২৫৪: বানু হারিথ বিন কা’ব গোত্রের ইসলাম গ্রহণ – কারণ?

মক্কা বিজয় পরবর্তী প্রথম হজ্জের প্রাক্কালে হযরত মুহাম্মদ (সা:) সুরা তাওবাহর ‘প্রথমাংশে’ বর্ণিত তাঁর চূড়ান্ত নৃশংস নির্দেশগুলো ঘোষণা করেন (পর্ব: ২৪৯-২৫০)। তাঁর এই ঘোষণার পাঁচ-ছয় মাস পর, হিজরি ১০ সালের জুমাদিউল আওয়াল বা জমাদিউস সানি মাসে (আগস্ট-অক্টোবর, ৬৩১ সাল), তিনি খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ কে বানু আল-হারিথ বিন কা’ব গোত্রের লোকদের নিকট প্রেরণ করেন। খালিদের সঙ্গে ছিল চারশত মুহাম্মদ অনুসারী। আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ খ্রিস্টাব্দ) বর্ণনা: [1] [2]
(আল-তাবারীর বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ।)
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৫৩) পর:

‘অতঃপর হিজরি ১০ সালের জুমাদিউল আওয়াল বা জমাদিউস সানি মাসে আল্লাহর নবী খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ কে (আল-তাবারী: ‘চারশত লোকের এক সৈন্যবাহিনী দিয়ে’) নাজরানে অবস্থিত বানু আল-হারিথ বিন কা’ব গোত্রের লোকদের নিকট প্রেরণ করেন ও তাকে এই নির্দেশ দেন যে সে যেন তাদেরকে আক্রমণ করার তিন দিন আগে ইসলামের দাওয়াত দেয়। তারা যদি তা গ্রহণ করে তবে সে যেনো তাদের কাছ থেকে তা গ্রহণ করে (আল-তাবারী: ‘ও তাদের সাথে অবস্থান করে ও তাদের-কে আল্লাহর কিতাব ও নবীর সুন্নাহ ও ইসলামের বিধানগুলো শিক্ষা দেয়’); আর তারা যদি তা প্রত্যাখ্যান করে তবে সে যেনো তাদের সাথে যুদ্ধ করে। তাই খালিদ রওনা হয় ও তাদের কাছে আসে এবং চতুর্দিকে তার অশ্বারোহীদের পাঠিয়ে লোকদের ইসলামের দাওয়াত দেয়, এই বলে, [3] [4]

“যদি তোমারা ইসলাম গ্রহণ করো তবে তোমরা নিরাপদ”; তাই লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে যেমনটি তাদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল।

খালিদ তাদের সাথে অবস্থান করে ও তাদেরকে ইসলাম ও আল্লাহর কিতাব ও তার নবীর সুন্নাহ শিক্ষা দেয়; কারণ আল্লাহর নবী তাকে এটিই করার নির্দেশ দিয়েছিলেন যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে ও যুদ্ধ না করে।

অতঃপর খালিদ আল্লাহর নবীর কাছে চিঠি লেখে:

“আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময় ও অতিশয় দয়ালু। আল্লাহর নবী মুহাম্মদের নিকট। খালিদ বিন আল-ওয়ালিদের কাছ থেকে। আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। হে আল্লাহর নবী, আল্লাহর রহমত ও আশীর্বাদ। আমি একমাত্র আপনার আল্লাহরই প্রশংসা করি। আপনি আমাকে বানু হারিথ বিন কা’ব গোত্রের নিকট পাঠিয়েছিলেন ও আমাকে এই আদেশ দিয়েছিলেন যে, তাদের কাছে আসার পর আমি যেনো তিন দিন যাবত তাদের-কে আক্রমণ না করি ও তাদের-কে ইসলামের দাওয়াত দিই: অতঃপর তারা যদি ইসলাম কবুল করে তবে আমি যেনো তাদের কাছ থেকে তা গ্রহণ করি ও তাদের সাথে অবস্থান করি এবং তাদের-কে ইসলামের নিয়ম-কানুন, আল্লাহর কিতাব ও তার নবীর সুন্নাহ শিক্ষা দিই। আর তারা যদি আত্মসমর্পণ না করে তবে আমি যেনো তাদের সাথে যুদ্ধ করি।

