প্রেম-হুমায়ুন আজাদ

হুমায়ুন আজাদের কিছু প্রবন্ধ পড়ছিলাম। পড়তে পড়তেই ‘প্রেম’ শীর্ষক প্রবন্ধটি পেয়ে গ্যালাম। তারপর থেকেই খুব ইচ্ছা করছিল সবার সাথে শেয়ার করার। শেয়ার করার সাহস বা উতসাহ যাই বলেন না ক্যানো মুলত পেয়েছি নাগরিকব্লগের নাগরিক বায়স এর পোষ্টগুলো থেকে। প্রবন্ধটির কিছু অংশ শেয়ার করার পেছনে যে কারনটি কাজ করেছে তা হল আমি আর কোথাও কাউকেই প্রেম ভালবাসা জিনিসটাকে এত নিরপেক্ষ,কোন রকম যুক্তিতে না যায়েই কাউকে বিশ্লেষন করতে দেখি নাই। সবাই ক্যামন যানি একটা রাখঢাক করেই এই ব্যাপারটাকে এখন পর্যন্ত বিশ্লেষন করেন। সেই দৃষ্টিকোন থেকে এই প্রবন্ধটি একদম আলাদা। নিচে কয়েকটি প্যারা শেয়ার করলাম।

“……চোদ্দ-পনের-ষোল বছর বয়সের দিকে বালকবালিকারা বুকের বা পাশে কেমন একটা কাতরতা বোধ করতে থাকে। স্বপ্নে দেখতে থাকে রাজপুত্র রাজকন্যাকে;এক সময় অই রাজপুত্র রাজকন্যার রূপ ধয়ে দেখা দেয় পাশের বাড়ির ছেলেটি বা মেয়েটি। তাকে দেখতে থাকে সবখানে ; মেঘে,গাছের পাতায়,পুকুরের জলে দেয়ালে ; তার চারিদিক কুয়াশায় ভরে যায়,বুকের ভিতর শিশির জমতে থাকে।বদলে যায় বুকের ভিতরের জলবায়ু,রক্তের রঙ ও হয়তো ঘোলাটে হয়ে যায় একটু। প্রেম একটা মানসিক রোগের মত অবস্থা ; সেটা সুস্থ অবস্থায়।প্রেমিক প্রেমিকা কখনই সুস্থ নয়। তাদের জগত আগ্নেয়গিরির চূড়ায়,সর্বদা কম্পমান। প্রেমিক প্রেমিকা ঘুমোতে পারে না,ক্ষুধা থাকে না,তারা থাকে নিরন্তর উদ্বে্গের মধ্যে।”

“প্রেম ঝড়,বিস্ফোরন,জোয়ার বা ফুল ফোটার মত অচিরস্থায়ী আবেগ। ঝড় দিনের পর দিন চলতে পারে না,ফুল ফুটে থাকতে পারে না বছর ধরে। প্রেমের ঝড়ের বিস্ফোরনের পর থাকে ভাংগা ঘরবাড়ি,জোয়ারের পর থাকে নদীতে ভেসে আসা পোড়াকাঠ,ময়লা মাটি। যে ফুল মাসের পর মাস ফুটে থাকে,তা ফুল নয়; প্লাস্টিকের ফুল। প্রেমও মাসের পর মাস ফুটে থাকতে পারে না। প্রেম হচ্ছে প্রেমের তীব্র আবেগটুকু,যা বিয়ারের ক্যানের মত কানায় কানায় ভরা থাকে ; খুললে উপচে পড়ে তার সমস্ত শীতল।”

