কতিপয় অনুভুতির পোষ্টমোর্টেম

আমাদের মানুষদের ভেতরটা একেকটা অনুভূতির বস্তা।আমাদের একেকজনের ভেতরটা যে কত শত অনুভূতিতে ভরপুর তার কোন ইয়াত্তা নাই। প্রত্যেকটা অনুভূতি আমাদের ভেতরে গাদাগাদি করে বাস করে,করতে হয়।তাদের একটা আবার আরেকটার সাথে ভয়ংকর রকম ভাবে সাংঘর্ষিক।তবু তারা সহ-অবস্থান বজায় রেখে চলেছে,চলতে হয়। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি ‘প্রান থাকলেই প্রানী হয়,কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না।’ ইদানীং এইটা সত্য মনে হয় না।উদ্ভিদের প্রান থাকা সত্তেও তারা প্রানী নয়,আবার অনুভূতিহীন সকলেই মানুষ হতে পারে না।বরং ব্যাপারটা এমনভাবে বলা যায় ‘প্রান থাকলেই জীব হয়,কিন্তু অনুভূতি না থাকলে মানুষ হয় না।’ আসেন আজকে কিছু বিভিন্ন ধরনের অনুভূতি দেখি।

ধর্মানুভূতিঃ ইহা একটি ম্যালিগন্যান্ট অনুভূতি।এই অনুভূতি প্রতিটা মানুষের ভিতরে স্পেশালী বাংগালীদের ভেতরে বিশেষ ভাবে অবস্থান করে। ম্যালিগন্যান্ট হলেও এটি অনেকের জন্যে ছোয়াচে,কাচের চাইতেও ভংগুর।তাই অল্পতেই আঘাতপ্রাপ্ত হয়,ভেংগে হয় চুরমার।মানুষ এই অনুভূতিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয় সবচাইতে বেশী ফেইসবুক থেকে,তারপর ইউটিউব।তাই সেজদারত পাহাড়,গাছ,মাছ,ফুল,পাখি,লতা-পাতা,এমনকি হিজাবরত রমনী দেখে ইহা জেগে ওঠে,আবার সামান্য ছবি শেয়ারকে কেন্দ্র করেও তা আঘাতপ্রাপ্ত হয়,ঘড়-বাড়ি জালিয়ে দেয়া হয়।

ছাগনুভূতিঃ ইহা প্রতিষ্ঠিত ছাগু,ছুপা ছাগু এবং ক্যালকুলাসের ভাষায় টেনস-টূ-ছাগু সবার মাঝেই দেখা যায়।এই অনুভূতি সাধারনত মুক্তিযুদ্ধ,আওয়ামীলীগ,যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং হালের প্রজন্মের আন্দোলন এর পক্ষে কিছু বললে আঘাতপ্রাপ্ত হয়।এমন সময় তারা কিছু ছকে বাধা কথা (নিন্দুকেরা যাকে ম্যা ম্যা বলে থাকে) উদগীরন করে।তার কয়েকটি নমুনা নিচে দেয়া হল

এতদিন পর পুরোন জিনিস ঘাটাঘাটি করার কি দরকার,দেশে আরো অনেক সমস্যা আছে

আমিও বিচার চাই তবে…

আমার বাবাও (অতি উতসাহী কেউ বলে আমার ১৪ গুষ্টী) মুক্তিযোদ্ধা,তাই বলে…

…জানি আমাকে ছাগু বলবেন,তবু আমি বলবই।আমি ভয় করি না

…পদ্মা ব্রিজটাই তো হইল না…

অনুসিদ্ধান্ত ১: ধর্মানুভূতি এবং ছাগনুভূতি খুব কাছাকছি বলে মনে হলেও এর মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান

লাইকানুভূতিঃ এই অনুভূতি সাধারনত উঠতি ফেসবুক সেলিব্রেটিদের ক্ষেত্রে দেখা যায়।মনে করেন আপনার কাছের কোন মানুষ ধীরে ধীরে সেলিব্রেটি হয়ে উঠছে।আপনি তার স্ট্যাটাসে লাইক না দিয়ে অপর কারো টায় দিলেন।তখন তার লাইকানুভূতি তে আঘাত লাগে।বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এটা সরাসরি প্রকাশ পায় না।তাই উক্ত ব্যাক্তির আপনার সাথে অন্য আচরনের দিলে খেয়াল রাখুন,বুঝতে পারবেন নিশ্চিত।

প্রেমানুভূতিঃ এইটা একটা ভয়াবহ অনুভূতি।এই অনুভূতি একই সাথে প্রচন্ড শক্ত এবং ঠুনকো।বলার অপেক্ষা রাখে না মানুষ মাত্রই প্রেমিক (উভলিংগ অর্থে।) তাই সবার মাঝেই এই অনুভূতি দেখা যায়। অনেকেই থাকে যারা একসাথে কয়েকটি প্রেম চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রচন্ড যত্ন,আন্তরিকতা নিয়ে,নিষ্ঠার সাথে।তাদের প্রেমানুভূতি শক্ত।আবার অনেকে আছে যারা একটি প্রেম করলেও বিপরীত লিংগের অন্য কারো সৌন্দর্যের দিকে তাকাতেই পারে না।তাদেরটা ঠুনকো।তবে উভয়ই স্বাস্থের জন্যে ক্ষতিকর।

ভালবাসানুভূতিঃ (ভালো বাসা নয়) একটু জটিল ধরনের অনুভূতি যার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।মনে করেন এক ছেলে ইকোনমিক্সে পড়ে সাথে শখের ফটগ্রাফার।ফটোগ্রাফি করে কাজটাকে ভালবেসে।আপনি তাকে বললেন ‘তুমি তো ইকোনোমিক্সের কিছুই জানো না?’ সে রাগ করবে না,বরং হাসবে।কিন্তু তাকে বলেন ‘তোমার ফটোগ্রাফি তো মোটামুটি,খুব আহামরি কিছু না।’সাথে সাথে তার ভালবাসানুভূতিতে আঘাত লাগবে,মুখটা হবে বাংলার পাচ।আবার মনে করেন একজন ডাক্তার ভালবেসে ব্লগ লিখে।আপনি বললেন “তুমি তো ডাক্তারির কিছুই জানো না।” দেখবেন কিছু বলবে না।কিন্তু বললেন “তোমার ব্লগ পড়লাম,কি লিখ এইসব?”দেখবেন প্রচন্ড মন খারাপ হবে।কিন্তু হওয়ার কথা ছিল উল্টো।বোঝা গেছে ব্যাপারটা?