আমি যথাযথ তাদের কাছে এসেছি ও নবীর আদেশ অনুযায়ী তাদের-কে তিন দিন যাবত ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি ও তাদের কাছে আপনার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমি অশ্বারোহীদের প্রেরণ করেছি। তারা আত্মসমর্পণ করেছে ও যুদ্ধ করে নাই; আর আমি তাদের মধ্যে অবস্থান করছি ও তাদেরকে নবীর ইতিবাচক ও নেতিবাচক আদেশে-গুলো, ইসলামের রীতি-নীতি ও নবীর সুন্নাহ শিক্ষা দিচ্ছি, যতক্ষণ না আল্লাহর নবী আমার কাছে চিঠি লিখছেন। আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক ও এরূপ অন্যান্য অনুরূপ বিশয়।”

আল্লাহর নবী তাকে আগের মতো একই ভূমিকা সহকারে চিঠি লিখেন, এই বলে;

‘আমি তোমার চিঠি পেয়েছি যা তোমার বার্তাবাহক নিয়ে এসেছে, যাতে আমাকে বলা হয়েছে যে তুমি বানু হারিথ গোত্রের লোকদের সাথে যুদ্ধ করার আগে তারা আত্মসমর্পণ করেছে ও তোমার দেওয়া ইসলামের দাওয়াতে সাড়া দিয়েছে ও শাহাদা উচ্চারণ করেছে; আল্লাহ তাদের-কে তার হেদায়েত দান করেছে। অতএব তুমি তাদেরকে উত্তম প্রতিশ্রুতি দাও ও তাদেরকে সতর্ক করো ও ফিরে এসো। আর তাদের প্রতিনিধিদল-কে তোমার সাথে আসতে দাও। তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক; এরূপ অন্যান্য অনুরূপ বিশয়।’

তাই, বানু আল হারিথ গোত্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে খালিদ আল্লাহর নবীর কাছে ফিরে আসে; যাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল কায়েস বিন আল-হুসায়েন ধুল ঘুসসা, ও ইয়াযিদ বিন আবদুল-মাদান, ও ইয়াযিদ বিন আল-মুহাজজাল, ও আবদুল্লাহ বিন কুরাদ আল-যিয়াদি, ও শাদদাদ বিন আবদুল্লাহ আল-কানানি, ও আমর বিন আবদুল্লাহ আল-দিবাবি।

তারা যখন নবীর কাছে আসে, তিনি জিজ্ঞাসা করেন যে ভারতীয়দের মতো দেখতে এই লোকগুলো কারা; তাঁকে বলা হয় যে তারা হলো বানু হারিথ বিন কাব গোত্রের লোক। আল্লাহর নবীর কাছে আসার পর তারা বলে, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রসূল ও আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই।” কিন্তু তিনি বলেন, ”আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই ও আমি আল্লাহর রসূল।”

অতঃপর তিনি বলেন, “তোমরাই সেই লোক, যাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া হলে যারা শক্তি-প্রয়োগে সম্মুখে অগ্রসর হয়”; তারা চুপ থাকে ও তাদের কেউই তাঁর জবাব দেয় না৷ কোন জবাব না পেয়ে তিনি তিনবার এই কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করেন; অতঃপর চতুর্থ বার ইয়াযিদ বিন আবদুল-মাদান বলে, “হ্যাঁ, আমরা তা করেছি”, এটি সে চারবার বলে।

আল্লাহর নবী বলেন,

“খালিদ যদি আমাকে না লিখতো যে তোমরা ইসলাম গ্রহণ করেছো ও যুদ্ধ করো নাই তবে আমি তোমাদের মস্তক-গুলো তোমাদের পায়ের নীচে ফেলে দিতাম।”

