¤শাহবাগ একটি অগ্নিগিরি এবং একটি প্রেমের গল্প ।¤

*এই গল্পটি লিখি ভালোবাসা দিবসের দিন যারা নিজের ভালবাসাকে উৎসর্গ করেছিলো আমাদের দ্বিতীয় মুক্তি সংগ্রামে তাদেরকে উৎসর্গ করে । কিন্তু তার পরদিন ই হায়েনাদের হাতে নির্মম ভাবে নিহত হন আমাদের আরেক সহযোদ্ধা রাজিব হায়দার ।জানি এ লেখাটি তাই এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে । সবার বুকে এখন তীব্র ঘৃণার আগুন।তবুও শহীদ রাজিবকে উৎসর্গ করে লেখাটি আবার দিলাম ।যদি আমদের সহযোদ্ধা রা কিছুটা অনুপ্রেরনা পায়। সেই আশায় ।*


*এই গল্পটি লিখি ভালোবাসা দিবসের দিন যারা নিজের ভালবাসাকে উৎসর্গ করেছিলো আমাদের দ্বিতীয় মুক্তি সংগ্রামে তাদেরকে উৎসর্গ করে । কিন্তু তার পরদিন ই হায়েনাদের হাতে নির্মম ভাবে নিহত হন আমাদের আরেক সহযোদ্ধা রাজিব হায়দার ।জানি এ লেখাটি তাই এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে । সবার বুকে এখন তীব্র ঘৃণার আগুন।তবুও শহীদ রাজিবকে উৎসর্গ করে লেখাটি আবার দিলাম ।যদি আমদের সহযোদ্ধা রা কিছুটা অনুপ্রেরনা পায়। সেই আশায় ।*

মেয়েটি ব্যাতিক্রম কেউ ছিলোনা ।সচরাচর মেয়েদের মতোই ।তার গালের পাশের তিলটার মতোই সহজ ছিলো তার জীবনাচারন ।মেয়েটির প্রেমিক পুরুষটিও তার ব্যাতিক্রম ছিলোনা ।দুজনের সহজবোধ্য জীবন ।অদ্ভুত এক সুতোয় বাঁধা নিস্তরঙ্গ ছিলো ।ঢাবি যেখানে ইতিহাস অবিরত পাক খায় তারা সেখানে পড়তো ।দুজন দুই হলের যথাক্রমে বৈধ এবং অবৈধ আবাসিক বাসিন্দা ।

রাজনীতির প্রসঙ্গ এলে প্রেমিক পুরুষটি গলা চড়িয়ে বলতো “সব শালা শুয়োরের বাচ্চা” ! মেয়েটি নিরবে সায় দিতো ।ঢাবি ক্যাম্পাস উত্‍সবের ক্যাম্পাস ।কোন না কোন পার্বণ লেগেই থাকে ক্যাম্পাস জুড়ে সারাবছর ।তাই হঠাত্‍ কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া জটলা ভিড় এসব এ জুটির মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারতোনা খুব একটা ।তারা একে অপরের চোখের দিকে গাড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো অপলক । ভিড় ভাট্টা দেশ জনপদ রাষ্ট্রনীতি এসব খুব একটা আলোচনায় আসতোনা তাদের ।খুব বেশী হলে ,”কি আজাইরা একটা দেশে আছি রাস্তায় এতো জ্যাম””উফফ এত্ত লোডশেডিং”এ জাতীয় একটু ভ্রু কুঁচকানো বিরক্তি ।তারপর আবার নিরবতা ।খুনসুঁটি।শারীরিক দেনা পাওনার হিসেব নিকেষ । এভাবেই চলছিলো,বিরক্তি আর আরক্তির মাঝে দিবারাত্রি ।

একদিন , যেদিন আবার একটি বিশেষ প্রজাতির দলের হরতাল ছিলো ,সেদিন তারাবৈকালিক রিকশা ভ্রমণে বেরুলো ।

কিছুদিন যাবত মান অভিমান চলছিলো তাদের ।প্রত্যোক সুশ্রী নারীর মত তার ও কিছু অনাকাঙ্খিত প্রেমাকাঙ্খি পুরুষ আছে ।এই পুরুষেরা প্রতিনিয়ত ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে মুঠোফোনে তাদেরঅস্তিত্ব জানান দেয় ।মেয়েটি গ্রাহ্য করেনা ।ছেলেটি ও গ্রাহ্য করেনি প্রথম প্রথম ।মহত্‍ উদার সাজার একটা মানসিকতা ছিলো তার ।কিন্তু মানবিক সন্দেহ প্রবৃত্তি তাকে মুক্তি দেয়না ।ছেলেটিসন্দেহগ্রস্থ হয়ে পড়ে ।টি এস সি থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রাস্তায় তাদের ঝগড়া মৃদু থেকে প্রচন্ডে রুপ নেয় ।যাই হোক কিছু সময় পর তাদের মধ্যেনিরবতা বিচ্ছেদ হয়ে নেমে আসে ।শাহবাগে এসে একটা ছোট জনস্রোত তারা লক্ষ্য করে ।শ্লোগানগুলো মাথায় ঢোকেনা তাদের,শুধু বুঝতে পারে কোন একটা রাজাকারের ফাঁসি হয়নি তাই এ বিক্ষোভ ।নিজেদের ক্রান্তিকালীন সময়ে এসব নিয়ে মাথা ঘামায়না দুজনে খুবএকটা । অতঃপর ছেলেটি রিকশা থেকে নেমে পড়ে ,দুজনের পথ দু দিকে ভাগ হয়ে যায় ।

