কৌরো

যাদব চক্রবর্তী ওরফে যাদু, এক অদ্ভুত সমস্যায় পড়েছেন তিনি, দিবারাত্রি যতক্ষণ জেগে থাকেন ততক্ষণ তো বটেই, এমনকি ঘুমিয়ে স্বপ্নের ঘোরেও কৌরো ঘুড়ির পোঁ পোঁ শব্দ শুনতে পান! ছেলেবেলায় কৌরো ঘুড়ি তার খুব পছন্দের ছিল, কারণ কৌরো শরীরে হাওয়া পেলেই পোঁ পোঁ শব্দ করত। কৌরোর কাছে অন্যসব ঘুড়িকে তার মনে হত বোবা, তাই তিনি প্রায়ই কৌরো ঘুড়ি কিনে ছাদে উঠে উড়াতেন। একটা কেটে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে আরেকটা কিনতেন। সাকরাইন উৎসবের দিনেও তিনি কৌরো-ই উড়াতেন।

কৌরো ঘুড়ির আকৃতি বর্গাকার, কাঠামোর মাঝখান দিয়ে কোনাকুনি দুটো কাঠি উপরের দিকের মূল কাঠামোকে অতিক্রম করে কোনা দিয়ে অনেকটা বেরিয়ে থাকে। মূল কাঠামোতে কাগজ লাগানো হয় আর কাঠামোর উপরের দুই দিকের কাঠিতে ত্রিকোনাকৃতির লম্বা কাপড় লাগানো হয়, যা বাতাসে ওড়ে। নিচের দিকের কাঠামোর সঙ্গেও ত্রিকোনাকৃতির লম্বা দুটো কাপড় লাগানো হয়, যা দেখতে বাচ্চাদের আঁকা মানুষের পায়ের মতো লাগে। সম্পূর্ণ ঘুড়িটাকে মনে হয় বাচ্চাদের আঁকা মানুষের ছবি, চার হাত-পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে! মূল কাঠামো বাঁকিয়ে উপরের দুই কাঠি ভেতর দিকে টেনে তাতে একফালি সরু বেত বেঁধে দেওয়া হয়, ঘুড়ি শূন্যে উড়লেই বাতাসের সহযোগে সরু বেতে পোঁ পোঁ শব্দ হয়।

সেই পোঁ পোঁ শব্দটাই আজকাল শয়নে-স্বপনে-জাগরণে বড্ড জ্বালায় যাদুকে। যাদুর বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে, সংসারে মা-বাবা আছেন, স্ত্রী আর দুই ছেলে আছে। তিনি একটি ফার্নিচার কোম্পানীর সিনিয়র সেলস অফিসার, সারাদিন চরকির মতো ঘুরতে হয় বিভিন্ন কর্পোরেট অফিসে। ওই পোঁ পোঁ শব্দও তার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে। তিনি মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেন যে কোথাও কোনো কৌরো ঘুড়ি আছে কি না? এই উত্তর ঢাকায় কেই-বা কৌরো ঘুড়ি উড়ায়! তবু কানে যখন পোঁ পোঁ শব্দ বাজে, তখন আকাশের দিকে তাকান, আকাশ আর মেঘ ছাড়া কিছুই চোখে না পড়লেও মনশ্চক্ষে একটি কৌরো ঘুড়ি দেখতে পান!

পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন যাদু, তার অফিস বনানী, অত দূর থেকে পাবলিক বাসে চড়ে অফিসে যাতায়াত করতে অনেক সময় নষ্ট হয় বলে তার স্ত্রী গঙ্গা প্রায়ই রামপুরা বা বাড্ডার দিকে বাসা নিয়ে থাকার কথা বলেন। তার নিজের জীবনের পুরোটাই কেটেছে শাঁখারীবাজারে, সরু গলির ঘিঞ্জি বাসায় বসবাস করলেও এই এলাকার প্রতি তার মায়া জন্মে গেছে, তবু দিনের পর দিন দূর্বিসহ জ্যামে বসে গরমের কষ্টের কথা ভেবে মাঝে মাঝে তারও মনে হয় যে বাসাটা অফিসের কাছাকাছি হলেই ভালো হয়। কিন্তু তার এই মনে হওয়াটা কখনোই বাস্তবে রূপ দেওয়া হয় না বাবা-মায়ের কথা চিন্তা করে। বাবা-মা দীর্ঘদিন যাবৎ শাঁখারীবাজারে বসবাস করছেন, বাবা শাঁখারীবাজারের একটা বাদ্যযন্ত্রের দোকানের প্রধান কারিগর ছিলেন, এখন বয়সের কারণে কাজ করতে না পারলেও মালিক তাকে দোকানে বসে অন্য কারিগরদের কাজ দেখাশোনা করতে বলেছেন, বেতন আগের মতো না থাকলেও হাত খরচটা পাওয়া যায়। হাত খরচের ব্যাপারটা বাদ দিলেও দীর্ঘদিন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও হিন্দু সংস্কৃতির সংদস্পর্শে এবং পরিচিত মানুষের মাঝে থাকার পর এখন অন্য এলাকায় থাকতে তাদের কষ্ট হবে। এই চিন্তা করেই তিনি বাসা বদল করেন না, এজন্য গঙ্গার সঙ্গে প্রায়ই তার মনোমালিন্য হয়।

