শাহবাগের আন্দোলনের ভবিষ্যৎ ও বর্তমান রূপরেখা নিয়ে কিছু সোজা কথা

জাহানারা ইমাম

দুইটা বিষয়

এক. জাহানারা ইমাম

জাহানারা ইমাম

দুইটা বিষয়

এক. জাহানারা ইমাম
আমার চোখে, যদি রাজাকারদের ফাঁসির দাবীতে কেউ আদর্শ হয়ে থাকেন, তবে তিনি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। উনার সংগ্রামী অবদান এই ক্ষেত্রটিতে অনস্বীকার্য। তিনি বেঁচে থাকতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজাকারদের ফাঁসির জন্যে কথা বলেছেন। কিন্তু আপোষকামী রাজনীতির কারণে তিনি সুফল পান নি। সমাজে রাজাকারদের ঘৃণিত করে তুলতে এবং ফাঁসির দাবীকে জোরালো করতে অগ্রসর ভূমিকা রেখেছেন। আজ আমরা যে দাবীতে এবং যে চেতনায় ফুঁসে উঠছি, তা শহীদ জননীর অবদানের ফসল।

অথচ, আজ শাহবাগে যারা আন্দোলন করছেন, তারা জননীর এই শীর্ষ অবদানকে শীর্ষে তুলে ধরছেন না। প্রগতিশীল সচেতন মানুষের কাছে স্বার্থপর হিশেবে বিবেচিত হচ্ছেন। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের এই আন্দোলনে প্রথম দিকে জাহানারা ইমামের প্রসঙ্গ উপেক্ষিত ছিল। এখনো জাহানারা ইমাম প্রসঙ্গ বেশ উপেক্ষিত, প্রধানতম স্মরণীয় আদর্শ নয়। যারা এটা বুঝতে পারছেন, তারা শহীদ জননীর পর্যাপ্ত মূল্যায়ন না দেখে নিশ্চয় কষ্টও পাচ্ছেন।

দুই. অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট
আমার দেখায় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে মেধা, যৌক্তিকতা, গ্রহণযোগ্যতা কিংবা সহনশীল মানসিকতার দিক দিয়ে আসিফ মহিউদ্দিন অনন্য। আসিফ মহিউদ্দিন বাংলাদেশি অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের আদর্শ না হলেও, তিনি যখন আক্রান্ত হয়েছিলেন তখন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ভেতরে প্রতিবাদের এরকম বিপ্লব দেখা যায় নি। অথচ, তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ফিরলেন। সাধারণ মানুষের কাছে প্রত্যাশা করছি না; অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট বলে যারা নিজেদের মনে করেন, তারা কি তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন? তারা কি আক্রমণকারী বিষধর প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে এরকম অবস্থান নিয়েছিলেন? নেন নি।

BOAN নামক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের সংগঠনের ব্যানারে তারা যখন প্রথম শাহবাগে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা শুরু করলেন, তখন আসিফ মহিউদ্দিন গিয়ে একাত্মতা জানিয়েছিলেন। তিনি আক্রান্ত হবার পর তারা এরকম আন্দোলন করেন নি বলে, আসিফ মহিউদ্দিন কিন্তু রাগ করে নাও আসতে পারতেন। এক্ষেত্রে তিনি মহত্বের পরিচয় দিয়েছেন। অথচ, আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে আসিফ মহিউদ্দিনের সাক্ষাৎকার টেলিভিশনওয়ালারা নিয়েছে বলে তারা কুৎসা রটাতে শুরু করলেন। আমি নিজে আড়ালে থেকে রাতদিন খেটে অনালাইনের মাধ্যমে শাহবাগের এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিচ্ছি। আমি নিজেও এধরনের ম্যাসেজ বহু আইডি থেকে পেয়েছি। আমি যে পেজে এই আন্দোলন চালাচ্ছি সেখানে এরকম কুৎসা রটানো ম্যাসেজ পোস্ট করি নি। যখন একই ধরণের ম্যাসেজ বিভিন্ন আইডি থেকে বার বার আসে, তখন যে সেটা একটা প্রোপাগান্ডা তা অন্তত আমরা বুঝি।

যাইহোক, আসিফ মহিউদ্দিন স্বেচ্ছায় আন্দোলনে আসার পরেও তাকে নিয়ে কুৎসা রটানো কি শুভ চিন্তার মানুষদের কাজ? যেহেতু আসিফ মহিউদ্দিন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট হিশেবে বেশি পরিচিত, সেহেতু তার কাছে টিভির লোকেরা আগে যাবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু শাহবাগের আন্দোলনকারীরা কেন এটা করেছিলেন? কর্তৃত্ব হারানোর আশংকায়?

