তৃষা ০১

তৃষার জন্য শনিবারটা ইদানিং বেশ ঝামেলার হয়ে গেছে। আগে আগে ভালই লাগতো। অনিমেষ বাসায় থাকার কারণে কোন ধরণের চিন্তা ছাড়া বাইরে থাকতে পারতো। এখনও তাই, কিন্তু বাইরে থাকাটাই এখন কেমন বিরক্তিকর লাগে, বৈচিত্রহীন এক সুরো এক গান। মাঝে মাঝে বাসায় চলে যেতে ইচ্ছে হয়। মানুষের সব ইচ্ছে যেমন পূরন হয় না, তেমনি তৃষার এই ইচ্ছেটাও হয়ত পূরণ হবার নয়। শনিবারে শুভনীতার বাবা সুদীপ্ত আসেন, সুদীপ্তর সাথে দেখা হয় কিংবা করতে হয়। দেখা দেখিটা বন্ধুর ফ্লাট পর্যন্ত গড়ায়, গড়ায় একটা তুলতুলে শরীর, তুলতুলে বিছানা পর্যন্ত।

সুদীপ্তর সাথে তৃষার পরিচয় শুভনীতাকে নিয়েই। সেদিন একটু আগে আগেই স্কুল ছুটি হয়ে যায়। সবাই সবার বাচ্চা নিয়ে চলে গেলেও তৃষা অন্তুকে নিয়ে যেতে পারেনি, অন্তু যাবে না। বায়না ধরেছে, যতক্ষণ না কেউ এসে শুভনীতাকে নিয়ে যাবে, ততক্ষণ সেও শুভনীতার সাথে স্কুলে থাকবে। তৃষারও খারাপ লাগছিলো মেয়েটার জন্য। মনে মনে গালমন্দ করছিলো শুভনীতার মাকে, এ কেমন দ্বায়িত্বহীন মা!! বাচ্চার স্কুলে কাটায় কাটায় আসে? একটু কি আগে আসা যায় না? স্কুল ছুটি হলে তিনি কাটায় কাটায় হাজির হন। কিন্তু প্রতিদিন কি কাটায় কাটায় ছুটি হয়। তৃষা শুভনীতাকে কান্না না করার জন্য বুঝাচ্ছিলো। কিন্তু মেয়ের কান্না কি আর থামে? প্রচণ্ড বিরক্ত হচ্ছিলো তৃষা। তবু বাচ্চাদের সাথে রাগ করা যায় না, নানান সান্ত্বনা দিতে দিতে এক সময় বলছিলো, মনে করো আমিই তোমার মা। হটাত পেছনে শুনতে পায়, যাকে তাকে মা বলো না মামনি, এই তো বাবা এসে গেছি। পেছনে পুরুষ কণ্ঠ শুনে ঘুরে দাঁড়ায় তৃষা, একটা কটু কথা শুনাতে যাচ্ছিলো ঘুরতে ঘুরতে। কিন্তু পারে না, দুটো অদ্ভুত চোখে দৃষ্টি আটকে যায়, সাথে কণ্ঠও।

মানুষের চোখে কি এমন দৃষ্টি থাকতে পারে!! একেই কি বলে সম্মোহনী চাহনি! অনেকটা বিহবল ও কিংকর্তব্য বিমূড় হয়ে যায় তৃষা। ভদ্রলোকের কণ্ঠ আড়মোরা ভাঙ্গায়,

– অবশ্য এমন একটা মা পেলে শুভনীতার জন্য মন্দ হতো না।
– কেন তার মা নেই বুঝি?
– থাকবে না কেন? আছে, তবে সেটা মনে হয় না এই মায়ের মত।
– আমি কিন্তু তার মা নই।
– দিব্যি তো হতে চাচ্ছিলেন একটু আগে।
– আপনার তাতে কি আসে যায়, বেল পাকলে কাকের তো কোন লাভ নেই।

তৃষা ভাল করেই জানে শায়লার মা প্রতিদিন তাকে স্কুলে নিয়ে আসে, নিয়ে যায়। তবু এই লোকটার সাথে কেন যেনো একটু রসিকতা করতে ইচ্ছে হয়ে গেলো! অদ্ভুত! এই মানুষের মনন। তৃষার মত গম্ভীর আর কোন গার্জেন এই স্কুলে আছে কি না জানা নেই। রসিকতা দূরে থাক আগ বাড়িয়ে কারও সাথে কথাটাই বলে না। সেই তৃষার কি হলো! এতটা প্রগলভ!

পরের শনিবার তৃষা বোধ হয় অপেক্ষা করছিলো সুদীপ্তের জন্য। একটু বেশি সাজগোজও কি করেছে অন্যদিনের থেকে! হবে হয়ত। স্কুল বসার পর সুদীপ্তই তৃষাকে খুঁজে নিয়েছে ।
– কেমন আছেন “ আদর্শ মা” ?
– জ্বী ভাল আছি, তা কেমন আছে “উদাসীন বাবা” ?
– এখন পর্যন্ত ভালই মনে হচ্ছে।
– এখন পর্যন্ত কেন? নিজে কেমন আছেন তাই জানেন না?
– তা জানবো না কেন? কিন্তু মাঝে মাঝে জানাটাও কেমন এলোমেলো হয়ে যায়।
– তারপর, আপনি কি ফ্রি আছেন? থাকলে চলুন কোথাও গিয়ে বসা যাক।

কোথায় বসবে তারা? স্কুলের পাশে একটা কফি হাউস খুলেছে কিছুদিন হলো, “টাইম পাস কফি হাউস”। টাইম পাস করার জন্য তৃষা সুদীপ্ত টাইম পাসেই গিয়ে বসলো। এ কথা, সে কথা, কত কথা! নারী পুরুষ সম্পর্কে জড়াতে চাইলে কি এত এত কথা বলতে হয়! বলতে হয় নাড়ি নক্ষত্রের জানা অজানা সব কথা? হতে পারে। তৃষার এতসব খেয়াল ছিলো না, খেয়াল ছিলো একজোড়া সম্মোহনী চোখ আর এক মাথা ঝাকড়া চুল, চুলগুলোকে আলতো করে আগোছালো করে দেয়ার অদম্য একটা আদিম বাসনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “তৃষা ০১

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 6