শেষ নিমন্ত্রণ (১ বছর পর) # শেষ পর্ব

কলিংবেলের শব্দ পাওয়া মাত্রই ফয়সাল বুঝতে পারল ডাঃ আতিক এসেছেন। অনেকক্ষণ ধরেই বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টির মাঝে ডাঃ আতিক আসবেন কি না সেই নিয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল। আসলেও ভদ্রলোক। কথা দিয়েছেন তাই চলেও এসেছেন। রান্নাঘরে টুংটাং শব্দ হচ্ছে। নিজেকেই উঠতে হবে দরজা খুলতে।

“আসুন ডাক্তার সাহেব। একদম ভিজে গেলেন দেখছি।“
“না ভিজে উপায় আছে বলুন? বাসা থেকে বের হবার সময় বৃষ্টির কোন চিহ্নই ছিল না। অস্ট্রেলিয়া চলে যাব বলে গাড়িটাও বিক্রি করে দিয়েছি। তাই রিক্সা করেই আসলাম।“

ভেজা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন ডাঃ আতিক।

‘আরে, হাতে করে কি এনেছেন?”
“আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে কয়দিন দেশে আছি সে কয়দিন আর কোন রোগী দেখব না। আপনার স্ত্রীই হবেন আমার দেখা শেষ রোগী। তাই শেষ রোগীর জন্য শুভেচ্ছা উপহার হিসাবে গাঁদা ফুল নিয়ে আসলাম। গোলাপ ফুল কিনবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু পেলাম না। আপনার স্ত্রী গাঁদা ফুল পছন্দ করেন তো?“

ফয়সাল কিছুটা অবাক। গাঁদা ফুল নিসার খুব পছন্দের কিন্তু সেটা তো ডাঃ আতিকের জানার কথা নয়। কাকতালীয় কত কিছুই না ঘটে এই দুনিয়াতে।

“হ্যাঁ, খুব পছন্দ করে। গাঁদা ফুল তাঁর ফেভারিট। কিন্তু ফুলগুলো প্লাস্টিক মুড়িয়ে আনলেন কেন?”
“চাই নি বৃষ্টির পানিতে ফুলগুলো ভিজে যাক। গোলাপ ফুলে বৃষ্টির পানি পড়লে দেখতে ভালো লাগে, কিন্তু গাঁদা ফুলে লাগে না। বুঝেন না, শীতকালীন ফুল তো।“

বাইরে বেশ ঠাণ্ডা থাকলেও ঘরের ভিতরটা আরামদায়ক উষ্ণতায় ছেয়ে আছে। ফয়সালের দেওয়া তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুলগুলো মুছে ডাঃ আতিক সোফায় বসে চারপাশে তাকালেন। রুচির ছাপ স্পষ্ট। ফয়সাল সাহেবের স্ত্রী যে বেশ রুচিবান সেটা বোঝাই যাচ্ছে।

“আপনার স্ত্রীর সমস্যা কি?”
“তেমন সিরিয়াস কিছু মনে হয় না। ইদানিং খুব দুঃস্বপ্ন দেখছে। একটু কথা বলে দেখুন। হয়ত তাঁর মনের অস্থিরতা দূর হবে।“

এমন সময় ভিতর থেকে নিসার ডাক শোনা গেল।

“এই, এদিকে এসো। খাবার রেডি।“
“নিসা, একটু পড়ে খাব। তাঁর আগে তুমি এখানে আস। ডাক্তার সাহেব এর সাথে পরিচিত হয়ে যাও।“
“আসছি।“

রান্নঘরের দিকে পিছন করে বসে ছিলেন ডাঃ আতিক। তাই নিসা যখন রুমে ঢুকল তখন দেখতে পায় নি। পায়ের শব্দে পিছন ফিরে তাকিয়েই তিনি চমকে গেলেন। এই কারণে নয় যে নিসা অসম্ভব সুন্দরী। কারণ নিসার চোখ। এত তীব্র দৃষ্টিতে কেউ যে তাকাতে পারে তা নিসাকে না দেখলে তিনি বুঝতেই পারতেন না।

