স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অস্বীকার করা রাষ্ট্রদ্রোহিতা

যাতে দেশদ্রোহিতার অপরাধে বিচার ও শাস্তি দেয়া যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। এটি করা হলে উদ্দশ্যপ্রণোদিত অনেক বির্তক, ইতিহাসবিকৃতি এবং জঙ্গী মৌলবাদীদের সন্ত্রাস ও দৌরাত্ন্য থেকে দেশ ও জাতি মুক্তি পাবে। ১৯৭১ সালে নয় মাসব্যাপী এক অনন্যসাধারন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের। এই প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের তিরিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন, সোয়া চার লক্ষ নারী চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এক কোটি মানুষ দেশত্যাগ করে প্রতিবেশী ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন, দেশের অভ্যন্তরে কয়েক কোটি মানুষ স্থানচ্যুত হয়ে সন্ত্রস্ত জীবন যাপন করেছেন এবং শত সহস্র জনপদ ধ্বংশ হয়ে গেছে। স্বাধীনতার এত চরম মূল্য আর কোনও জাতিকে দিতে হয়নি।

১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার। একই দিন প্রনীত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। এই ঘোষণাপত্রের ভিত্তিতেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার বৈধতা অর্জন করে এবং এরই ভিত্তিতে পরিচালিত হয় নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, যে যুদ্ধে নেতুত্ব প্রদান করেছেন বঙ্গবন্ধু, সৈয়দ নজরুল ও তাজউদ্দিনের অস্থায়ী সরকার যা মুজিবনগর সরকার হিসেবে অধিক পরিচিত।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাপত্রের খসড়া ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করেছেন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও তৎকালীন জাতীয় সংসদ নির্বাচিত ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আদলে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার খসড়া ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করেছেন, যা অনুমোদন করেছেন নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিগণ। পৃথিবীর খুব কম সংখ্যক দেশই অনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধের আইনি ভিত্তি স্থাপন করেছে। সেদিক থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র ঐতিহাসিক অত্যন্ত তাতপর্যপূর্ণ। এই ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে কোন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিগন স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের রুপরেখা কী রকম হবে, স্বাধীনতার ঘোষক কে এবং কখন থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে হন্য হবে।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পটভূমি এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে ১০ এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে-‘যেহেতু এইরুপ বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসম্বাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের অত্ননিয়ন্ত্রনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখন্ডতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগনের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান।’

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বপ্রতানকারী মুজিবনগর সরকার স্বাধীনতার ঘোষণাডত্রে আরও বলেছেন- ‘যেহেতু পাকিস্তান সরকার একটি অন্যায় যুদ্ধ চাপাইয়া দিয়া, গণহত্যা করিয়া এবং অন্যান্য দমনমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিনিধিগণের পক্ষে একত্রিত হইয়া একিটি সংবিধান প্রণয়ন এবং নিজেদের জন্য একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব করিয়া তুলিয়াছে, এবং যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাহাদের বীরত্ব, সাহসীকতা ও বিপ্লবী উদ্দিপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূখন্ডের উপর তাহাদের কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিয়াছে, যেহেতু আমরা বাংলাদেশের প্রদত্ত কর্তৃত্বের মর্যাদা রক্ষার্থ, নিজেদের সমন্বয়ে যথাযথ একটি গণপরিসদরুপে গঠন করিলাম, এবং পারস্পারিক আলোচনা করিয়া, এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থ, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র রুপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম এবং তদ্দরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ইতিপূর্বে ঘোষিত স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করিলাম’।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হেয়ছে ১৯৭১-এর ২৬শে মার্চ থেকে এই ঘোষণাপত্র কার্যকর হবে। এই ঘোষণা পত্রের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরদিনই (১১ জানুয়ারী ১৯৭২) অস্থায়ী সংবিধান ঘোষণা করেন, যার ভিত্ততে ৭২-এর ৪ নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। যে কারণে আমরা বলতে পারি ১০ এপ্রিল প্রণীত স্বাধিনতার ঘোষণাপত্র অস্বীকার করবার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম সত্তা অস্বীকার করা। কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ অথবা কোন দল যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অস্বীকার করে সে বাংলাদেশে নাগরিক হওয়ার যোগ্য নয়। বাংলাদেশের কোন নাগরিক যদি এই ঘোষণাপত্র অস্বীকার করে তাকে রাষ্ট্র বিরোধী হিসেবে অভিযুক্ত করে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আমাদের দেশের কোনও ব্যক্তি যদি বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম সত্তা অস্বীকার করে তার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনেই শাস্তিমূলক ব্যভস্থা গ্রহণ করা যায়।