ইয়াযিদ জবাবে বলেন, “আমরা আপনার প্রশংসা করি না ও খালিদের প্রশংসা করি না।” তিনি জিজ্ঞাসা করেন, “তাহলে তোমরা কার প্রশংসা করো?” সে বলে, “আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি, যে আপনার মাধ্যমে আমাদের পরিচালিত করেছে।” তিনি বলেন, “তোমরা ঠিকই বলেছো,”

অতঃপর তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন যে পৌত্তলিক আমলে যাদের সাথে তারা যুদ্ধ করতো তাদের-কে তারা কীভাবে বশীভূত (conquer) করতো। তারা বলে যে তারা কখনো কাউকেই বশীভূত করে নাই।

তিনি বলেন, “না, কিন্তু তোমাদের সাথে যারা যুদ্ধ করতো তাদের-কে তোমরা পরাজিত করতে।” তারা উত্তর দেয়, “আমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করতাম তাদেরকে আমরা পরাজিত করতাম, এই কারণে যে, আমরা ঐক্যবদ্ধ ছিলাম ও কোন মতভেদ করতাম না ও কখনও অন্যায় কাজ শুরু করি নাই।” তিনি বলেন, “তুমি ঠিক বলেছ”; অতঃপর তিনি কায়েস বিন আল-হুসায়েন কে তাদের নেতা নিযুক্ত করেন।

প্রতিনিধিদলের লোকেরা শাওয়াল মাসের শেষ দিকে কিংবা জিলকদ মাসের শুরুতে তাদের লোকদের কাছে ফিরে আসে; আর তাদের ফিরে আসার প্রায় চার মাস পর আল্লাহর নবী মৃত্যুবরণ করেন।

– অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ – লেখক।

>>> আদি উৎসে মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (ও আল-তাবারীর) ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো, বানু হারিথ বিন কা’ব গোত্রের লোকদের উপর অতর্কিত আক্রমণের পরিকল্পনা ও নির্দেশ দানকারী ব্যক্তিটি ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ!

“এই গোত্রের একমাত্র অপরাধ ছিল, এই যে, তাঁরা তখনও মুহাম্মদের বশ্যতা স্বীকার করে নাই। ব্যস এটুকুই!”

মুহাম্মদের আদেশে খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে এই গোত্রের লোকদের এলাকায় এসে তাদের-কে ঘিরে ফেলে ও খালিদ চতুর্দিকে তার অশ্বারোহী সৈন্যদের পাঠিয়ে এই গোত্রের লোকদের ইসলামের দাওয়াত দেয়, এই বলে,

“যদি তোমারা ইসলাম গ্রহণ করো তবে তোমরা নিরাপদ!”

মুহাম্মদ, খালিদ-কে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন যে যদি তাঁরা “তিন দিনের মধ্যে” ইসলাম গ্রহণ না করে, তবে খালিদ যেন তাদের-কে আক্রমণ করে। আর আক্রমণ মানেই তাঁদের-কে খুন, জখম, তাঁদের সমস্ত সম্পদ লুট ও তাঁদের পরিবার-পরিজন, স্ত্রী-কন্যা-মা-বোনদের ধরে নিয়ে এসে দাস ও যৌন-দাসী করণ ও বিক্রি! ভীত-সন্ত্রস্ত বানু হারিথ বিন কা’ব গোত্রের অসহায় লোকেরা মুহাম্মদের বশ্যতা স্বীকার করে “ইসলামে” দীক্ষিত হয়।

“নিঃসন্দেহে, তাঁদের এই ‘ইসলাম গ্রহণের’ কারণটি ছিল তাঁদের ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা শঙ্কা! এই নৃশংস পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের প্রচেষ্টা! মুহাম্মদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়।”

