ইস্টিশন-১

ভর দুপুরে হটাৎ ঘুম ভেঙে গেল। কাল সারারাত একফোঁটাও ঘুম হয়নি। এই প্রথমবার ট্রেন জার্নির রোমাঞ্চ সারা রাত চোখের পাতা এক করতে দেয় নি। হেঁটে হেঁটে এক বগি থেকে অন্য বগি আর দু-বগির মাঝখানে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতেই রাত পার। অবশ্য পাশের কম্পার্টমেন্টে সুন্দরী রমণীদের ঝাঁকটি রাতে ঘুম না হবার অন্যতম প্রভাবক সেটা তো বলাই বাহুল্য। একটু চোখাচোখি, মুচকি হাসি তারপর আলাপ, রাতে কি আর ঘুম চোখ স্পর্ষ করতে পারে? তবুও ক্লান্তি ভোর বেলায় আমাকে হার মানিয়ে দিল। ট্রেনের একরোখা ঝাঁকুনিটা অভ্যাস হয়ে যেতে বেশ সময় লেগেছে, কিন্তু চোখ ধাঁদিয়ে দিয়েছে বাহিরের অন্ধকার আর চকিতে একটি দুটি আলোর দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া। তারপর ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ঘুম। ঘুম ভাঙতে দেখি ট্রেন মফঃস্বল ইস্টিশনে দাড়িয়ে। বাহিরে খুব একটা কোলাহল নেই, কম্পার্টমেন্টাও গতরাতের তুলনায় কিছুটা খালি, আবার একটি দুটি নতুন মুখ ও দেখা যাচ্ছে। পাশের ভদ্রলোকটি দেখি খবরের কাগজ হাতে বসে আছে। এই ভদ্রলোকটির সাথে গতরাতে আলাপ হয় নি। উনি যাচ্ছেন তার স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে, অন্তত দেখে তো তাই মনে হলো। যুবতী মেয়ে সঙ্গে থাকায় আমার মতো চ্যাংড়া ছেলের দিকে কটমটে দৃষ্টিতে তাকাবেন এ তো তার জন্মগত অধিকার, আর এ দৃষ্টি উপেক্ষা করা আমার কর্তব্য। তো সারারাত এভাবেই পেরিয়ে গেছে, আলাপের সুযোগ হয় নি। তা সে যাক, এখন এই মূহুর্তে মনে হচ্ছে ভদ্রলোকের মন কিছুটা নরম, অতটা কাঠখোট্টা নয়। শহরের বিশাল বিশাল দেয়াল গুলোর জায়গায় গুল্ম-লতার সারি বেশ ভালো সিডেটিভের কাজ করে, বেশ একটা নির্লিপ্ততা এসে যায় মানুষের ভিতর, তিনিই বা ব্যাতিক্রম হবেন কেন? আমার দিকে তাকিয়ে তিনি মুচকি হেসে বললেন, “কী ইয়ংম্যান, ঘুম ভাঙল তবে?”
আমি তার দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, “খবর শুনেছেন? কাদের মোল্লার আজকে রায় হয়ে গেছে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তাই নাকি? কী রায় হলো?
তিনি মনে হলো এক শিশি খুব তেতো ওষুধ খেয়ে ফেলেছেন, ঠিক তেমন মুখ করে তিনি বললেন, “যাবজ্জীবন।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “খবরটা কী পত্রিকায় এসেছে?”
তিনি বললেন, “আরে না, পত্রিকা তো ছাপা হয়েছে গতরাতে, ইস্টিশন মাস্টারের সাথে কথা হলো, উনিই বললেন।”
“আপনি মনে হয় এই রায় শুনে খুব একটা খুশি হননি?”
“ও আপনারা কী বুঝবেন, আপনারা এই সময়ের আধুনিকতায় বড় হয়েছেন, একাত্তুরে এই অমানুষ গুলোর কাজ তো আর চোখে দেখেন নি, ও আপনারা বুঝবেন না, ইতিহাসের বই আর একটা দুটো ডকুমেন্টারি দেখে ওই সময়ের বিভীষিকা আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না।”
আমি তাকে বললাম, “তা হয়তো ঠিক, তবু একটু চেষ্টা করেই দেখুন না।”
