হিজাব বিতর্ক, পর্দা প্রথার সৃষ্টি ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা- তৃতীয় পর্ব

পূর্ববর্তী পর্বে আমরা নবী মহম্মদের রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে আলোচনা করেছি বর্তমান পর্বে আমরা নবী মহম্মদের ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা করব। এখানে অনেকেই হয়তো মনে করবেন হিজাব বিতর্কে নবী মহম্মদের ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা করা কেন প্রয়োজন? তাঁদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই ইসলামের যাবতীয় সমস্যার সূত্রপাত ও তাঁর সমাধান সবই নবী মহম্মদের জীবনীর উপর নির্ভরশীল। তাই নবী মহম্মদের জীবনী জানলে আমরা ইসলামের সমস্ত কিছুই বুঝতে পারব। এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তি হল।

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

এই পর্বে আমরা গল্পের ছলে নবী মহম্মদের ব্যক্তিগত জীবনী জানার চেষ্টা করব এবং সেই সঙ্গে জানব হিজাব, বোরখা বা পর্দা প্রথার সৃষ্টি হল কিভাবে? এই লেখাটি বিশেষ করে সেইসব বুদ্ধিজীবীদের ভন্ডামি ও প্রতারণা প্রকাশ করবে যাঁরা হিজাব, বোরখার মতো চরম অমানবিক ও বর্বর প্রথাকে ব্যক্তিগত অধিকার বলে একে সমর্থন করে, সমাজকে আরও অন্ধকারের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর এই লেখাটি সেইসব মুমিন ভাই ও মুমিনা নারীদের জন্য যাঁরা নবী মহম্মদকে ফুলের মতো পবিত্র মনে করেন এবং মহম্মদের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে ও পিছপা হন না! বিশেষত মুমিনা নারীরা যাঁরা মহম্মদকে আদর্শ পুরুষ মনে করেন এই লেখাটি তাঁদের জন্য উৎসর্গকৃত!

এই পর্বে কোরান, হাদিস, সীরাত ও অন্যান্য ইসলামিক তথ্যসূত্র থেকে নবী মহম্মদের ব্যক্তিগত জীবনী আলোচনা করা হবে। নবী মহম্মদের রাজনৈতিক জীবনের পর ব্যক্তিগত জীবন দেখলে আমরা দেখতে পাই নবী মহম্মদ বহু বিবাহ করেছিলেন এবং দাসী রাখতেন। ইসলামিক স্কলাররা এই বিষয়গুলি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং বোঝাতে চেষ্টা করেন নবী মহম্মদ এক বিরাট মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই বিয়ে গুলি করেছিলেন। এখানে কামনা বাসনার কোন জায়গা নেই বরং নবী মহম্মদ এভাবে বিবাহের মাধ্যমে বহু অসহায় নারীর জীবন রক্ষা করেছিলেন। বলাইবাহুল্য এই পর্বে ইসলামিক পন্ডিতদের এই দাবিগুলির চুলচেরা বিশ্লেষণ হবে এবং নবী মহম্মদের এই বিবাহ গুলির প্রকৃত উদ্দেশ্য কি ছিল তা প্রকাশিত হবে।

প্রকৃতপক্ষে নবী মহম্মদের কতজন স্ত্রী ও  যৌনদাসী ছিল তা নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। রাসূলুল্লাহর অন্যতম প্রচীনতম জীবনীকার ‘সীরাতে ইবনে হিসাম’ এ ইবনে হিসাম  বলেছেন নবী মহম্মদের নয় জন স্ত্রী ছিল। পন্ডিতদের মতে আসলে নবী মহম্মদের মোট তেরোজন স্ত্রী ছিলেন তাঁর মধ্যে হিসামের বর্ণনায় উল্লেখিত স্ত্রীদের মধ্যে দুইজন আগেই ইন্তিকাল করেছিলেন (মারা যায়) বাকি নয় জন বেঁচে ছিলেন এবং আর ও দুই জনের সঙ্গে নাম মাত্র বিয়ে হয়েছিল তাঁরা রাসূলুল্লাহর গৃহিণী হননি।

বলাইবাহুল্য, ইবনে হিসাম কিন্তু নবীর যৌনদাসীদের পত্নী হিসাবে গ্রহণ করেননি। এরকম দুইজনের নাম আমরা পাই, আবার অন্য অনেক সূত্র থেকে জানতে পারি এঁদের সংখ্যা ছিল চারজন। এছাড়া ও বহু নারীর কথা আমরা জানতে পারি যাঁরা নাকি স্ব-ইচ্ছায় নবীর কাছে নিজেকে উৎসর্গ করতেন? তাই প্রকৃতপক্ষে নবী মহম্মদের কতজন স্ত্রী ও কটি উপপত্নী অর্থাৎ যৌনদাসী ছিল তাঁর সঠিক কোন হিসাব পাওয়া যায় না এবং এই বিষয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কোন কোন পন্ডিতের মতে তাঁর মোট স্ত্রী ও যৌন দাসীদের সংখ্যা ছিল পনেরো জন, আবার কেউ কেউ বলেন এই সংখ্যাটি ছিল উনিশ জন আবার কোন কোন সূত্র দাবি করে তাঁর মোট স্ত্রী ও যৌন দাসীর সংখ্যা ছিল ছাব্বিশ থেকে প্রায় চল্লিশ জন বা তাঁর ও অধিক! তাই প্রকৃতপক্ষে নবী মহম্মদের কতজন স্ত্রী, উপপত্নী ও নারীসঙ্গী ছিল তাঁর কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না।

আসলে নবী মহম্মদের দুঃখে আল্লাহ এতই কাতর ছিলেন যে তিনি শুধুমাত্র নবী মহম্মদের জন্যই অফুরন্ত স্ত্রী, যৌনদাসী ও নারীসঙ্গী রাখার অনুমতি দেন। তাই কোরানের আল্লাহর ইচ্ছা মোতাবেক নবী মহম্মদ অফুরন্ত যৌনসঙ্গী রাখার অধিকার পেয়েছিলেন! তাই প্রকৃতপক্ষে নবী মহম্মদের কতজন স্ত্রী, যৌনদাসী ও নারীসঙ্গী ছিল তাঁর সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায় না। নবী মহম্মদের ব্যাক্তিগত ইচ্ছা পূরণ করার উদ্দেশ্যে কোরানের উল্লেখিত আয়াতটি হল।

□ সূরা আল আহযাব:50 – হে নবী! আপনার জন্য আপনার স্ত্রীগণকে হালাল করেছি, যাদেরকে আপনি মোহরানা প্রদান করেন। আর দাসীদেরকে হালাল করেছি, যাদেরকে আল্লাহ আপনার করায়ত্ব করে দেন এবং বিবাহের জন্য বৈধ করেছি আপনার চাচাতো ভগ্নি, ফুফাতো ভগ্নি, মামাতো ভগ্নি, খালাতো ভগ্নিকে যারা আপনার সাথে হিজরত করেছে। কোন মুমিন নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে সমর্পন করে, নবী তাকে বিবাহ করতে চাইলে সেও হালাল। এটা বিশেষ করে আপনারই জন্য-অন্য মুমিনদের জন্য নয়। আপনার অসুবিধা দূরীকরণের উদ্দেশে। মুমিনগণের স্ত্রী ও দাসীদের ব্যাপারে যা নির্ধারিত করেছি আমার জানা আছে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।