অনুসিদ্ধান্ত ২: সকল প্রেমানুভূতি ভালবাসানুভূতি হলেও সকল ভালবাসানুভূতি প্রেমানুভূতি নয়।

ডাক্তারানুভূতিঃ এই ধরনের অনুভূতি সাধারনত নতুন ডাক্তারদের ক্ষেত্রে দেখা গেলেও জীবনের বাকে বাকে পোড় খাওয়া ডাক্তারদের মাঝে (প্রায়) অনুপস্থিত। সাধারনত ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কিছু বললে,ভুল চিকিতসা,কমিশনের গোমড় ফাস,রোগীদের প্রতি অবহেলা,চেম্বারের প্রতি আন্তরিকতা ইত্যাদি বিষয় সামনে এলে এই অনুভূতিতে তীব্র আঘাত লাগে।এই বিশয়ে কারো জানা না থাকলে বা পরীক্ষা করতে চাইলে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে একখান পোষ্ট দেন,বাকীটা আমার উপর ছেড়ে দেন।সুদে আসলে বুঝিয়ে দেয়া হবে ইনশাল্লাহ।

সাংবাদিকতানুভূতিঃ নাম দেখেই বোঝা যায় এটা সাংবাদিকদের মাঝে বিদ্যমান।হলুদ সাংবাদিকতার বিষয়ে দৃশ্যত চুপ থাকলেও জীবনমূখী বা পজিটিভ কোন নিউজ কাভার দিতে বললে অনেক সাংবাদিকের এই অনুভূতিতে আঘাত লাগে।তাদের বক্তব্য এটা ত পাবলিক খায় না।

অনুসিদ্ধান্ত ৩: ডাক্তারানুভূতি এবং সাংবাদিকতানুভূতি পরস্পরের ব্যাস্তানুপাতিক (জীবন থেকে নেয়া)।

ট্যাগানুভূতিঃ (ট্যাগ+অনুভূতি) এই অধুনা অনুভূতি বর্তমানে অনলাইন দুনিয়ায় ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সবাই এই অনুভূতি পাইতে চায়,এর ব্যাবহার করে অনলাইন দুনিয়ায় নিজেকে “হরিদাস পাল” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দ্যাখে।ট্যাগ প্রধানত দুই ধরনের। এক. ছাগু ট্যাগ আর দুই. ভাদা (ভারতীয় দালাল) ট্যাগ।তবে সবাই যে এই অনুভূতি পায় এমনটা না।অনেককেই দ্যাখা যায় ট্যাগানুভুতি পাইতে যায়ে উলটা ভোদাই বনে যায়।ব্যাপারটা দুঃখজনক।

সিগারেটানুভূতিঃ সকলের মাঝেই এই অনুভূতি আছে।সিগারেটের খারাপ দিক নিয়ে কিছু বললে,সিগারেট খাইতে মানা করলে,সিগারেট টানতে গিয়ে বাপের কাছে হাতে নাতে ধরা খাইলে ধুমপায়িদের এই অনুভূতিতে আঘাত লাগে।সর্বশেষ উন্মূক্ত স্থানে ধুমপানের বিধি-নিষেধ আরোপ করে আইন প্রনয়নের পর জাতীয় ভাবে ধুমপায়ীদের সিগারেটানুভূতিতে আঘাত লেগেছিল।পরবর্তীতে আইনটির প্রয়োগ না থাকায় সিগারেটানুভূতিতে আঘাত লাগে অধুমপায়ীদের।

এমনই বিচিত্র সব অনুভূতিতে পূর্ণ আমাদের জীবন।যা আমাদের মাঝে না থাকলে হয়ত জীবনটাই অসম্পুর্ণ হত।তাই মাঝে মাঝে মনে হয় মহাকাশ,সৌরজগত বা কৃষ্ণ-গহবর না সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে বিষ্ময়কর উপাদান ‘মানুষ’ ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “কতিপয় অনুভুতির পোষ্টমোর্টেম

  1. এইডা কি লিখস, পুরাই পাঙ্খা।
    :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে:
    এইডা কি লিখস, পুরাই পাঙ্খা। হাসতে হাসতে শেষ। আমি কুনুদিন ডাক্তারদের বিরুদ্ধে লিখে তোমার ডাক্তারুনুভুতিতে আঘাত দিমু না। প্রমিচ। :শয়তান:

  2. আমার ভালোবাসানভুতিতে,
    আমার ভালোবাসানভুতিতে, ডাক্তারানুভুতিসহ বেশ কিছু অনুভুতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে শয্যাশায়ী। :কানতেছি:
    এইটা কি লিখছ ম্যান? :bow: পইড়া হাসতে হাসতে ক্ষিদা লাইগা গেছে। :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে:

  3. চমৎকার একটি স্যাটায়ার পোস্ট।
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    চমৎকার একটি স্যাটায়ার পোস্ট। আপনি এখন পুরাদমের একজন ব্লগার। শেয়ার দিলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

77 + = 87