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নিয়ে কিছু কথা
অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট বলতে যা বুঝায় তা সরল অর্থে, মাঠে-ঘাটে কাজ করা নিশ্চয় বুঝাবে না। যদি অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মানে ইন্টারনেটের কর্মী হিশেবেই বুঝি তাহলে তাকে অনলাইনে থাকাটা বাঞ্ছনীয়। আমি আগেই বলেছি, শাহবাগের এই আন্দোলনকে রাতদিন খেটে নিজে থেকে সহায়তা দিয়ে আসছিলাম। আমি শাহবাগে উপস্থিত থাকতে পারি নি। তাই আমি অনলাইনে পরিশ্রম করে গেছি। শাহবাগের আন্দোলনকারীরা আন্দোলনের ইভেন্ট খুলে শাহবাগে আন্দোলনে এতোটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে, তাদের ইভেন্টে শিবিরের কীটেরা যা খুশি তাই বলে মানুষকে আন্দোলন থেকে বিমুখ করতে তৎপরতা চালাচ্ছিল এবং ইভেন্ট নোংরা করছিলো। সাধারণ মানুষ এই ধরণের তৎপরতা দেখে বারবার ইভেন্টে শিবিরের প্রোপাগান্ডা রুখতে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলো। কিন্তু তারা অনলাইনে থাকেন নি। প্রথম দিকে একেবারেই থাকেন নি। সাধারণ মানুষ শিবিরের প্রোপাগান্ডাকে প্রতিহত করছিলো।

আমি ইভেন্টটা দেখে তাদের সহযোগিতা করার মানসে পেজ করি। পেজ করার একদিন পর আমি তাদের ফোন দেই। আমি তাদের ইভেন্টের এরকম বাজে অবস্থার কথা জানাই। তারা বলে, তারা এখন শাহবাগের আন্দোলনে ব্যস্ত, অনলাইনে সময় দেওয়ার মতো সময় নেই। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের এমন কথা মানায়? নাকি অনলাইনে আন্দোলনকে একটু গরম করে নিয়ে দ্রুত মাঠের কর্তৃত্ব নেওয়াই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য?

আন্দোলনের ভবিষ্যৎ ও বর্তমান রূপরেখা
রাজাকারদের ফাঁসির দাবীতে শাহবাগের এই আন্দোলনে আরও কিছু বিষয় নতুন যুক্ত হয়েছে। যেমন, জামাতের রাজনীতি বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, জামাত ও রাজাকারদের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা ইত্যাদি।

ধরে নিন, তারা আন্দোলন করে রাজাকারদের ফাঁসির দাবী আদায় করে সফল হল এবং আন্দোলন বন্ধ করে দিলো; সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেলো কী? মনে হয় না। আন্দোলন করে রাজাকারদের ফাঁসি দিয়ে তাদের সাফ করলেও, রাজাকাররা যতদিন বেঁচে ছিলো ততোদিনে হাজার হাজার নব্য রাজাকার তৈরি করে গেছে। নব্য রাজাকাররা আজ না জাগলেও কাল জাগবে। কাল না জাগলেও পরশু জাগবে। জেগে উঠে আবার দেশটা বিষাক্ত করবে। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের জনজোয়ারের এই আন্দোলন রাজাকারদের ফাঁসি দেওয়ার মধ্যেই কি সীমাবদ্ধ? যদি তাই হয়, তাহলে রাজাকারদের ফাঁসি দিতে বাংলাদেশে এতো মানুষকে নিয়ে আন্দোলন করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। জামাতিরা শিবিরের ছেলেমেয়েদেরকে যেভাবে মগজ ধোলাই করে তাদেরকে অমানবিক বানিয়েছে, তাদের মানবিক বানানোর জন্যে পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে এই বিষ বাঙলাদেশ থেকে সমুলে তোলা অসম্ভব। যদি সামনে সুন্দর সমাজ উপহার দিতে পারেন, তাহলে স্পষ্ট করে সে ঘোষণা দিয়ে আমাদের ব্যবহার করুন। আমরা সবাই এই ঘুণেধরা সময় থেকে মুক্তির জন্যে আকুল হয়ে আছি। আমাদের নিরাপদ আগামী চাই। সমৃদ্ধ বাঙলাদেশ চাই।

