আজীবন সংগ্রামী অধ্যাঃ রেজা শাহ্‌ তৌফিকুর রহমানের জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আজ ১৮ আগস্ট, রংপুরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির রংপুর জেলা আহ্বায়ক, রংপুর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জেলা উদীচী ও জেলা ন্যাপের সাবেক সভাপতি প্রয়াত অধ্যাপক রেজা শাহ্‌ তৌফিকুর রহমান সাহেবের ৭৪ তম জন্মদিবস। আজীবন সংগ্রামী এই মহান ব্যক্তিত্বের জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি তাঁকে। তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে প্রেরণার উৎস হয়ে। সৃষ্টিকর্তা তাঁর মঙ্গল করুন।

অধ্যাপক রেজা শাহ্‌ তৌফিকুর রহমান ১৯৩৯ সালের আজকের দিনে রংপুর জেলার পীরগঞ্জে এক সম্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ করার পরের বছরই তিনি প্রভাষক পদে রংপুর নৈশ কলেজে যোগ দেন। এই রংপুর নৈশ কলেজই পরবর্তীতে রংপুর কলেজ নাম ধারণ করে এবং ১৯৮৪ সালে এই কলেজ জাতীয়করণ করা হলে তিনি সহকারী অধ্যাপক সরকারী রংপুর কলেজ থেকে আত্তীকৃত হন। সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজে ১৯৯২ সালে। এবং সেই কলেজ থেকেই ১৯৯৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন তিনি।

ছাত্রাবস্থা থেকেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের একজন সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন রংপুর শহর ও পীরগঞ্জ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে জনমত গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ২৫ মার্চের কালো রাত্রিতে তিনি আটকা পড়ে গিয়েছিলেন চাচাত ভাই ও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রয়াত ভাষা সৈনিক এ্যাড শাহ্‌ আনোয়ারুল হক সাহেবের (আনু উকিল নামেই বেশী পরিচিত, পরবর্তীতে রংপুর জেলা জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি) কলেজ রোড এলাকার বাসায়। ২৬ মার্চ ঐ বাসা থেকে কারফিউয়ের মধ্যেই অবিশ্বাস্য এক কাজ করে বসেন অধ্যাপক রেজা শাহ্‌ ও এ্যাড আনু সাহেবের ভাগিনা বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত নূর উর রসুল চৌধুরী এবং এবং আনু উকিল সাহেবের ছোট ভাই বিএলএফ (মুজিব বাহিনী) এর রংপুর জেলার সহ অধিনায়ক মুক্তিযোদ্ধা শাহ্‌ এমদাদুল হক। কারফিউয়ের মধ্যে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছে যান রংপুর কলেজে। সেখান থেকে তুলে নিয়ে আসেন কলেজের একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন। কারফিউ উপেক্ষা করে এই দুই দুঃসাহসী তরুণ তাদের মামা বা ভাইকে জানিয়ে গিয়েছিলেন কি না তা আমি জানিনা। তবে নিশ্চিত ভাবেই বলতে পারি রংপুর কলেজে ঐ মেশিন আছে তা অধ্যাপক রেজা সাহেবেরই জানার কথা। কারণ তিনি তখন ঐ কলেজের প্রভাষক।

পরবর্তীতে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ঐ বাসা থেকে এবং পরে পীরগঞ্জে গিয়ে যুদ্ধে বিভিন্ন উৎসাহ ব্যঞ্জক লেখা হাতে লিখে সাইক্লোস্টাইলে কপি করে বিলি করা হতো মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। দেশপ্রেম এবং পশ্চিম পাকিস্তানীদের প্রতি কি পরিমাণ ঘৃণা জমা থাকলে কোন শিক্ষিত-আধুনিক সমর সরঞ্জাম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মানুষ পাক হানাদার বাহিনীর ট্যাংক মোকাবেলা করতে চান তীর ধনুক নিয়ে, তার প্রমাণ ঐ বাসায় অবস্থানকারী কয়েকজন তরুণ। যাদের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক রেজা শাহ্‌ তৌফিকুর রহমান। এই প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের মধ্যে সামান্যতম ধারনাও হয়তো ছিলো না কি বর্বর ও নিষ্ঠুর আক্রমণ অপেক্ষা করছিল ২৫ মার্চের রাতে। পরে পাক বাহিনীর আক্রমণ জোরদার হলে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ওনারা ঐ সাইক্লোস্টাইল মেশিন নিয়ে সকলেই চলে যেতে বাধ্য হন পীরগঞ্জের মকিমপুর গ্রামে। এই মকিমপুর গ্রামেই তাঁদের পৈতৃক নিবাস। স্বাধীনতার পরে পীরগঞ্জ শাহ্‌ আব্দুর রউফ কলেজে (পীরগঞ্জ কলেজ) ঐ সাইক্লোস্টাইল মেশিন ব্যবহার করা হয়।

