হিউম্যানিজম বা মানবতাবাদের উত্থান

মধ্যযুগের আরেক নাম বলা হয়ে থাকে অন্ধকার যুগ। অনেকে ভাবতে পারেন, সেসময় কি আকাশে সূর্য উঠতো না, নাকি মেঘে ঢাকা থাকতো সবসময়? না আসলে এর কোনওটাই সেই সময়কালকে অন্ধকার যুগ বলার কারন না। মধ্যযুগের ৪০০-১৫০০ শতাব্দিকালকে সাধারনত অন্ধকার যুগ বলার মূল কারন, সে সময় শিক্ষার বিকাশ ছিল না, ছিল না সুসম আর্টচর্চার সুযোগ। সেই সময়টায় ইউরোপের প্রধান শিক্ষাব্যবস্থা বলতে ছিল গীর্জা (খ্রীষ্টানদের উপসনালয়) গুলিতে বাইবেলের গীতসংহিতা মুখস্ত করা, এবং বাইবেল হাতে লিখে কপি করার প্রয়োজনে লেখালিখি শেখা। তাও অনেকেই কি লিখছেন সেটাও ঠিকমত জানতেন না। গীর্জায় যেসব পুরোহিত শিক্ষকতা করতেন, তারা নিজেরাও খুব শিক্ষিত ছিলেন না। সেসময় লিখতে জানলেই শিক্ষীত,এমনটাই ছিল মানদন্ড। পরিবারের দ্বিতীয় ছেলেকে পাঠানো হতো শিক্ষিত হতে, আর বড় ছেলে যেত কোনও এক বীর যোদ্ধার কাছে অস্ত্রচালনা শিখতে। তখনকার দিনে অস্ত্র চালনাই ছিল সর্বাধিক সম্মানিত একটা বিষয়। যোদ্ধা হতে পারাটা ছিল সর্বোচ্চ গৌরবের! কে কি বলবে, কি শিখবে বা কি ধরনের আর্ট হবে, সবকিছু নিয়ন্ত্রন করতো তৎকালীন ক্যাথলিক মন্ডলীর হর্তাকর্তারা।

Teachers and students

এর মাঝে ১৪০০সনের দিকে ইতালীতে হিউম্যানিজম, বা মানবতাবাদের শুরু লক্ষ্য করা যায়। মানবতাবাদ মানে অপরের জন্যে দরদ উথলে ওঠা না। মানবতাবাদ হচ্ছে অন্য মানুষকে মানবীক গুনাবলির কারনে সম্মান দেয়া, তার শিক্ষা ও কলার পারদর্শীতার কারনে তাকে সম্মান দেখানো, মানুষ হিসেবে আরেকটা মানুষকে শ্রদ্ধা করা।

অন্ধকার যুগের অন্ধত্ব ও অভিশাপকে দূর করাই ছিল তৎকালীন মানবতাবাদীদের মূল আন্দোলন; যেখানে মানুষ ভালবাসবে অন্য মানুষকে, যেখানে শিল্পকে মানুষ সম্মান করবে, গুড়িয়ে দেবে না কোনও সুন্দর স্থাপনা, যেখানে বিধর্মী হলে হত্যা করার হুমকি দেয়া হবে না! সেইসময়কার আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের অবলম্বন ছিল গ্রীস ও রোমেরা কিছু প্রাচীন দর্শনশাস্ত্র, ও তাদের ইতিহাস। প্লেটো, অ্যারিস্টটল, সিসেরো, ল্যইভিদের রেখে যাওয়া দর্শনই সেসময়ে হিউম্যানিস্টদের আদর্শ ছিল, ছিল তাদের অবলম্বন।

শুরুর দিকের বেশিরভাগ মানবতাবাদীরাই ব্যক্তি জীবনে ছিলেন দারুন ধার্মিক। তখনকার খ্রীষ্টানদের নেতৃত্বাধীন সমাজে সাধারন মানুষের মঙ্গলের জন্যে কিছু করা হতো না। সব কিছুই করা হতো যেন গীর্জার কাজে লাগে, অথবা স্বর্গে যাওয়ার জন্যে। অথচ শিক্ষা চিকিৎসা কিম্বা নিরাপত্তা নিয়ে তারা কেউ চিন্তিত ছিল না। কিন্তু তখনকার হিউম্যানিস্টরা ভাবতে শুরু করেছিলেন, যুদ্ধ করে দেশ দখল ও ধর্মই সব নয়। সাধারন মানুষের নিত্যদিনে কাজে লাগে এমন বিষয়ও প্রয়োজন!