আমি বেশ বুঝতে পারছি, একাত্তুরের সৃতি তাকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।
তিনিও বেশ নাটকীয় ভঙ্গীতে আমার দিকে মুখ বাড়িয়ে বললেন, “আমি তখন তরুণ, উনিশ-কুড়ির মতো বয়স হবে, আপনাদের থেকেও কম বয়স। আমি নিজের চোখে রাস্তায় বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েদের পচা-গলা লাশ দেখেছি। তাদের অপরাধ ছিলো- তারা বাঙালী। বাচ্চারা রাজনীতির কী বা বোঝে আপনিই বলুন? আর ওদের বাবা মা দের অপরাধ ছিলো তারা নিজ পছন্দের দল কে ভোট দিয়েছিল, ব্যাস। তখন যদি দেখতেন এই সব রাজাকার শয়তানদের, ইবলিশ শয়তান নিজেই হয়তো এ দেখে মাথা কূটে মরতো। কতলাশ দেখেছি বটগাছে ঝুলে আছে, নয়তো রাস্তায় পরে আছে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, নয়তো নদীতে ভেসে যাচ্ছে, সে ভয়াবহতা বলে বোঝানো যাবে না। আর জানেন তো এই কাদের মোল্লার ডাক নাম ছিল কসাই কাদের, নিজ হাতে মানুষ জবাই দিতো এই শয়তানটা, কতো ধর্ষন আর হত্যা যে এ করেছে তার কোন হদিশ নাই।”
আমি বললাম, “তবে যাবজ্জীবন দিলো কেন? ফাঁসিই তো দেওয়া উচিৎ ছিল। নাকী সব অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমান করা যায় নি বলে এই রায় হয়েছে।”
তিনি বেশ উত্তেজিত হয়ে গেলেন, বললেন, ” আরে, কে বলে ওসব কথা, সবগুলো হত্যা ও ধর্ষনের অভিযোগ একদম সন্দেহাতীত ভাবেই প্রমানিত হয়েছে, বারবার সে কথা বলাও হচ্ছে, আলবৎ এই শয়তানের ফাঁসি হওয়া উচিৎ। এ রায় কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। নিশ্চই এর পেছনে কোন চক্রান্ত আছে। আপনারা ইয়ংমেন’রা এর প্রতিবাদ করেন না কেন? ওই কুলাঙ্গার জামাত- শিবির গুলো হরতাল দিচ্ছে এই স্বাধীনতা বিরোধী খুনি-ধর্ষকদের বাঁচাবার জন্য, তাও আবার স্বাধীন বাংলাদেশে বসে! কত্তবড় সাহস ভেবে দেখেছেন। আপনারাও নেমে যান না রাস্তায় ওই বেজন্মাগুলোকে প্রতিরোধ করবার জন্য”
আমি বললাম, “তা তো অবশ্যই, ইতিহাস সব সময় পুনরাবৃত্তি করে, আজ যদি এদের বিচার না হয় তবে হয়তো নতুন একটি ঘাতক প্রজন্ম তৈরী হয়ে আবার সেই নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি করবে।”
তিনিও বললেন, “আলবৎ, আপনারা ইয়ংমেন’রা রুখে না দাঁড়ালে একদিন দেখবেন এই বাংলাদেশ আবার সেই পাকিস্তানের ছায়ায় পরিনত হয়ে গেছে।”
আমি কিছু বলবার আগেই হঠাৎ স্টেশনের বাহিরে থেকে বেশ হট্টগোলের আওয়াজ ভেসে আসলো। কি ব্যাপার? কি হয়েছে? সবার চোখে মুখেই একই প্রশ্ন। জানালার কাছে গিয়ে প্লাটফর্মে দাড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধলোককে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, ” আর কইয়েন না, শিবিরের হাঙ্গামা, হেতনেরা নাকি কাদের মোল্লার বিচারের রায় মানে না, মুক্তি চায়। না হইলে হেতনেরা আবার গ্যাঞ্জাম করবো। কালকেও হরতাল দিসে।”