*****
ফয়সাল কিছুটা অবাক। কিছু একটা যেন মিলছে না। সে একজন পুলিশ। মানুষের আচরণ বিশ্লেষণ করে অপরাধী বের করাই তাঁর কাজ। যেসব ব্যাপার অনেকের চোখ এড়িয়ে যায় সেগুলো বিশ্লেষণ করে সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ডাঃ আতিককে দেখার পর থেকে নিসার আচরণ কেমন জানি হয়ে গেছে। এমন জড় পদার্থের মত আচরণ নিসা কখনোই করে নি। ডাঃ আতিকের প্রতি তাঁর দৃষ্টিটাও কেমন জানি অস্বাভাবিক। ফয়সাল নিসাকে জানায় নি যে সে ডাঃ আতিককে নিমন্ত্রণ করেছে তাঁকে দেখানোর জন্য। এটা শুনলে সে কষ্ট পেত। কিন্তু নিসা মনে হয় ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে। একারণেই কি সে এমন করছে? এই মুহূর্তে ডাঃ আতিকের মুখোমুখি বসে সে ডাঃ আতিকের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।

“…ওয়েল। আপনি খুবই দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। এই কারণেই এমন দুঃস্বপ্ন দেখছেন। আপনি যেহেতু প্রেগন্যান্ট তাই অনাগত সন্তানের কথা ভেবে টেনশন করছেন। এবং একই সাথে আশা করছেন কোন এক যোদ্ধা আপনাকে এবং আপনার সন্তানকে রক্ষা করবেন। যোদ্ধার ভুমিকায় এখানে আপনার স্বামীই আছেন। তিনি থাকতে আপনার টেনশন করার কোন প্রয়োজন নেই। ঠিকমত ঘুমাবেন। একটা ওষুধ লিখে দিচ্ছি। সেটা খাবেন, তাহলেই হবে।“

নিসার মুখ থেকে বিরক্তির ভাবটা যায় নি এখনও। খুব কম কথা বলেছে পুরোটা সময়। কেন জানি ডাঃ আতিককে সে পছন্দ করছে না।

“নিসা, আমাদেরকে খাবার দাও। ডাক্তার সাহেবের অনেক ক্ষুধা পেয়েছে বোঝা যাচ্ছে।“

*****
“আপনার স্ত্রী তো চমৎকার রান্না করেন। স্পেশালি মুরগীর মাংসটা তো জোস।“

খাওয়ার পর আড্ডা দিচ্ছে ফয়সাল আর ডাঃ আতিক। দুইজনের হাতেই সিগারেট।

“হ্যাঁ, নিসার রান্নার হাত খুব ভাল। মুরগীর মাংসও সে অর্ডার দিয়ে আনায়। এই উত্তরাতেই একটা পোলট্রি ফার্ম আছে। “নন্দিনী পোলট্রি ফার্ম” না কি যেন নাম। ওইখানে অর্ডার দেওয়া আছে। প্রতি সপ্তাহেই সেখান থেকে মুরগী চলে আসে। ব্যাচেলর লাইফে খাওয়ার ব্যাপারে খুব কষ্ট হত। বিয়ের কিছু সুবিধাও আছে সেটা আসলে বিয়ের পরই বুঝতে পেরেছি।“
“অসুবিধাও আছে। কেন ঐ কথাটা শোনেননি? একটি বিয়ে সারা জীবনের কান্না। কোন কোন বিয়ে কিন্তু জীবনকেও শেষ করে দিতে পারে।“
“সেটাও ঠিক, কিন্তু নিসা আর আমার ক্ষেত্রে অন্তত সেটা যে হবে না তা জোর দিয়েই বলতে পারি। We love each other very much.”
“ফুলগুলো আপনার স্ত্রীর জন্য এনেছিলাম, এখনও তো দিলেন না। এইগুলো কিন্তু দেশি গাঁদা না। কোরিয়ান গাঁদা ফুল। ফুলের ঘ্রাণটাও ভিন্ন। টেস্ট করে দেখতে পারেন। ঘ্রাণটা যেন চলে না যায় সে কারণেই তো প্লাস্টিক মুড়িয়ে আনলাম।“