ঘটনাটি শুধু এখানেই শেষ নয়:
অতঃপর খালিদের সাথে এই গোত্রের প্রতিনিধি দলের লোকেরা যখন মুহাম্মদের কাছে আগমন করে, তখন মুহাম্মদ তাঁদের-কে হুমকি দেন, এই বলে:

“খালিদ যদি আমাকে না লিখতো যে তোমরা ইসলাম গ্রহণ করেছো ও যুদ্ধ করো নাই তবে আমি তোমাদের মস্তক-গুলো তোমাদের পায়ের নীচে ফেলে দিতাম।”

আদি উৎসে মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, এই প্রতিনিধি দলটি-কে তাঁদের এলাকায় ফেরত পাঠানোর পর মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ, আমর বিন হাযম আল-আনসারি নামের তাঁর এক অনুসারী-কে এই গোত্রের লোকদের কাছে পাঠান। এই ঘটনাটির বর্ণনা ইবনে হিশাম সংকলিত “সিরাত রাসুল আল্লাহ” বইটির ইংরেজি অনুবাদের তুলনায় আল-তাবারী সংকলিত “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক” বইটির ইংরেজি অনুবাদে অধিক প্রাণবন্ত; আদি উৎস মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (বিস্তারিত: পর্ব: ৪৪)। ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:

আল-তাবারীর (৮৩৯-৯২৩ সাল) বর্ণনা: [5]

‘ইবনে হুমায়েদ <সালামাহ <ইবনে ইশাক [হইতে বর্ণিত]: আমি আবদুল্লাহ বিন আবি বকর হইতে যে বিবরণটি পেয়েছি, তা হলো:

“বানু হারিথ বিন কাব গোত্রের প্রতিনিধি দলটি ফিরে যাওয়ার পর, আল্লাহর নবী তাদেরকে দ্বীন শেখানো, তাদেরকে সুন্নাহ ও ইসলামের বিধিনিষেধ শিক্ষা দান ও তাদের কাছ থেকে দানের অর্থ (alms) আদায়ের জন্য আমর বিন হাযম আল-আনসারি ও পরবর্তীতে বানু আল-নাজ্জার গোত্রের এক লোককে তাদের নিকট প্রেরণ করেন। আল্লাহর নবী আমর-কে এক চিঠি লিখেন ও তাতে তিনি তাঁর নির্দেশগুলো প্রদান করেন। [তাতে লেখা ছিল]: [6]

‘আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। এটি আল্লাহ ও তার রসূলের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা।

“হে মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর (কুরআন: ৫:১)।” [7]

(এটি হলো) আল্লাহর নবী মুহাম্মদের এক দলিল, আমর বিন হাযমের প্রতি যখন তিনি তাকে ইয়েমেনে পাঠিয়েছেন। তিনি তাকে তার সমস্ত কাজের জন্য আল্লাহকে ভয় করার (তাকওয়া) আদেশ করেছেন; কারণ,

“নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা পরহেযগার এবং যারা সৎকর্ম করে” (কুরআন: ১৬:১২৮)।”

তিনি তাকে সত্য পালনের নির্দেশ দিয়েছেন যা আল্লাহ আদেশ করেছেন; সে যেনো মানুষকে সুসংবাদ (আল-খায়ের) প্রদান করে ও তাদেরকে তা অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়, তাদেরকে কুরআন শিক্ষা দেয়, তাদেরকে দ্বীনের শিক্ষা দেয় ও তাদেরকে [অন্যায় কাজ থেকে] নিষেধ করে; কারণ,

“পাক-পবিত্র ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য কেউ যেনো কুরআন স্পর্শ না করে (কুরআন: ৫৬:৭৯])”

[তার] উচিত জনগণকে তাদের সুযোগ-সুবিধা ও দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত করা ও সৎকর্ম-শীলদের প্রতি নম্র ও অন্যায়কারীদের প্রতি কঠোর আচরণ করা, কারণ আল্লাহ অন্যায়কে ঘৃণা করেন ও নিষেধ করেন ও বলেছেন,

