ঢাকা ও চট্টগ্রাম আন্দোলনের ঘোষণাপত্র এবং শপথ বাক্য।

ঢাকার ঘোষণাপত্র এবং শপথবাক্য,পাঠ করান ইমরান এইচ সরকার

সংগ্রামী ভাই ও বোনেরা,
আজ আমরা ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি।আপনাদের এই শ্রম এই ঘাম আজ সারা বাংলার দৃপ্ত শপথ।
আজ এখানে দল-মত,ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যারা বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির পক্ষে এসে দাঁড়িয়েছেন,তাদের সবাইকে জানাই সংগ্রামী শুভেচ্ছা।
১৯৭১ সালের মহান মক্তিযুদ্ধের মতো আজও পুরো দেশবাসী একত্রিত হয়েছি।এই “প্রজন্ম চত্বর” থেকে ফাঁসির দাবী তুলেছি।আপনারা জানেন,শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ এই প্রজন্ম চতেওর থেকে অল্প দূরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গঠন করেছিলেন গণয়াদালত।আর সেই আদালতের ঐতিহাসিক বিচারে ফাঁসি হয় রাজাকার গোলাম আযমের।
এরপর দীর্ঘ একটি সময় পেরিয়ে যায়।২০০১ সালে যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রিত্বের মাধ্যমে কলঙ্কিত হয় বাঙালির ইতিহাস।২০০৮ এর নির্বাচনের পর বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদে প্রথম অধিবেশনেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাবনা পাস করে।এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল।এই ট্রাইব্যুনাল অত্যন্ত সফলতার সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্য পরিচালনা করে আসছে।

প্রিয় দেশবাসী,
আপনারা জানেন,কিছুদিন আগে ফাঁসির রায় হয় একাত্তরের নরপশু বাচ্চু রাজাকারের।আনন্দে উদ্বেলিত হয় পুরো জাতি।গত ৫ ফেব্রুয়ারী মিরপুরের কসাই রাজাকার আব্দুল কাদের মোল্লার রায় ঘোষিত হয়।এই নরপশুর রায় হলো যাবজ্জীবন।
এ রায় কি আমরা মানি? মানি না।
এমন একটি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের তরুন প্রজন্ম ব্লগ ও ফেসবুকের মাধ্যমে একটি সাধারন দাবীতে একত্রিত হয়।সে দাবী ফাঁসির দাবী।

আপনারা জানেন ব্লগার অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক এ আন্দোলন শুরু করে।প্রথম দিন থেকেই আপনাদের সবার হাত ধরে পূর্ণতা পায় এ আন্দোলন।রুপ নেয় আজকের এই মহাসমাবেশ।
এই সমাবেশ গভীর ক্ষোভ,ঘৃণা ও লজ্জার সঙ্গে একাত্তরের কসাই ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার বিচারের রায় প্রত্যাখান করছে।সমগ্র বাঙালি জাতির আবেগ,অনুভুতি এবং প্রত্যাশার সঙ্গে একাত্ম হয়ে এই মহাসমাবেশ মনে করে,যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কেবল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাই করেনি,প্রত্যক্ষভাবে গনহত্যা,বুদ্ধিজীবি হত্যা,ধর্ষণ,অগ্নিসংযোগ,লুটতরাজ এবং জোর করে ধর্মান্তকরনের মতো জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিল,তাদের বিচারের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত “মৃত্যুদন্ড”।কিন্তু ৬ টির মধ্যে ৫টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়া স্বত্ত্বেও আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল খুনি জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে তার প্রাপ্য সর্বোচ্চ শাস্তি না দিয়ে সমগ্র দেশবাসীকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে।এই রায় পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার পরীপন্থী।এই রায় কোনোভাবেই দেশবাসীর কাছে গ্রহনযোগ্য নয়।এই সমাবেশ দ্ব্যার্থহীন ভাষায় ঘোষণা করছে,মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবীতে সমগ্র বাঙালি জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ।এটা কোন রাজনীতির প্রশ্ন নয়।
এটা বাঙালি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার আরেক মুক্তিযুদ্ধ।ন্যায়বিচার,আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশকে রাজাকারমুক্ত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক,গণতান্ত্রিক,বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হচ্ছে আজকের এই নিরস্ত্র শান্তিপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র লক্ষ্য।
এই লক্ষ্যে আমরা অবিচল।এই লক্ষ্য অর্জনের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কর্তব্য সম্পাদন করবে এবং ৩০ লাখ শহীদের আত্মদানকে সর্বোচ্চ গৌরব দান করতে সক্ষম হবে।
এই মহাসমাবেশ থেকে আমরা উল্লিখিত লক্ষ্য অর্জন,সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুততর করা এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দলমত নির্বিশেষে তরুন প্রজন্মসহ বাংলাদেশের সকল ছাত্র,যুবক,কৃষক,শ্রমিক,পেশাজীবি,বুদ্ধিজীবি,সংস্কৃতিকর্মী,নারী সংগঠন,মুক্তিযোদ্ধা,শিল্পী,সাহিত্যিক,সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিকে ইস্পাত দৃঢ় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