“……প্রেমের মধ্যে সবচেয়ে ভাল বাল্যপ্রেম। পাশাপাশি বাড়িতে পাশাপাশি বাড়তে বাড়তে চোদ্দপনের বছরের দিকে বালকটি দেখে বালিকার চোখে ফুল ফুটেছে,মাংসে ফুল ফুটেছে,চোখে মহাসমুদ্রের থেকেও বড় বড় অশ্রুবিন্দু দেখা দিচ্ছে ; বালিকা দেখে বালকটি অন্ধ হয়ে যাচ্ছে,তাকে ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না,তার দিকেও ঠিকমত তাকাতে পারছে না ; দেখে বালকটির হাত কাপছে,পা কাপছে,মহাজগত কাপছে। ….তারা আকাশ ভরে গোলাপ আর মাটি ভরে নক্ষত্র ফুটে থাকতে দেখে। তারা হাতে আংগুল নিয়ে খেলে,হাত ধরে থাকে সকলের চোখের আড়ালে।তারা মাসে তিনশো চিঠি লেখে,দিনরাত মনে মনে চিঠি পড়তে থাকে। ঐ চিঠি রবীন্দ্রনাথের কবিতার চাইতেও অনেক অকাব্যিক,ঐশী শ্লোকের থেকে অনেক পবিত্র। প্রেমে পড়ার সময় হঠাত অনেক ভোরে ঘুম ভেংগে যায়,নিজেকে মনে হয় মহাশুন্যে ভাসমান…..”

এক প্যারা পর আবার লিখেছেন “….প্রেমিকাকে হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা দেখা দিলে তার মনে জেগে ওঠে প্রবল ঈর্ষা ; সে দুঃসপ্ন দেখতে থেকে ঐ দেহটি ভোগ করছে অন্য একটি পুরুষ,আর সে পাগল হয়ে উঠে। একবার মাংসের স্বাদ পাওয়ার পর প্রেমিক প্রেমিকা আর বারান্দায় সুখ পায় না ; তারা চলে যায় ঝোপের আড়ালে….তারপর কোণ একান্ত কক্ষ পেলে ঢোকে পরস্পরের ভেতরে। এইতো প্রেম।বাংলাদেশ প্রেমের জন্য উপযুক্ত ভূ-ভাগ নয়”

শেষ প্যারাটিতে এসে তিনি লিখেছেন “…..প্রেম জীবনে বারবার আসে। পিতৃতন্ত্র পুরুষের জন্যে যেমন কামের অজস্র দরজা খোলা রেখেছে,তেমনি প্রেমের জন্যেও রেখেছে ; নারীর জন্যে রাখেনি।নারী-পুরুষ বারবার প্রেমে পড়তে পারে,কিন্ত চারপাশে রটানো হয় শাশ্ব্ত প্রেমের বিজ্ঞাপন। শাশ্ব্ত প্রেম হচ্ছে একজনের ভেতরে ঢুকে আরেকজনের স্বপ্ন দেখা।প্রেমিকপ্রেমিকা স্বামীস্ত্রী হয়ে ওঠার পর তা হয়ে ওঠে হাস্যকর ; তারা কামের আবেগ বোধ করে,কিন্তু বুকে একবারও প্রেমের কাপন বোধ করে না। কেননা ধারাবাহিক প্রেমের উত্তেজনার মাঝে মানুষ বাস করতে পারে না,মানুষকে যাপন করতে হয় অনুত্তেজিত সাদামাটা জীবন। তবে আবার যখন তারা প্রেমে পড়ে দেখা দেয় তীব্র উত্তেজনা,ঘুমহীনতা,ঝড়ো,ভুমিকম্প বা গোলাপ ফোটা।

দ্বিতীয়,তৃতীয়,চতুর্থ,পঞ্চম প্রেম বলে কোণ কথা নেই ; প্রতিটি প্রেমই প্রথম প্রেম। প্রতিটি প্রেমই শরীরের দিকে যাত্রা।”

পুরো প্রবন্ধটি পড়ে আমার খুব বেশি করে মনে হয়েছে আসলেই তিনি জন্মেছিলেন অন্যদের সময়ে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “প্রেম-হুমায়ুন আজাদ

  1. আমি হুমায়ুন আজাদের এই
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    আমি হুমায়ুন আজাদের এই প্রবন্ধটিকে প্রেমের সংবিধান মনে করি। যে কোন প্রেম বিষয়ক জটিলতায় বাস্তবিক সমাধানের পথ বাতলে দেয়া আছে। ইস্টিশনের যাত্রীদের প্রেম বিষয়ক জটিলতায় আপনার এই্ পোস্টটি বুস্টার ডোজ হিসাবে কাজ করবে। আমারও মাঝে মাঝে পড়ার সুযোগ তৈরী করার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। :চোখমারা:

  2. প্রেম শব্দটা শুনলে আমার মাথা
    প্রেম শব্দটা শুনলে আমার মাথা গরম হই যায়। ধুত তারিকা। :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

40 − 34 =