“নিশ্চয়ই যালেমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত রয়েছে [কুরআন: ১১:১৮]।”’

“সে যেন মানুষকে জান্নাতের সুসংবাদ দেয় ও তা অর্জনের পথ দেখায় এবং তাদের-কে জাহান্নামের আগুন সম্পর্কে সতর্ক করে ও তা লাভের উপায় বলে দেয়। (তার) উচিত লোকদের বন্ধুরূপে বিচার করা যতক্ষণ না তারা ধর্মকে বুঝতে পারে এবং তাদের-কে বৃহৎতর হজ্জ (আল-হজ্জ আল-আকবর) ও ক্ষুদ্রতর হজ্জ (আল-হজ্জ আল-আসগর) – যাকে বলা হয় ওমরাহ, তার আচার-অনুষ্ঠান ও অনুশীলন ও এর বাধ্যবাধকতা সম্বন্ধে শিক্ষা দেয়; যেটির বিশয়ে আল্লাহ তাকে নির্দেশ দিয়েছেন।

(সে অবশ্যই) লোকদেরকে কোন ছোট পোশাকে নামাজ আদায় করতে নিষেধ করবে যদি না সেটি হয় এমন এক পোশাক যার প্রান্ত কাঁধের উপর দুই-ভাঁজ করে রাখা যায়। [সে অবশ্যই] তাদের এমন কোন পোশাকে নিজেকে আবৃত করা থেকে নিষেধ করবে যা উন্মোচন করবে (যা গোপন করা আবশ্যক ছিল) ও পুরুষদের মাথার পিছনে লম্বা চুল হলে তা বিনুনি করা নিষেধ করবে।

যখন তাদের মধ্যে বিবাদের সূত্রপাত হয়, (সে অবশ্যই] তাদেরকে তাদের গোত্র ও জ্ঞাতিগোষ্ঠীর কাছে আবেদন করা থাকে নিষেধ করবে; বরং তাদের আবেদন একমাত্র আল্লাহর কাছেই হোক, যার কোন শরীক নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আবেদন না করে [পরিবর্তে] তাদের গোত্র ও জ্ঞাতিগোষ্ঠীর কাছে আবেদন করে, তাকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করা উচিত যাতে আবেদনটি একমাত্র আল্লাহর কাছে হয় যার কোন শরীক নেই।

(সে অবশ্যই] লোকদেরকে প্রচুর পানি দিয়ে ভালোভাবে ওযু করার নির্দেশ দেবে: মুখমণ্ডল ধৌত করা, হস্তদ্বয় ও বাহুদ্বয় (forearms) কনুই পর্যন্ত ধৌত করা, পাগুলো গোড়ালি পর্যন্ত ধোয়া ও (ভেজা হাত) মাথার উপর দিয়ে ঘষা; যেমনটি আল্লাহ আদেশ করেছেন।

“তিনি তাকে যথাযথ সময়ে রুকু ও নম্রতার সাথে নামাজ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন; ভোর বেলায় সকালের নামাজ, সূর্য ঢলে পড়ার সময় দুপুরের নামাজ, সূর্য ঢলে পড়ার পর বিকেলের নামাজ, রাত ঘনিয়ে আসার সময় সূর্যাস্তের নামাজ (আকাশে তারা দেখা যাওয়া পর্যন্ত দেরী করা উচিত নয়), এবং রাতের শুরুতে সন্ধ্যার নামাজ। (সে অবশ্যই) তাদেরকে আদেশ করবে যে তাদেরকে যখন জামাতে নামাজ আদায় করার জন্য ডাকা হয় তখন তারা যেনো উপস্থিত হয় এবং [জামাতে নামাজে] যাওয়ার আগে পুরো শরীর (গোসল) ধুয়ে নেয়।

“তিনি তাকে লুন্ঠিত-সম্পদ থেকে আল্লাহর এক পঞ্চমাংশ এবং বিশ্বাসীদের স্থাবর সম্পত্তি থেকে খয়রাতি (Alms) গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন:

