২৫৫: জুরাশে ইয়েমেনি উপজাতিদের উপর হামলা ও হত্যাকাণ্ড!

আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি হিজরি দশ সালে বানু আল-আযদ গোত্রের এক প্রতিনিধি দল মদিনায় নবী মুহাম্মদের কাছে আসে, তাদের নেতৃত্বে ছিল সুরাদ বিন আবদুল্লাহ আল-আযদি। আল-তাবারীর বর্ণনা মতে, সেই দলে ছিল দশ জন বা তার অধিক লোক। তাদের ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মদ, সুরাদ বিন আবদুল্লাহ আল আযদি-কে নেতা নিযুক্ত করেন। অতঃপর তিনি তাকে এই নির্দেশ দেন যে সে যেন তার লোকদের নিয়ে তাদের প্রতিবেশী ইয়েমেনের মুশরিকদের উপর আক্রমণ চালায়।

সুরাদ বিন আবদুল্লাহ তার দলবল নিয়ে রওনা হয় ও ‘জুরাশ’ নামক স্থানে গিয়ে পৌঁছে, যেখানে বসবাস করতো ইয়েমেনের উপজাতি-গুষ্ঠির লোকেরা। অতঃপর তারা তাঁদের এলাকাটি প্রায় এক মাস যাবত ঘেরাও করে রাখে। কিন্তু, তারা সেখানে ঢুকতে পারে না (ইবনে ইশাকের বর্ণনা), বা জুরাশের অধিবাসীরা তাঁদের এলাকা থেকে বাহিরে বের হয় না (আল-তাবারীর বর্ণনা)। তাই সুরাদ তার দলবল নিয়ে পিছু হঠে ও তাঁদের এলাকা থেকে সরে আসে।

জুরাশের লোকেরা মনে করে যে সুরাদ ও তার বাহিনী তাঁদের এলাকা থেকে চলে গিয়েছে। তাঁরা বের হয়ে আসে ও সুরাদের যাত্রাপথ অনুসরণ করে তাঁরা যখন শাকার (Shakar) নামের এক পর্বতের নিকট আসে, তখন সুরাদ তার দলবল নিয়ে তাঁদের উপর হামলা চালায় ও তাঁদের বহু লোকদের হত্যা করে।

আদি উৎসের বর্ণনায় ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:

ইবনে হিশাম সম্পাদিত মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনা (কবিতা পঙক্তি পরিহার): [1]
(আল-তাবারী সম্পাদিত বর্ণনা, ইবনে হিশামের বর্ণনারই অনুরূপ (পর্ব:৪৪) [2]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৫৪) পর:

”আল-আযদ গোত্রের প্রতিনিধি দলের সাথে সুরাদ আল্লাহর নবীর নিকট আসে ও একজন ভাল মুসলমানে পরিণত হয়। আল্লাহর নবী তাকে তার যে লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের নেতারূপে নিযুক্ত করেন ও তাকে তাদের প্রতিবেশী ইয়েমেনের মুশরিকদের সাথে লড়াই করার নির্দেশ দেন। আল্লাহর নবীর নির্দেশ পালনের জন্য সুরাদ রওনা হয় ও জুরাশে গিয়ে থামে, যা ছিল এক নিকটবর্তী শহর ও সেই সময় যেখানকার লোকেরা (আল-তাবারী: ‘অধিবাসীরা’) ছিল ইয়েমেনের কিছু উপজাতি। খাতাম গোত্রের লোকেরা যখন মুসলমানদের আগমনের খবরটি শুনতে পায়, তারা সেখানে যায় ও তাদের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়। [3]

পরের দলটি (আল-তাবারী: ‘মুসলমানরা’) তাদের-কে প্রায় এক মাস যাবত অবরোধ করে রাখে, কিন্তু তারা সেখানে জোরপূর্বক প্রবেশ করতে পারে না (আল-তাবারী: ‘উপজাতি লোকেরা শহর থেকে বের হয়ে আসা থেকে বিরত থাকে’)। সুরাদ সেখান থেকে তাদের এক পাহাড় পর্যন্ত সরে আসে, যা (এখন) শাকার (আল-তাবারী: ‘কাশার’) নামে অবিহিত।