ফয়সাল ফুলগুলো হাতে নিল। আসলেও একটু অন্যরকম এই গাঁদা ফুলগুলো। প্লাস্টিক ছিঁড়ে নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রান নিল ফয়সাল। মিষ্টি একটা সুবাস যেন তাঁর পুরো অস্তিত্বকে নাড়িয়ে মগজে গিয়ে আঘাত হানল এবং এর পরেই ফয়সালের আর কিছুই মনে নেই।

*****
অনেক কষ্টে চোখ মেলল ফয়সাল। মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। অচেনা এক শূন্যতার অনুভুতি সমস্ত অস্তিত্বকে গ্রাস করে রেখেছে। মাথা নাড়ানো যাচ্ছে না কিন্তু মগজ কাজ করছে পুরোপুরিই। প্রথমদিকে সবকিছু ঝাপসা লাগছিল। এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, কিন্তু চোখ খুলে যে জিনিস তাঁর চোখে পড়ল সেটা দেখার চাইতে আর কোনোদিন চোখ না খুললেই মনে হয় ভাল হত। নিসা এবং ডাঃ আতিক একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মত চুমু খাচ্ছে। ফয়সাল উঠতে চেষ্টা করল কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করল সে নড়তে পারছে না। চিৎকার করতে চেষ্টা করল কিন্তু মুখ দিয়ে কোন শব্দও বের হল না। হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই তাঁর করবার নেই।

এতক্ষণে ডাঃ আতিককে দেখা গেল তাঁর দিকে ফিরতে। মুখে মৃদু হাসি। শিশুর মত সরল হাসিতে উদ্ভাসিত নিসার মুখ। দুইজন মিলে ফয়সালের দিকে এগিয়ে এল। ফয়সালের মুখোমুখি সোফায় গা এলিয়ে বসলেন ডাঃ আতিক আর তাঁর কাঁধে মাথা দিয়ে জড়িয়ে ধরে বসল নিসা।

“সরি মিঃ ফয়সাল। আপনাকে কোন সাহায্য এই মুহূর্তে করতে পারছি না। আমি জানি আপনার মনে অনেক প্রশ্ন খেলা করছে। সেগুলোর উত্তর দেওয়া আমার দায়িত্তের মাঝেই পড়ে। এখনই আপনি তা জানতে পারবেন। এক এক করে বলি।

আপনার সম্পূর্ণ সেন্স এখন আছে। আপনি সবকিছু দেখতে, শুনতে এবং বুঝতেও পারবেন কিন্তু নড়তে পারবেন না। কথাও বলতে পারবেন না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলে Conscious Sedation. এর কারণ আপনাকে একটা ড্রাগ দেওয়া হয়েছে। ড্রাগটার নাম Sevuflorane. ইথার জাতীয় এই ড্রাগটা গাঁদা ফুলের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর সাথে Nitrous Oxide এবং Oxygen এর মিক্সচার ব্যবহার করা হয়েছে কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য। যেই মাত্রায় আপনার উপর ড্রাগটা প্রয়োগ করেছি তাঁর থেকে মাত্রা আরেকটু বাড়ালে আপনার আর ঘুম ভাঙত না। কিন্তু আমার মনে হয়েছে আপনার জানা দরকার সবকিছু। মরবার আগে তাহলে কিছুটা হলেও তো সান্ত্বনা পাবেন।

আমি ডাঃ আতিক নই। আমার কাঁধে মাথা রেখে বসে থাকা যেই মানুষটিকে আপনি এতদিন আপনার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী নিসা ভেবে এসেছেন, সেটাও ভুল। আমি শামস; আর ও আমার স্ত্রী নন্দিনী। আমরাই সেই খুনি দম্পতি যাকে আপনি সাইকিয়াট্রিস্টদের হত্যার অপরাধে হন্যে হয়ে খুঁজছেন। আপনি হয়ত ভাবতে পারেন কেন আমাদের সাইকিয়াট্রিস্টদের উপর এত ক্ষোভ। এর কারণ এমন একজন সাইকিয়াট্রিস্ট এর চিকিৎসার কারণেই আমাদেরকে দীর্ঘদিন পাগলা গারদে থাকতে হয়েছে। আপনাদের ভাষায় আমরা যাকে বলে সাইকো, ঠিক তাই। এবং এই সাইকো হওয়ার কারণেই আমরা জীবনটাকে এত বিচিত্রভাবে উপভোগ করতে পারি। We just love it.