জলস্রোত এবং বৃষ্টি দ্বারা সিক্ত জমি থেকে এক দশমাংশ ও চামড়ার বালতি দ্বারা সেচ করা জমি থেকে বিশ ভাগের এক ভাগ;

প্রতি দশটি উটের জন্য দুটি ভেড়া ও প্রতি বিশটি উটের জন্য চারটি ভেড়া;

প্রতি চল্লিশটি গরুর জন্য একটি গরু ও প্রতি ত্রিশটি গরুর জন্য একটি গরুর বাছুর কিংবা একটি ষাঁড়;

চারণভূমিতে প্রতি চল্লিশটি ভেড়ার জন্য একটি ভেড়া।

এটি হলো আল্লাহর অধ্যাদেশ যা তিনি খয়রাতি বিশয়ে বিশ্বাসীদের জন্য আদেশ করেছেন। যে ব্যক্তি এর বেশী যোগ করে, সে পুরস্কৃত হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে। একজন খ্রিস্টান বা ইহুদি যে আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে, নিজের ইচ্ছায় এবং ইসলাম-কে অনুসরণ করে, সে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত একই বিশেষ অধিকার ও একই বাধ্যবাধকতা-গুলোর সাথে।

যে তার খ্রিস্টান বা ইহুদি ধর্মকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে তাকে তা থেকে প্রলুব্ধ করা হবে না। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক লোকদের জন্য, পুরুষ বা মহিলা, মুক্ত-মানুষ বা ক্রীতদাস; [মাথাপিছু ট্যাক্স] এক পূর্ণ দিনার বা সমপরিমাণ মূল্যের বস্ত্র।

যে তা [এই মাথাপিছু ট্যাক্স] পরিশোধ করে,

সে আল্লাহ ও তার রসুলের কাছ থেকে সুরক্ষা প্রাপ্ত;

আর যে তা প্রদানে অসম্মত,

সে আল্লাহ ও তার রসুল ও সকল ইমানদারদের শত্রু।”

আল-ওয়াকিদি: আল্লাহর নবী যখন ইন্তেকাল করেন, আমর বিন হাযম তখন নাজরানে তাঁর প্রতিনিধি (`আমিল’) হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন।’

– অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ – লেখক।

>>> আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যা সুস্পষ্ট, তা হলো, “সন্ত্রাসী কায়দায়” উন্মুক্ত শক্তি প্রয়োগে বানু হারিথ বিন কা’ব গোত্রের লোকদের “ইসলামে দীক্ষিত করার পর” নবী মুহাম্মদ তাঁদের-কে তাঁর মতবাদটি শিক্ষা দানের নিমিত্তে আমর বিন হাযম-কে অত্র এলাকায় প্রেরণ করেছিলেন। এই শিক্ষা গ্রহণ ও তা অনুশীলন ছিল “বাধ্যতা-মূলক!” এই বাধ্যতামূলক শিক্ষা ও তা অনুশীলন যদি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জোরপূর্বক চালু রাখা যায়, তবে তার অবশ্যম্ভাবী দীর্ঘ মেয়াদী ফলাফল হলো:

“সেই জনপদের প্রায় সমস্ত মানুষের ‘মগজ ধোলাই (Brainwash)!”

এই বিশয়ের বিশদ আলোচনা “কুরানের ফজিলত” পর্বে (পর্ব: ১৫) করা হয়েছে! ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় একটু মনোযোগের সঙ্গে খেয়াল করলেই যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে উঠে, তা হলো: ইনিয়ে বিনিয়ে, ওযু, নামাজ, হজ্জ, ইত্যাদি বয়ান করার পর মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ, আমর বিন হাযম-কে যে নির্দেশগুলো দিয়েছেন, তা হলো:

(১) “মুহাম্মদ তাকে লুণ্ঠিত-সম্পদ থেকে আল্লাহর এক পঞ্চমাংশ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।”