ইউরোপে তখন ব্যবসা বানিজ্য ও শহরবন্দরের প্রসারের সাথে সাথে মানবতাবাদের প্রসার বেড়ে গিয়েছিল বহুগুনে। হিউম্যানিস্টদের কল্যানে গড়ে উঠতে থাকে স্কুল – ইউনিভার্সিটি যেখানে শিখানো হতে থাকে ভাষা, ইতিহাস, হিসাবনিকাশ, দর্শন, চিকিৎসাবিদ্যা ইত্যাদি। ৫০০ খ্রীষ্টাব্দে তখনকার রোমান সাম্রাজ্যের স্কুলগুলি শেষ করে দেয়া হলেও, ১০৭৩ থেকে গড়ে উঠতে থাকে নতুন নতুন শিক্ষালয়, ১০৮০ সনে পাওয়া যায় রেজিস্ট্রার্ড বিদ্যালয়ের কথা। আমরা আজকে যে স্কুল কলেজে পড়ছি তার সূচনা হয়েছিল সেই হিউম্যানিস্টদের কল্যানে যারা অন্ধকার যুগে থেকেও শিখেছিল চোখ মেলে দেখতে! ১৪৫০ সনের দিকে ছাপাখানার আবিস্কার হলে শিক্ষার প্রসার বেড়ে যায় বহুগুনে। আগে যেখানে হয়ত পুরো শহরে একজনের কাছে হয়ত বই একটা থাকতো (তাও হয়তো বাইবেল) ছাপাখানার আবিস্কারে গ্রীস ও রোমানদের হারিয়ে যাওয়া দর্শন ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারিদিকে। ধনী বা উচ্চবংশীয়দের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা শিক্ষা বইয়ের পাতায় করে ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। ধর্মযাজকদের একছত্র আধিপত্ত থেকে সমাজের নেতৃত্ব চলে যায় ব্যবসায়ী ও সাধারন মানুষের হাতে। দেখতে দেখতে প্রমীত/উচ্চবংশীয় ভাষা শুধু নয়, চলিত ভাষার ব্যাকরনও পড়ানো হতে থাকে নতুন গড়ে ওঠা বিদ্যালয়গুলিতে।

হিউম্যানিজম বা মানবতাবাদ ছিল আমাদের সুপরিচিত রেনেঁসা যুগের প্রধান চালিকা শক্তি। যারা রেনেঁসা অর্থ জানেন না, তাদের জন্যে জানিয়ে রাখি রেনেঁসা অর্থ ‘নতুন জীবন পাওয়া’ বা ‘পূনর্জন্ম’ যা ইউরোপ ইতিহাসে মধ্যযুগের শেষ ঘটায় দারুন সব সাংষ্কৃতিক ও শিল্পকলার অবদানে।

রেনেঁসা যুগে ১৫০০শতাব্দীর শেষদিকে ইতালির বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠতে থাকে হিউম্যানিস্টদের বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্রের মত। সেসময়কার প্রথমদিকে এর শুরু হয়েছিল ফ্লোরেন্স নামক স্থানে প্লেটোনিক দর্শনে পরিচালিত একটি শিক্ষাকেন্দ্রে। সেসময়ে বিদ্যালয়কে বলা হতো – জিমনেশিয়া, যার উদ্যোক্তা ছিলেন বিভিন্ন বিত্তবান পরিবারগন। ছাত্রদের লিবারেট আর্টসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হতো, যেন তারা ভবিষ্যতে ভেনিস কিম্বা ফেরেরার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পড়া শুরু করার জন্যে প্রস্তুত হতে পারে। সেসময়ের পাঠ্যসূচী তৈরীতে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন – গুয়ারিনো ভেরোনিস (ছবি দ্রষ্টব্য); যিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে ৩টি স্তরে ভাগ করেছিলেন যেখানে থাকতো- (১) হাতেখড়ি (২) উচ্চারন ও পড়তে শেখানো ও (৩) ব্যাকরন। ধীরে হিউম্যানিজমের সাথে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সুশিক্ষার আলো। ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেইনে মানবতাবাদিদের হাতে করে গড়ে ওঠে নতুন এক সমাজ, যেখানে আর ধর্মের ছায়ার পরিচালিত হতো না আইন। যেখানে সমাজ পরিচালিত হতে শুরু করে মানুষের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে, ঈশ্বরের নয়। হয়তো, এ কারনেই বর্তমান কিছু জাতিগোষ্ঠী পশ্চিমা শিক্ষার ধূয়া তুলে বন্ধ করে দিতে চায় পরিচিত স্কুল-কলেজ বিদ্যালয়। একারনেই হয়তো গুলি করে যখন কেউ তার শিক্ষার অধিকার আদায় করতে চায়!

বিঃদ্রঃ বিশাল এক ইতিহাস কয়েক অনুচ্ছেদে সংক্ষেপে করে তুলে ধরা যে কি ভয়াবহ কঠিন তা আজ খুব টের পেলাম। তবে যাদের জানার আরও ইচ্ছা আছে, ইংরেজি বইয়ের সন্ধান দিতে পারি। বাংলায় কি আছে সে সম্বন্ধে আমি অবগত নই।

তথ্যসূত্র:
The penguin guide of medeival history (Richard Barbar)
A Social history of education in England, London: Methuen (John Lawson & Harold silver)
Europe in the fourteenth and fifteenth centuries (Denys Hay)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “হিউম্যানিজম বা মানবতাবাদের উত্থান

  1. সংক্ষিপ্ত হলেও মানবতাবাদের
    সংক্ষিপ্ত হলেও মানবতাবাদের সূচনার ইতিহাস খুব সুন্দর ও সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। এই ধরনের লেখা আমাদের এখন অনেক বেশি প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

40 − 35 =