এদিকে যে ইতিহাসের সুচনালগ্ন তারা প্রত্যক্ষ করেছিল সেটা ধীরে ধীরে অগ্নিগর্ভা হয় ।পিঁপড়ের সারির মত মানুষ নেমে আসে শাহবাগে ।বিক্ষোভের প্রথম দিন ।মেয়েটি গালে হাত দিয়ে বসে থাকে টিএসসিতে।দুরের উত্তাল শ্লোগান তাকে স্পর্শ করেনা । সে ভাবতে থাকে বিগত এবং অনাগত দিনগুলোর কথা ।তৃতীয় দিন মেয়েটি সারাদিন হলেই থাকে ,বের হয়না ।মুঠোফোনে কোন ক্ষুদে বার্তা আসেনা তার ।যদিও সে প্রতিক্ষায় থাকে ।তার ফোলা চোখ এবং নিরুত্তাপ মুখাবয়ব দেখে তার হল মেটরা ধরে নেয়

সম্ভাব্য পরিস্থিতি ।শ্লীল অশ্লীল অনেক ধরনের রসিকতা করে মন ভালো করনের চেষ্টা করে তারা ।কিন্তু লাভ হয়না ।মেয়েটি কাষ্ঠ হাসি হাসে শুধু ।এদিকে বিক্ষোভ বিস্তার লাভ করে ।পরের দিনে ঝারু মিছিল বের করে তার হলের মেয়েরা ।সে তাকিয়ে থাকে ।বের হয়ে দেখার চেষ্টা করে ।নিজের অজান্তে মিছিলের পিছু পিছু হাঁটা শুরু করে ।কিন্তু শ্লোগান দেয়না ।এরা সবাই কি মন থেকে এসেছে তার মনে প্রশ্ন জাগে ।কিন্তু শ্লোগানের তীব্রতা এবং জমায়েতের সার্বজনীনতা দেখে তার মনে হয় ভিন্ন কিছু ।এটা আর সব জমায়েতের মত গত্‍বাঁধা বুলি সর্বস্ব নয় ।একটা প্রচন্ত অনাচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ যেনঠিকরে বেরুচ্ছে সর্বত্র ।একটা প্রচন্ড আবেগ বেশিরভাগের চোখেমুখে ।এই জনতার ভিড় অন্য কথা বলছে ।

তারপর ও মিছিলে মিশে যেতে সংকোচ হয় তার ।ব্যাক্তিগত হিসাব নিকাশের খাতাটা যে বন্ধ হতে চায়না ।মনটাকে বিক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ।মনযোগ অন্য দিকে নেবে স্থির করে সে ।কয়েক দিন আগের একটা পত্রিকা টেনে নেয় সে ।পত্রিকার প্রথম পাতা জুড়ে সেই আলোচিত রায়টার আদ্যপান্ত ।মনটা কৌতুহলী হয়ে ওঠে তার ।প্রথম কয়েকটা প্যারা পড়ার পর শরীরটা গুলিয়ে আসে ।রিপোর্টটার উপর ভি চিহ্ন দেখানো রাজাকারটার দাঁত কেলানো ছবি ।মনের অজান্তে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে”শুয়োরের বাচ্চা” !ছবিটা বারবার চোখে পড়ে ওর ,বুকে একটা অসহ্য ক্রোধ দলা পাকিয়ে ওঠে তার !অনেক দিন পর ব্যাক্তিগত বেদনার বাইরের একটা বেদনায় চোখ ভিজে ওঠে তার ।বাইরে একটা মিছিল থেকে শ্লোগানের আওয়াজ আসছে ।নিজের অজান্তে মিছিলটার দিকে পা বাড়ায় মেয়েটা ।