আপনি হয়ত ভাবছেন আমি যদি শামস হই তাহলে ডাঃ আতিক কোথায়? তিনি আছেন। এই মুহূর্তে আপনার পাকস্থলীতে। আপনি গত দুইমাস ধরে যেসব মুরগীর মাংস খাচ্ছেন সেগুলোর খাবারে স্পেশাল একটা আইটেম থাকে আর তা হচ্ছে মানুষের হাড়গোড় এবং অস্থি মাংসের গুড়া। একজন মানুষ খুন করলে তিন মাস মুরগীগুলোর খাবার নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হয় না। ডাঃ আশফাককে খুন করার পরপরই আমরা ডাঃ আতিককে খুন করি। জানতাম পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদেরকে ধরবার জন্য আপনি হন্যে হয়ে উঠেছেন। তাই ডাঃ আশফাককে খুন করবার পর নন্দিনীকে ডাঃ আশফাকের সহকারী নিসা হিসাবে আপনার সাথে ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ করে দেই। বলতেই হবে, সে খুব ভালোভাবেই সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে। ভাগ্যও আমাদের সহায় ছিল। কারণ আপনি নিজেও একা ছিলেন আর নিসার ব্যাপারে কোন খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন নি। ভালোবাসা কি সত্যিই মানুষকে অন্ধ করে দেয়? একজন পুলিশ হয়ে এমন ভুলটা কিভাবে করলেন ফয়সাল?

ডাঃ আতিককে খুন করার পরেই আমরা বুঝতে পারি সাইকিয়াট্রিস্টদের আর টার্গেট করা যাবে না। আর ঐ মুহূর্তে ডাঃ আতিক নিখোঁজ জানলে আপনারা আরও সিরিয়াস হয়ে যেতেন। তাই আমি নিজেই ডাঃ আতিক সেজে বসি। আমার ধারনা ছিল আজ হোক কাল হোক আপনি আমার কাছে আসবেনই। দেখতেই পাচ্ছেন ধারনাটা ভুল ছিল না। এদিক থেকে নিসার দুশ্চিন্তায় আপনিও চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। তাই আমার সাহায্য চাওয়াটাও অস্বাভাবিক ছিল না। মোদ্দাকথা আমাদের প্ল্যানটা কাজে লেগেছে। That’s it.

আপনাকে যে ড্রাগটা দিয়েছি তাতে আরও ৩ ঘণ্টা আপনি এমন অবস্থায়ই থাকবেন। কিন্তু বুঝতেই পারছেন আপনাকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে কথা দিচ্ছি, আপনাকে কোন ধরণের কষ্ট দিয়ে মারা হবে না। আপনাকে গাঁদা ফুলগুলো আবারও শুঁকানো হবে। আপনি মিষ্টি সুবাস নিয়ে ঘুমিয়ে যাবেন। সেই ঘুম আর ভাঙবে না। আর এই কাজটুকু আপনার ভালোবাসার মানুষই করবে।“

ধীর পায়ে কিন্তু নিশ্চিত ভঙ্গিতে ফয়সাল নিসাকে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখল। যেন খুব ভালোভাবেই জানে যে তাঁকে কি করতে হবে। হতে পারে সে নন্দিনী, কিন্তু ফয়সালের কাছে তো সে নিসা’ই। কলাপাতা রঙের শাড়িটা পড়ে আছে সে। এই শাড়িটাই পড়েছিল নিসা যখন ফয়সাল ডাঃ আশফাকের চেম্বারে প্রথম তাঁকে দেখে। কলাপাতা রঙের আগুনে মনে হচ্ছে পুড়ে যাচ্ছে নিসা। ফয়সালের খুব কষ্ট হচ্ছে। এজন্য না যে সে এখুনি মারা যাবে তাই। এ জন্যে যে আর কোনোদিন সে নিসার সাথে বৃষ্টিতে ভিজতে পারবে না; ছাদে উঠে যান্ত্রিক নগরীর জ্যোৎস্না দেখতে পারবে না; একসাথে কোরিয়ান মুভি দেখে সেগুলোর বিশ্লেষণ করতে পারবে না।