এ থেকেই বোঝা যায় কেন নবী মহম্মদের এত নারী সঙ্গী ছিল। যাইহোক আমরা এখন একে একে নবী মহম্মদের সবচেয়ে বহুল প্রচলিত স্ত্রী ও উপপত্নীদের নাম এবং তাঁদের সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করব। তাঁরা হলেন। (উল্লেখিত সময়কাল হল নবী মহম্মদের সঙ্গে উক্ত নারীদের দাম্পত্য জীবনের সময়কাল। নবী মহম্মদের মৃত্যু হয় 8 ই জুন 632 খ্রিস্টাব্দে। নবী মহম্মদের মৃত্যুর পর ও তাঁর অনেক স্ত্রী বহু বছর বেঁচে ছিলেন।)

☆ খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (595-619)

☆ সাওদা বিনতে জামআ (619-632)

☆ আয়িশা (623-632)

☆ হাফসা বিনতে উমর (625-632)

☆ জয়নব বিনতে খুযায়মা (625-626)

☆ উম্মে সালামা বিনতে আবু উমাইয়া (625-632)

☆ জয়নব বিনতে জাহশ (627-632)

☆ জুওয়াইরিয়া বিনতে আল-হারিস (628-632)

☆ রামালাহ বিনতে আবু সুফিয়ান (উম্মে হাবীবা)(628-632)

☆ সাফিয়া বিনতে হুওয়াই (629-632)

☆ মায়মুনা বিনতে আল-হারিস (630-632)

☆ রায়হানা বিনতে জায়েদ (উপপত্নী) (627-631)

☆ মারিয়া আল-কিবতিয়া (উপপত্নী) (628-632) মিশরের বাদশাহ মুকাওকিসের উপহার হিসাবে প্রদত্ত।

☆ নাফীসা (উপপত্নী) প্রিয়তম বিবি জয়নাব বিনতে জাহশ নবীকে উপহার হিসাবে দেন।

☆ নবীর চতুর্থ উপপত্নীর কথা সীরাত গ্রন্থে উল্লেখ থাকলে ও তাঁর নাম জানা যায়নি।

এবার আমরা একে একে নবী মহম্মদের পত্নী ও উপপত্নীদের সম্পর্কে আলোচনা করব এবং পর্দা প্রথার সৃষ্টির হল কিভাবে তা জানতে চেষ্টা করব।

☆ খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ

ইসলামের ইতিহাসে ও নবী মহম্মদের জীবনে খাদিজার গুরুত্ব বিশাল, খাদিজা সেই নারী যিনি তাঁর সমস্ত অর্থ, সম্পদ ও ভালোবাসা দিয়ে মহম্মদকে গড়ে তুলেছিলেন এবং নবী মহম্মদকে পথের পথিক থেকে নবুয়ত প্রাপ্তি পর্যন্ত সমস্ত কিছুতেই খাদিজা সহযোগিতা করেছিল। তিনিই প্রথম মানুষ যিনি নবীর উপর ঈমান এনে মুসলমান হয়েছিলেন। এটা বলা কোন ভাবেই অযৌক্তিক হবে না যে, যদি খাদিজার সান্নিধ্য মহম্মদ না পেতেন তাহলে হয়তো আমরা নবী মহম্মদকে পেতাম না।

খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মহিলা। তিনি লোকজনকে বেতন ও লভ্যাংশের ভিত্তিতে ব্যাবসায় নিয়োগ করতেন। তাঁর ব্যবসার জন্য সৎ মানুষের প্রয়োজন ছিল। এইসময় তাঁর পরিচয় হয় মহম্মদের সঙ্গে, চাচা আবু তালিব মহম্মদকে খাদিজার কাছে কাজের জন্য পাঠান। তবে মহম্মদের এই পর্ব জানার আগে তাঁর অতীত জীবন সম্পর্কে একটু জানার প্রয়োজন রয়েছে তাহলে আমরা বুঝতে পারব খাদিজা আসার পর মহম্মদের জীবনে ঠিক কতটা পরিবর্তন এসেছিল।

পিতামাতা হারা মহম্মদ আবু তালিবের কাছে বড় হতে থাকেন। চাচা আবু তালিব গরীব হলেও  মহম্মদকে খুবই স্নেহ করতেন এবং আজীবন মহম্মদকে সমস্ত বিপদ আপদ থেকে আগলে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে আবু তালিবের জন্যই কুরাইসগণ মহম্মদের নতুন ধর্ম প্রচারের সময় সেভাবে বাধা সৃষ্টি করেনি।

যাইহোক এই সময় নবী মহম্মদ চাচা আবু তালিবের পশু চরাতেন এবং একপ্রকার বেকার ছিলেন। তৎকালীন সময়ে আরবের মানুষরা খুব দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হতেন সেদিক থেকে দেখলে মহম্মদ তখন ও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি। ঠিক এইসময় নবী মহম্মদের প্রথম প্রেম হয় আবু তালিবের কন্যা উম্মেহানির সঙ্গে, নবী মহম্মদ ও উম্মেহানি উভয়ে একে অপরকে ভালোবাসতেন এবং বিয়ে করতে চাইতেন। মহম্মদ যখন চাচা আবু তালিবের কাছে এই প্রস্তাব দেন তখন আবু তালিব এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন কারণ তিনি চালচুলোহীন হীন, পথের ভিখারি মহম্মদের হাতে নিজের কন্যার জীবন তুলে দিতে চাননি। যদিও আর একটি মত হল যেহেতু আবু তালিব মহম্মদ ও উম্মেহানিকে প্রায় একই ভাবে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছিলেন এবং তাঁদের উভয়কে ভাই বোনের মতো মানুষ করেছিলেন সেই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ও তিনি এই বিবাহের বিরোধী ছিলেন।

যাইহোক মহম্মদ এই বিষয়টি কোন দিন ভুলতে পারিনি এবং উম্মেহানি ও মহম্মদকে ভুলতে পারিনি। তাঁর নিদর্শন স্বরূপ আমরা দেখতে পাই উম্মেহানির ঘর থেকেই বিখ্যাত মেরাজ তত্ত্বের (মানুষ রূপী গাধার পিঠে চড়ে আল্লার সঙ্গে সাক্ষাৎ) আবিষ্কার হয়। পরবর্তীকালে উম্মেহানির বিবাহ হয় এবং তাঁর স্বামী ও তাঁর পিতা আবু তালিবের মৃত্যুর পর তিনি নিজে মুসলমান হয়ে যান এবং মহম্মদকে বিয়ের প্রস্তাব দেন, যদিও সেই সময় মহম্মদ এই বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘উম্মেহানি খুব দেরি হয়ে গেছে’! আসলে এইসময় মহম্মদের অনেকগুলি স্ত্রী ছিল তিনি চাইলেই তাঁকে বিবাহ করতে পারতেন তবে তাঁর মধ্যে প্রবল প্রতিহিংসা পরায়ণ মনোভাব ছিল তাই তিনি এই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি, আবার কোন কোন সূত্র দাবি করে মহম্মদ বিয়ের প্রস্তাব দিলেও উম্মেহানি আর রাজি হননি!

