বাংলাদেশ এখনো অপ্রস্তুত : আসছে কপ-১৯

আগামী নভেম্বর মাসের ১১ তারিখ থেকে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে শুরু হতে যাচ্ছে ১৯তম জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ-১৯)। ডেলিগেট, সাংবাদিক, কনসালট্যান্টসহ কারা কারা যাবে তা নিয়ে হৈচৈ হচ্ছে খুব। কিন্তু সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান কি হবে তা এখনো স্পষ্ট না। আগের অবস্থানগুলোই মোটা দাগে বলে যাচ্ছেন কর্তারা। কিন্তু তাতে কি কাজ হবে? পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু কোনো পরিকল্পনা দাঁড় করাতে না পারলে কি আমরা এ থেকে কিছু অর্জন করতে পারব? প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।

নতুন একগাদা সঙ্কট এরই মধ্যে জড়ো হয়েছে। প্রতিশ্রুত অর্থ ঠিকমতো দিচ্ছে না বিদেশিরা। আমাদের ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। নতুন আসা প্রতিবেদনগুলো বলছে ক্ষয় ক্ষতি বাড়তেই থাকবে। জলবায়ু তহবিল ব্যবস্থাপনায় সুশাসন ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দর কষাকষির ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন মহল থেকে তাই প্রশ্ন উঠেছে, কি হতে যাচ্ছে ওয়ারশ সম্মেলনে। সরকারের পরিকল্পনা, প্রত্যাশা কি! বাংলাদেশের এই মুহূর্তে করণীয় ও উদ্ভূত সঙ্কটগুলোর সুষ্ঠু সমাধানের পথ কি হতে পারে তা নিয়ে এই লেখা।

কি হতে যাচ্ছে!
আসছে ১৯তম জলবায়ু সম্মেলনে কি হবে এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। এর কারণটা হচ্ছে নতুন একটা চুক্তি। এর নাম লিগালি বাইন্ডিং এগ্রিমেন্ট বা আইনগত বাধ্যবাধকতা চুক্তি। কিয়োটো প্রটোকলের স্থলাভিষিক্ত হবে নতুন এই চুক্তি। কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের বিষয়ে একমত হয়ে কিয়োটো প্রটোকলে স্বাক্ষর করেছিল মাত্র ৩৫টি দেশ। কিন্তু নতুন চুক্তিটিতে সারা বিশ্বের সব দেশকে অন্তর্ভূক্ত করার চেষ্টা চলছে।

এবারের জলবায়ু সম্মেলনে এই নতুন চুক্তিটি নিয়ে আলাপ আলোচনা হবে। এর রূপরেখা চূড়ান্ত হবে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ২০১৫ সালের মধ্যে এই চুক্তির আওতায় সব দেশকে আনতে চান। ২০২০ সাল থেকে বা সম্ভব হলে তার আগেই এই চুক্তি কার্যকর করার জন্য চেষ্টা চলছে। এর বাইরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের কর্মকান্ড, অগ্রগতি, দাতা দেশগুলোর অর্থ ছাড় ও সবুজ জলবায়ু তহবিল নিয়ে এই সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত হবে। তবে এবার প্রধানত আলোচনায় থাকবে লিগালি বাইন্ডিং এগ্রিমেন্ট।

লিগালি বাইন্ডিং এগ্রিমেন্ট কি?
জাতিসংঘ সমর্থিত আন্তঃসরকার সংস্থা ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি) সম্প্রতি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতি নিয়ে আরো বেশি ব্যাখ্যা সম্বলিত একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। এটি তাদের পঞ্চম প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে এবং এভাবে বাড়তেই থাকবে। আইপিসিসি তথ্য প্রমাণ হাজির করে বলছে, ১৯০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বেড়েছে ০.১৯ মিটার। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, যদি এ মুহূর্তে সারা বিশ্বের কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করেও দেয়া হয়, তবুও পানির উচ্চতা বাড়তে থাকবে অন্তত আরো ১৫০ বছর। এতে করে বিলীন হবে উপকূলের বিরাট এলাকা।

