স্লোগানকন্যাদের কণ্ঠের কাছে হার মানছে আগ্নেয়গিরি

ওদের কণ্ঠে ঝরছে দ্রোহ আর প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ। জাদুকরি স্লোগানে উজ্জীবিত লাখো জনতা। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবাই তাদের কণ্ঠের জাদুতে বিমোহিত। ক্লান্তিহীন ঝাঁঝালো কণ্ঠের তেজোদীপ্ত হুঙ্কার ছড়িয়ে পড়ছে পদ্মা-মেঘনা-যমুনায়। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। রূপসা থেকে পাটুরিয়া। শাহবাগের স্লোগানকন্যাদের কণ্ঠের উত্তাপে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিও যেন হার মানছে। গতকাল সন্ধ্যার স্লোগান দিতে গিয়ে দুইবার অসুস্থ হয়ে পার্শ্ববর্তী বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসা নেন অগ্নিকণ্ঠি লাকী আক্তার। তবে অসুস্থতা তাকে আটকাতে পারেনি। রাতেই গণজাগরণ মঞ্চে ফিরে এসে স্লোগান ধরে লাকী বলেন, ‘আন্দোলন চলবে। আমি সুস্থ আছি।’

ওদের কণ্ঠে ঝরছে দ্রোহ আর প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ। জাদুকরি স্লোগানে উজ্জীবিত লাখো জনতা। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবাই তাদের কণ্ঠের জাদুতে বিমোহিত। ক্লান্তিহীন ঝাঁঝালো কণ্ঠের তেজোদীপ্ত হুঙ্কার ছড়িয়ে পড়ছে পদ্মা-মেঘনা-যমুনায়। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। রূপসা থেকে পাটুরিয়া। শাহবাগের স্লোগানকন্যাদের কণ্ঠের উত্তাপে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিও যেন হার মানছে। গতকাল সন্ধ্যার স্লোগান দিতে গিয়ে দুইবার অসুস্থ হয়ে পার্শ্ববর্তী বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসা নেন অগ্নিকণ্ঠি লাকী আক্তার। তবে অসুস্থতা তাকে আটকাতে পারেনি। রাতেই গণজাগরণ মঞ্চে ফিরে এসে স্লোগান ধরে লাকী বলেন, ‘আন্দোলন চলবে। আমি সুস্থ আছি।’
লাকি
অনেক আগে থেকেই পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখ লাকী। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন আন্দোলনে সোচ্চার হয় তার বলিষ্ঠ কণ্ঠ। এবার লাকীর কণ্ঠের স্লোগান জগন্নাথের ছোট্ট ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে গেছে। তার কণ্ঠ শুনছে গোটা দেশ। গণমাধ্যমের কল্যাণে তার কণ্ঠের তেজোদীপ্ত ঝাঁঝ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশে এবং দেশের বাইরেও। লাকীর আদর্শ তার মুক্তিযোদ্ধা বাবা।
লাকী জানান, আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা শাহবাগে যোগ দেন। এর সঙ্গে তারও জড়িয়ে পড়া। সেই থেকেই রাত-দিন স্লোগান দিয়ে যাচ্ছেন। মাঝে কয়েক ঘণ্টার জন্য বিশ্রাম নিয়ে আবার জাগরণের মঞ্চে আসেন তিনি। কখনও রাজাকারবিরোধী নতুন সব স্লোগান, আবার কখনও ‘৭১-এর সেই জাগরণের স্লোগান। জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিভিন্ন স্লোগান থাকলেও এবার ‘জামাতে ইসলাম/মেইড ইন পাকিস্তান’ স্লোগানটি নতুন করে দেন তিনি। এ ছাড়া প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নাটকে টিয়া পাখির কণ্ঠে ‘তুই রাজাকার’ শব্দটি এবার লাখো জনতার কণ্ঠে তুলে দিয়েছেন লাকী। মঞ্চ থেকে তিনি স্লোগান ধরেন ‘স’-তে সাঈদী, পুরো শাহবাগ ছড়িয়ে যায়_ তুই রাজাকার/তুই রাজাকার। এরপর সব যুদ্ধাপরাধীর নামের আদ্যাক্ষর ধরে ধরে স্লোগান ধরেন তিনি। আর জনসমুদ্রে জোয়ার ওঠে_ ‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’।
নিজের দেওয়া স্লোগান সম্পর্কে লাকী জানান, ২০০৯ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেদখল হলগুলো উদ্ধারে প্রথম স্লোগান ধরেন তিনি। এরপর নিজস্ব আয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার আইন বাতিল (২৭-এর ৪ ধারা) এবং বিশাল অঙ্কের উন্নয়ন ফি বাতিলের দাবিসহ নানা দাবিতেই স্লোগান ধরতে হয় তাকে। তবে শাহবাগের স্লোগানকে অন্য কোনো আন্দোলনের স্লোগানের সঙ্গেই তুলনা করতে চান না তিনি। তার কথায়, এ স্লোগান অস্তিত্বের স্লোগান। পাপমোচনের স্লোগান। ফলে রাত-দিন টানা স্লোগান দিয়ে গেলেও ক্লান্ত হন না তিনি।
