মোল্লার মৃত্যুদন্ড জটিলতাঃ সমাধানের যৌক্তিক উপায় – ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ

কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ড হলো এই মূহুর্তে বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের দাবি। আপীল আইনের সীমাবদ্ধতার কারনে বিজ্ঞ প্রসিকিউশনের পক্ষে কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ডের শাস্তি নিশ্চিত করা খুবই দূরুহ হয়ে পড়েছে। তাই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে বিজ্ঞ প্রসিকিউশনের পক্ষে আপিল করবার বিধানটি সংশোধন করবার। বর্তমান মামলাটির আপীলে সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সম্পূর্ন ন্যায় বিচারের দাবি করবেন বলেও বিজ্ঞ প্রসিকিউশন ইচ্ছা পোষন করেছেন। ন্যায় বিচারের দাবি অথবা আপীলের বিধানের সংশোধনী যা-ই এই মূহুর্তে বিজ্ঞ প্রসিকিউশন এবং সরকার চিন্তা-ভাবনা করছেন, তার উদ্দেশ্য হলো কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ডের সাজা নিশ্চিত করা। আজকের সারা বাংলাদেশে সর্বসাধারনের দাবিও কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ড। আমিও এই দাবির সাথে সহমত পোষন করি। তবে জনগনের দাবির সাথে বিজ্ঞ প্রসিকিউশনকেও আইনী লড়াইয়ে জিততে হবে। এই সাধারন ব্যাপারটি যদি আমরা উপেক্ষা করি, তাহলে আজকের জনগনের আন্দোলনটি অগ্রহনযোগ্য পরিনতির দিকে এগোবে।

কাদের মোল্লার মামলাটিতে যদি বিজ্ঞ প্রসিকিউশনের কোন কৌশলগত দুর্বলতা, অদক্ষতা বা ব্যর্থতা থেকে থাকে, সেটি আপীলের ক্ষেত্রে খুব বেশি পরিবর্তিত রায় না-ও দিতে পারে। বিজ্ঞ প্রসিকিউশনের কৌশলগত অদক্ষতার মূল কারনটি হলো, কাদের মোল্লার অপরাধের দায়বদ্ধতা শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি হিসেবে আনা হয়েছে (Individual Criminal Responsibility)। এটি আনা হয়েছে ১৯৭৩ সালের আইনের ৪(১) ধারা অনুযায়ী (সংক্ষিপ্ত রায়ের ৯০, ১০৫ এবং ১০৬ অনুচ্ছেদ সমূহ দ্রষ্টব্য)।

আমার মতে কাদের মোল্লার অপরাধের দায়বদ্ধতা নিরুপনের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি বিজ্ঞ প্রসিকিউশনের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে তা হলো- কাদের মোল্লার নেতা হিসেবে অপরাধের দায়বদ্ধতা (Superior Responsibility)। কাদের মোল্লা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদুল্লাহ হল ইউনিটের ‘ইসলামী ছাত্র সংঘের’ তৎকালীন সভাপতি (সংক্ষিপ্ত রায়ের অনুচ্ছেদ ১২ দ্রষ্টব্য)। সুতরাং কাদের মোল্লা ছিল ‘ইসলামী ছাত্র সংঘের’ একটি ইউনিটের নেতা, যার অধীনে বা নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে ‘ইসলামী ছাত্র সংঘের’ নীতি এবং কর্মসূচী বাস্তবায়িত হত। কাদের মোল্লার ইউনিটের অধীনস্তরা কাদের মোল্লার নির্দেশ মানতে বাধ্য ছিল, কেননা একটি অর্গানাইজড বা সংগঠিত সংঘের সদস্য বা অধীনস্তরা তাদের নেতার নির্দেশ, উপদেশ বা অবস্থানকে সমর্থন করবে এটাই তো স্বাভাবিক।

‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’ যদি ১৯৭১ সালে আল বদর বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় (সংক্ষিপ্ত রায়ের অনুচ্ছেদ ৮ দ্রষ্টব্য), তাহলে এই সিদ্ধান্ত-নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্বে কাদের মোল্লা অবশ্যই অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছে। এটি আর প্রমানের অপেক্ষা রাখে না যে, কাদের মোল্লা তার ইউনিটের সভাপতি হিসেবে ইউনিটের অধীনস্তদের সংগঠিত করেছে আল বদর পরিকল্পনা এবং কর্মসূচী বাস্তবায়নে। অতএব, ১৯৭৩ সালের আইনের ৪(২) ধারা অনুযায়ী কাদের মোল্লার অপরাধের দায়বদ্ধতা শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি হিসেবেই নয়, বরং একটি সংগঠিত বা অর্গানাইজড ইউনিটের নেতা হিসেবেও (Superior Responsibility) আনা উচিত ছিল। সংঘটিত অপরাধসমূহের দায়বদ্ধতা যদি একজন ব্যক্তি হিসেবে কাদের মোল্লার কম হয়েও থাকে, একজন ইউনিট প্রধান হিসেবে তার অপরাধের দায়বদ্ধতা ছিল অনেক অনেক বেশী। তবে বিজ্ঞ প্রসিকিউশন কাদের মোল্লার অপরাধের দায়বদ্ধতা শুধুমাত্র ১৯৭৩ সালের আইনের ৪(১) ধারা অনুযায়ী এনেছে। বিজ্ঞ প্রসিকিউশন ৪(২) ধারা অনুযায়ী কাদের মোল্লার উপর অপরাধের দায়বদ্ধতা অর্পনে ব্যর্থ হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, অপরাধের দায়বদ্ধতা ১৯৭৩ সালের আইনে ৪(১) এবং ৪(২) ধারা অনুযায়ী যুগপৎ আনা সম্ভব; এক্ষেত্রে আইনী কোন নিষেধাজ্ঞা নাই। অতএব, বিজ্ঞ প্রসিকিউশনের কৌশলগত দূর্বলতা আপীলের ক্ষেত্রে কাংখিত মৃত্যুদন্ডের সাজা না-ও নিশ্চিত করতে পারে।

এটা ঠিক যে, সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের ‘সম্পূর্ন ন্যায় বিচার’-এর স্বার্থে যে কোন রায় দেবার ক্ষমতা রয়েছে। তবে এই ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘সম্পূর্ন ন্যায় বিচার’ বলতে কি বুঝাবে, সেই ব্যাপারে কোন সংজ্ঞায়ন বা নির্দেশনা আইনের কোথাও দেয়া হয়নি। ‘সম্পূর্ন ন্যায়বিচার’ সঠিক ন্যায়বিচার না-ও হতে পারে [নাজিরউদ্দিন বনাম হামিদা বানু (১৯৯৩) ৪৫ ডি.এল.আর. (এ.ডি.) ৩৮, ৪৪]। এখানে আরো একটি প্রশ্ন রয়েছে, ন্যায় বিচারের স্বার্থে আপীল বিভাগ কি আইনের সাথে অসঙ্গতিমূলক কোন রায় দিতে পারে? ইতিপূর্বে আপীল বিভাগের রায়ে প্রতীয়মান হয় যে, সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের অধীনে সম্পূর্ন ন্যায় বিচারের ক্ষমতা ব্যবহার কখনো আইনের প্রকাশ্য বা লিখিত বিধানের সাথে অসঙ্গতিমূলক হলে চলবে না [এইচ এম এরশাদ বনাম রাষ্ট্র (২০০১) ৬ বি.এল.সি. (এ.ডি.) ৩০]। আবার একই সাথে মনে রাখতে হবে, ‘সম্পূর্ন ন্যায় বিচার’ মামলারত যে কোন একটি পক্ষের জন্য প্রযোজ্য হয় না। ‘সম্পূর্ন ন্যায় বিচার’ করতে গিয়ে আদালত দুই পক্ষের অধিকারের একটি ভারসাম্য রক্ষা করবেন এটাই স্বাভাবিক। আর তাই কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ড সঠিক বিচার বলে মনে হলেও আপিল বিভাগ ‘সম্পূর্ন ন্যায় বিচারের’ দাবিতে সঠিক বিচারটি না-ও করতে পারেন।

