নারী তুমি পারবেই

নারীদের টিপ পড়া ধর্মে নিষেধ, ঘর থেকে বের হয়ে বিধবা নারী চোখে পড়লে যাত্রা অশুভ হবে,বিধবা নারীদের সাদা থান পড়ে থাকতে হয়, অশুভ বিধবা নারীদের অন্ধকার ঘরে এক ঘরো করে রাখা তো এক পুরনো প্রচলিত কুসংস্কার। মহিলার পেটে বাচ্চা থাকলে কিছু কাটা-কাটি বা জবেহ করা যাবে না তো আমাদের উপমহাদেশে অনন্ত কাল থেকেই মেনে আসা হচ্ছে। নতুন বধূ কোন ভাল কাজ করলে শোকর করুন কারণ তা সংসারে শুভ লক্ষণ। নারীদের জোড়া কলা খেতে দিতে নেই খেলে কিন্তু জোড়া সন্তান জন্ম নেবে। নতুন স্ত্রীকে নরম স্থানে বসতে দিলে স্ত্রীর মেজাজ নরম থাকবে, নব বধূকে দুলা ভাই কোলে করে ঘরে আনতে হবে। নতুন বধূকে স্বামীর বাড়িতে প্রথম পর্যায়ে আড়াই দিন অবস্থান করতেই হবে। পাতিলের মধ্যে খাবার মেখে খেলে মেয়ে সন্তান হয়, পেট বড় হয়। বাসর ঘরে স্ত্রী নিকট দেন মোহর মাপ চেয়ে নিলেই চলে, দিতে হয় না, সংসার সুখের হয় নারীর গুনে, ভাই বড় ধন যদিও পৃথক হয় তা নারীর কারণ। ব্যাস, এবার এসবের ব্যত্যয় হলেই নারী তুমি অপয়া।
হেটে মাঠে ঘাটে বাজারে ট্রেনে বাসে স্বপ্নে পাওয়া মহৌষধের রমরমা বাজার তো এখনও দেখতে পাওয়া যায় , খাওয়ার সময় সালাম দেয়া যাবে না, বাড়ি থেকে বাহির হওয়ার সময় খালি কলস,কালো বিড়াল, ঝাড়ু দেখলে যাত্রা অশুভ। এরপর আরও আছে যেমন: ঘর থেকে বের হয়ে পিছন দিকে ফিরে তাকানো বা ডাকা মোটেই ভালো কাজ না, খাবার সময় হেঁচকি উঠলে কেউ স্মরণ করছে মনে করা। আরও শুনুন তবে যে সব কুসংস্কারের ভেতর দিয়ে আমাদের সন্তানরা বড় হচ্ছে নাকি অন্ধকারে হারিয়ে যা যাচ্ছে তা নিজেরাই বিবেচনা করবেন, খালি মুখে মেহমান ফেরত গেলে সংসারে অমঙ্গল হবে, কাউকে শুধু পানি দেয়া উচিত নয় সাথে দুটো লাড়ু তো দিতেই হয়। আমাদের সন্তানদের আরও অনেক কুসংস্কার শেখানো হচ্ছে যেমন ধরুন কুরআন মাজীদ হাত থেকে পড়ে গেলে আড়াই কেজি চাল বা লবণ ছদকা দিতে হয় অসাবধানতা বশত পড়ে গেলেও সেই একই নিয়ম, পরীক্ষা পূর্বে ডিম খেলে পরীক্ষায় নির্ঘাত ডিম (শূন্য) পাবে।
ভীষণ রকম একটি জটিল সমাজ ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত ভারতবর্ষে বিদ্যমান, এখানে ভারতবর্ষ বলতে আমাদের পাক-ভারত উপমহাদেশকেই বোঝাতে চাইছি। বৈদিক ইতিহাস পড়লে জানা যায় ভারতবর্ষে সমাজের দুটি প্রধান অংশ ছিল, একটি দ্বিজ বা ব্রাহ্মণ সমাজ যাদের কে শিক্ষা দীক্ষায় অগ্রজ সমাজ হিসেবেই ধরা নেয়া হতো অপরটি হচ্ছে দ্বিজতোর বা শূদ্র যারা ছিল সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ। কর্ম, গুন, পেশা, দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে এই বিভাজন তৈরী হয়েছিল। ভারতবর্ষে আদি সমাজ ব্যবস্থায় নানা পেশা ও বৃত্তির উদ্ভব হতে থাকে, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পেশার সূত্রে এই বিভাজন আরও বেশী প্রকট আকার ধারণ করে, বিভিন্ন পেশার মানুষ শ্রেণী ভুক্ত হয়ে একই স্থানে অবস্থান শুরু করে যেমন ঋষি পাড়া, তাঁতি পাড়া, ঘোষ পাড়া আর ঠিক সে ভাবেই তরী হতে থাকে বিভিন্ন শ্রেণীর মাঝে দূরত্ব। ব্রাহ্মণ সমাজ ছিল শিক্ষা আচারে সমাজের সব চাইতে উঁচু শ্রেণীর যাদের আমরা সমাজে সুশীল সমাজ হিসেবে গৌণ করি। তাই বলা যেতে পারে ভারতবর্ষে সমাজের এই বর্ণ ভেদা ভেদ একটি ঐতিহাসিক ভিত্তির উপরই তৈরী হয়েছে,যা বিবর্তনের