ফার্নিচার কোম্পানীতে চাকরি করে যাদু বেতন ও কমিশন বাবদ যা পান, তার থেকে ব্যাংকে তিন হাজার টাকার একটা ডিপিএস বাদে সবটাই সংসার চালাতে খরচ হয়ে যায়। ছাত্রাবস্তায় তার মদ্যপানের অভ্যাস হয়, তখন টিউশনির টাকায় মদ্যপান করতেন। মদ্যপানের অভ্যাসটা এখনো আছে, তিনি প্রত্যেক বৃহস্পতিবার বারে গিয়ে মদ্যপান করেন। এই মদ্যপানের টাকা তিনি রোজগার করেন ভিন্নভাবে, অফিস ছুটির পর প্রত্যেক শনিবার একটা মন্দিরে শনিপূজা আর বৃহস্পতিবার আরেকটা মন্দিরে লক্ষ্মীপূজা করেন, পূজার দক্ষিণার টাকায় মদ্যপান করেন। আগে আরেকটা পূজা ছিল, সেটা মঙ্গলবারে করতেন। কিন্তু মন্দির কমিটির নবনিযুক্ত সভাপতি তাকে পছন্দ করেননি বলে পুরোহিতের সেই চাকরিটি গেছে। সভাপতির অপছন্দের কারণ তার গায়ের কালো রঙ! সভাপতির বক্তব্য ছিল এই যে- ‘ব্রাহ্মণের গায়ের রঙ আবার কালো হয় নাকি! ব্রাহ্মণের গায়ের রঙ হবে ফর্সা, এ লোক খাঁটি ব্রাহ্মণ নয়!’

কেন যাদু খাঁটি ব্রাহ্মণ নন সভাপতি সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন তার কমিটির অন্যান্য পদাধিকারীদের- ‘আগের দিনে ব্রাহ্মণ পুরুষরা ডজন ডজন বিয়ে করতেন, স্ত্রীকে বাপের বাড়িতেই রাখতেন আর বছরে বা দু-বছরে একবার শ্বশুরবাড়িতে যেতেন দক্ষিণার লোভে। সেই সময় তারা স্ত্রী-সঙ্গ করতেন, ফলে স্ত্রী গর্ভবতী হতেন এবং বাচ্চা দিতেন। এমনও হত যে কোনো কোনো ব্রাহ্মণ তার কোনো কোনো স্ত্রীকে গর্ভবতী করে নিজ গৃহে ফিরে যেতেন, আর কোনোদিন স্ত্রী-সন্তানদের মুখই দর্শন করতেন না! ব্রাহ্মণেরা যে সব সময় স্ব-গোত্রেই বিয়ে করতেন তা নয়। কয়েস্থ, বৈশ্য, শূদ্র গোত্রেও বিয়ে করতেন। সেই সব সন্তানদের গায়ের রঙ টকটকে ফর্সা না হওয়াই স্বভাবিক! নিশ্চয় যাদু চক্রবর্তীর পূর্বপুরুষ কোনো শূদ্রানীর গর্ভজাত!’ এই ব্যাখ্যায় কমিটির অন্যান্য পদাধিকারীগণ সন্তুষ্ট আর বেচারা যাদু পুরোহিতের চাকরি থেকে বরখাস্ত হন! ফলে যাদুকে মাঝে মাঝে বিদেশীর বদলে কেরুর হুইস্কি-ভোদকা গলাধঃকরণ করতে হয়!