যাইহোক খাদিজার কাছে কাজের পূর্বে মহম্মদের জীবন কেমন ছিল সেটা নিশ্চয়ই উপরিউক্ত আলোচনা থেকে পরিস্কার হয়েছে। খাদিজার কাছে কাজের পরই মহম্মদের জীবনে আসল পরিবর্তন আসে। খাদিজা তাঁর পণ্য সামগ্রী নিয়ে  বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে মহম্মদকে সিরিয়া পাঠান সঙ্গে মাইসারাহ নামে এক কিশোরকে ও তাঁর সাহায্যের জন্য পাঠান। এখানে মহম্মদের সঙ্গে বেশকিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। ইবনে হিসাম বলেন সিরিয়া পৌঁছে তিনি জনৈক ধর্মযাজকের গীর্জার নিকটবর্তী এক গাছের নিচে বিশ্রাম করলেন। ধর্মযাজক মাইসারাহকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি কে? মাইসারাহ বললেন তিনি জনৈক কুরাইস বংশীয় ব্যক্তি। ধর্মযাজক বললেন তিনি নবী ছাড়া আর কিছুই নন। রাসূলুল্লাহ তাঁর আনীত পণ্য বিক্রি করে দিলেন এবং নতুন কিছু জিনিস ক্রয় করে মক্কা অভিমুখে রওনা দিলেন। পথে যেখানেই দুপুর হয় এবং প্রচন্ড রৌদ্র ওঠে, মাইসারাহ দেখতে পান, দুজন ফিরিশতা মুহাম্মদকে ছায়া দিয়ে রৌদ্র থেকে রক্ষা করছে এবং তিনি উটের পিঠে সওয়ার হয়ে এগিয়ে চলেছেন। মক্কায় গিয়ে তিনি খাদিজাকে সব হিসাব বুঝিয়ে দেন এবং তাঁর দ্বিগুণ মুনাফা হয়। খাদিজা মহম্মদের এই সততায় মুগ্ধ হয়। মাইসারাহ খাদিজাকে যাজকের বক্তব্য ও দুই ফেরেস্তা মারফত ছায়াদানের বিষয়টি অবহিত করলেন।

খাদিজা ছিলেন দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন বুদ্ধিমতী ও সম্ভ্রান্ত মহিলা। তিনি এই সমস্ত ঘটনা তাঁর চাচাতো ভাই ‘ওয়ারাকা বিন নওফেলের’ কাছে বর্ণনা করেন। তাঁর পুরো নাম ছিল ‘ওয়ারাকা ইবনে নওফেল ইবনে আসাদ ইবনে আবদুল উযযা’। তিনি পূর্বতন আসমানী কিভাবে ব্যুৎপত্তি সম্পন্ন একজন খৃষ্টান পন্ডিত ছিলেন। তিনি পার্থিব জ্ঞানে ও যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। খ্রিষ্টান ধর্মমত অনুযায়ী আরও নবীর আবির্ভাব হওয়ার কথা ছিল। তিনি খাদিজার কাছ থেকে সিরিয়ার খৃষ্টান যাজক ও মাইসারাহের বক্তব্য শুনে বললেন, “খাদিজা এ সব ঘটনা যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই জেনে রাখো যে, মুহাম্মদ এই যুগের নবী। আমি জানতাম, বর্তমান মানব বংশধরের কাছে একজন নবীর আগমন আসন্ন এবং তার প্রতীক্ষা করা হচ্ছে। এটা সেই নবীরই যুগ।” এখানে একটি কথা উল্লেখ্য তৎকালীন যুগে মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক বিষয় সম্পর্কে ধারণা এত কম ছিল যে সাধারণ মেঘের যাতায়াতকে ও অনেকেই ফেরেস্তার ছায়া বা মোজেজা বলে মনে করত। অদ্ভুত বিষয় হল এই সমস্ত মোজেজা শুধুমাত্র দু একজন ব্যক্তি দেখেছে। মহম্মদের সঙ্গে অন্য নবী গুলির তফাত হল ঈসা (খৃষ্ট), মুসা (মোজেস), তাঁরা নিজে থেকে এসে নবুয়তের সুসংবাদ দিত কিন্তু মহম্মদের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই মহম্মদ যে একটা নবী তা তিনি নিজেই জানতেন না, তিনি অন্যের মাধ্যমে তাঁর নবুয়ত প্রাপ্তির বিষয়টি জানতে পারেন। আর নওফলের আর একটি কথা তাৎপর্যপূর্ণ তিনি বলেছিলেন সিরিয়ার খ্রিস্টান পাদ্রী ও মাইসারাহের কথা যদি সত্য হয়, তাহলে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় মহম্মদ একজন নবী অর্থাৎ নওফল ও প্রকৃতপক্ষে জানতেন না মহম্মদ একজন নবী কি না? তিনি সিরিয়ার খ্রিস্টান পাদ্রী ও মাইসারাহের কথা বিশ্বাস করে মহম্মদকে একজন নবী হিসাবে মেনে নেন, পরবর্তীতে খাদিজা মহম্মদের নবুয়ত প্রাপ্তিতে বিশ্বাস করেন।

এখানে একটি কথা উল্লেখ্য মহম্মদকে নবী হিসাবে শুধু সিরিয়ার জনৈক খ্রিস্টান পাদ্রী বলেননি কথিত রয়েছে, তিনি যে আগামী দিনের নবী তা তাঁর শিশুকাল থেকেই প্রকাশিত হয়। এ ঘটনা কতটা সত্য আর কতটা রটনা তা সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে তবে মহম্মদ যে আগামী দিনের নবী তা অনেকেই অনুমান করলে ও প্রথম চিন্হিত করেন সিরিয়ার খ্রিস্টান পাদ্রী বাহীরা। ইবনে হিসাম বলেন শিশু বয়সে প্রায় সাত আট বছর বয়সে পিতামাতা ও দাদা আব্দুল মুত্তালিব কে হারানোর পর মহম্মদের মনে আপনজনকে হারানোর ভয় আরও বৃদ্ধি পায়। তাই চাচা আবু তালিব বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়া রওনা হলে বালক মুহাম্মদ তাঁর সঙ্গে যাওয়ার জন্য বায়না ধরে, শিশুর আবদার শুনে চাচা তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রকে না রেখে যেতে পারেননি তিনি ও বালক মুহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে সিরিয়া যাত্রা শুরু করেন। বাণিজ্য কাফেলা বুসরা এলাকায় পৌঁছালে যাত্রা বিরতি করলো। সেখানে বাহীরা নামে এক খৃষ্টান পাদ্রী ছিলেন তিনি গির্জায় থাকতেন তিনি আসমানী কিতাবে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তিনি দেখেন সমগ্র কাফিলা এগিয়ে চললেও একখন্ড মেঘ বালক মুহাম্মদকে ছায়া দিয়ে চলেছে। অতঃপর তারা একটা গাছের ছায়ায় যাত্রা বিরতি করলে মেঘ এবং সেই গাছের ডালপালা রাসূলুল্লাহর দিকে ঝুঁকে ছায়া দিতে লাগল। এ দৃশ্য দেখে বাহীরা সমস্ত কাফেলার সকলকে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করেন। সকলের খাওয়ার শেষে মহম্মদকে কোলে করে নিয়ে আসেন চাচা আবু তালিব। খাওয়ার শেষে বাহীরা তাঁকে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন এবং বেশকিছু প্রশ্ন করলেন এবং তাঁর পিঠে দুই স্কন্ধের মধ্যবর্তী স্থানে নবুয়তের মোহর অঙ্কিত দেখতে পেলেন (তিল জাতীয় কিছু)। এসব দেখে বাহীরা বলেন ঠিক এরকম হওয়ার কথা ছিল। আবু তালিবকে বলেন আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র অচিরেই এক মহামানব হিসাবে আবির্ভূত হবেন। অতএব ওকে নিয়ে দ্রুত স্বদেশে ফিরে যান। তবে ইহুদিদের থেকে সাবধান এই খবর বাইরে না ছড়িয়ে পড়ে তাহলে ওর ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে ওকে সাবধানে রাখবেন।