অর্থাৎ, সন্ত্রাসী কায়দায় মুহাম্মদের যে কোন অনুসারী যদি একক বা সম্মিলিত ভাবে তাঁদের জীবন বাজী রেখে অবিশ্বাসীদের নিপীড়ন, খুন-জখম করে তাঁদের সম্পদ লুণ্ঠন ও দাস ও যৌন-দাসী আয়ত্ত করে, তবে তার এক পঞ্চমাংশ মুহাম্মদ-কে দিতে হবে (কুরআন: ৮:৪১)।

(২) “এবং মুহাম্মদ বিশ্বাসীদের স্থাবর সম্পত্তি থেকে খয়রাতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।”

অর্থাৎ, যে জনপদ-বাসী মুহাম্মদের সন্ত্রাসের কবল থেকে তাঁদের ও তাঁদের পরিবার-পরিজনদের রক্ষার প্রচেষ্টায় তাঁকে নবী হিসাবে স্বীকার করে তাঁর মতবাদে দীক্ষিত হয়েছে, তাদেরকেও তাদের সম্পদ থেকে এক নির্দিষ্ট পরিমাণ (ওপরে বর্ণিত) “জমির ফসল, গরু, ভেড়া, উট” মুহাম্মদের কাছে পাঠানো বাধ্যতামূলক।

(৩) “যে খ্রিস্টান বা ইহুদি ব্যক্তি তাঁর ধর্মকে ধরে রাখবে তাদের প্রত্যেকের জন্য মাথাপিছু ট্যাক্স ‘এক পূর্ণ দিনার বা সমপরিমাণ মূল্যের বস্ত্র’ বাধ্যতামূলক, মুহাম্মদের কাছে পাঠাতে হবে।

আর যে তা প্রদানে অসম্মত, সে আল্লাহ ও তার রসুল ও সকল ইমানদারদের শত্রু!”

তাঁদের উপর আরোপিত হবে সুরা তাওবাহর ২৯ নম্বর আয়াতের বিভীষিকা (পর্ব: ২৫০)! অর্থাৎ, আবারও সন্ত্রাস ও গণিমত! বিশ পার্সেন্ট হিস্যা মুহাম্মদের।

সংক্ষেপে, ধর্ম-শিক্ষা ও তা অনুশীলনের আড়ালে ‘ইসলাম নামের এই সন্ত্রাসী মতবাদের’ প্রথম স্বত্বভোগী ছিলেন সর্বাবস্থায় মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব।

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সফল পেশা হলো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ধর্মব্যবসা! ঈশ্বরের নাম ব্যবহার করে এই অত্যন্ত সফল পেশাটি দশ হাজার বছরেরও অধিক সময় ধরে টিকে আছে ও আজকের পৃথিবীর বিজ্ঞানের মহা-উৎকর্ষের যুগেও তা অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে বাণিজ্য করে চলেছে (পর্ব: ২৫২)। মুহাম্মদ ছিলেন নতুন এক ‘ধর্ম-বাণিজ্যের’ আবিষ্কারক এবং মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ধর্ম-ব্যবসায়ীদের একজন।

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনার প্রাসঙ্গিক অংশটির মূল ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করছি; আল-তাবারীর বর্ণনা তথ্যসূত্র ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক দ্রষ্টব্য।]

The relevant of Muhammad Ibn Ishaq: [1]

‘Then they apostle sent Khalid b. al-Walid in the month of Rabi`ul-Akhir or Jumadal-Ula in the year 10 to the B. al-Harith b. Ka`b in Najran and ordered him invite them to Islam three days before he attacked them. If they accepted then he was to accept it form them; and if they declined he was to fight them. So Khalid set out and came to them and sent out riders in all directions inviting the people to Islam saying, `If you accept Islam you will be safe,’ so the men accepted Islam as they were invited. Khalid stayed with them teaching them Islam and the book of God and the sunna of His prophet, for that was what the apostle of God had ordered him to do if they accepted Islam and did not fight.