এই যে যাদু সবসময় কৌরো ঘুড়ির পোঁ পোঁ শব্দ শোনেন, এটা সর্বপ্রথম বলেন গঙ্গাকে, গঙ্গা ধমক দিয়ে বলেন, ‘তামাশা কোইরো না! কৌরো ঘুড্ডির পোঁ পোঁ শব্দ আইতাছে সগ্গ থেইকা!’

ব্যাপারটা বাবা-মাকেও বলেন যাদু, শুনে ছেলেকে নিয়ে উদ্বিগ্ন-চিন্তিত বাবা-মা আজ এ মন্দির কাল সে মন্দির থেকে ফুল-বেলপাতা এনে ছেলের বালিশের নিচে রাখেন, লাল সুতো হাতে বেঁধে দেন, ধুলি এনে ছেলের কপালে মাখেন।

এসব দেখে গঙ্গা মুখ ঝামটা দেন, ‘আজাইরা আদিখ্যেতা পোলারে লইয়া!’

যাদু পোঁ পোঁ শব্দ শোনার ব্যাপারটা অফিসের কোনো সহকর্মীকে বলেননি, এমনিতেই সহকর্মীরা তার পিছে লেগে থাকে, কে আবার বসকে গিয়ে বলে বসবে যে যাদু পাগল হয়ে গেছে, আর পর পর দু-মাসে বিক্রির টার্গেট পূরণ না হলে বস হয়ত তাকে পাগল বলে চাকরি থেকে বের-ই করে দেবেন! ফলে অফিসের কাউকে বলতেও চান না তিনি। কিন্তু তিনি খুব অস্বস্তিবোধ করেন যখন অফিসের মিটিংয়ের সময় পোঁ পোঁ শব্দ তার কানে বাজে।

বিশ্বস্ত এবং বিচক্ষণ কারো সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে না পারলে তার স্বস্তি হচ্ছিল না, শেষে এক ছুটির দিনে কলেজের এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান ধানমন্ডি, লেকের পাড়ে বসে বন্ধুকে সব খুলে বলেন। সব শুনে বিষয়টা মানসিক সমস্যা বিবেচনা করে বন্ধু তাকে পরামর্শ দেন একজন মনো-চিকিৎসকের কাছে যাবার।

যাদু তার এই বন্ধুটিকে বিচক্ষণ এবং সৎ বুদ্ধিদাতা মনে করেন, ফলে তার কথা মতো যান মনো-চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক সব মন দিয়ে শোনেন। তারপর কিছু পরামর্শ আর কয়েকটি ওষুধ লিখে দেন। টানা ছয় মাস ওষুধ খেয়ে এবং আরো দু-বার চিকিৎসকের কাছে গিয়েও কোনো ফল হয়নি, পোঁ পোঁ শব্দ থেকেই তিনি নিস্কৃতি পাননি!

তার জীবন অতিষ্ট, সারাজীবন কি এই পোঁ পোঁ শব্দের সঙ্গেই তাকে বাস করতে হবে!

পোঁ পোঁ শব্দ থেকে নিস্কৃতি পেতে তিনি অবসরে কবিতা আবৃত্তি করেন, গান শোনেন। কিন্তু আবৃত্তির মাঝেও পোঁ পোঁ শব্দ শুনতে পান, গান শুনতে থাকলে কোনো একটা বাদ্যযন্ত্রের সুর হঠাৎ পোঁ পোঁ শব্দ হয়ে যায়! এমনকি সঙ্গমকালেও পোঁ পোঁ শব্দ হানা দেয়! মাঝে মাঝে তার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে! অনেকবার স্বপ্নের ঘোরে পোঁ পোঁ শব্দ শুনে ঘুম ভাঙার পর বিছানায় বসে তার আত্মহত্যা করার কথা মনে হয়েছে।