নন্দিনী ফয়সালের মুখের উপর ঝুঁকে গভীরভাবে চুমু খেল। একপলকের জন্য ফয়সাল নন্দিনীর চোখে বিষণ্ণতার নাচন দেখে। পরক্ষনেই সব আগের মত হয়ে যায়।

“টুশটুশ। আমি সত্যিই তোমাকে অনেক ভালোবাসি। ভালোবাসি বলেই চাই না তুমি বেঁচে থাক। তুমি বেঁচে থাকলে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারব না। আমার আর শামসের অনেক কাজ পড়ে আছে। সেগুলো করতে তোমার চিন্তা মাথায় ঠাই দেওয়া যাবে না। শামস চেয়েছিল তোমাকে অন্যদের মত করেই যেন খুন করি। কিন্তু আমি সেটা চাই নি। আমি চাই তোমার মৃত্যুটা যেন খুব শান্তিময় হয়। আমাদের অনাগত সন্তানকে নিয়ে তোমার চিন্তা করার দরকার নেই। সে ভালই থাকবে। আমি আর শামস তাঁর খুব ভালো যত্ন নিতে পারব। আসলে শামস কোনোদিন বাবা হতে পারবে না। কিন্তু ওর খুব সন্তানের শখ। কি করব বল। তাই তোমাকে বিয়ে করতে হল। আমার উপর কোন ক্ষোভ রেখো না প্লীজ। তাহলে আমি খুব কষ্ট পাব। আর আমি কষ্ট পাব এটা কি তুমি চাইতে পার?”

নন্দিনী আবারও গভীরভাবে ফয়সালকে চুমু খায়। ফয়সালের মনের আকাশে বিষাদ ভর করে। জীবনটা এমন কেন? যখনই সে মনে করেছে তাঁর জীবন পূর্ণতা পেয়েছে; তক্ষুনি কেন অপূর্ণতার ঢল এসে সমস্ত পূর্ণতাকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিবে? এটাই হয়ত জীবন। পাওয়া না-পাওয়ার মহাকাব্য। ফয়সাল দেখে নন্দিনীর হাতে গাঁদা ফুলের তোড়া। ফুলগুলো ফয়সালের মুখের উপর নেমে আসে। খুব মিষ্টি একটা গন্ধ। ফয়সালের চোখের পাপড়িগুলো ভারী হয়ে উঠে। রাজ্যের ঘুম নেমে আসে চোখে। চারপাশে কেবল শুন্যতা আর অন্ধকার। এটাই কি তবে মৃত্যু? মৃত্যু তো তাহলে খুব খারাপ কিছু নয়।

*****
“মারা গেছে?”
“হুম।“
“তাহলে দেরী করছ কেন? কাজ শুরু করে দাও।“
“এত অস্থির হওয়ার কি আছে? মাংসের সাপ্লাই তো আমাদের পর্যাপ্ত পরিমানেই আছে। আচ্ছা শামস, ফয়সালের লাশটা আমরা মুরগীর খাবার হিসাবে ব্যবহার না করলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে?”
“হ্যাঁ, হবে। লাশ থাকলেই পুলিশ ক্লু বের করে ফেলবে। আর তুমি প্রেগন্যান্ট। এখন তোমার পুষ্টিকর খাবার বেশি করে খাওয়া দরকার।“
“তুমি কিন্তু প্রমিজ করেছিলে এই এসাইনমেন্ট শেষ করতে পারলে আমাকে সুইজারল্যান্ড নিয়ে যাবে। সেটার কি হবে?”
“বলেছি যখন, নিয়ে তো যাবই। তবে আগে ভুটান যাব। বাচ্চা হওয়ার পর সুইজারল্যান্ড। কি খুশি?”
“খুব।“