জুরাশের অধিবাসীরা তাকে অনুসরণ করে বের হয়ে আসে, এই ভেবে যে, সে তাদের কাছ থেকে পালিয়ে গিয়েছে।

তারা যখন তার নাগাল পায়, সে ঘুরে দাঁড়ায় ও তাদের বহু সংখ্যক লোককে হত্যা করে।

এই সময়টিতে জুরাশের লোকেরা তাদের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে ও (কি ঘটছে তা) জানতে তাদের দুজন লোককে মদিনায় আল্লাহর নবীর কাছে পাঠিয়েছিল। আছর নামাজের পর তারা যখন নবীর সাথে ছিল, তিনি জিজ্ঞাসা করেন যে শাকার স্থানটি কোথায়। লোক দুটি উঠে দাঁড়ায় ও তাঁকে বলে যে তাদের এলাকায় একটি পাহাড় আছে যাকে জুরাশের লোকেরা কাশার (Kashar) নামে জানে। তিনি জবাবে বলেন যে কাশার নয়, শাকার।’ তারা জিজ্ঞাসা করে, “অতএব সেটির বিশয়টি কী?”

তিনি বলেন,
“এখন সেখানে আল্লাহর নিকট অর্পিত ভিকটিমদের হত্যা করা হচ্ছে।”

লোক দুটি উঠে আবু বকরের কাছে কিংবা তা হতে পারে উসমানের কাছে গিয়ে বসে এবং সে বলে, “তোমাদের জন্য দুঃখ হয়! এইমাত্র নবীজী তোমাদের কাছে তোমাদের লোকদের মৃত্যুর ঘোষণা দিয়েছেন। সুতরাং, উঠে দাঁড়াও ও তোমাদের লোকদের রক্ষার ব্যাপারে তাঁকে আল্লাহর কাছে দোয়া করার অনুরোধ করো।” তারা তাই করে ও তিনি অনুরূপ প্রার্থনা করেন।

তারা আল্লাহর নবীর কাছ থেকে তাদের লোকদের কাছে ফিরে আসে ও দেখতে পায় যে তাদের লোকদের হত্যা করা হয়েছে ঐ দিনটিতে যেদিন সুরাদ তাদের-কে আক্রমণ করেছিল, ঠিক সেই দিনটিতে ও ঠিক সেই সময়ে যখন আল্লাহর নবী এই কথাগুলো বলেছিলেন।

জুরাশের প্রতিনিধি দলের লোকেরা আল্লাহর নবীর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করে ও তিনি তাদের জন্য তাদের শহরের চারপাশে ঘোড়া, সওয়ারি উট ও চাষের কাজে ব্যবহৃত গরুগুলোর জন্য নির্দিষ্ট চিহ্ন-যুক্ত একটি বিশেষ সংরক্ষিত স্থান প্রদান করেন। (অন্য) যে কোনো লোকের গবাদি পশুগুলো যদি এতে চারণ করে, শাস্তির ঝুঁকি ব্যতিরেকে তা জব্দ করা যেতে পারে।’ —-

– অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ – লেখক।

>>> আদি উৎসে মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের উপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো, ‘জুরাশে’ অবস্থানকারী ইয়েমেনি উপজাতির কোন লোক নবী মুহম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের উপর আক্রমণ করতে আসেন নাই।

“বরাবরের মতই, আগ্রাসী আক্রমণকারী গুষ্টিটি ছিল মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা!”