ছয় দিন ধরে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর স্লোগানে মাতিয়ে রেখেছেন অন্তত ১০ নারী। তারা কেউ একাত্তরের যুদ্ধ দেখেননি। তবে সবাই ‘নতুন একাত্তরের’ যোদ্ধা। গতকাল শাহবাগে অগি্নগর্ভ প্রজন্ম চত্বরে কথা হয় তেজোদীপ্ত কণ্ঠের সেই নারীদের সঙ্গে।
উম্মে হাবিবা বেনজীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। রাজনৈতিক পরিচয়, ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দফতর সম্পাদক। আন্দোলনের শুরুর দিন থেকে শাহবাগে স্লোগানে জনতাকে মাতিয়ে রাখছেন এই মেধাবী ছাত্রী।
হাবিবা
হাবিবা জানান, পরীক্ষা চলছে। তবুও রাজাকারের ফাঁসির দাবি নিয়ে সবার সঙ্গে এক মঞ্চে হাজির হয়েছি। স্লোগানে কোনো ক্লান্তি নেই। পরীক্ষার ব্যাপারে বন্ধুরা খুব সহায়তা করছে। এখানে স্লোগান দিতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। দাদা হাবিবুল্লাহ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এখন নিজেকেও মুক্তিযুদ্ধের অংশ মনে হচ্ছে। তার মতে, সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে একইভাবে তরুণ প্রজন্মকে জেগে উঠতে হবে।
হাবিবা বলেন, ‘আমার সবকিছুর প্রেরণা আমার বাবা। রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করার আন্দোলনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’
আরেক তেজোদীপ্ত কণ্ঠের তরুণী প্রীতিলতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। ছাত্রফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রচার-প্রকাশনা সম্পাদক প্রীতিলতা বলেন, লাখ লাখ মানুষ আজ এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। স্লোগানের মধ্য দিয়ে সবার সঙ্গে সংহতি জানাতে পারছি, এর চেয়ে বড় পাওয়ার কী আছে। আমার প্রেরণা আমার বাবা। আর মোটা দাগে আমার অনুপ্রেরণা ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামী বীরকন্যা প্রীতিলতা।
তামজিদা তুবা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী।
তুবা
তুবা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সময় স্লোগান দিয়েছেন। তিনি বলেন, আজ সারাদেশের মানুষের প্রাণের দাবিতে স্লোগান দিতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।
সামিয়া রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাস্টার্সের ছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি। সামিয়া জানান, স্লোগানের মধ্য দিয়ে তার ভেতরে জমা রাজাকারবিরোধী ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
আফসানা কলি। আরেক দীপ্ত কণ্ঠের তরুণী। পেশায় আইনজীবী। কলির কণ্ঠের ঝাঁঝালো স্লোগানে অনুপ্রাণিত মানুষ। কলি জানান, শাহবাগ চত্বরে স্লোগান দিতে পেরে নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুখী মানুষ মনে হচ্ছে।
অনিতা বাড়ৈ। ইডেন কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। অনিতা জানান, স্লোগানে তার কোনো ক্লান্তি নেই। স্লোগানে নিজেকে আরও দীপ্ত মনে হয় তার।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “স্লোগানকন্যাদের কণ্ঠের কাছে হার মানছে আগ্নেয়গিরি

  1. এইসব অগ্নিকন্যাদের কণ্ঠের
    এইসব অগ্নিকন্যাদের কণ্ঠের আগুন আজ দেশ ছাপিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এরাই সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে- আমরাও পারি। শাহবাগের এই আন্দোলনের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত একটা হীনমন্যতা কাজ করত- আমাদের প্রজন্ম কি আসলেই ভীরু কাপুরুষের উপমা বয়ে বেড়াবে ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু আজ বুক ফুলিয়ে বলতে পারি- আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষের যোগ্য উত্তরসূরি। স্যালুট অগ্নিকন্যাদের।

    1. লিখে ফেলেন। এ আমাদের এক বিরাট
      লিখে ফেলেন। এ আমাদের এক বিরাট অর্জন। সেই ৭১ আর ৯০ এর আন্দোলনের পর আমাদের আর গর্ব করার মতন কিছু ছিলোনা। এবার সেই অভাব ঘুচল। আমাদের তরুণ প্রজন্ম বুঝিয়ে দিয়েছে এখনও আমরা ফুরিয়ে যাইনি। লিখে ফেলেন দ্রুত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 + = 73