আইন পরিবর্তন করে যদি বিজ্ঞ প্রসিকিউশন এবং আসামী পক্ষের আপিল করবার অধিকারের ক্ষেত্রে সমতা আনা হয়, সেটা নিঃসন্দেহে মামলারত দুই পক্ষকে আইনের সমান সুযোগ লাভে সক্ষম করবে। ফলে, সাজা বাড়ানোর দাবিতে বিজ্ঞ প্রসিকিউশনও আপিল দায়ের করবার সুযোগ পাবে। সরকার বর্তমানে এই ধরনের একটি আইন প্রণয়নের চিন্তা-ভাবনা করছেন, যাতে ভবিষ্যতে ট্রাইবুনালের কোন রায়ে দন্ডের বা সাজার পরিমাণ কম মনে হলে প্রসিকিউশন যেন সাজা বৃদ্ধি করার জন্য আপিল করতে পারে। তবে, যেহেতু ট্রাইবুনাল ইতিমধ্যে কাদের মোল্লার রায় ঘোষনা করেছে, সেক্ষেত্রে নতুন আইনটিকে কাদের মোল্লার রায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করতে হলে, আইনটির ভুতাপেক্ষ (Retrospective) প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে এমন একটি আইন পার্লামেন্ট বা প্রেসিডেন্টের পক্ষে প্রণয়ন করা সম্ভব হলেও তা রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিবে বৈ-কি। আর তাছাড়া যদি কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রসিকিউশনের কোন কৌশলগত বা অদক্ষতা থেকেই যায়, সেক্ষেত্রে নতুন আইনের অধীনে কাদের মোল্লার মামলার বিজ্ঞ প্রসিকিউশন আপীল করবার সুযোগ লাভ করলেও কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ডের সাজা নিশ্চিত করার বিষয়টি সুদুর পরাহত থেকেই যাবে।

এই পরিপেক্ষিতে বিজ্ঞ প্রসিকিউশন কি করে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে একটি মৃত্যুদন্ডের রায় নিশ্চিত করতে পারেন? এই মূহুর্তে প্রসিকিউশনের উচিত শুধুমাত্র আপিলের রায় অথবা আইন সংশোধনের অপেক্ষায় না থেকে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে নতুন চার্জ এনে আরো এক বা একাধিক মামলা দায়ের করা। কাদের মোল্লা ১৯৭১ সালে ‘কসাই মোল্লা’ নামে পরিচিত ছিল। তার কৃত অপরাধের সংখ্যা অগনিত। বর্তমান মামলাটিতে বিজ্ঞ প্রসিকিউশন কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে শুধু মাত্র ৬টি চার্জ এনেছে। এত কম চার্জ আনার পেছনে সম্ভাব্য কারণগুলো ছিল – তদন্তের অপ্রতুলতা; ভয়ভীতির কারণে ভিকটিম, প্রত্যক্ষদর্শী অথবা সাক্ষীদের অসহযোগিতা; তদন্ত এবং প্রসিকিউশন টিমের মাঝে সমন্বয়হীনতা; আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন সম্পর্কে প্রসিকিউশন টিমের জ্ঞানের অগভীরতা ইত্যাদি।
এই মূহুর্তে দেশে যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদন্ডের দাবিতে একটি গণজোয়ার চলছে। রাজনৈতিকমন্ডলেও লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। এমন একটি অনুকূল পরিবেশে ভিকটিম, প্রত্যক্ষদর্শী বা সাক্ষীরা নির্ভয়ে এবং স্বতঃস্ফুর্তভাবে এগিয়ে আসবে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত এবং সাক্ষ্যপ্রমান প্রদানের জন্য। তদন্ত এবং বিজ্ঞ প্রসিকিউশনের এই মূহুর্তে উচিত অনতিবিলম্বে সঠিক কৌশল নির্ধারনের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত তদন্ত ও বিশ্লেষন করে ট্রাইবুনালে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এক বা একাধিক ফরমাল চার্জ দাখিল করা। এক্ষেত্রে অবশ্যই তদন্ত টিম এবং প্রসিকিউশনকে তাঁদের ফৌজদারী এবং প্রথাগত অনুশীলনীয় সংস্কৃতির পরিসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন এবং সংশ্লিষ্ট মামলার রায়ের আলোকে আমাদের ট্রাইবুনালের মামলাগুলোকে পরিচালনা করতে হবে।