নন্দিনী হাসতে থকে। শিশুর মত সরল আর প্রাণোচ্ছল সেই হাসি। শামস মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নন্দিনীর দিকে। কি ভালই না সে বাসে নন্দিনীকে। কতদিন পর সে নন্দিনীকে কাছে পেয়েছে। এই মেয়েটার জন্য মরতেও তাঁর বাঁধবে না। মনের অজান্তেই গুণগুণ করে কবিতাটা আবৃত্তি করল শামস –

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
খুব ছোট একটি স্বপ্নের জন্যে
খুব ছোট দুঃখের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো ঘুমের ভেতরে
একটি ছোটো দীর্ঘশ্বাসের জন্যে
একফোঁটা সৌন্দর্যের জন্যে।

শেষ নিমন্ত্রণ (মূল গল্প)

শেষ নিমন্ত্রণ (১ বছর পর) # ১ম পর্ব

শেষ নিমন্ত্রণ (১ বছর পর) # ২য় পর্ব

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৮ thoughts on “শেষ নিমন্ত্রণ (১ বছর পর) # শেষ পর্ব

  1. নিসাই যে নন্দিনী, সেইটা আগেই
    নিসাই যে নন্দিনী, সেইটা আগেই ধারনা করেছিলাম। কিন্তু ডাঃ আতিক সেজে যে শামস আছে, তা দুঃস্বপ্নতেও ভাবিনি!! :খাইছে: :খাইছে: :খাইছে: :খাইছে:
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    1. আপনাকে আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম
      আপনাকে আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম বলেই ধারনা করতে পেরেছিলেন যে নিসাই নন্দিনী। তা না হলে কিছুতেই বুঝতে পারতেন না এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। আর যদি সব আগে থেকেই বুঝতে পারেন তাহলে সাইকো গল্পের সার্থকতা কোথায়? লেখক হিসাবে সেটা তো আমার ব্যর্থতার প্রতিফলনই দেখাবে। গল্প ভাল লেগেছে শুনে ভাল লাগলো। সাইকো গল্প লিখে মজা পেয়ে গেছি। এখন থেকে নিয়মিত সাইকো গল্প লেখার আশা রাখি। :খুশি:

  2. আমার কাছে মনে হয় পৃথিবীতে
    আমার কাছে মনে হয় পৃথিবীতে দুইটা কাজ সবচাইতে কঠিন। একটি হচ্ছে মানুষকে হাসাতে পারা আরেকটি মানুষকে ভয় দেখাতে পারা বা ভড়কে দিতে পারা। আমি ব্যাক্তিগতভাবে সাইকো,থ্রিলার আর হরর মুভির ফ্যান। আমার কালেকশনে ৮০ ভাগ মুভিই এই টাইপ। এছাড়া হাসির ছবিরও ভীষন ফ্যান আমি। ছবি দেখাটা আমার কাছে যতটুকু না শিল্পবোধের জায়গা তার চাইতে বেশি আমার মানসিক প্রশান্তির জায়গা। ক্লাসিক ছবি তাই আমার কম দেখা হয়। বিশেষ বিশেষ মানুষের রিকোমেন্ডেশন পেলেই পরে দেখি।

    এতক্ষন “আমি” “আমি” “আমি” করলাম কারণ তোমার গল্পটা সাইকো নির্ভর। :লইজ্জালাগে:

    ওভার অল আমি ৫ এ ৪ দিবো। একটা কারনে। ফিনিশিংটা একটু লম্বা হয়ে গিয়েছে। আমার এতদিনের সাইকো মুভি,থ্রিলার মুভি/বই পড়ার এক্সপেরিয়েন্স থেকে যা বুঝেছি যে থ্রিলার বা সাইকো গল্পের ফিনিশিং এর টুইস্টা হবে ছোট্ট কিন্তু দর্শক বারবার দেখবে ব্যাপারটা বোঝার জন্য বা রস আস্বাদন করার জন্য। যেমন দেখা না থাকলে হলিউডের সবচাইতে নামকড়া সাইকো থ্রিলার ” স এর সিকুয়েলগুলা দেখতে পারো। পুরা মুভির ম্যাইন টুইস্ট হচ্ছে লাস্ট ১ মিনিট। ১ মিনিটে তোমাকে কই থাইকা কই নিবে তুমি কিছুই বোঝবানা,পুরা তব্দা লাইগা বসে থাকবা। তবে “স” সহ্য করা একটু কঠিন। তাই সহ্য করতে পারলে দেখতে পারো। তোমার ফিনিশিংটা একটু লম্বা হয়ে গিয়েছে ,তাই ১ কম দিলাম,তাইলে পাচতারা পাওয়া এই গল্প ডিজার্ভ করে। বাংলা সাহিত্যে এই জায়গাটা পুরাই ফাঁকা। হুমায়ুন আহমেদ যা একটু চেষ্টা করেছিলেন আর কেউ তেমনভাবে চেষ্টাও করেন নি। চালিয়ে যাও, কে জানে কে কোথায় যায়… 😀 😀 😀