Then Khalid wrote to the apostle: In the name of God the compassionate, the merciful. To Muhammed the prophet the apostle of God. From Khalid b. al-Walid. Peace be upon you. O apostle of God and God’s mercy and blessings. I praise God the only God unto you. You sent me to the B. al-Harith b. Ka`b and ordered me when I came to them not to fight them for three days and to invite them to Islam: and if they accepted it to stay with them and to accept it from them and teach the institutions of Islam, the book of God, and the sunna of His prophet. And if they did not surrender I was to fight them. I duly came to them and invited them to Islam three days as the apostle ordered me, and I sent riders among them with your message. They have surrendered and have not fought and I am staying among them instructing them in the apostle’s positive and negative commands and teaching them the institutions of Islam and the prophet’s sunna until the apostle writes to me. Peace upon you &c.

The apostle wrote to him with the same preamble as before saying; `I have received your letter which came with your messenger telling me that the B. al-Harith surrendered before you fought them and responded to your invitation to Islam and pronounced the shahada and that God had guided them with His guidance. So promise them good and warn them and come. And let their deputation come with you. Peace upon you &c.

So Khalid came to the apostle with the deputation of B. al-Harith among whom were Qays b. al-Husayn Dhu’l Ghussa, and Yazid b. `Abdu’l -Madan, and Yazid b. al-Muhajjal and `Abdullah b, Qurad al-Ziyadi and Shaddad b. `Abdullah al-Qanani, and Amr b. `Abdullah al-Dibabi.

When they came to the apostle he asked who these people who looked like Indians were and was told that they were the B. al-Harith b. Ka`b. When they came to the apostle they said, `We testify that you are the apostle of God and that there is no God but Allah.’ But he said,’ `And I testify that there is no God but Allah and that I am the apostle of Allah.

Then he said, ‘You are the people who when they were driven away pushed forward’, and they remained silent and none of them answered him. He repeated the words three times without getting an answer, and the fourth time Yazid b. Abdu’l -Madan said `Yes we are,’ and said it four times. The apostle said, ‘If Khalid had not written to me that you had accepted Islam and had not fought I would throw your heads beneath your feet.’ Yazid answered `We do not praise you and we do not praise Khalid,’ ‘Then whom do you praise?’ he asked. He said: ‘We praise God who guided us by you.’ ‘You are right,’ he said, and asked them how they used to conquer those they fought in the pagan period. They said that they never conquered anyone. ‘Nay, but you did conquer those who fought you,’ he said. They replied, `We used to conquer those we fought because we were united and had no dissentients, and never began an injustice.’ He said,`You are right,’ and he appointed Qays b. al-Husayn as their leader.

The depution returned to their people towards the end of Shawwal or at the beginning of Dhu’l-Qa`da, and some four months after their return the apostle died.’ —-

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬৪৫- ৬৪৬
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী, ভলুউম ৯: পৃষ্ঠা ৮২-৮৫
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp
[3] Ibid আল-তাবারী -নোট নম্বর ৫৬৪:
বানু আল-হারিথ বিন কা’ব – ‘দক্ষিণ আরবের একটি গোত্র।’

[4] Ibid আল-তাবারী -নোট নম্বর ৫৬৬:
নাজরান – ‘উত্তর ইয়েমেনের একটি শহর ও একটি জেলার নাম।’

[5] Ibid আল-তাবারী: পৃষ্ঠা ৮৫-৮৭;
অনুরূপ বর্ণনা: Ibid ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬৪৬-৬৪৮

[6] Ibid আল-তাবারী – নোট নম্বর ৫৮১: ‘আমর বিন হাযম ছিলেন আল-খাযরাজ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত বানু আল নাজ্জার উপগোত্রের এক লোক।’

[7] কুরআনের উদ্ধৃতি ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক বিতরণকৃত তরজমা থেকে নেয়া। অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। http://www.quraanshareef.org/

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.