim b. Hakim b. `Abbad b. Hunayf from Abu Jafar Muhammad b. `Ali told me that when the discharge came down to the apostle after he had sent Abu Bakr to superintend the hajj, someone expressed the wish that he would send news of it to Abu Bakr. He said, `None shall transmit it from me but a man of my own house.’ Then he summoned `Ali and said: Take this section from the beginning of The Discharge” and proclaim it to the people on the day of sacrifice when they assemble at Mina. No unbeliever shall enter paradise, and no polytheist shall make pilgrimage after this year and no naked person shall circumambulate the temple. He who has an agreement with the apostle has it for his appointed time (only).`Ali went forth on the apostle’s slit-eared camel and overtook Abu Bakr on the way. When Abu Bakr saw him he asked whether he had come to give orders ot to convey them. He said ‘to convey them.’ They went on together and Abu Bakr superintended the hajj, the Arabs in that year doing as they had done in the heathen period. When the day of sacrifice came Ali arose and proclaimed what the apostle had ordered him to say and he gave the men a period of four months from the date of the proclamation to return to their place of safety or their country; afterwards there was to be no treaty or compact except for one with whom the apostle had an agreement for a period and he could have it for that period. After that year no polytheist went on pilgrimage or circumambulated the temple naked. Then the two of them returned to the apostle. This was the Discharge in regard to the polytheists who had a general agreement, and those who had a respite for the specified time.’ —-‘

The relevant narratives of Al-Waqidi: [3]

‘He said: Ma‛mar related to me from Muḥammad b. ‛Abdullah, Ibn Abī Ḥabība, Ibn Abī [Page 1077] Sabra, Usāma b. Zayd, Hāritha b. Abī Imrān and ‛Abd al-Ḥamīd b. Ja ‛far, and each one, as well as others, related portions of this tradition to me. They said:

It took place before the Qurānic chapter Barā’a was revealed. The Messenger of God had made an agreement with people among the polytheists. The Messenger of God appointed Abū Bakr over the pilgrimage. Abū Bakr set out with three hundred men from Medina. The Messenger of God sent twenty sacrificial animals with him as well. He adorned them with sandals and marked them with his hand on the right side. He appointed Nājiya b. Jundub al-Aslamī over them. Abū Bakr drove five sacrificial animals. ‛Abd al-Raḥmān b. ‛Awf went on haj, as well, with sacrifical animals, and a group of people of power pilgrimaged with them. Abū Bakr appeared in Dhū l-Ḥulayfa, and marched until he was at al-‛Arj at dawn, when all of a sudden he heard the bray of the Messenger of God’s camel, al-Qaṣwā’. He said, “This is al-Qaṣwā’!” and he looked, and lo and behold there was ‛Alī b. Abī Tālib on her. He said, “Has the Messenger of God appointed you over the pilgrimage?” ‛Alī replied, “No, but he sent me to recite the Barā’a to the people, and to dissolve his agreement with all those who possess an agreement with him.”

The Messenger of God had promised Abū Bakr that he would oppose the polytheists, and that he would stop at ‛Arafa on the day of ‛Arafa and that he would not stop in Jam‛. Abū Bakr did not push forward from ‛Arafa until the sun had set, and he left Jam before sunrise. Abū Bakr set out until he arrived in Mecca and he, alone, led the pilgrimage. He spoke to the people before tarwiyya, after Ẓuhr, one day. When it was the day of tarwiyya and the sun had declined from the meridian, he circumambulated the house seven times.’——-

‘On the day of the slaughter, at al-Jamra, ‛Alī recited the chapter Barā’a, and withdrew the agreement from all who possessed an agreement.

He said, “Indeed, the Messenger of God said that a polytheist will not be permitted to make the Ḥajj pilgrimage to Mecca after this year, nor will he be permitted to circumambulate the house, naked.” ——–‘

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬১৭-৬১৮ ও ৬১৯
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী, ভলুউম ৯: পৃষ্ঠা ৭৭-৭৯
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[3] অনুরূপ বর্ণনা: আল-ওয়াকিদি ভলুম ৩, পৃষ্ঠা ১০৭৭-১০৭৮; ইংরেজি অনুবাদ: পৃষ্ঠা ৫২৭-৫২৮
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[4] Ibid আল-তাবারী; নোট নম্বর ৫৩৩: ‘মুহাম্মদ বিন আল-হুসায়েন বিন ইবরাহিম আল-আমিরি আল-বাগদাদী হিজরি ২৬১ সালে (৮৭৪-৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ) মৃত্যু বরণ করেন।’
5] Ibid আল-তাবারী; নোট নম্বর ৫৩৪: ‘আহমদ বিন আল-মুফাদদাল আল-কুরাশী হিজরি ২১৪-২১৫ সালে (৮২৯-৮৩১ খ্রিস্টাব্দ) মৃত্যু বরণ করেন।’
[6] Ibid আল-তাবারী; নোট নম্বর ৫৩৬: ‘ইসমাইল বিন আবদ আল-রহমান আল-সুদদি হিজরি ১২৭ সালে (৭৪৪-৭৪৫ খ্রিস্টাব্দ) মৃত্যু বরণ করেন।’
[7] Ibid আল-তাবারী; নোট নম্বর ৫৩৭: ‘ধু আল-হুলাইফা – মদিনা থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরবর্তী একটি স্থান।’
[8] “তরবিয়াহ (tarwiyya)”- জিলহজ্জ মাসের অষ্টম দিন, যেদিন হজ-যাত্রীরা মক্কা থেকে মিনায় যাত্রা করেন।
[9] কুরআনের উদ্ধৃতি ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক বিতরণকৃত তরজমা থেকে নেয়া। অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। http://www.quraanshareef.org/

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.