অর্থাৎ মহম্মদের নবুয়ত নিয়ে শিশু বয়স থেকেই কানাঘুষো শোনা যায় এবং যুবক বয়সে প্রায় একই রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি শোনা যায়। তাই খাদিজা যখন মহম্মদের নবী হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে শুনলেন তখন তাঁর চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে লোক মারফত বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন। মহম্মদ যখন এই বিয়ের প্রস্তাবের কথা তাঁর চাচা আবু তালিব, হামজা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বললেন তাঁরা ও অবাক হয়ে গেলেন। ইবনে হিসাম বলেন চাচা হামযা খাদিজার পিতা খুয়াইলিদ ইবনে আসাদের সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিলেন এবং বিয়ে সম্পন্ন হলো। কিন্তু অন্যান্য ইসলামি সূত্রগুলি বলে বিষয়টি এত সরল ছিল না খাদিজা জানতেন তাঁর পিতা তাঁর এই বিবাহ মেনে নেবেন না। তাই বিবাহের দিন তাঁর পিতাকে প্রচুর মদ্যপান করানো হয় এবং এই মদপ্য অবস্থায় তাঁর কাছ থেকে বিয়ের অনুমতি নেওয়া হয়, তিনি নেশার ঘোরে এই বিয়েতে অনুমতি দেন। পরের দিন সকালে যখন তাঁর ঘুম ভাঙ্গে এবং তিনি ধীর স্থির হন তখন তিনি এই বিয়ে মেনে নিতে চাননি। খাদিজা তখন বলেন আপনি এখন যদি এই বিয়ে মেনে না নেন তাহলে এই বার্তা যাবে যে আপনি মদ্যপ অবস্থায় কথা দেন এবং পরে সেই কথার খেলাপ করেন, সেটি কি আপনার জন্য মর্যাদাকর হবে? বস্তুত খাদিজার এই কথায় তাঁর পিতা সন্মানহানীর ভয়ে এই বিবাহ মেনে নিতে বাধ্য হয়। ইবনে হিসাম বলেন বিবাহের সময় রসূলুল্লাহ তাঁকে বিশটি বকনা উট মেহেরানা দেন আবার কোন কোন সূত্র মতে তিনি 500 দিরহাম মেহেরানা হিসাবে খাদিজাকে দেন।

খাদিজার বিবাহের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাহল তাঁর বয়স সংক্রান্ত বিতর্ক। ইসলামি সূত্রগুলিতে এই বিষয়ে কোন সঠিক ব্যাখ্যা নেই। বলা হয় খাদিজার সঙ্গে বিবাহের সময় মহম্মদের বয়স ছিল 22 অথবা 25। অন্যদিকে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী খাদিজার বিবাহের সময় বয়স ছিল 28 অথবা 40। বলাইবাহুল্য এটাই সব চেয়ে বড় গোলক ধাঁধা। কারণ ইসলামি পন্ডিতরা এটিকে ব্যাবহার করার চেষ্টা করেন নবী মহম্মদের চরিত্র কত উদার ছিল তা দেখানোর জন্য এবং সেই জন্য বহুল প্রচলিত তত্ত্ব হল নবী মহম্মদের সঙ্গে খাদিজার বিবাহের সময় তাঁর বয়স ছিল 40 বছর কিন্তু আধুনিক গবেষণকরা বিভিন্ন তথ্য দিয়ে প্রমাণ করেন যে নবীর বিবাহের সময় তাঁর প্রকৃত বয়স ছিল 25 বছর অন্যদিকে খাদিজার বয়স ছিল 28 বছর এবং এটিই সবচেয়ে যৌক্তিক বিশ্লেষণ বলে মনে করা হয়।

এর স্বপক্ষে আমরা যুক্তি হিসাবে দেখি তাদের হওয়া সন্তান সন্ততি। সুন্নি পন্ডিতদের মতে তার দুই ছেলে কাসিম ও আব্দুল্লাহ (যাদের ডাকনাম যথাক্রমে আল-তাহির ও আল-তাইব), উভয়েই অল্প বয়সে মারা যায় এবং চার মেয়ে ছিল-জয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম এবং ফাতিমা।যদিও শিয়া পণ্ডিতরা খাদিজার সন্তানদের নিয়ে এই মত মেনে নেননি তাঁদের মতে প্রথম তিন জন হল খাদিজার পূর্ববর্তী স্বামীদের সন্তান একমাত্র ফাতিমা ছিল মুহাম্মদের সন্তান। এর স্বপক্ষে আমরা যে যুক্তি পাই তা হল খাদিজার পূর্ববর্তী স্বামী ছিলেন আবু হালা ইবনে মালিক। তিনি বনু আবদুদদার গোত্রের মিত্র বনু ঊসাইদের লোক ছিলেন। আবু হালার স্ত্রী থাকাকালীন তাঁর গর্ভে হিন্দ নামে একটি ছেলে ও যয়নাব নামে একটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। আবার আবু হালার পূর্বে খাদিজার বিয়ে হয়েছিল আতীক ইবনে আবিদের সাথে। তাঁদের আব্দুল্লাহ নামে একটি ছেলে ও জারিয়া নামে একটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করে।