সেই বৃদ্ধ লোকটির পরের কথাটা স্বগতোক্তি হলেও আমি বেশ শুনতে পেলাম, তিনি তখন বিড়বিড় করে বলছেন, “শয়তানে এহন আবার দাড়ি রাইখা ধর্মের কথা কয়, শালারে জুতা পেটা করা উচিৎ।”
নিজের সিটে এসে ভদ্রলোককে খবরটা জানাতেই তিনি বেশ অবাক হয়ে বললেন, “দেখেছেন, দেখেছেন এদের সাহস! আরে বেটা তোদের তো এই বিচারের রায় শুনে আনন্দে নাকে খত দেয়া উচিৎ, তওবা করে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ, যে তোদের বাপের ফাঁসির রায় হয় নাই। এই রায় এর বিরুদ্ধে কথা বলতে হলে আমরা বলবো, যারা ওই শয়তান পশুটার ফাঁসি চাই, যারা এই বাংলাদেশকে ভালোবাসি। এতো দেখি চোরের মা’র বড় গলা।”
আমি তখন সত্যি চিন্তায় পড়ে গেলাম, কই স্বাধীনতার পরে এই জামাত শিবিরের এতোটা সাহস তো আর কখনই দেখা যায় নি। নব্বইয়ের দশকে যখন গণ আদালতে বিচার হয় তখনো তো এরা এভাবে প্রকাশ্যে হরতাল দিয়ে ভাঙচুর করে বেড়াতে পারে নি। এখন তারা বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মিলে আবার দেশটাকে নরকে পরিণত করবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে গেছে। দেশ কী তবে সত্যি ধিরে ধিরে আবার সেই পাকিস্তানের কংকালে পরিণত হচ্ছে? আমরা যদি এখনই রুখে না দাড়াই তবে কী নব্য পাকিস্তানের ছায়ায় গড়ে উঠবে আমাদের পরবর্তি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ? তাহলে আর সেই বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা শুধু শুধু প্রাণ বিসর্জন দিল কেন? সেও তো আমাদের মতো স্বার্থপর হয়ে উঠতে পারতো। ট্রেনে এই স্বল্প সময়ের আলাপে এই ভদ্রলোকের কথায় হতাশার ছায়া থাকলেও আত্মগ্লানি নেই, সে অন্তত বলতে পারে, আমাদের প্রজন্মের খাঁটি মানুষেরা বুকের রক্ত দিয়ে তোমাদের জন্য একটি দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছে। কিন্তু আমরা কী জবাব দেব আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে? নাকি বলবো, জামাত শিবিরের হাত ধরে দেশ যখন আবার একটি শোষণের কারখানায় পরিণত হচ্ছিল, আবার একটি নব্য পাকিস্তানের ভৌতিক ছায়ায় পরিণত হচ্ছিল, তখন আমাদের প্রজন্মে খাঁটি মানুষ বলে কেউই ছিল না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “ইস্টিশন-১

  1. আমি তখন সত্যি চিন্তায় পড়ে

    আমি তখন সত্যি চিন্তায় পড়ে গেলাম, কই স্বাধীনতার পরে এই জামাত শিবিরের এতোটা সাহস তো আর কখনই দেখা যায় নি। নব্বইয়ের দশকে যখন গণ আদালতে বিচার হয় তখনো তো এরা এভাবে প্রকাশ্যে হরতাল দিয়ে ভাঙচুর করে বেড়াতে পারে নি।

    আমি এই দায় আওয়ামীলীগ আর বিএনপি দুজনকেই দায়ী মনে করছি। এরাই আমাদের এই পরিনতির দিকে নিয়ে এসেছে।

  2. শুধুমাত্র ব্লগারদের
    শুধুমাত্র ব্লগারদের আন্দোলনটাই যথেষ্ট নয়। যেদিন ক্যাপশন হিসেবে “ব্লগারদের আন্দোলন” এর পরিবর্তে “জনসাধারণের আন্দোলন” লেখা হবে বিভিন্ন মিডিয়াতে, তখনই প্রকৃত কোন পরিবর্তন সম্ভব।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

95 − 86 =