১৯৭১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে সব ধরনের তাপমাত্রা বাড়ার হিসেব দিয়েছে আইপসিসির বিজ্ঞানীরা। বর্তমানে যেভাবে কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে তাতে করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আটকে রাখার চেষ্টা সফল হবে না বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এর পক্ষে আইপিসিসির বিজ্ঞানীরা নানা মডেল, যুক্তি দেখিয়েছে। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের জন্য তারা মানবসৃষ্ট কর্মকান্ডকেই দায়ি করেছেন। প্রতিবেদনটিতে দ্রুত কার্বন নিঃসরণ নি¤œ মাত্রায় নিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কিন্তু কোনোভাবেই বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের হার কমানো যাচ্ছে না। বরং দিনকে দিন তা বেড়েইে চলেছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের হার আগের চেয়ে ১.৪ শতাংশ বেড়েছে। পুরো বিশ্বে গত বছর নিঃসরণ ঘটেছে ৩১.৬ গিগাটন। ২০১০ সালে ৩০.৬ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে মিশেছে, যা ২০০৯ সালের চেয়ে ১.৬ গিগাটন বেশি।

লিগালি বাইন্ডিং এগ্রিমেন্ট মূলত কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। এখন পর্যন্ত এই চুক্তিতে বলা হচ্ছে, ১৯৯০ সালকে ভিত্তি সাল ধরে ২০৫০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বের প্রতিটি দেশকে কার্বন নিঃসরণের হার অন্তত ৯০ ভাগ কমাতে হবে। ২০৩০ এর মধ্যে অন্তত ৪০ ভাগ। সবার ওপর সমভাবে এই আইন প্রযোজ্য হওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ সব দেশকে নিজ নিজ দেশের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ২০৫০ সালেল মধ্যে ৯০ ভাগ কমাতে হবে। এতদিন বড় দেশগুলো এ চুক্তির ভেতর আসতে চায়নি। এর প্রধান কারণ ছিল চীন, ভারত ও ব্রাজিলের মতো উঠতি অর্থনীতির দেশগুলো। এই দেশগুলোর মোট কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ অনেক হলেও মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের হার তুলনামূলক কম।

উঠতি অর্থনীতির দেশগুলো যুক্তি দেখিয়েছে, শিল্প বিপ্লবের পর থেকে এতদিন পর্যন্ত উন্নত বিশ্বের দেশগুলো প্রচুর পরিমাণ শিল্প কারখানা গড়ে তুলে নিজেদের অর্থনীতির ভীতকে শক্তিশালী করেছে। এটা করতে গিয়ে তারা কার্বণ নিঃসরণ করেছে অনেক। উঠতি অর্থনীতির দেশগুলো তার সিকিভাগ কার্বনও এখন পর্যন্ত নিঃসরণ করেনি। অথচ এখনই যদি কার্বন নিঃসরণ প্রশমন করার উদ্যোগ তারা নেয় তাহলে তাদের অর্থনীতি বিরাট চাপে পড়বে। তাই কার্বন নিঃসরণ প্রশমনের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত কিয়োটো প্রটোকলে তারা স্বাক্ষর করেনি। এক্ষেত্রে ভারত তো আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছে ‘উই হ্যাভ রাইট টু পলিউট ফর ডেভেলপমেন্ট।’ বিপরীতে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোকে বলতে হচ্ছে, ‘উই হ্যাভ রাইট টু লিভিং।’

যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো যুক্তি দেখিয়েছে, চীন, ভারত যদি কার্বন নিঃসরণ না কমায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র একা কমিয়ে কোনো লাভ হবে না। সবাই একমত না হলে তারা এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আসবে না বলে জানিয়ে দেয়। কিন্তু আইপিসিসির পঞ্চম প্রতিবেদনের পর অনেকের টনক নড়েছে। এখন দৌড়ঝাঁপ চলছে কিভাবে সব দেশকে কার্বন নিঃসরণ প্রশমনের জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা যায়।

কিন্তু অনুন্নত বিশ্বের উঠতি অর্থনীতির দেশগুলো এই চুক্তির ফলে বিরাট অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা করছে, বাংলাদেশও যার বাইরে নয়। যদিও কার্বন নিঃসরণ বাংলাদেশ যা করে তা পরিমাণে অনেক কম। তথ্যমতে, বিশ্বের মোট কার্বনের ২৩ দশমিক ৫০ শতাংশ নিঃসরণ করে চীন। ১৮ দশমিক ২৭ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ করে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র। আর বাংলাদেশ করে মাত্র দশমিক ১৬ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ।

