খুঁজে পাওয়া প্রাণের স্পন্দন ও একটি প্রতিজ্ঞা

বইয়ের সাথে পরিচয় ও সখ্যতা সেই ছোটবেলা থেকে(পাঠ্য বই ভেবে ভুল করবেন
না কিন্তু)। বইয়ের প্রতি ভালবাসাটা অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছি।
বুঝতে শেখার পর থেকেই বইয়ের অরণ্য দেখে আসছি। আব্বা বাড়িতে যেখানেই
ফাঁকফোকর পেতেন সেখানেই আলমারি বসিয়ে তাঁর বইয়ের সংগ্রহ বাড়াতেন। আমার
এক দাদি আছে প্রায় ৭০ বছর বয়সী, কিন্তু এখনো উনি চশমা চোখে বই পড়েন।
পরিবারের আবহাওয়াই যদি এমন বইময় হয় আমি কি এর বাইরে যেতে পারি? যখন
থেকে অ, আ পড়তে শিখেছি তখন থেকেই বড়দের বই হাতে নিয়ে পড়তে চেষ্টা
করতাম, কিন্তু বেশিরভাগই বুঝতাম না। না বুঝলে কী হবে, আমার উৎসাহ কিন্তু

বইয়ের সাথে পরিচয় ও সখ্যতা সেই ছোটবেলা থেকে(পাঠ্য বই ভেবে ভুল করবেন
না কিন্তু)। বইয়ের প্রতি ভালবাসাটা অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছি।
বুঝতে শেখার পর থেকেই বইয়ের অরণ্য দেখে আসছি। আব্বা বাড়িতে যেখানেই
ফাঁকফোকর পেতেন সেখানেই আলমারি বসিয়ে তাঁর বইয়ের সংগ্রহ বাড়াতেন। আমার
এক দাদি আছে প্রায় ৭০ বছর বয়সী, কিন্তু এখনো উনি চশমা চোখে বই পড়েন।
পরিবারের আবহাওয়াই যদি এমন বইময় হয় আমি কি এর বাইরে যেতে পারি? যখন
থেকে অ, আ পড়তে শিখেছি তখন থেকেই বড়দের বই হাতে নিয়ে পড়তে চেষ্টা
করতাম, কিন্তু বেশিরভাগই বুঝতাম না। না বুঝলে কী হবে, আমার উৎসাহ কিন্তু
একবিন্দু কমত না। একটু আগে ভাগেই বইয়ের জগতে ঢুকে পড়েছিলাম। তিন
গোয়েন্দা, দস্যু বনহুর ধরি দ্বিতীয় শ্রেণীতে। সপ্তম-অষ্টম শ্রেণী
পর্যন্ত যেতেই রবীন্দ্র, শরৎ মোটামুটি ভেজে খেয়ে ফেলেছি। এরপর নবম
শ্রেণীতে উঠে সুনীল, সমরেশ, শীর্ষেন্দু, কিরীটি ধরি। আর হুমায়ুন
আহমেদ, জাফর ইকবালের বই পড়া তৃতীয় শ্রেণী থেকে যে শুরু হয়েছে তা আজ
অবধি চলছে। স্কুলে পড়ার সময় প্রতিদিন হাতখরচ পেতাম ১৫-২০ টাকা করে। এ
টাকাটা খরচ না করে ২-৩ দিনের টাকা জমিয়ে ২-৩ দিন পরপর তিন গয়েন্দা,
ফেলুদা এসব বই কিনতাম। স্কুল থেকে বাড়ি ছিল ৩ কিলোমিটার দূরে, সারাটা রাস্তা
হেঁটে যেতাম আর বই পড়তাম। বইয়ের সাইজ একটু ছোট হলে একদিনের হন্টন
অভিযানেই এক বই শেষ হয়ে যেত। আমাদের স্কুলে তিন গোয়েন্দা মহামারী আকারে
ছড়িয়ে পড়ে আমার হাত ধরেই। স্যার ক্লাস নিতেন আর আমি বইএর ভিতর গল্পের
বই রেখে পড়তাম। এর জন্য মাঝে মাঝে ঠ্যাঙানিও খাইছি। কত সিনিয়র-জুনিয়র
পোলাপান যে আমার কাছ থেকে বই নিত তার হিসাব রাখতে পারতাম না। বেশিরভাগ
বই-ই ফেরত পাইনি, তাই আমার কালেকশনে এখন গুটিকয়েক বই ছাড়া আর কিছুই
নাই।
বই পড়তে পড়তে দিন যেত আর প্রত্যেক বছর পত্রিকায় বইমেলা নিয়ে যত
খবর ছাপত সব পড়তাম। পড়ে পড়ে আফসোস করতাম ইস! কবে যে
যাব বইমেলায়। আব্বা এমনিতেই
মাত্রাতিরিক্ত বইপ্রেমের জন্য আমার
উপর খেপে ছিলেন, তার উপর যদি তাকে
বলি বইমেলায় যাব তাহলে তো আমার
দফারফা। আব্বার হাতে বহুত ঠাঙানি
খাইছি পাঠ্য বইয়ের ভেতরে গল্পের
রেখে পড়ার জন্য। এমনকি একবার