এই মহাসমাবেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী,যুদ্ধাপরাধে জড়িত,সংবিধান অমান্যকারী,সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী হিংস্র ফ্যাসিস্টদের দল জামায়াতে ইসলামীকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ করার দাবী জানাচ্ছে।একইসঙ্গে দেশে গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়ে যে জামায়াত-শিবির বাংলাদেশকে একটি তালেবান রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাচ্ছে,রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে তাদের গ্রেফতার এবং কঠোরতম শাস্তির দাবী জানাচ্ছে।
এই মহাসমাবেশ আরো দাবী জানাচ্ছে,যারা যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতিতে পূনর্বাসিত করেছে এবং এখনো নানা কৌশলে তাদের সহযোগিতা করে যুদ্ধাপরাধ বিচার বানচাল,নৈরাজ্য সৃষ্টি এবং দেশকে পুনরায় ’৭৫ পরবর্তী প্রতিক্রিয়াশীল ধারায় নেয়ার ষড়যন্ত্র করছে,সেই সব অপশক্তির বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।

এই মহাসমাবেশ চলমান আন্দোলনকে জাতীয় নব জাগরনে পরিণত করার দৃঢ় সংকল্প ঘোষণা করছে।একই সঙ্গে কোণ অপশক্তি যেন জনতার এই স্বতঃস্ফুর্ত ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে কোনরকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং দূর্বল করতে না পারে সেজন্য সকলকে সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছে।
এই মহাসমাবেশ থেকে ভাষা শহীদের স্মৃতি বিজড়িত ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা শপথ নেবো,এই চলমান আন্দোলনকে আরো বেগবান এবং সুসংহত করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাব।এই মহাসমাবেশে একটি স্পার্ক।আপনারা প্রত্যেকে নিজ নিজ এলাকায় চলমান এই আন্দোলনের স্পার্ক ছড়িয়ে দিন।
আজ এই মহাসমাবেশ থেকে আমরা শপথ গ্রহন করবো।আপনারা সকলে আমার সঙ্গে বলুন।

  • ‘‘আমরা শপথ করছি, যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াত-শিবিবের রাজনীতি নিষিদ্ধ ও তাদের নাগরিকত্ব বাতিল না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে ও অনলাইনে সক্রিয় থাকবো।’’
  • ‘‘আমরা শপথ করছি, ’৭৫ পরবর্তী যে সমস্ত অপরাধীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের ট্রাইব্যুনালের আওতায় আনব।
  • ‘‘ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা, রেটিনা ফোকাসসহ জামায়াতের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বয়কট করবো। আমরা মনে রাখবো, এগুলোর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তারা এ দেশে স্বাধীনতা বিরোধী অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।’’
  • ‘‘এক কথায় রাজাকার আলবদরদের সব সামাজিক ও ব্যবসা-সংস্কৃতি নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে কাজ করবো। এমনকি যে সব প্রতিষ্ঠান শিশুদের সাম্প্রদায়িকতায় উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করছে, সেগুলোকেও বয়কট করবো।’’
  • ‘‘আমরা আরও শপথ করছি, দেশে গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়ে জামায়াত-শিবিরের যারা রাষ্ট্রদ্রোহসম অপরাধ করেছে, পত্রিকার খবর ও টিভি ফুটেজ দেখে গ্রেফতার করে তাদের অবিলম্বে বিচারের আওতায় আনবো।’’
  • ‘‘যুদ্ধাপরাধীদের গণমাধ্যম নয়া দিগন্ত, দিগন্ত টিভি, আমার দেশ, সংগ্রাম, সোনার বাংলা ব্লগ বয়কট করবো। কোনো অফিস বা বাসায় যুদ্ধাপরাধীদের পত্রিকা রাখবো না।’’
  • ‘‘ফাঁসিই একমাত্র সাজা রাজাকারের।’’

চট্টগ্রামের শপথ পাঠ করান শহীদ জায়া বেগম মুস্তারী শফি

  • স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতক-রাজাকার যুদ্ধাপরাধীদের এদেশের মাটি থেকে নির্মূলে নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করব।
  • লাখো শহীদের রক্তের নামে শপথ করছি যে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাব।
  • আমরা আরও শপথ করছি যে, শহীদ জননী জাহানার ইমামের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এবং ৯২ এর গণআদালতের গণরায় প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখব।
  • যারা ৭১ এর পরাজিত শত্রুকে রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে প্রশ্রয় দিয়ে লাখো শহীদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানী করেছে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাব।
  • আরও শপথ করছি যে, `জামায়াত ইসলামীসহ সকল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা এবং ধর্ম নিরপেক্ষ,গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে আজীবন লড়াই চালিয়ে যাব। বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত।
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “ঢাকা ও চট্টগ্রাম আন্দোলনের ঘোষণাপত্র এবং শপথ বাক্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

28 − 22 =