ভাঁজ ভাঙা দৃশ্য

রোদ ঝলমলে বিকেল। চোখ মুছতে মুছতে জানালায় দাঁড়ালাম। অনেকক্ষণ বইয়ের দিকে তাকালে ইদানিং চোখ থেকে পানি গড়ায়। আমার বয়স কত। এ বয়সে অনেকে পৃথিবীকে চিনতে শুরু করে। অথচ আমার মনে হয় ঢের বুড়ো হয়ে গেছি। বুড়ো চোখে হাত বুলোতে বুলোতে বাইরের দিকে দৃশ্য খুঁজি। এই জানালায় প্রথম দাঁড়িয়ে যেদিকেই তাকিয়েছি সবটাই দৃশ্য মনে হয়েছে। এরপর থেকে যেদিকে তাকাই মনে হয় সবটা পরিচিত। আকাশের রঙ বদলালে মাঝে মাঝে দৃশ্য মনে হয়। মাঝে মাঝে কোনো জানালায় মানুষের আনাগোনা দেখলেও। যদিও মানুষের সঙ্গ এখন আর আমার ভাল্লাগে না।

জানালা ছেড়ে বিছানায় আসি। আবার বই হাতে নেই। পঁচিশ বছর বয়স। জীবনের অর্ধেকটা শেষ। পৃথিবীতে কত কি হয়ে গেল। আমার কিছু হলো না। শুধু আমি কেন, অনেকেই তো এ বয়সেও সন্ধ্যের আগে ঘরে ফেরে।
বইয়ের গল্প মাথায় ঢুকতে পারছে না। কি যেন এক বোধ বারবার লেপ্টে যাচ্ছে তার ওপর। বই সরিয়ে রাখি। চারদিকে তাকিয়ে চমকে উঠে বসি। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার কেন। টেবিল লাইটটা জ্বেলে চারদিক দেখি। নিজেকে বারবার প্রশ্ন করে নিশ্চিত হই, আমি ঘুমুচ্ছিলাম না। একবার জানলায় গিয়ে রোদ ঝলমলে বিকেল খুঁজে আসি। আমার অস্থিরতা বাড়তে থাকে। দ্রুত বেরিয়ে পড়ি ঘর থেকে।

রাস্তায় মানুষের জটলা। এই মোড়টায় যখনই আসি দাঁড়িয়ে থাকি অনেকক্ষণ। পরিচিত মানুষ খুঁজি। এতদিন থাকি এই শহরে। অথচ এখনো কাউকে পাইনি। মানুষের সঙ্গ ভাল্লাগে না আমার। তবু এইখানে এলে কাকে যেন দেখতে ইচ্ছে করে খুব। কাউকে পাই না। শহর আমাকে তার বৃহৎ বপুর বড়াই দেখায়।
মানুষের জটলাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে একটি ছেলে বসে আছে ফুটপাতে। আমি তার মাঝে দৃশ্যের খোঁজ পাই। সোডিয়ামের আলোয় ছেলেটির জামার রঙ বোঝা যাচ্ছে না। আমি রঙ খুঁজতে থাকি। চতুর্দিকে শুধু রঙ আর রঙ। আশ্চর্য, মানুষের সমাজ এত রঙিন!
ছেলেটা এদিক ওদিক তাকায়। কাউকে খুঁজছে যেন। আমি ফোনে সময় দেখি, সাড়ে আটটা। আরো কিছুক্ষণ ছেলেটাকে দেখি। একে অপরকে দেখি। সোডিয়ামের আলোয় কেউ কারো চোখের ভাষা পড়তে পারি না। তারপর আমি হতাশ হতে শুরু করি। ছেলেটা কিছু করছে না। দৃশ্য মনে হচ্ছে না তাকে আর। আমি হাঁটতে শুরু করে দেই।

এগারোটায় ঘরে ফিরতে হবে। না ফিরলে কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু আমি ফিরি। এগারোটার মধ্যেই ফিরি। আজ হাতে অল্প সময়। আড্ডায় যাওয়া যাবে না। কোথায় যাব। বৃহৎ বপুর শহর সঙ্কুচিত হতে শুরু করে। আমি দু একটা জায়গার কথা মনে করি। যুৎসই মনে হয় না কোনোটা। ফুটপাতের বইয়ের দোকানের সামনে থেমে যাই।
বই দেখে আমার অস্থিরতা আবার নতুন করে শুরু হয়। অন্ধকারে আমি কিভাবে বই পড়ছিলাম, ভেবে পাই না। সারি বেঁধে শোয়ানো বইয়ের নাম পড়ি। পড়া, না পড়া বইয়ের মিশেল। অধিকাংশ বইয়ের ওপর এক একটা দৃশ্য। কতক শুধু অক্ষরে মোড়া। আমি সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। মাঝে মাঝে দোকানিকে দেখি। আগ্রহ নিয়ে আমাকে দেখছে। তার চোখে আমি বই বিক্রির আকুতি দেখি। পরিচিত দৃশ্য। আমার ঠোটের কোনায় ঢেউ তুলে হাসি মিলিয়ে যায়।
দোকানি আমার নাম ধরে ডাকে। আমি চমকে উঠি। তাকে তো চিনি না। কোনোদিন কোথাও পরিচয় হয়েছে বলেও তো মনে পড়ে না। সে আমাকে টাকা ফেরত দিতে চায়। আগের দিন নাকি বই কেনার পর ফেরত নিতে ভুলে গেছি। আমার মনে পড়ে না। তার হাত থেকে টাকা নেই। সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে আমি কোনো গভীরতা দেখি না। এত সহজ চোখের ভাষাও আমি বুঝতে পারি না। অস্থিরতা আমাকে ঘিরে ধরতে শুরু করে। আমি পা চালাই। দোকানি তাকিয়ে থাকে। আমি স্বীকার করি না, ভুলে গেছি। বলি না, আমি সে নই।