অধ্যাপনার পাশাপাশি রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি প্রতিটা ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। স্বাধীনতার পরে তিনি ন্যাপ রংপুর জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যুক্ত হন কৃষক আন্দোলনের সাথে। ১৯৭২ সালে নির্বাচিত হন কৃষক সমিতির রংপুর জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক। ৭৩ সালে রংপুর থেকে বগুড়া পর্যন্ত ১২০ কিমি কৃষক সমিতির পদযাত্রায় অংশ নেন এবং এই পদযাত্রার একজন সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ।

সমাজসেবাতেও তিনি ছিলেন সমান তৎপর। ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সহ সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজশাহীতে থাকাকালীন ছিলেন রাজশাহীস্থ রংপুর সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক।

১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় ৩৫/৪০ জন নিরন্ন পরিবারের সন্তানদের বিভিন্ন পরিবারে পুনর্বাসন করে মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তিনি।

অধ্যাপক রেজা শাহ্‌ তৌফিকুর রহমান “বাংলাদেশ সোভিয়েত মৈত্রী সমিতি”র রংপুর জেলা সভাপতি, সচেতন নাগরিক সমাজ (সনাক) এর উপদেষ্টা ছিলেন। ছিলেন ‘উৎসর্গ’র অন্যতম ট্রাস্টি।

২০১১ সালে মৃত্যুকালীন সময়েও তিনি পর পর ২য় বারের মতো ‘উদীচী’র রংপুর জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির রংপুর জেলা আহ্বায়ক ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট রংপুর জেলা শাখার সভাপতি হিসেবেও। এছাড়াও ন্যাপ, কৃষক সমিতি, শিক্ষক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক রেজা শাহ্‌ তৌফিকুর রহমান।

রংপুর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতির দায়িত্ব পালন কালে তিনি “শিল্পী বনানী সামাদের চিকিৎসার্থে গঠিত কমিটি”র আহবায়ক ছিলেন এবং শিল্পীর চিকিৎসার জন্য প্রায় ছয় লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেন।

অসুস্থ শরীর নিয়ে ২০১০ সালে তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির ঢাকা-বড়পুকুরিয়া-ফুলবাড়ি লং মার্চে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন আজীবন সংগ্রামী এই মানুষটি। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির জেলা জেলা আহবায়ক।

অধ্যাপক রেজা শাহ্‌ তৌফিকুর রহমান পূর্ণ মাত্রায় বিশ্বাস করতেন নিজ ধর্মের সকল বিধান। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেননি বিন্দুমাত্র। উগ্র মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। ইরাকে ব্রিটিশ-মার্কিন হামলার ও গণ হত্যার প্রতিবাদে তাঁরই ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও অক্লান্ত পরিশ্রমে ২০০২ সালের ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল রংপুরের ইতিহাসের স্মরণকালের দীর্ঘতম মানববন্ধন।

ব্যক্তি জীবনে তিনি তিন সন্তানের জনক। অধ্যাপক রেজা শাহ্‌ তৌফিকুর রহমানের সহধর্মিণী মিসেস মারহামাতুন্নেসা দেশের নারী আন্দোলনের অগ্র সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ রংপুর জেলা ও বেগম রোকেয়া ফোরামের সভানেত্রী। বড় ছেলে দেশ বরেণ্য ভাস্কর অনীক রেজা। রংপুরের বিখ্যাত স্থাপনা শাপলা চত্বর, অর্জনসহ প্রায় সব ভাস্কর্যগুলো তারই করা। ২য় সন্তান শাফিয়া সামি একটি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত এবং কনিষ্ঠ পুত্র অমিও রেজা উন্নয়ন কর্মী।

(ওনার সাথে কিছু কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক জোটের কবি শামসুর রাহমানের সংবর্ধনা ও শহীদ জননীর আন্দোলনের সময়। আমার কাছে যা অনেক বড় প্রাপ্তি। তাঁর মানবিক গুণাবলী ও কর্মকাণ্ডের কারণেই তিনি ছিলেন আমার অনুপ্রেরণার উৎস। আজকের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি তাঁকে।)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “আজীবন সংগ্রামী অধ্যাঃ রেজা শাহ্‌ তৌফিকুর রহমানের জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

    1. উনি আমার চাচা। কিন্তু চাচা
      উনি আমার চাচা। কিন্তু চাচা হিসেবে নয়, তাঁর মানবিক গুণাবলী ও কর্মকাণ্ডের কারণেই তিনি ছিলেন আমার অনুপ্রেরণার উৎস।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

13 − = 10