উল্লেখ্য শিয়া পন্ডিতদের এই দাবিগুলি বেশি যৌক্তিক মনে হয় কারণ পরবর্তীতে নবীর এতগুলি স্ত্রী থাকার পর ও নবীর আর কোন সন্তান সন্ততি হয়নি এটাই খুব আশ্চর্যের বিষয়! এখন সুন্নি পন্ডিতদের দাবি যদি মেনে নেওয়া হয় তাহলে প্রশ্ন হল খাদিজার চল্লিশ বছরে বিবাহের পর মুহাম্মদের এতগুলি সন্তান হয় কিভাবে? এবং মেডিক্যাল সায়েন্সের দিক থেকে এত অধিক বয়সে গর্ভে সন্তান আসা কষ্টকর এবং পরপর এতগুলি সন্তান আসা মানে খাদিজার সব সময় গর্ভবতী অবস্থায় থাকার কথা, খাদিজার ক্ষেত্রে কি আমরা সে অবস্থা দেখি? বরং আমরা দেখি মুহাম্মদের সঙ্গে বিবাহের পর খাদিজা প্রতিটি ক্ষেত্রে মুহাম্মদকে সহযোগিতা করে গেছে এবং এইসময় খাদিজা সর্বদা গর্ভবতী ছিল এমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে শিয়া পন্ডিতদের মতে মহম্মদ ও খাদিজার যদি একটি মাত্র সন্তান ফাতিমা হয় এবং এই দাবিকে যদি স্বীকার করা হয় তাহলে বিবাহের সময় খাদিজার চল্লিশ বছর বয়সের তত্ত্ব তা তবুও সত্যের কথাকাছি হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে অন্যান্য সন্তানগুলি যে মহম্মদের সন্তান সুন্নিদের এই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। বস্তুত পক্ষে খাদিজার বিবাহের বয়স নিয়ে ইসলামি পন্ডিতদের মধ্যে বিতর্কের শেষ নেই তবুও খাদিজার বিবাহের ক্ষেত্রে শিয়া পন্ডিতদের মত বেশি যৌক্তিক মনে হয়। তবে যাইহোক মুহাম্মদ ও খাদিজার বিবাহতে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে বিবাহের সময় খাদিজা ‘যায়েদ ইবনে হারেস’ নামে এক ব্যক্তিকে দাস হিসাবে কিনে নেন এবং মুহাম্মদের অনুরোধে খাদিজা তাঁকে মুক্ত করে এবং মহম্মদ তাঁকে নিজের পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন। যাইহোক এই যায়েদ ইসলামের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং পর্দা প্রথা সৃষ্টির পিছনে ও যায়েদ এর একটা প্রচ্ছন্ন ভূমিকা  রয়েছে। সেটি পরে আলোচনা করা হবে।

যাইহোক খাদিজার এই উত্থানকে মুসলমানরা দেখাতে চেষ্টা করে ইসলাম কত উদার এবং কত মহান যে নারীকে ব্যবসা করার সুযোগ দেয় এবং নারীর স্বাধীন অস্তিত্ব স্বীকার করে। বলাইবাহুল্য এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা কারণ খাদিজা ব্যবসা বাণিজ্য করে ইসলাম প্রবর্তনের আগে এবং খাদিজা তাঁর পূর্ববর্তী স্বামীদের সম্পত্তি পেয়েছিলেন। অর্থাৎ এথেকেই প্রমাণিত হয় ইসলাম প্রবর্তনের পূর্বে আরবের সমাজ কত উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ ছিল এবং মহিলাদের সমাজে কি রূপ স্বাধীনতা ও অধিকার ছিল। কিন্তু ইসলাম প্রবর্তনের পরেই মহিলাদের সমস্ত অধিকার বিনষ্ট করে তাঁদের বস্তাবন্দি করা হয়।

মুমিন ভাইয়েরা খাদিজার সঙ্গে মহম্মদের বিবাহকে দেখাতে চান যে মহম্মদ কত উদার ও নৈতিক মানুষ ছিলেন যে এক বয়স্কা বিধবাকে বিবাহ করেছিলেন অর্থাৎ নবীর চরিত্র কত উদার এবং তিনি কোন কামনা বাসনা হেতু পরবর্তী বিবাহগুলি করেননি। এখানে প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো খাদিজা কোন ভাবেই বয়স্ক নারী ছিলেন না তিনি ছিলেন যুবতী নারী এগুলি আসলে মুসলমান ঐতিহাসিকদের নবীর চরিত্রকে আদর্শ হিসাবে তুলে ধরার জন্য মিথ্যা প্রচার, যা পূর্বের আলোচনাতেই তুলে ধরেছি। এখন বহুল প্রচলিত তত্ত্বকে যদি সত্য ধরে নিয়ে তর্কের খাতিরে যদি মেনে নিয় বিবাহের সময় খাদিজার বয়স ছিল 40 বছর, তাহলে ও প্রশ্ন হল 40 বছর বয়স কি খুব বেশি বয়স? আমরা আমাদের চারপাশে বহু অভিনেত্রী ও অনেক নারীকেই দেখি যাদের বয়স 40 বা তাঁর উর্ধে তা সত্ত্বেও তারা কি কম আকর্ষণীয়? খাদিজার মতো সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী মহিলা কি কম আকর্ষণীয় হবেন? তিনি যদি আকর্ষণীয় না হতেন তাহলে তৎকালীন বহু পুরুষ খাদিজাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতেন কেন এবং নবী মহম্মদ ও কেন এক কথায় এই বিয়েতে রাজি হয়ে গেলেন?

আসলে নবী মহম্মদ খাদিজার স্নেহ, ভালোবাসা ও সম্পদে সিক্ত হয়ে নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন। অন্যদিকে খাদিজার বিবাহের বয়স তুলে মুমিন ভাইয়েরা দেখাতে চান নবী মহম্মদ কত উদার ও মহৎ চরিত্রের মানুষ ছিলেন। তাঁরা আর ও বোঝাতে চান যে খাদিজার জীবিতাবস্থায় তিনি আর কোন বিবাহ করেননি এবং পরবর্তীতে পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে তিনি বহু বিবাহ করতে বাধ্য হন। বলাইবাহুল্য এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আসল কথা হল মহম্মদ ছিল খাদিজার অনুগত কর্মচারী তাই মহম্মদের ইচ্ছে থাকলেও খাদিজাকে সরিয়ে তিনি অন্য কাউকে বিবাহ করবে এমন সাহস বা সামর্থ্য তখন মহম্মদের মধ্যে ছিল না তাই তিনি খাদিজার মৃত্যুর আগে আর নতুন কোন বিবাহ করেন নি।

তবে আধুনিক গবেষকদের একাংশ মনে করেন মহম্মদ আসলে ছিলেন মানসিক রোগী, বিভিন্ন ইসলামি তথ্যসূত্রগুলি থেকে ও আমরা জানতে পারি মহম্মদের মৃর্গী রোগ ছিল এবং তিনি অদ্ভুত সব জিনিস দেখতে পেতেন যা দেখে তিনি ভয়ে লুকিয়ে পড়তেন। এগুলি থেকে রক্ষা পেতে ও মহম্মদকে সুস্থ রাখতে খাদিজা তাঁর ভাই ওয়ারাকা বিন নওফেলের সঙ্গে পরামর্শ করে নবুয়তের প্রেক্ষাপট রচনা করেন কিন্তু খাদিজা হয়তো কল্পনা ও করতে পারেননি যে তাঁদের এই নবুয়ত প্রাপ্তির খেলা আগামী দিনে পৃথিবীর জন্য কতটা ভয়ংকর হবে। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় ইসলামের প্রবর্তনে খাদিজার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খাদিজা ও চাচা আবু তালিব মহম্মদকে বিভিন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করেছিলেন। এই দুইজন একই বছরে মারা যান মহম্মদ এই বছরটিকে ‘আম উল-হুজন বা দুঃখের বছর’ হিসেবে বর্ণনা করেন। আর ওয়ারাকা সম্পর্কে মহম্মদ বলেন তিনি জান্নাতবাসী হবেন। সম্ভবত নবী মহম্মদের দৃষ্টিভঙ্গীতে একমাত্র অমুসলমান যে জান্নাতবাসী হবেন তিনি হলেন ওয়ারাকা বিন নওফল। এর অর্থ হল যাঁরা নবীর পক্ষে কথা বলত তাঁরাই জান্নাতবাসী হবে অথচ নবীর পিতামাতা ও চাচারা জান্নাতবাসী হবেন কিনা তিনি তা জানতেন না!