এত কম পরিমাণ কার্বন নিঃসরণকারি দেশগুলো আইনগত বাধ্যবাধকতার মধ্যে গেলে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না বলে সাধারণভাবে অনেকে মনে করেন। অনেকে মনে করেন বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলো যেহেতু অনেক কম কার্বন নিঃসরণ করে তাই আরো অনেক দূর পর্যন্ত কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো বাধা নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, লিগালি বাইন্ডিং এগ্রিমেন্টের ভেতর এলে আর সব দেশের মতো বাংলাদেশকেও কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। কিন্তু এখানে আশঙ্কার অনেক কারণ রয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্কট কোথায়
লিগালি বাইন্ডিং এগ্রিমেন্ট সবার জন্য ইতিবাচক একটি প্রস্তাব। কিন্তু সমভাবে সব দেশের ওপর বাধ্যবাধকতা চাপানো হলে আমাদের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলো চাপে পড়বে। বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণ এখনো প্রধানত কৃষিতে। এই কার্বন নিঃসরণ প্রশমন করতে গেলে খাদ্য উৎপাদন সঙ্কটে পড়বে। এই জটিলতা নিরসনের জন্য সিবিডিআর নীতির কথা বলা হচ্ছে। যার অর্থ হচ্ছে ‘সাধারণ কিন্তু ভিন্ন কর্তব্য ও সক্ষমতা অনুসারে দায়িত্ব’ (Common but differentiated responsibilities and respective capabilities – CBDR & RC) নীতি। এই নীতির কথা চুক্তিতে থাকলেও এ সংক্রান্ত কোনো আলোচনা কোথাও চোখে পড়ে না।

কপ-১৯ থেকে বাংলাদেশ যদি সিবিডিআর নীতির আলোকে নিজের পক্ষে একটি রায় বের করে না আনতে পারে তাহলে সঙ্কট তৈরি হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে জোর চেষ্টা চালাতে হবে। উন্নত দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণ প্রশমনের জন্য চাপে ফেলতে হবে। বাধ্য করতে হবে। বিপরীতে আমাদের ‘ভিন্ন কর্তব্য’টা জোর করে তুলতে হবে। কার্বন নিঃসরণ প্রশমন আমাদের কাজ নয়। বরং আমাদের কাজ হচ্ছে অভিযোজন। এটাকে সিবিডিআর নীতির আওতায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তদুপরি আমরাও কার্বন নিঃসরণ প্রশমন করব। তবে তা অবশ্যই আমাদের টেকসই উন্নয়নকে কেন্দ্রে রেখে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের দেশে এখন অনেক জলবায়ু উদ্বাস্তু তৈরি হয়েছে। এদেরকে রক্ষা করার জন্য আমাদের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী করতে হবে। সে বিষয়টা বারবার করে বলতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু উদ্বাস্তু তারা কেন হলো সেটাকে আলোচনায় এনে উন্নত বিশ্বের কাছে আরো জোর গলায় ক্ষতিপূরণ চাইতে হবে। তাদেরকে বাধ্য করতে হবে এই বাস্তুহারাদের দায়িত্ব নেয়ার জন্য। এটা ঠিকঠাক না করতে পারলে আমরা বিরাট সঙ্কটে পড়ব। সাধারণভাবে এই চুক্তিতে ঢুকলে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হবে। তাই কোনো ফাঁকফোঁকর রাখা যাবে না। সব কিছু পরিষ্কার করে আসতে হবে।

জলবায়ু উদ্বাস্তু প্রসঙ্গ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং কিভাবে এটা মোকাবেলা করা যাবে এ নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের অধিকাংশেরই দাবি, এ মুহূর্তে বাংলাদেশের উচিত জলবায়ু উদ্বাস্তু প্রসঙ্গটাকে সামনে আনা। কিন্তু সরকারের কাগজপত্রে বা আলাপ আলোচনায় এ বিষয়ে তেমন কোনো ভালো বক্তব্য নেই। এমনিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে বাংলাদেশ নদী ভাঙনের শিকার হচ্ছে। নদীর পানি বাড়ছে। জলাবদ্ধতা বাড়ছে। অতি বৃষ্টি অতি খরা, ঝড়, বণ্যার প্রকোপও দেশে বেড়েছে।