যেহেতু আপনারা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, সেহেতু কোথাও আপডেট তথ্য না থাকলেও অনলাইনে আপনাদের আন্দোলনের আপডেট তথ্য থাকা উচিত, এটা প্রত্যাশিত। অথচ, আপনারা অনলাইনে শিবিরের হাতে হেনস্তা হয়েছেন এবং এখনো হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ বা আমার মতো অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আপনাদেরকে শিবিরের গুঁতা থেকে রক্ষা করতে প্রাণ দিয়ে কাজ করেছি; জনগণকে এই আন্দোলনে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে কাজ করেছি। আপনাদের পক্ষে যারা কাজ করছে, তাদের কাজ নজরে আসলেও ধন্যবাদ দেবার মানসিকতা করেছেন কী? অনেক আশা নিয়ে সারাদেশের মানুষ আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আপনাদের দেখে দেখে জনগণ রাজাকারদের ফাঁসির দাবীতে আন্দোলন করছে। আপনারা কি যোগাযোগ করে তাদেরকে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন? ধন্যবাদ জানিয়েছেন? কি করতে হবে আর কি করতে হবে না, তা বলেছেন? কোথাও প্রচার করেছেন? অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট হিশেবে অনলাইনে সব আপডেট তথ্য দিয়েছেন? দেন নি। কিন্তু, কোন টিভি চ্যানেল আপনাদের কখন দেখাবে সেই খবর অনলাইনে ফলাও করার লোভ সামলাতে পারেন নি। আপনারা কি তাহলে নিজেদের জন্যে আন্দোলন করছেন? আপনাদের চেতনাও কি ঘুণে ধরা? যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক ক্ষোভ। এটা দেখেই কি আপনারা আন্দোলনের এই সহজ পথ অনুসরণ করেছেন? জনমানুষের জন্যে করলে, আপনাদের মধ্যে এতো গলদ কেন? নাকি আন্দোলনের ডাক দিয়ে ল্যাজেগোবরে করে ফেলেছেন?

যে বুদ্ধিজীবীরা “জয় বাঙলা” বলার পর, “জয় বঙ্গবন্ধু” বলে সাধারণ মানুষের এই আন্দোলনে দলীয় গন্ধ ঢুকিয়ে দিতে পারে এমন আশংকা থাকা সত্ত্বেও; তাদের আপনারা মাইক দিলেন কেন?

(এই লেখাটি কারো পক্ষের না। সাদা চোখে যা দেখা যাচ্ছে তা-ই তুলে ধরলাম। আন্দোলন হলে, জনতার আন্দোলন হোক তা এখনো চাই। জামাত-শিবিরমুক্ত বাঙলাদেশ হোক। রাজাকার নিপাত যাক।)

জয় হোক জনতার!
জয় হোক শুদ্ধ চেতনার!

(লেখাটি ‘শাহবাগ মোড় : বাংলাদেশের হৃদয়‘ পেইজ থেকে শেয়ার করা হল আলোচনার স্বার্থে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “শাহবাগের আন্দোলনের ভবিষ্যৎ ও বর্তমান রূপরেখা নিয়ে কিছু সোজা কথা

  1. বাহঃ! শাহবাগ আন্দোলন নিয়েও
    বাহঃ! শাহবাগ আন্দোলন নিয়েও আসিফ মহিউদ্দিনের ব্র্যান্ডিং চলছে। আর এই নোংরা ব্র্যান্ডিং কাজে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম’কে ব্যবহার করা হচ্ছে! আশ্চর্য্য! আন্দোলনের ক্ষতি করে এই সব নোংরামীর মানে কি? যদি কোন কারণে এসব নোংরামীর জন্য আন্দোলনের ক্ষতি হয়, আমরা কেউ ক্ষমা করব না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 5 =