☆ সাওদা বিনতে জামআ

খাদিজার পর নবী পত্নী কে হয়েছিলেন এ নিয়ে ইসলামি পন্ডিতদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কোন কোন সূত্র মতে খাদিজার পর নবী আয়েশাকে বিবাহ করেন। তবে বেশিরভাগ ইসলামি পন্ডিত মনে করেন খাদিজার পর নবী মুহাম্মদ সাওদাকে জীবন সঙ্গিনী হিসাবে বেছে নেন। ইবনে হিসাম বলেন, ‘সালীত ইবনে আমর মতান্তরে আবু হাতিম ইবনে আমর তাঁকে রাসূলুল্লাহর সাথে বিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে মোহরানা স্বরূপ চারশো দিরহাম প্রদান করেন। তাঁর পূর্ব স্বামীর নাম সাকরান ইবনে আমর।’ বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে জানা যায় নবী মহম্মদের সঙ্গে যখন সাওদার বিবাহ হয় তখন সওদার বয়স ছিল 50 বা 55 বছর। অন্যদিকে নবী মহম্মদের বয়স ছিল 50 বছর। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে নবী মহম্মদ ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বয়সের বিশেষ তফাত ছিল না, সাওদার প্রধান কাজ ছিল নবী মহম্মদের সন্তানদের যত্ন নেওয়া। ইসলামি পন্ডিতরা যে দাবি করেন নবী মহম্মদ কামনা বাসনা হেতু বিবাহ করতেন না, তা যে কত বড় মিথ্যাচার তা সাওদার ঘটনা থেকেই বোঝা যায়। সাওদাই একমাত্র নারী যাকে মহম্মদ বেশি বয়সে বিবাহ করেন। যদি মহম্মদ সাওদাকে বিবাহ করেই ক্ষান্ত হতেন তাহলে এটা মেনে নিতে কোন সমস্যা হত না যে নবী মহম্মদ অতি উচ্চ আদর্শের মানুষ ছিলেন এবং তিনি মানবিক উদ্দেশ্যে বিবাহগুলি করেছিলেন। কিন্তু আমরা কি দেখি মহম্মদ এই বেশি বয়স্ক সাওদাকে নিজের পত্নী হিসাবে মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং তালাক প্রদানের কথা বলে। যদিও এই বিষয়টি ইসলামে বেশ জটিল ইসলামের কিছু কিছু সূত্র মতে নবী মহম্মদ নিজে থেকে তালাক চাইতেন আবার কোন কোন সূত্র মতে নবী মহম্মদ তালাক চাইতে পারে এই ভয়ে ভীত হয়ে সাওদা নিজেই নিজের ভাগটি আয়েশাকে দিয়ে দেয়। এখন প্রশ্ন হল কোন নারী কি স্বেচ্ছায় নিজের ভাগ অন্য নারীর হাতে তুলে দিতে চাই? এখন প্রশ্ন হল তর্কের সাপেক্ষে যদি ধরি সাওদা ভয় পেয়ে এই প্রস্তাব দিয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন হল সাওদা নবীকে নিয়ে ভয় পাবে কেন? সাওদার ক্ষেত্রে নবীর উচ্চ মানবিক মূল্যবোধ কোথায় গেল? যাইহোক এভাবেই শেষ পর্যন্ত সাওদা দাম্পত্যের নিজের ভাগটি আয়েশার ভাগে দিলে নবী তালাক দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। উপরিউক্ত ঘটনাটি কোরান ও হাদিসের আলোকে দেখা দরকার।

□ সূরা আন নিসা:128 – যদি কোন নারী স্বীয় স্বামীর পক্ষ থেকে অসদাচরণ কিংবা উপেক্ষার আশংকা করে, তবে পরস্পর কোন মীমাংসা করে নিলে তাদের উভয়ের কোন গোনাহ নাই। মীমাংসা উত্তম। মনের সামনে লোভ বিদ্যমান আছে। যদি তোমরা উত্তম কাজ কর এবং খোদাভীরু হও, তবে, আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।

□ আবু দাউদ, হাদিস নং- 2135

হিশাম ইবনু ‘উরওয়াহ (রহঃ) হতে তার পিতা থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেছেন, হে ভাগ্নে! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের সাথে অবস্থানের ব্যাপারে কাউকে কারো উপর প্রাধান্য দিতেন না। এমন দিন খুব কমই হয়েছে; যেদিন তিনি আমাদের কাছে আসতেন এবং সহবাস না করে সবার সাথে আলাপ করতেন। অতঃপর যার নিকট রাত যাপনের পালা হতো, তিনি সেখানে রাত যাপন করতেন। যখন সাওদা বিনতু যাম’আহ (রাঃ) বার্ধক্যে পোঁছলেন তখন আশংকা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হয়তো তাকে ত্যাগ করবেন, তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার পালার দিনটি ‘আয়িশাকে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমরা বলতাম, এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেনঃ “যদি কোন নারী তার স্বামীর পক্ষ হতে উপেক্ষিত হওয়ার আশংকা করে………” (সূরাহ আন-নিসাঃ 128)

উপরিউক্ত কোরানের আয়াত ও হাদিস থেকে বোঝা যায় নবী মহম্মদ সাওদাকে উপেক্ষা করে চলত এবং তালাক দেওয়ার কথা বলত। তাই সাওদা বাধ্য হয়ে নিজের ভাগ আয়েশাকে  দিয়েছিলেন। তাই নবী মহম্মদের মধ্যে কোন কামনা বাসনা ছিল না তিনি মানবিক উদ্দেশ্যে বিবাহ করতেন এটা যে কত বড় মিথ্যাচার তা এই ঘটনা থেকেই প্রমাণিত বরং সত্য হল নবী মহম্মদ কামনা বাসনার দ্বারা তাড়িত হয়েই সাওদাকে তালাক দিতে চাইত। আর তাঁর কামনা বাসনা কত তীব্র ছিল যে শিশু থেকে শুরু করে নিজের পুত্রবধূ কেউই রক্ষা পায়নি!

