মাদকের মরণ ছোবল গ্রাস করছে কোমলমতি শিশুদের

সারাদিন খিদের জ্বালায় ছটফটাই। খাতি পাইনে। ড্যান্ডি খালি পরে খিদে লাগে না। ক্ষুদার জ্বালায় মাদকের ফাদে পা দেওয়া এক শিশুর সরল আর করুন স্বীকারোক্তি।

শাহবাগের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসে ড্যান্ডি খাচ্ছিল আট থেকে ১০ বছর বয়সের দুই শিশু। কাগজ কুড়িয়ে পেট চলে তাদের। ওদের সাথে কথা বলে জানলাম, নিজেদের উপার্জনের টাকা দিয়েই কখনও গাঁজা, কখনও গাম সেবন করে তারা। এই দু’জনের মতো উদ্যানে আরও কয়েকজনের দেখা মেলে। শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নয়, নিউমার্কেট থেকে বিআরটিসি মোড়, কমলাপুর রেলস্টেশন, হাইকোর্ট এলাকা, কারওয়ানবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদকসেবী শিশু-কিশোরদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। এসব এলাকায় প্রকাশ্যে বিক্রি হয় গাঁজা ও ফেনসিডিল।

৩০ থেকে ৪০ টাকায় এক ধরনের জুতার গাম কেনে শিশুরা। ঢাকার প্রায় সব এলাকার দোকানেই এসব জুতার গাম সহজলভ্য। পলিথিনের ব্যাগে আঠালো ওই পদার্থ নিয়ে কিছুক্ষণ ঝাঁকানো হয়। তারপর পলিথিন থেকে নাক বা মুখ দিয়ে বাতাস টেনে নেয়। এই নেশা ‘ড্যান্ডি’ নামেই পরিচিত। উদ্যানের ওই দুই শিশু বলে, সারাদিন কাজকাম করলে একশ’ ট্যাকা হয়। কোনো দিন ট্যাকা বেশি পাইলে ড্যান্ডি খাই। টাকা কম হইলে খাই গাঁজা। ড্যান্ডি খাইলে ক্ষুধা লাগে না, মাথা ঝিমঝিম করে। ভালাই লাগে।

ভয়াবহ মাদকের ছোবলে আক্রান্ত হয়ে অন্ধকার জীবনে চলে যাচ্ছে পথশিশুরা। এদের বেশিরভাগের বয়সই বয়স ১০ থেকে ১৫ বছর। অনেকের বাবা-মা বেঁচে থাকলেও খোঁজ নেই। তাই তাদের দেখারও কেউ নেই। পথেঘাটেই এদের বসবাস। এদের অধিকাংশই ইনজেকশনের মাধ্যমে প্যাথেডিন নেয়। এর জন্য সিরিঞ্জগুলো তারা একাধিকবার ব্যবহার করে। একজন শিশু প্যাথেডিন নেয়ার পর অন্যরা তা ব্যবহার করে। আর এসব সিরিঞ্জ তারা রাস্তার পাশের ডাস্টবিন থেকে সংগ্রহ করে।

এই বয়সে এদের হাতে বইখাতা থাকার কথা ছিল সে সময়ে বইয়ের পরিবর্তে থাকছে সর্বনাশা মাদক।
বিভিন্ন ফুটপাত, রাস্তা, কাঁচবাজার ও শহরের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবনের নিচে রাত কাটায় এসব শিশু। অনেকটা প্রকাশ্যে মাদক সেবন করে এরা। মা-বাবার আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত, ছোটবেলায় মা-বাবা হারানো শিশুরা অভাব কখনওবা জীবনের নানা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ায় মাদকের দিকে ঝুকে পড়ছে।

মাদকাসক্তি থেকে মাদক বিক্রি ও পরিবহন কাজে জড়িয়ে পড়ছে কোনো কোনো শিশু-কিশোর। অনেক শিশুকে মাদক বহনে বাধ্য করা হয়। মাদক ব্যবসায়ীরা শিশুদের টাকার লোভ দেখিয়ে মাদক বহন করায়। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নজর এড়াতেই শিশুদের ব্যবহার করা হয় বেশি। পাশাপাশি মাদকদ্রব্য কেনার টাকা জোগাড় করতে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করছে অল্প বয়সী মাদকাসক্তরা। মাদক ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থে শিশুদের মাদকাসক্ত করে তোলে। রাজধানীর একাধিক মাদক চক্র ও প্রভাবশালী ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করতে ছিন্নমূল শিশুদের নেশায় জড়িয়ে ফেলছে। প্রথমে তারা মাদকদ্রব্য ফ্রি দেয়। আসক্ত হয়ে পড়লে শিশুরা তখন এমনিতেই কিনতে বাধ্য হয়। আর এ টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ব্যবসায় জড়িয়ে পড়া ছাড়া উপায় থাকে না। ড্যান্ডি, প্যাথেড্রিন ছাড়াও বর্তমানে পথশিশুরা ইয়াবা, পোড়া মবিল ও টিকটিকির লেজ খেয়েও নেশা করছে। যা স্বাস্থের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