আব্বা ৫০টির মত পুড়িয়েও ফেলেছিলেন।
তাই তাঁর কাছে বইমেলায় যাওয়ার
অনুমতি চাওয়ার মত দুঃসাহস করিনি।
মনে মনে শুধু বলতাম-“দাঁড়া
ব্যাটা, ১৮+ হইয়্যা লই, তহন দেখমু
মেলায় যাওয়া কেমনে আটকায়া রাহস।”
অবশেষে ১৪ই ফেব্রুয়ারী আমার স্বপ্ন
পূরণ হল। ঐ দিন সদম্ভে
প্রথমবারের মত বইমেলায় আমার
উপস্থিতি জানান দিলাম। এক বন্ধুবরের
সাথে গেলাম স্বপ্নের বইমেলায়। উৎসাহের
আতিশয্যে আধঘন্টা আগেই মেলায়
উপস্থিত হলাম। আর মাত্র আধঘন্টা
পরেই আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে
এই খুশিতে বাক-বাকুম করতে শুরু
করলাম। মেলায় ঢুকে তো আমার
বেহুঁশ অবস্থা। মেলায় ঢুকেই আনিসুল
হক স্যারের কথার সত্যতা উপলব্ধি
করলাম-“বাংলা ভাষার চর্চা কোথায়
হচ্ছে দেখতে হলে যাও বাংলাদেশে,
বাংলার ভবিষ্যত কোথায়? ওই
বাংলাদেশে।” মেলায় প্রবেশ করেই
বুঝতে পারলাম এটাই আমার প্রাণের
জায়গা। এতদিন ধরে বইয়ের সাথে প্রেম
চললেও কোথাও কিছু একটার খামতি
থেকে যাচ্ছিল। অবশেষে এখানে এসে
টের পেলাম খামতিটা কোথায়
ছিল-“বইমেলায় আমার অনুপস্থিতি।”
এখানে না এলে এটা কোনদিনই জানতে
পারতাম না। অবশেষে আমার স্বপ্ন
পূরণ হল, সেই সাথে ফিরে পেলাম প্রাণের
সবগুলো স্পন্দন।
মেলায় ঢুকেই প্রথম যে কথাটা
মনে এসেছিল তা হল-“ধুর শালা! ক্যান
যে কোটিপতির পোলা হইলাম না।” জীবনে এই প্রথম বড়লোক বাপের পোলা না হওয়ার জন্য আফসোস হল। আপনারাই
বলুন এত সুন্দর সুন্দর বই দেখে কি
ওগুলোকে স্টলে রেখে আসা যায়? বই
উল্টেপাল্টে দেখি আর জিভের জল ফেলি। কিচ্ছু
করার নাইরে ভাই! আমি মিডলক্লাস, আর
মিডলক্লাস মানুষের জীবনটাই একটা
অভিশাপ। তাই সব বই কিনার স্বপ্ন
জলাঞ্জলি দিয়ে ৬টা বই কিনে বন্ধুবরের
চাপাচাপিতে মেলা থেকে বের হলাম,
যদিও আমার একদমই ইচ্ছা ছিল না। ইচ্ছা করছিল অনন্তকাল ধরে প্রাণের মেলায় হাঁটিতে থাকি। কিন্তু কি আর
করা, বাস্তবতা বড়ই নির্মম। তাই দিনশেষে ক্লান্ত-শ্রান্ত হইয়া নীড়ে
ফিরিতে বাধ্য হইলাম।
বইমেলা থেকে মনের আশ মিটিয়ে বই কিনতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু আজন্ম
লালিত স্বপ্ন পূরণ হওয়ার খুশি কিন্তু মলিন হয়ে যা। তবে মেলা থেকে
ফিরে এসে একটা প্রতিজ্ঞা করেছি-“বই কিনার জন্য হলেও আমাকে কোটিপতি হতে
হবে।”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “খুঁজে পাওয়া প্রাণের স্পন্দন ও একটি প্রতিজ্ঞা

  1. বই পড়া মানুষের সন্ধান পেলে
    বই পড়া মানুষের সন্ধান পেলে ভালই লাগে। বই মেলা নিয়ে আপনার অনুভুতি ভাল লেগেছে। এবার আমি মনে হয় মেলায় যেতে পারব না। ভাবতেই খারাপ লাগছে।

    বি.দ্র: লেখার শুরুতে স্বাভাবিক থাকলেও কিছু পরেই লেখাটা কবিতা আকার নিল কেন? বুঝলাম না।

    1. আসলে লেখাটি কোন স্টাইলে লিখব
      আসলে লেখাটি কোন স্টাইলে লিখব তা নিয়ে কনফিউশনে ছিলাম। তাই জগাখিচুরি পাকিয়ে গেছে। তাছ্ড়া খুব তাড়াহুড়া করে অল্প সময় নিয়ে লিখেছিলাম, এটাও একটা কারণ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 2 =