নিত্যদিনের মতো আজও যাদু অফিস থেকে ফিরে স্নান সেরে বিছানায় বসে কিছুক্ষণ তার মায়ের বিরুদ্ধে গঙ্গার বিষোধগার শোনেন আর বকা খান। বাবা-মায়ের শরীরের খোঁজ নিতে তাদের ঘরে গেলে মা চাপাস্বরে গঙ্গার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন, তাও নীরবে শুনতে হয় তাকে। গঙ্গার ডাকে নিজেদের ঘরে ফিরে এলে পুনরায় গজগজ করতে থাকেন গঙ্গা, তিনি মোবাইলে গান চালিয়ে দেন- কিশোর কুমার। ছোট ছেলের ঘোড়া হন কিছুক্ষণ, তারপর ভাত খেয়ে বিছানায় শুয়ে মোবাইল হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকে স্ক্রল করতে করতে আর গঙ্গার বাঁকা কথা শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লেও শান্তি মেলে না- পোঁ পোঁ শব্দ কানে শুনতে পান আর একটা কৌরো ঘুড়ি দেখতে পান আকাশে, অনেক ওপরে; ঘুড়িটা পোঁ পোঁ শব্দ করতে করতে ক্রমশ ওপরে উঠছে তো উঠছেই! কী আশ্চর্য, হঠাৎ যাদু অনুভব করেন যে তিনি চার হাত-পা ছড়িয়ে শূন্যে ভাসছেন, তার সারা শরীর বাদামী রঙের কাগজে মোড়া, দুই হাতে বাঁধা আর কোমর থেকে পায়ের পাতা আবৃত করা লাল কাপড়ের টুকরোগুলো পত পত করে উড়ছে, দুই হাতে বাঁধা বেতের ফালি পোঁ পোঁ শব্দ করছে!

নিচের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝিম ঝিম করে যাদুর। হঠাৎ তিনি মাটিতে দেখতে পান তার বাবা-মা, গঙ্গা আর অফিসের বস ওসমান আলীকে! বাবা দূরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও বাকি তিনজন নাটাই নিয়ে কাড়াকাড়ি করছেন, তাতে সুতোয় টান লাগছে আর যাদু এলোমেলোভাবে দোল খাচ্ছেন, কিন্তু তিনি কিছু বলতে পারছেন না, প্রবল বাতাসের চাপে তার কণ্ঠ যেন রোধ হয়ে আসছে! নাটাইয়ের মাঝখানে ধরে আছেন ওসমান আলী, তার ডানপাশে নাটাই ধরে টানছেন গঙ্গা আর বামপাশে মা। গঙ্গা বলছেন, ‘আঃ যাদু, এক জায়গায় থির অইয়া উড়তাছ ক্যান? উপরে ওঠো, আরো উপরে ওঠো, সবাইরে ছাড়াইয়া তোমারে উপরে উঠতে অইব! দেখতাছ না অন্য ঘুড়িগুলান ক্যামনে উপরে উঠতাছে? তোমারেও উঠতে অইব। ধুর, গাধা একটা, হোপলেস, তোমারে দিয়া কিচ্ছু অইব না! আবার থামলা ক্যান, ওড়ো….!’

মা চিৎকার করছেন, ‘আমি তরে দশমাস গর্ভে ধরছি যাদু, কত কষ্ট অইচে আমার, অহন আমার কতা না শুইনা বউয়ের কতা শুনবি যাদু! শুনিস না, অয় একটা অলক্ষ্মী, এক জায়গায় থির অইয়া থাক, তরে আর উপরে উঠতে অইব না।’

অফিসের বস বলছেন- ‘যাদু, ডানে-বাঁয়ে নেচে নেচে ওড়ো, দেরি কোরো না, হারি আপ যাদু, হারি আপ। কমপিটিটিভ মার্কেট যাদু, দেখছ না তোমার আশপাশের ঘুড়িগুলো কেমন নেচে নেচে উড়ছে! তোমাকে ওদের চেয়েও ভাল নাচতে হবে! পারফরমেন্স দেখাও যাদু, পারফরমেন্স। দরকার হলে অন্য ঘুড়ির সুতো কেটে দাও। ইউ নো যাদু, আই ডোন্ট লাইক আনসাকসেস গাই। হারি আপ, পারফরমেন্স দেখাও যাদু, পারফরমেন্স!’

যাদু উড়তে থাকেন, উপরে উঠতেই থাকেন, একসময় তার মনে হয় তিনি মেঘে ঢাকা পড়ে যাছেন, তারপর মনে হয় তিনি সুতো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাক খেতে খেতে হারিয়ে যাচ্ছেন মেঘের রাজ্যে! যাদুর কান্না পায়, চিৎকার করে কাঁদতে গিয়েও পারেন না, মুখ দিয়ে শব্দ বের হয় না। বিড়বিড় করেন, ‘আহারে সাধের মানব জীবন, আমার জীবন, আমি কোথায়!’

 

ঢাকা
জুলাই, ২০২১।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.