☆ আয়িশা বিনতে আবু বকর

নবী মহম্মদের সবচেয়ে প্রিয়তম পত্নী ছিলেন আয়েশা। সওদার পর নবী মহম্মদ আয়েশাকে বিবাহ করেন। আয়েশার সঙ্গে বিবাহ মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম লজ্জাজনক ঘটনা যা মুসলিম ঐতিহাসিকরা অনেক কষ্ট করে ও এই লজ্জা ঢেকে রাখতে পারেন না। প্রকৃতপক্ষে আয়েশার ছিলেন এক ছয় বছরের শিশু যাঁর সঙ্গে 53 বছর বয়সী মহম্মদের বিবাহ হয়। প্রকৃতপক্ষে নবী মহম্মদ আদতে কেমন মানুষ ছিলেন তা এই আয়েশার ঘটনা থেকেই বোঝা যায়। খাদিজার মৃত্যুর পর নবী মহম্মদ সাওদাকে বিবাহ করেন কিন্তু তিনি তাঁতে সন্তুষ্ট ছিলেন না, তিনি এই সময় সব সময় কুমারী মেয়ে বা শিশুর কথা ভাবতেন তখন তাঁর নজরে আসে আয়েশা এবং আয়েশাকে দেখেই তাঁর কামনা বাসনা জাগ্রত হয় এবং তিনি তৎক্ষণাৎ আবু বকরকে এই বিবাহের প্রস্তাব দেন। আবু বকর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন তুমি তো আমার ভাই কিন্তু কিছু দিন পর মুহাম্মদ আবার স্বপ্নে আয়েশাকে দেখতে পান এবং বলেন যে এই বিবাহ আল্লা কর্তৃক সংগঠিত হয়েছে তাই শেষ পর্যন্ত আবু বকর এই বিবাহে রাজি হয়।

□ সহি বুখারি, হাদিস নং- 5078

‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু’বার আমাকে স্বপ্নযোগে তোমাকে দেখানো হয়েছে। এক ব্যক্তি রেশমী কাপড়ে জড়িয়ে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছিল, আমাকে দেখে বলল, এ হচ্ছে তোমার স্ত্রী। তখন আমি তার পর্দা খুললাম, আর সেটা হলে তুমি। তখন আমি বললাম, এ স্বপ্ন যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, তবে তিনি বাস্তবে তা-ই করবেন। [3895] (আধুনিক প্রকাশনীঃ 4705, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ 4707)

সহি হাদিস।

আমরা জানি যখন কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করি তা অনেক সময় আমরা স্বপ্নের আকারে দেখতে পাই। উপরিউক্ত হাদিস থেকেই বোঝা যায় মহম্মদ সর্বদা আয়েশার কথা ভাবত এবং আল্লার ভয় দেখিয়ে এই বিবাহ সংগঠিত করেছিলেন। মুসলমান ঐতিহাসিকরা গোঁজামিল দিয়ে বলার চেষ্টা করে আয়েশার বয়স ছয় বছর ছিল না তা অনেক ক্ষেত্রে দশ বা চোদ্দো এমনকি উনিশ বছর ছিল এভাবে নবীর কুকর্মকে ঢাকার চেষ্টা করে কিন্তু আয়েশা বর্ণিত হাদিসে স্পষ্ট নবী শিশু আয়েশাকে বিবাহের নামে ধর্ষণ করেছিলেন। নিম্নে বর্ণিত হাদিস থেকেই তা প্রমাণিত হয়।

□ সহি মুসলিম হাদিস নং- 3370

আয়িশাহ্‌ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত,
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বিয়ে করেছেন, আমার বয়স তখন ছয় বছর। তিনি আমাকে নিয়ে বাসর ঘরে যান, তখন আমার বয়স নয় বছর। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমরা হিজরাত করে মাদীনায় পৌঁছানোর পর আমি একমাস যাবৎ জ্বরে আক্রান্ত ছিলাম এবং আমার মাথার চুল পড়ে গিয়ে কানের কাছে (কিছু) থাকে। (আমার মা) উম্মু রূমান আমার নিকট এলেন, আমি তখন একটি দোলনার উপরে ছিলাম এবং আমার কাছে আমার খেলার সাথীরাও ছিল। তিনি আমাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকলেন, আমি তার নিকট গেলাম। আমি বুঝতে পারিনি যে, তিনি আমাকে নিয়ে কী করবেন। তিনি আমার হাত ধরে আমাকে দরজায় নিয়ে দাঁড় করালেন। আমি তখন বলছিলাম, আহ, আহ। অবশেষে আমার উদ্বেগ দূরীভূত হল। তিনি আমাকে একটি ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে আনসার মহিলাগণ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সকলে আমার কল্যাণ ও রহমাতের জন্য দু‘আ করলেন এবং আমার সৌভাগ্য কামনা করলেন। তিনি (মা) আমাকে তাঁদের নিকট সমর্পণ করলেন। তাঁরা আমার মাথা ধুয়ে দিলেন এবং আমাকে সুসজ্জিত করলেন। আমি কোন কিছুতে ভীত শংকিত হইনি। চাশ্‌তের সময় রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এলেন এবং তাঁরা আমাকে তাঁর নিকট সমর্পণ করলেন। (ই.ফা. 3344, ই.সে. 3343)

আয়েশা বর্ণিত এই হাদিস থেকেই বোঝা যায় নবী মহম্মদ ছয় বছর বয়সী আয়েশাকে বিবাহ করেন এবং নয় বছর বয়সে তাঁর সঙ্গে যৌন সঙ্গম শুরু করেন। নবী মহম্মদ যে আসলে একজন শিশুকামী ছিলেন তা এই ঘটনা থেকেই প্রমাণিত। এই বিয়ে নিয়ে যাঁরা নবী মহম্মদের পক্ষে কথা বলেন তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন পারবেন তো নিজের 6 বছরের শিশু কন্যার সঙ্গে 53 বছরের বৃদ্ধার বিবাহ দিতে? পারবেন তো নবীর সুন্নত আদায় করতে?

অনেক মুমিনরা বলতে আসে এগুলি আসলে সেই যুগে প্রচলিত ছিল আগে শিশু বিবাহ প্রচলিত ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই নবী মহম্মদের ব্যাক্তিগত জীবনে একমাত্র আয়েশা বাদ দিয়ে এত কম বয়সী কোন নারীর সঙ্গে মুহাম্মদের বিবাহ হয়নি এথেকেই প্রমাণিত হয় এই দাবি পুরোই মিথ্যা। আর ভারতবর্ষ বা অন্যান্য যেসব অঞ্চলে শিশু বিবাহ প্রচলিত ছিল সেখানে পাত্রীর বয়স 6 বছর আর পাত্রের বয়স 53 বছর এমন কোন নিদর্শন পাওয়া যায় না। আর দুএকটা এমন ঘটনা ঘটলেও তাঁরা কেউ নবী নয়। যাইহোক বস্তুত নবী মহম্মদের এই কুশিক্ষা সভ্য সমাজের পক্ষে লজ্জাজনক এবং তাঁর এই শিক্ষা আজও আধুনিক সভ্যতাকে দগ্ধ করে চলেছে! এই কারণেই নবীর সুন্নত আদায়ের লক্ষ্যে আজও সৌদি আরব, ইরান, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশে 6 বছরের শিশুর সঙ্গে 53 বছরের বৃদ্ধার বিবাহ হয়। আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখি আফগানিস্তানে তালিবান শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ছোট ছোট শিশুদের জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে জেহাদিরা বিবাহ করে অথচ তাঁদের পরিবারের মানুষদের কিছুই করার থাকে না! বস্তুত এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা আর দেখা যায় না! এগুলি সবই নবী মহম্মদের কুশিক্ষার ফল!