টাকা হাতে দূরে এসে আমার প্রফুল্ল লাগে। একেবারেই অল্প কিছু টাকা। তবু আমার ভাল্লাগে। ওই টাকা দিয়েই সিগারেট কিনি। যদিও আগের সিগারেট এখনো পকেটে আছে। যাত্রী ছাউনিতে বসে রাস্তার দিকে তাকাই। গাড়ির সংখ্য কমে গেছে। দশটা বাজতে গেল। সিগারেটের আগুন নামার তালে তালে আমার অস্বস্তি বাড়তে থাকে।
আমি ভালো করে নিজেকে দেখার চেষ্টা করি। গায়ের দিকে তাকাই। হাতের দিকে তাকাই। মুখ খুঁজে পাই না। আয়না ছাড়া মুখ দেখা কঠিন। এই সাধারণ সত্যটা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আমি বুঝতে পারি কিছু একটা ভুল হচ্ছে। কিন্তু এ জয়গাটা তো আমার পরিচিত। এখানে সব কেন দৃশ্য মনে হবে। আমি আমার মুখ, ছবি ভাবতে থাকি। কুল কিনারা পাই না। চোখে হাত দিয়ে পানি খুঁজি। পাই না। আবার বইয়ের দোকানের উদ্দেশে হাঁটা দেই।
দোকানিকে দেখে আশ্বস্ত হই। সে তো আমাকে দেখছে। তাকে বলে ফেলি, টাকা না পাওয়ার কথা। কেন সে টাকা দিল, জানতে চাই। সে আমার কথা মানতে চায় না। আমার প্রফুল্লতা আবার ফিরে আসতে শুরু করে। দোকানি পাশের চাঅলাকে ডেকে আমাকে চা দিতে বলে। আমি একটা বই হাতে নেই। দোকানি বলে, এটা নাকি কদিন আগে কিনেছি তার কাছ থেকেই।
আমার অস্বস্তি আবার ফিরে আসতে শুরু করে। দোকানিকে তার বয়স জিজ্ঞেস করি। সে উত্তর দেয়- পঞ্চাশ। আমি চা খেয়ে উঠে পড়ি। রাতের খাবার খেতে খেতে রেস্টুরেন্টের জানালায় বসে নিচ তলার কোলাহল থেকে শব্দ আলাদা করি। কে একজন উচ্চস্বরে তার প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলছে। বাক্যগুলো বুঝতে পারি না। দু চারটে শব্দ শুনে অনুমান করতে থাকি। একজন রিকশাঅলাকে ডাকে। তার হাঁক আরো লম্বা হতে হতে হারিয়ে যায়। রিকশাঅলার জবাব শুনি না।

এগারোটার আগেই ঘরে ফিরে আসি। চোখে মুখে পানির ঝাপটা দেই। ফোন বেজে ওঠে। আমি ফোন ধরি। ওপাশ থেকে আমার নারীটি জিজ্ঞেস করে সারাদিন ফোন দেইনি কেন। আমি জিজ্ঞেস করি সে কেন দেয়নি। সে জানায় আমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমার বিশ্বাস হয় না। আমি তাকে কিছু বলতে চাই। সে তেঁতে উঠে আমাকে থামিয়ে জানান দেয়, ইদানিং নাকি আমি আলাভোলা হয়ে যাচ্ছি। আমার অসহায় লাগে।
আমি তাকে দোকানির টাকা ফেরত দেয়ার গল্প বলি। সে হেসে বলে আমার নাকি বয়স হয়ে গেছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, এখন তার বয়স কত। সে আবার হাসতে শুরু করে। তার হাসির শব্দ আমার কাছে মোটেও ভাল্লাগে না। আমি আতঙ্কিত হই। তার হাসির দমক আরো লম্বা হতে থাকে। হাসির মধ্য থেকে আমি একটা শব্দ আলাদা করতে পারি- পঞ্চাশ।

[গল্পটি ৬ জুন, ২০১২ তারিখে নাগরিকব্লগে প্রথম প্রকাশ হয়েছিল।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৫ thoughts on “ভাঁজ ভাঙা দৃশ্য

  1. লেখা ভালো লেগেছে । সুন্দর
    লেখা ভালো লেগেছে । সুন্দর লেখনী,শব্দ, ভাষা, বর্ণনা খুব চমৎকার ভাবেই করেছেন।
    যদিও গল্পের থিম বুঝি নি। কিন্তু পড়তে ভালো লেগেছে।

  2. আপনার লিখার হাত বেশ ভাল। এ
    আপনার লিখার হাত বেশ ভাল। এ ধরণের গল্প আমার খুব ভাল লাগে। চরিত্রগুলোর মধ্যে সংঘাত অন্তর্দ্বন্দ্ব বাদেও যে খুব সুন্দর একটা গল্প হতে পারে এটি তার একটা উদাহরণ। এ রকম গল্প ইদানিং কম হয়। বিষন্নতায় মোড়া থাকে একটা গল্প। আমার ভাল লেগেছে।

  3. দারুন লিখেছেন। আপনি তো কবিতাও
    দারুন লিখেছেন। আপনি তো কবিতাও ভালো লেখেন। দুই একটা কবিতাও পোস্ট দেন। ভুইল্লা যাইয়েন না আবার। বয়সের দোহাই মানবো না। 😀

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 25 = 29