পরিবেশের এই আচরণের ফলে প্রচুর দরিদ্র মানুষ গ্রাম ছেড়ে বেঁচে থাকার তাগিদে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। এরাই হচ্ছে জলবায়ু উদ্বাস্তু। এই মানুষগুলো উদ্বাস্তু হয়েছে উন্নত বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের ফলে। সুতরাং এই মানুষদের দায়িত্ব তাদেরকে নিতে হবে। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। আমাদের শহরগুলো আরো বেশি ঘনবসতিপূর্ণ। এখন এভাবে যদি শহরে লোক বাড়তেই থাকে তাহলে আমাদের দারিদ্র্য আরো বাড়বে। উন্নত বিশ্বের উচিত এর জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়া। পাশাপাশি জমি হারানো মানুষদের তাদের দেশে জায়গা করে দিতে হবে।

এই জলবায়ু উদ্বাস্তু ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের তেমন কোনো গবেষণা নেই। অথচ সরকারের উচিত মাঠ পর্যায়ে গবেষণা চালানো। কত লোক প্রতি বছর উপকূল এলাকা থেকে শহরমুখী হচ্ছে। কোন কোন এলাকার জনসংখ্যায় পরিবর্তন কম। অর্থাৎ কোন দিকের মানুষ শহরে বেশি আসছে সেই জেলাগুলোকে শনাক্ত করতে হবে। তথ্য ও প্রমাণ সহকারে আসল চিত্রটা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে বলতে হবে, তোমাদের আরাম আয়েশের জন্য আমরা নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে নিঃস্ব হচ্ছি। তাহলে কার্বন নিঃসরণের ভয়াবহতা চাক্ষুস হবে এবং বাংলাদেশের সহায়তা প্রাপ্তির পথও সুগম হবে।

সরকার এখনো অপ্রস্তুত!
সবার কাছেই এটা স্পষ্ট যে, আসছে কপ-১৯ বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান কি হবে তা এখনো সরকার স্পষ্ট করতে পারেনি। এছাড়া জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ যেভাবে তার দল নিয়ে যায় এবং দলের মধ্যে যে ধরনের অনৈক্য দেখা যায় তাতে করে এই সম্মেলন থেকে বাংলাদেশ কিছু অর্জন করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সরকারের প্রস্ততি কি? আগামী সম্মেলনে সরকারের দাবি কি, সরকার কি বলবে এ বিষয়ে জানতে কথা বলেছিলাম জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সরকারের আন্তর্জাতিক সমঝোতাকারি দলের প্রধান এবং জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাষ্টি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক কাজী খলীকুজ্জামান আহমদের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘আমরা জলবায়ু পরিবর্তন প্রশ্নে আমাদের অর্জনগুলো তুলে ধরব। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণ প্রশমনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হবে। পাশপাশি ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়ে তারা যে টালবাহানা করছে তার সমালোচনা করা হবে। এবং এই ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে তাদেরওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে।’
লিগালি বাইন্ডিং এগ্রিমেন্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বক্তব্য কি থাকবে?
‘আমরা এ বিষয়গুলো চূড়ান্ত করছি। তবে এ জিনিসটা আমরা চাই। কিভাবে ককরলে আমাদের কোনো ক্ষতি হবে না সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
এবার কি কোনো নতুন প্রস্তাবনা বা বিষয় বাংলাদেশ হাজির করবে?
‘আমরা পোল্যান্ডে যাবার আগে আপনাদের এই সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাব। সাংবাদিক সম্মেলন করে সব জানানো হবে।’

সাধারণত দেখা যায়, বাংলাদেশ প্রতিবারই বিশাল দল নিয়ে জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেয়। যা কিছুটা দৃষ্টিকটু তো বটেই। একশ’রও বেশি লোক যায় বাংলাদেশ থেকে। বিশাল দল গেলেও বাংলাদেশ জলবায়ু সম্মেলনে তেমন একটা শক্ত ভূমিকা কোনোবারই নিতে পারেনি। যদিও সবার ধারণা ছিল, বাংলাদেশই হবে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে দরাদরির প্রশ্নে প্রধান কান্ডারি। কেননা এটা স্বীকৃত যে, বাংলাদেশ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ দেশ।

কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বিশাল দল নিয়ে জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেয়া ছাড়া বাংলাদেশ তেমন কোনো জোরালো ভূমিকা কখনোই পালন করতে পারেনি। এর মূল কারণ হচ্ছে, সরকারের দরকষাকষি দলের মধ্যে সমঝোতা না থাকা, সুশীল সমাজ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, প্রচার-প্রশিক্ষণ না থাকায় সম্মেলনে উপস্থিত সদস্যদের অজ্ঞতা, কি বলতে হবে না জানাটা। এসব কারণে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ নেতৃত্বের কাতার থেকে ছিটকে পড়ছে। তুলনামূলকভাবে এগিয়ে গেছে বলিভিয়া, ভেনিজুয়েলা, ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো। এই দেশগুলো থেকে ৬-৭ জনের বেশি লোক জলবায়ু সম্মেলনে কখনো যেতে দেখা যায়নি। কিন্তু তারা প্রতিটি সম্মেলনে খুব জোরালো ভূমিকা রাখে। অথচ বাংলাদেশকে সব সময়ে দেখা যায় মধ্যমপন্থী ভূমিকা নিতে। এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে না পারলে বাংলাদেশ এ থেকে বিশেষ কোনো সুবিধা আদায় করতে পারবে না। বরং সঙ্কটে পড়বে।

করণীয়
আসছে সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সরকারের করণীয় ঠিক করাটা এখন প্রধান কাজ। সাধারণত দেখা যায়, নিজেদের পক্ষগুলোর মধ্যে এত বেশি বোঝাপড়ার অভাব যে, বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তেই আসতে পারে না। আবার যা সিদ্ধান্তে আসে তা জোরালোভাবে উপস্থাপিত হয় না। তাই উচিত হচ্ছে, বাছাইকৃত নেগোসিয়েশন টিম আলাদা করা। ওই টিমের সদস্যদের উচিত সবার সঙ্গে বসে পয়েন্ট আউট করে কাজগুলো ঠিক করে নেয়া। টিমের সদস্যদের মধ্যে কাজগুলো ভাগ করে দিতে হবে।

সরকারের কাছে কিছু বিষয়ে সক্রিয়তা দাবি করছি। সেগুলো হলো-

  • বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কি কি প্রভাব পড়ছে তার একটা ভালো হিসাব উপস্থাপন করতে হবে।
  • জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার যেসব কাজ করছে তার খতিয়ান তুলে ধরতে হবে।
  • জলবায়ু প্রভাব মোকাবেলায় প্রধান সঙ্কটগুলো কোথায় তার একটা রূপরেখা তুলে ধরতে হবে।
  • কার্বন নিঃসরণ প্রশমনের জন্য উন্নত বিশ্বকে চাপ দেয়ার কৌশল সম্বলিত বক্তব্য জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
  • লিগালি বাইন্ডিং এগ্রিমেন্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বক্তব্য এবং সুস্পষ্ট দাবি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করতে হবে।
  • জলবায়ু উদ্বাস্তু সমস্যাকে বাংলাদেশ প্রধানভাবে হাইলাইট করবে। সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার ও দাবি বড় করে তুলে ধরতে হবে।
  • আন্তর্জাতিক তহবিলগুলো নতুন হওয়ার কথা থাকলেও তা নতুন হচ্ছে না, এ সংশ্লিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করে বিদেশিদের টালবাহানা উন্মোচন করতে হবে। অর্থপ্রপ্তির ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
  • স্বচ্ছ, দাদাগিরিমুক্ত, সহযোগিতামূলক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানাতে হবে।

এই কাজগুলো করার জন্যই সরকারকে এসব কাজে এতদিন ধরে যারা কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি শুধু চেয়ার আঁকড়ে বসে থেকেছে তাদের সরিয়ে উদ্যোগী লোকদের দায়িত্ব দিয়ে কাজটা এগিয়ে নিতে হবে।