☆ হাফসা বিনতে উমর

মুসলমানদের সঙ্গে মক্কার যুদ্ধে বহু মানুষ নিহত হলে উমর কন্যার স্বামী খুনাইস ইবনে হুযাফা সাহমী ও নিহত হন। তখন উমর তাঁর কন্যার জন্য খুবই চিন্তিত হয়ে উঠলেন এবং তিনি তাঁর কন্যার সঙ্গে বিবাহের জন্য ওসমান, আবু বকর প্রভৃতিকে অনুরোধ করলেন। এই প্রস্তাবে কেউ রাজি না হলেও আমাদের পেয়ারের নবী মহম্মদ এই বিয়েতে রাজি হন এবং 55 বছর বয়সে 22 বছরের হাফসার সঙ্গে চারশো দিরহাম মোহরানার বিনিময়ে এই বিবাহ সংগঠিত করেন। হাফসার বিবাহের বর্ণণা নিচের হাদিসে উল্লেখ করা হল।

□ সহি বুখারি, হাদিস নাম্বার – 4747

আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, যখন উমর (রাঃ)-এর কন্যা হাফসা (রাঃ) খুনায়স ইবনু হুযায়ফা সাহমীর মৃত্যুতে বিধবা হলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর একজন সাহাবী ছিলেন এবং মদিনায় ইন্তেকাল করেন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, আমি উসমান ইবনু আফ্ফান (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং হাফসাকে শাদীর জন্য প্রস্তাব দিলাম; তখন তিনি বললেন, আমি এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করে দেখি। এরপর আমি কয়েক রাত অপেক্ষা করলাম, তারপর আমার সঙ্গে সাক্ষাত করে বললেন, আমার কাছে এটা প্রকাশ পেয়েছে যে, যেন এখন আমি তাকে শাদী না করি। উমর (রাঃ) বলেন, তারপর আমি আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করলাম এবং বললাম, যদি আপনি চান, তাহলে আপনার সাথে উমরের কন্যা হাফ্সাকে শাদী দেই। আবূ বকর (রাঃ) নীরব থাকলেন এবং প্রতি-উত্তরে আমাকে কিছুই বললেন না। এতে আমি উসমান (রাঃ)-এর চেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট হলাম, তারপর আমি কয়েকরাত অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসাকে শাদীর জন্য প্রস্তাব পাঠালেন এবং হাফসাকে আমি তার সাথে শাদী দিলাম। এরপর আবূ বকর (রাঃ) আমার সঙ্গে সাক্ষাত করে বললেন, সম্ভবত আপনি আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। আপনি যখন হাফসাকে আমার জন্য পেশ করেন তখন আমি কোন উত্তর দেইনি। উমর (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হাঁ। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আপনার প্রস্তাবে সাড়া না দিতে কোন কিছুই আমাকে বিরত করেনি, বরং আমি জানি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসার বিষয় উল্লেখ করেছেন, কখনও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর গোপন ভেদ প্রকাশ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রত্যাহার করতেন তাহলে আমি হাফসাকে গ্রহণ করতাম।

উপরিউক্ত হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি নবী মহম্মদের নেক নজর হাফসার উপর পড়েছিল এই কারণেই আবু বকর হাফসাকে গ্রহণ করেনি। আদতে নবী মহম্মদ কেমন মানুষ ছিলেন তা এ থেকেই বোঝা যায় যে তাঁর নেক নজর কারোর উপর পড়লে তাঁর আর রক্ষে নেই তিনি যেমন করেই হোক তাঁকে পেয়ে ছাড়তেন এবং কৌশলে তাঁদের স্বামীদের মৃত্যুর ব্যবস্থা করতেন যেমন- হারিসের ক্ষেত্রে দেখতে পাই। আর একটা বিষয় উল্লেখ্য মুহাম্মদ, উমর, আবু বকর, ওসমান সকলেই প্রায় কাছাকাছি বয়সের ছিলেন তাই একে অন্যের কন্যাকে বিবাহ দেওয়া এ কেমন সম্পর্ক এবং কেমন রুচিবোধ? একদিকে তারা ছিলেন সহযোগী অন্যদিকে তাঁরা একে অপরের আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন!

☆ জয়নব বিনতে খুযায়মা

জয়নব বিনতে খুযাইমার প্রথমে চাচাতো ভাই যাহাম ইবনে আমরের সাথে বিয়ে হয়। পরে উবাইদা ইবনুল হারিসের সাথে বিয়ে হয়। তিনি বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। এরপর নবী মহম্মদ 55 বছর বয়সে 30 বছরের জয়নাবের সঙ্গে চারশো দিরহাম মেহেরানার বিনিময়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের বিবাহ দেন কাবীসা ইবনে আমর হিলালী। ফকির মিসকিন ও দরিদ্রের প্রতি তাঁর অত্যধিক দয়া ও মমত্ববোধের কারণে তাঁকে ‘উম্মুল মাসাকীন বা দরিদ্রদের মা’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হত। তিনি দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বিবাহের মাত্র তিন মাস পরেই মারা যান।

☆ উম্মে সালামা বিনতে আবু উমাইয়া

উম্মে সালামা হিন্দ বিনতে আবী উমাইয়্যা। তাঁর আর এক নাম ছিল হিন্দ। চতুর্থ হিজরিতে তার প্রথম স্বামী আব্দুল্লাহ আবু সালামা উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। তিনি একজন নিষ্ঠাবান মুসলিমও ছিলেন, তার ছোট সন্তান ছাড়া আর কেউ ছিল না।একজন পুরুষ ছাড়া থাকার কারণে তার দুর্দশা মুসলমানদের দুঃখিত করে এবং তাঁর ইদ্দতের পর কিছু মুসলমান তাকে বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিল; কিন্তু তিনি প্রতিটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পরে মুহাম্মাদ তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। অত:পর, শাওয়াল মাসে মুহাম্মাদ তাকে বিবাহ করেন। তাঁর 26 বছর বয়সে 56 বছরের মুহাম্মদের সঙ্গে বিবাহ হয়। বিবাহের সময় মহম্মদ তাঁকে খেজুরের ছালভর্তি একটি গদি, একটি পেয়ালা, একটি প্লেট ও একটি যাঁতাকল দেন। অন্য একটি সূত্র বলে মহম্মদ তাঁকে 10 দিরহাম মেহেরানার বিনিময়ে বিবাহ করেন।

চলবে….

তথ্যসূত্র:-

1) উইকিপিডিয়া।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Muhammad%27s_wives

2) সিরাত ইবনে হিসাম।
3) নবী মহম্মদের ২৩ বছর- আলি দস্তি।
4) রঙ্গিলা রসুল- পন্ডিত চমূপতি।
5) কোরআন।
6) সহি হাদিস ও অন্যান্য ইসলামি তথ্যসূত্র।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.