২।

পঞ্চম দিন থেকে শাহবাগে আরেকটি প্রচন্ড কণ্ঠ যোগ হয় ।ধীরে ধীরে অন্যতম তীব্র একটি কণ্ঠে রুপ নেয় সেটি।ষষ্ঠ ,সপ্তম ,অষ্টম এভাবে দিন পেরিয়ে যায় ।কিন্তু কণ্ঠটি ম্লান হয়না ।জনতা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মধ্যমণি মেয়েটির দিকে ।ক্লান্তিহীন শ্লোগান এজনতার কাছে অপরিচিত নয় ।কিন্তু এ যেন অন্যরকম ,শক্ত কাঁচে প্রচন্ড শক্তিতে আঘাত করলে ভাঙ্গন যেমন ছোট ছোট অসংখ্যফাটল তৈরি করে ,এই মেয়েটির শ্লোগান ও যেন তেমন ।বুকের ভেতর অসংখ্য ক্রোধের ফাটল তৈরি করে ।

ফেসবুকের পেজ এবং মিডিয়ার কল্যানে অল্প ক দিনেই পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে সে ।

জানোয়ার দের পেজগুলোতেও অশ্লীল অশ্রাব্য সব আলোচনা শুরু হয় ।কেয়ার করেনা মেয়েটা ।তার পথ এখন একটাই ।অবিচল গন্তব্যে ।

পহেলা ফাল্গুন কেটে যায় রাজপথে ।পরের দিন ভ্যালেনটাইন্স ডে ।তিনবছর পরের প্রথম ভালোবাসাহীন ভালোবাসা দিবস ।

লাল শাড়ি নয় কালো শাড়ি পড়ে রাজপথে নেমে আসে মেয়েটি ।শাহবাগ যাওয়ার সময় হঠাত্‍ উশকু খুশকু চুলের একটি ছেলে পথআগলে দাঁড়ায় তার ।এ কদিনে বেশ অপরিচিতহয়ে গেছে সে ।এবং তারা দুজনেই ।পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে একটা বোবা কান্না উঠে আসে গলায় ।কিন্তু মেয়েটি শক্ত করে নিজেকে ।ছেলেটার হাত থেকে ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে ।

“তুমি এটা কি করলা ,আমাকে একটু জানালে না ?”হতবাক চোখ ছেলেটার ।

মেয়েটা ধাবমান একটা মিছিলের দিকে তাকিয়ে বলে , “যা করার দরকার ছিলো ।তুমি নির্দ্ধিধায় আমার চরিত্র সম্পর্কে শুয়োরদের কথা বিশ্বাস করতে পারো ।আমি তোমার ভুল ভাঙ্গাবোনা ।”

ছেলেটি বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো ,”তুমি বোধহয় আমার মাথার দিকে তাকিয়ে দেখোনি!একটা বারের জন্য অন্তঃত তাকাও।”

মেয়েটি তাকিয়ে দেখে ছেলেটার মাথায় একটা জাতীয় পতাকা ।নিচে কপালে একটা পট্টি বাঁধা ।

সেখানে লেখা ,

“শুয়োরের বাচ্চাদের ফাঁসি চাই ।”

অতঃপর একটি আলিঙ্গন ।সমবেত জনতা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে

জাতীয় পতাকার ছায়ায় একটি নির্ভেজাল আলিঙ্গন দৃশ্য ।

ছেলেটি হাঁটু মুড়ে বসে ।

মেয়েটিক দিকে কাঁপা কাঁপা হাতে এগিয়ে দেয় একটি কালো গোলাপ ।মেয়েটি হাসিমুখে প্রত্যাখ্যান করে ।হাত ধরে টেনে তুলে তাকে ।তারপর তার চোখের দিকেতাকিয়ে বলে ,

“প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য”।তারপর যুগল দুটি হাত একসাথে মিশে যায় জনস্রোতের সাথে ।

৩।

গল্পের কোন পরিশিষ্ট হয়না ।কিন্তু আমি এ গল্পের একটি পরিশিষ্ট দেব ।এ গল্পের চরিত্র দুটির কোন নাম নেই ।গল্পকার হিসাবে এটি আমার সীমাবদ্ধতা।এ কয়েকদিনে অসংখ্য গল্প আমাদের ।অসংখ্য চরিত্রের অসংখ্য গল্প ।ছেলে মেয়ে দুটি অসংখ্য গল্পের অসংখ্য চরিত্র ।তাদের নামের বাঁধনে বাঁধবো এমন দুঃসাহস আমার নেই ।তাদের জন্য শুধুই ভালোবাসা ।ভালোবাসা দিবসের চেয়ে বেশী ভালোবাসা ।

চলুন আমি এবং আমরা মিশে যাই তীব্র ঘৃণা থেকে জন্ম নেয়া তীব্র খাঁটি এ ভালোবাসার স্রোতে ।আমি নিশ্চিত তাতে তলিয়ে যাবে নিকষ অন্ধকার ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “¤শাহবাগ একটি অগ্নিগিরি এবং একটি প্রেমের গল্প ।¤

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 7 = 12