একটি ইতিহাস। যে বিবর্তনের ধারায় বর্ণাশ্রম এক সময় বর্ণ প্রথা তারপর বর্ণভেদে পরিণত হল। আপাতত এখানেই এই আলোচনা শেষ করা যেতো কিন্তু সভ্যতার আলোকে খানিক বিশদ আলোচনা করার প্রয়োজন আছে : অনেকের ধারণা আমাদের উপমহাদেশে বাঙ্গালী মুসলমান সমাজে শ্রেণী ভেদাভেদ নাই, আসলে কথাটা খানিক ভুল এই উপমহাদেশের হিন্দু যেমন ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র শ্রেণী বিন্যাস আছে তদ্রূপ বাঙ্গালী মুসলমান সমাজেও আদিকাল থেকেই চারটি স্তর ভিত্তিক যথা সৈয়দ, শেখ, মোঘল ও পাঠানদের শ্রেণী বিন্যাস ছিল, সৈয়দরা দাবি করেন তারা নবী মোহাম্মদের বংশধর, শেখরা দাবি করেন তারা হজরত আলীর বংশধর ও নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা ধর্মান্তরিত হয়ে মোঘল ও পাঠান শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গবেষণাগুলো পাঠ করলে দেখা যায় যে ১৮৭২ সাল থেকে ১৮৯২ পর্যন্ত আদমশুমারীতে উপমহাদেশের মুসলমানদের পদবী ও পেশা ভিত্তিতে বিভিন্ন স্তর ও শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছিল, যথা : পদবীগুলো ছিল গাজী, খান, মীর, সৈয়দ, মোঘল, পাঠান, শেখ ও সরদার পেশাদারি শ্রেনীর, অন্যান্য শ্রেণীগুলো ছিল দর্জি, ধোপা, ফকির, ধুনিয়া, জোলা, হাজাম, কারিগর,কাহারি ও চুনকার যারা মেথর ও বেদিয়া শ্রেণীভুক্ত তাদের সাথে সাধারণ মানুষের দূরত্ব ছিল বেশী। ১৯০১ সালের আদমশুমারীতে আবার বাঙ্গালী মুসলমান সমাজে তিনটি স্তরের কথা উল্ল্যাখ করা হয়েছে যথা : উচ্চ শ্রেণী আশরাফ, নিম্ন শ্রেণী আতরাফ ও আজলাফ যাদের পতিত শ্রেণী বলা হয়েছিল। ১৯২১ সালের আদমশুমারীতে দেখা গেছে পেশাদারি শ্রেণীর মাঝে কুল, নিকার ও বেহারিদের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে বরং পাঠান, মোঘল ও শেখদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, কাজেই দেখা যাচ্ছে যে মানুষের জন্ম-ভিত্তিক সামাজিক পরিচয় আদিকাল থেকেই অলিখিত ভাবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে, যার পরিবর্তন শুধু মাত্র আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব। সম্পদের মালিকানা ভিত্তিক শ্রেণী বিন্যাস সমাজের সকল স্তরে আধিপত্য বিস্তার করে ক্ষমতার শিখরে অবস্থান করে, দেশের সম্পদের সিংহ ভাগ তাদের অধীনেই থাকে।
সময়ের সাথে সাথে দৃষ্টি ভঙ্গি, সমাজ ব্যবস্থা, কর্ম ও শিক্ষার পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হতে থাকে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের রুচি ও চাহিদা বৃদ্ধি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে, সমাজে কর্ম বণ্টনের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয় নতুন নতুন পেশা কর্ম সংস্থানের জায়গা তৈরী হতে থাকে একটি আধুনিক সমাজ তৈরীর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
ভারতবর্ষ ও আমাদের উপমহাদেশের বর্ণ প্রথা সম্ভবত পৃথিবীতে টিকে থাকা প্রাচীনতম ত্রুটিপূর্ণ একটি সমাজ ব্যবস্থা, শুধু মাত্র সংবিধানে অসাম্প্রদায়িকতা লিখলেই আমরা এই বর্ণ প্রথার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারছিনা, চাই শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন।
– মাহবুব আরিফ কিন্তু।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.