বর্তমানে মেয়েশিশুরাও আসক্ত হচ্ছে মাদকে। ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েশিশুরা মাদকে আসক্ত হচ্ছে বেশি। মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত ‘প্রিভিলেন্স অব মেন্টাল ডিজঅর্ডার, এপিলেপসি, মেন্টাল রিটার্ডেশন অ্যান্ড সাবস্টেন্স অ্যাবিউজ অ্যামং চিলড্রেন অব ঢাকা ডিভিশন’ শীর্ষক জরিপ দিয়েছে এই তথ্য। ঢাকা বিভাগে মাদকাসক্ত শিশুর ১৭ শতাংশ মেয়ে। মেয়েশিশুরা নিরাপত্তহীনতাসহ সমাজ ও পরিবারের নানাবিধ অসঙ্গতির কারণে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে বলে প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শুধু ভবঘুরে, ভাসমান যৌনকর্মী বা পথশিশুদের মধ্যেই মাদক সেবন সীমাবদ্ধতা নেই। এখন মধ্যবিত্ত বা ধনী পরিবারের শিশুরাও মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। কেউ বাবা-মায়ের মধ্যে ঝগড়া বা বিচ্ছেদের কারণে, কেউবা বন্ধুদের সঙ্গে শখের বশে মাদক নিতে গিয়ে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মধ্যবিত্ত ও ধনী শিশুরা সিগারেট ও ইয়াবায় আসক্ত হচ্ছে বেশি।

শিশুদের মাদকাসক্তি থেকে ফেরানো এবং এদের পুনর্বাসনের কেউ নেই। কিছু এনজিও কাজ করে, তবে তা কোনো কাজে আসে না। এরা মাদকাসক্ত ছিন্নমূল শিশুদের কিছুদিন চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়। এসব শিশু রাস্তায় ফিরে গিয়ে আবারও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে।

সামাজিক-রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা মাদকের আস্তানা দিন দিন পথশিশুদের নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে। শুধু পথশিশুই নয়, এতে জড়িয়ে পড়ছে সমাজের সব শ্রেণীর পরিবারের ছেলেমেয়েরা। যাদের অর্থ আছে, তারা ইচ্ছা করলে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে পারে। কিন্তু যাদের নুন আন্তে পান্তা ফুরায়, তারা কী করবে?

রাষ্ট্র পারেনি এইসব শিশুদের একটু আশ্রয় দিতে, ছায়া দিতে। আমরা কি পারি না, অন্তত একজন শিশুর দায়িত্ব নিতে? শিক্ষা, আশ্রয় আর স্নেহ দিয়ে তার নতুন জীবন গড়ে দিতে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “মাদকের মরণ ছোবল গ্রাস করছে কোমলমতি শিশুদের

  1. এসব শিশুদের দায়িত্ব রাষ্ট্রের
    এসব শিশুদের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেওয়া উচিত। আমাদেরও সামাজিকভাবে এদের জন্য কিছু করা উচিত। সম্মিলিত ক্ষুদ্র উদ্যোগ অনেক বড় সাফল্য এনে দিতে পারে।

  2. এই ড্যান্ডির কথা উঠলে মনে পড়ে
    এই ড্যান্ডির কথা উঠলে মনে পড়ে যায় আমি কত বড় বকচোদ,একবার কলকাতাতে অবস্থানকালীন সময়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখেছিলাম দুইটি ১০-১১ বছরের ছেলে মিলে একটা পলিথিন নিয়ে ফুলাচ্ছে আবার সেটির হাওয়া চলে যাচ্ছে।দেখেই মনটি খারাপ হয়ে গেল,হায়রে আমি কত ভাগ্যবান ছিলাম এরা গরীব বলে বেলুন কেনার টাকা পায় না আর আমি এদের মতো থাকতে কত বেলুন ফাটাইছি…এরকম আপসুস করে ফিরতি পথেই দেখি সেখানে জটলা মুখ উচিয়ে দেখলাম ঐ দুইটারেই মারছে ভাবলাম বেলুন কিনতে না পেরে হয়তো চুরি করেছে তাই মার খাচ্ছে তাই ভাবলাম একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি কিছু করা যায় কিনা,কিন্তু যেই শুনলাম তারা নেশা করছিলো এবং সেটির বিবরন আমি জাস্ট “থ” কি!!!!!!! এভাবেও নেশা হয়? শালার আমি তাইলে বকচোদ ছিলাম এতোক্ষন?
    তবে ব্যাপারটি এভাবে না দেখে একটু অন্যভাবে দেখি,তারা দৈনিক ১০০ টাকা পাচ্ছে তাই তো? তাহলে সেই ১০০ টাকায় কি তাদের একজনের অন্তত দুই বেলা চলে না? আবার বলছেন টাকা কম পেলে গাঁজা টানে,ভাই যতদুর জানি এবং বুঝি গাঁজা টানিলে ক্ষুধা বাড়ে কিন্তু এখানে যদি উল্টা হয় তাহলে বলব এরা মন মানসিকভাবে আসক্ত।
    যেমনটা বর্তমান উচ্চবিত্ত কিনবা মধ্যবিত্ত সমাজ ইয়াবাতে আসক্ত।

  3. “সারাদিন খিদের জ্বালায়
    “সারাদিন খিদের জ্বালায় ছটফটাই। খাতি পাইনে।
    ড্যান্ডি খালি পরে খিদে লাগে না। ” – এই মন্তব্যটাই তো সমাজের প্রকৃত রুপ বের করে আনে । আজ ওরা যা কিছু করছে তার সবথেকে বড় কারণ ক্ষুদা । ক্ষুদার জ্বালায় বড় থেকে বড় মানুষও মনুষত্ব্য হারিয়ে ফেলে; আর এরা তো ছোট শিশুমাত্র । ভবিষ্যৎ কিন্তু অন্য কথা বলবে … এদের মধ্যেই কেউ হবে খুনী , ছিনতাইকারী , বা ধর্ষক । এখনও সুযোগ । চলুন এদের পাশে দাঁড়াই । । ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 8 = 1