আমার মনে হয়, অতীতের অনেক আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে বিশ্বের সবগুলো দেশের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। প্রথমদিকে অনেক নমনীয় মনোভাব নিয়ে এগুলেও ক্রমশ উন্নত দেশগুলোর টালবাহানা বাড়ছে। আগে তারা ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে চেয়েছে। এখন তারা দিতে চায় ঋণ। বিশ্ব অর্থনীতিতে নানা ধরণের চাপ আসছে। বড় অর্থনীতির অনেক দেশ, যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো নিজেদের কার্বন নিঃসরণ প্রশমনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। তাদেরকে গরীব দেশগুলোর ক্ষয় ক্ষতি মোকাবেলার সঙ্গে যুক্ত করাটাই এখন প্রধান কাজ।

জলবায়ু সম্মেলনে শক্ত অবস্থান নিয়ে, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব কিভাবে আমাদের ওপর পড়ছে তা সবার সামনে তুলে ধরে সব দেশকে এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাঠে নামানোটাই এখন বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ। কারণ বাংলাদেশ এই পরিস্থিতির প্রধান ভুক্তভোগী এবং এই পরিস্থিতি এককভাবে মোকাবেলার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। আবার শুধু তাদের দিকে চেয়ে থাকলেই হবে না। পাশাপাশি নিজেদের সমন্বিত একটা পরিকল্পনা দাঁড় করাতে হবে। এবং তা অবশ্যই নিজস্ব সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে। যেন নিজেদের মানুষগুলোকে রক্ষা করা যায়। কিন্তু আসলে তা কি হবে? নাকি সরকারে থাকা মানুষগুলো নিজেদের ভাগ বুঝে পেয়েই চুপ হয়ে যাবেন। সাধারণ হিসেবে তো তাই হওয়ার কথা। হয়ে আসছে।

—————————————–***

প্রয়োজনে এই দুটো লেখা দেখতে পারেন-

ভাগাভাগি হচ্ছে জলবায়ু তহবিলের টাকা

জলবায়ু তহবিল ঘিরে বিশ্বব্যাংকের ষড়যন্ত্র

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “বাংলাদেশ এখনো অপ্রস্তুত : আসছে কপ-১৯

    1. কি বিষয়ে তথ্যসূত্র দরকার,
      কি বিষয়ে তথ্যসূত্র দরকার, বলুন। দিতে পারব সবই। মূলত যে কোনো তথ্য পাবেন গুগলেই। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ওয়েবসাইটে। এর বাইরে বাংলায় গুগল করলেও অনেক রেফারেন্স পাবেন যা পত্রিকায় বিভিন্ন সময় ছাপা হয়েছে নানা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের সূত্র ধরে।

  1. অসাধারণ লিখেছেন আনিস ভাই।
    অসাধারণ লিখেছেন আনিস ভাই। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় তুলে ধরেছেন যেই ব্যাপারে কোন ধারনাই ছিলোনা। আশা করি সরকার এই বিষয়ে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে রাখবে সময়মত।

  2. গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়েই
    গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়েই আমাদের অজানা। আমারও এই বিষয়টা নিয়ে জানা ছিল না। আনিস ভাইয়ের মত কিছু ডেডিকেটেড ব্লগার আছে বলেই আমরা অভ্যন্তরের অনেক বিষয় সম্পর্কে জানতে পারি। আশাকরি সরকার এই সম্মেলনে বাংলাদেশের যোগ্য প্রতিনিধিত্ব করবেন।

  3. এই লেখার পাঠক এত কম!
    এই লেখার পাঠক এত কম! মন্তব্যের দারিদ্রতা দেখে হাসি পাচ্ছে। বাঙালী রাজনৈতিক গসিপ শুনতে ভাল পায়।

    অনেকদিন পর আনিস ভাইয়ের একটা ভাল লেখা পড়লাম। :থাম্বসআপ:

  4. পোস্টটা পড়ে বেশ কিছু জিনিস
    পোস্টটা পড়ে বেশ কিছু জিনিস জানলাম।এরকম বিষয়ভিত্তিক এবং সমৃদ্ধ পোস্ট আরো চাই।অভিনন্দন আনিস সাহেব।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

29 − = 21