এই ঘটনাটির আগে এ সমস্ত উপজাতি-গুষ্ঠির কোন লোক মুহম্মদ কিংবা তাঁর কোন অনুসারীর উপর কোনরূপ হামলা করেছিলেন, এমন ইতিহাস ও কোথাও বর্ণিত হয় নাই। এই জনপদের উপর মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের আক্রমণের একমাত্র কারণ হলো, “তাঁরা তখনও মুহাম্মদের বশ্যতা স্বীকার করে তাঁর মতবাদে দীক্ষিত হয় নাই; এটাই ছিল তাঁদের অপরাধ!”

‘জুরাশ’ এলাকাটি ছিল আবহা (Abha) স্থানটি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত একটি শহর, যা হিযায ও ইয়েমেন সীমান্তে অবস্থিত। [4]

বর্তমান গুগল-ম্যাপ হিসাব অনুযায়ী স্থলপথে মদিনা থেকে আবহার বর্তমান ড্রাইভিং দূরত্ব হলো ১০১১ কিলোমিটার; প্রায় ৬৩২ মাইল। বাংলাদেশের সবচেয়ে উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্ত, তেতুলিয়া থেকে টেকনাফের দূরত্বের (৯৩০ কিলোমিটার বা ৫৮২ মাইল) চেয়ে আরও ৫০ মাইল বেশী।

স্ব-ঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) “বিস্তীর্ণ অঞ্চলের” নিরপরাধ অবিশ্বাসী জনপদের উপর কী বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসে মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই বর্ণিত মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের এই সকল আগ্রাসী আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায়।

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনার প্রাসঙ্গিক অংশটির মূল ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করছি; আল-তাবারীর বর্ণনা তথ্যসূত্র ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক দ্রষ্টব্য।]

The narratives of Muhammad Ibn Ishaq: [1]

THE COMING OF SURAD B. ‘ABDULLAH AL-AZDl

‘Surad came to the apostle and became a good Muslim with the deputation from al-Azd. The apostle put him in command of those of his people who had accepted Islam and ordered him to fight the neighbouring polytheists from the tribes of the Yaman with them. Surad went away to carry out the apostle’s orders and stopped at Jurash, whIch at that time was a closed town containing some of the tribes of the Yaman. Khatham had taken refuge with them and entered it when they heard of the approach of the Muslims.

The latter besieged them for about a month, but they could not force an entry. Surad withdrew as far as one of thelr mountains (now) called Shakar, and the inhabitants of Jurash, thinking that he had fled from them, went out in pursuit of him, and when they overtook him he turned on them and killed a large number of them.

Now the people of Jurash had sent two of their men to the apostle in Medina to look about them and see (what was happening), and whIle they were with the apostle after the afternoon prayer he asked where Shakar was. The two men got up and told him that there was a mountain in their country called Kashar by the people of Jurash, to which he replied that It was not Kashar but Shakar. ‘Then what is the news of It? – they asked. ‘Victims offered to God are being killed there now,’ he said.

The two men went and sat with Abu Bakr or it may have been ‘Uthman and he said, ‘Woe to you! the apostle has just announced to you the death of your people, so get up and ask him to pray to God to spare your people.’ They did so and he did so pray. They left the apostle and returned to their people and found that they had been smitten on the day that Surad attacked them on the very day and at the very hour in which the apostle said these words.

The deputation of Jurash came to the apostle and accepted Islam and he gave them a special reserve round theIr town wIth definite marks for horses, riding camels, and ploughing oxen. The cattle of any (other) man who pastured it could be seized with impuntty.’——

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] ইবনে হিশাম সম্পাদিত ‘সিরাত রাসুল আল্লাহ’- পৃষ্ঠা ৬৪২
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী, ভলুউম ৯: পৃষ্ঠা ৮৭-৮৯
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[3] Ibid আল-তাবারী – নোট নম্বর ৬০৪: খাতাম – ‘দক্ষিণ আরবের এই গোত্রটি ছিল আযদ গোত্রটির সাথে সম্পর্কযুক্ত।’

[4] Ibid আল-তাবারী – নোট নম্বর ১৪৫; পৃষ্ঠা ২০

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.