যুগে যুগে সত্যের জয় অনিবার্য। সত্য তার আপন রূপে প্রতিভাত হতে বাধ্য; কিন্তু কখনো কখনো সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করতে হয়। কাদের মোল্লা তার কৃত অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড পাবারই যোগ্য। কিন্তু আজ কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ডের শাস্তি নিশ্চিত করবার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত আইনী লড়াইয়ের। আমরা আশা রাখি, তদন্ত এবং বিজ্ঞ প্রসিকিউশন টিম আজকে জাতীর সামগ্রিক দাবি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের সকলের হয়ে এই আইনী লড়াইটি লড়বেন। আমাদের আবেগ, অশ্রু, হাহাকার, ক্ষোভ আর বিদ্রোহের প্রতিফলন যেন দেখি তাঁদের পেশাগত অঙ্গিকার এবং কর্মকান্ডে।

– ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ
আইন বিষয়ক সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “মোল্লার মৃত্যুদন্ড জটিলতাঃ সমাধানের যৌক্তিক উপায় – ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ

  1. আইনি ব্যাপার আমরা সাধারন জনগন
    আইনি ব্যাপার আমরা সাধারন জনগন কম বুঝি। আন্দোলন চলছে কাদের মোল্লার ফাঁসির জন্য। সেটা যেভাবে সম্ভব আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই করতে হবে। ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের প্রতি কৃতজ্ঞতা আইনি দিকনির্দেশনা মূলক এই লেখাটির জন্য। আশা করছি আইনি প্রক্রিয়ায় কসাই কাদেরের ফাঁসি আমরা দেখতে পাবো। একটা রাজাকারকেও আমরা ছাড় দেবো না।

    সমসাময়িক গুরুত্ব বিবেচনায় পোস্টটি স্টিকি করা যেতে পারে।

  2. এতো বড় কসাইয়ের বিরুদ্ধে মাত্র
    এতো বড় কসাইয়ের বিরুদ্ধে মাত্র ৬টি অভিযোগ? আরগুলি গেল কোথায়? সে ১৯৭১ সালে ‘কসাই মোল্লা’ নামে পরিচিত ছিল। তার কৃত অপরাধের সংখ্যা অগণিত।

    Better late than never. সুতরাং বিজ্ঞ প্রসিকিউশন এবং তদন্ত টিম আইন সংশোধনের অপেক্ষায় না থেকে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে নতুন চার্জ এনে আরও এক বা একাধিক মামলা দায়ের করুন।
    নতুন মামলাও চলবে এবং পাশাপাশি সংশোধিত নতুন আইনে আপীলের শুনানীও চলবে।

    নতুন আইন পাশ হোক, অসুবিধা কোথায়? নতুন আইনে তো শুধু আপীলের সমঅধিকার নিশ্চিত করবে। সরকার পক্ষ আপিলের সুযোগ পাবে। রায় কি হবে সেটা কেউই জানে না। মৃত্যুদন্ডও হতে পারে, আবার যাবজ্জীবনও থাকতে পারে। আর বিবাদি যেহেতু আপিল করবে, তাই সাজার মেয়াদ কমতেও পারে। অর্থাৎ সব কিছুই অনিশ্চিত। সুতরাং শুধু আপীলের উপর ভরসা করা কেন? পাশাপাশি মোল্লার বীরুধে নতুন কেস করে সেটাও চালাতে হবে। আপীলের শুনানীও চলবে, আবার নতুন মামলাও চলবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 2 =