১৯৭১ সালে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, যারা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে তারা তাদের অপারধ বৈধ করবার জন্য বলে ৭১-এ বাংলাদেশে কোন স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়নি ওটা ছিল গৃহযদ্ধ। তাদের কাছে ১০এপ্রিলের স্বাধিনতার ঘোষণাপত্র অস্তিত্বহীন। তারা মনে করে ৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোন স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব ছিল না। তাদের বিবেচনায় এই সময় যারা বাঙলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন তারা দুষ্কৃতকারী, পাকিস্তান ও ইসলামের দুষমন এবং তাদের হত্যা করা জায়েজ। যারা এ ধরনের কথা বলে তারা স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকার করে না। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম বাক্যে বলা হয়েছে-‘আমরা, বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ খৃষ্টাব্দে মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া….স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।’

১৯৭১-এর এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক গৃহীত ও ঘোষিত ‘স্বাধিনতার ঘোষণাপত্র’ বাংলাদেশের সযবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের ১৫০ অনুচ্ছেদের ৩। (১) ধারায় বলা হয়েছে ১৯৭১ সালের ২৬মার্চ হইতে এই সংবিধান-প্রবর্তনের তারিখের মধ্যে প্রণীত… সকল আইন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র…এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং আইনানুযায়ী যথার্থভাবে প্রণীত, প্রযুক্ত ও কৃত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল।

২০০১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেধে বিএনপি ক্ষমতায় এসে সংবিধান থেকে ‘স্বাধিনতার ঘোষণাপত্র’ বাদ দিয়ে নতুন সংবিধান ছেপেছিল। এর আগে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের সংবিধানের চার মূলনীতি সংশোধন করে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ ও ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়েছিলেন্। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চায়নি বলেই’৭১-এর ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর বুকে নৃশংসতম গণহত্যাযজ্ঞে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করেছে। যুদ্ধাপরাধ ছাড়াও ‘৭১-এ বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য জামায়াতকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দন্ড প্রদান করা যায়। একই ভাবে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সামরিক আদালতেও বিচার করা যায়।

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বপ্রদানকারী আওয়ামীলীগ ও মহাজোট সরকারের নিকট আমাদের দাবি- অবিলম্বে’৭২-এর সংবিধানের বাতিলকৃত মূলনীতিসমূহ এবং স্বাধিনতার ঘোষণাপত্র সংবিধানে সংযোজন করতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম অস্তিত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অগ্রাহ্যকারীদের যাতে দেশদ্রোহিতার অপরাধে বিচার ও শাস্তি দেওয়া যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। এটি করা হলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অনেক বির্তক, ইতিহাস বিকৃতি এবং জঙ্গী মৌলবাদীদের সন্ত্রাস ও দৌরাত্ন্য থেকে দেশ ও জাতি মুক্তি পাবে।

[লেখাটি প্রথম ০৯ই এপ্রিল, ২০০৯-এ প্রকাশিত হয়।]

– ভারপ্রাপ্ত সভাপতি
একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অস্বীকার করা রাষ্ট্রদ্রোহিতা

  1. দল হিসেবে জামাতকেও বিচারের
    দল হিসেবে জামাতকেও বিচারের সম্মুখিন দেখতে চাই। এই দাবীতেও সোচ্চার হতে হবে আমাদের। কারন গু- আজম, নিজামি এরা যুদ্ধাপরাধ করেছে জামাতের দলীয় ব্যানারে। বিচার সহ এদের নিষিদ্ধ করতেই হবে।

  2. লেখাটি পুরানো হলেও সবার পড়া
    লেখাটি পুরানো হলেও সবার পড়া উচিত। এসব লেখা অর্ন্তজালে ছড়িয়ে দিতে হবে। শাহরিয়ার কবির সাহেবকে অসংখ্য ধন্যবাদ ইস্টিশনে লেখার জন্য। আমরা নিয়মিত আপনার নতুন নতুন লেখা চাই। আমাদের এই প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। পাশাপাশি ইস্টিশনে অন্য ভাল লেখকদেরও লেখা আমরা দেখতে চাই। আশাকরি ইস্টিশন কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 3