    1. আমি এমেচার লেখক রে ভাই। সাইকো
      আমি এমেচার লেখক রে ভাই। সাইকো মুভি কয়টা দেখেছি জীবনে সেটা আঙ্গুল দিয়ে গুণে বলা যাবে। তবে পছন্দ করি খুব। এই গল্পের আইডিয়া সম্পূর্ণই নিজের। আগে যেহেতু কখনও সাইকো গল্প লিখি নাই সেক্ষেত্রে কিছু কিছু অপূর্ণতা তো থাকবেই। ব্যাপার না। লিখতে লিখতেই ঠিক হয় যাবে। :ভালাপাইছি:

      তবে ঈমানে কইলাম ভাই, রোম্যান্টিক গল্পের চাইতে সাইকো গল্প লিখে বেশি মজা পাইসি। সাইকো গল্পের প্রতি একটু সিরিয়াস হওয়ার চিন্তা করছি। টুইস্ট দিয়া সবার মাথা আওলাইয়া দিমু। :শয়তান:

  3. ………………………..
    :খাইছে: :খাইছে: :খাইছে: :খাইছে: :খাইছে: :খাইছে: :খাইছে: :খাইছে: :খাইছে: :খাইছে: ………………………………………………………… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    আর কিছু কইলাম না। :ফুল:

  4. এইটা কি করলেন?ফয়সালরে এত
    এইটা কি করলেন?ফয়সালরে এত ভুদাই বানাইলেন।যাক,এখন তো আর কিছু করার নাই।তবে আপনার কথাটা ঠিক।ধারনাতেও আসে নাই এমন ফিনিশিং।আরেকটা কথা ভাই।বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না।কলাপাতা রংটা আসলেই আমার অসাম লাগে।কোন মেয়েকে এই রংয়ের শাড়ি পড়া দেখলে মনে হয় সাক্ষাত কলাগাছ।সার্থক গল্প।

    1. কলাপাতা রঙটা আসলেও অসাম রে
      কলাপাতা রঙটা আসলেও অসাম রে পাগলা। বহুকাল আগে কোন একজনকে কলাপাতা শাড়ি পড়া দেখেছিলাম। একবারই। মাথায় ঢুকে আছে সেটাই। Life is a collection of আফসোস। :মনখারাপ:

  5. খুব মজা পেয়েছি। আগের
    খুব মজা পেয়েছি। আগের গল্পগুলোও পড়া হয়েছে। poison এর নামগুলো পড়তে যেয়ে আগাথা ক্রিস্টির গল্পগুলোর কথা মনে পড়েছে।

    অনেক দিন পর ভালো সাইকো গল্প পড়লাম। আরও লিখুন, শুভকামনা।

    1. তাড়াতাড়ি? কি কন? ৩ পর্ব
      তাড়াতাড়ি? :খাইছে: কি কন? :মাথানষ্ট: ৩ পর্ব লিখতে গিয়ে আমার মাথার তাঁর ছিঁড়ার অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। প্রেমের গল্প লেখা অনেক সহজ। সাইকো গল্প লিখতে গেলে খবর হয়ে যায়। তবে এটা ঠিক সাইকো গল্প লিখে মজা বেশি।

      চিন্তা করবেন না ভাই, খুব দ্রুতই নতুন সিরিজ শুরু হবে ইনশাল্লাহ। একটু জিরিয়ে নেই আগে। :কেউরেকইসনা:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

43 − = 38