রাজনৈতিক অস্থিরতার ফাঁকে বিদেশ তোষণের চুক্তি!

বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেশ কয়েকবারই চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছেছিল। কিন্তু এই মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা আগেকার অস্থিতিশীলতার সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আগে হরতাল হলে তবু রাস্তা ঘাটে মানুষ নেমে পড়তো। এখন মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। গত ২৯ অক্টোবর শেষ হওয়া ৬০ ঘন্টার হরতালে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৮ জন। সারাদেশে ককটেল ফুটেছে অন্তত ১০ হাজার। থানা, আদালতও বাদ পড়েনি। আদালত কক্ষের কাগজপত্রে আগুন লেগেছে। লক্ষণ দেখে মনে হবে যেন গৃহযুদ্ধ!

তার পরেও আমরা সাধারণ মানুষ দমে যাইনি। হরতাল শেষ হওয়ার পর আবার ঠিকঠাক রাস্তায় নেমে এসেছি। আবার কাজ শুরু করেছি। আমাদের ব্যস্ততা আরো বেড়েছে। তিনদিন বন্ধ থাকা কাজকর্ম গুছিয়ে নিতে, যেসব কাজ পিছিয়ে গেছে সেগুলো এগিয়ে নিতে আমরা আগের চেয়ে আরো বেশি ব্যস্ত হয়ে গেছি। ব্যস্ততার সেই রাস্তা চিনে চিনে ঠিক আবার এসে হাজির হয়েছে হরতাল। আবারো ৬০ ঘন্টার হরতাল। এই হরতালও আগের সব হরতালের চেয়ে আলাদা। মানুষের আতঙ্কের শেষ নাই। সরকারি, বিরোধী, সুশীল সবাই জনগণকে ভয় দেখিয়েছেন (সতর্ক করেছেন)।

ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে বড় দুই জোট যতক্ষণ না কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারছে না ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষকে এই পরিস্থিতির মধ্যেই জিম্মি হয়ে থাকতে হবে। সাধারণত মানুষ যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকে, সচেতন থাকে, সেই বিষয়গুলোর দিকে এ রকম সময়ে তাকানোর সুযোগ পায় না। রাজনৈতিক অস্থিরতার ডামাডোলে অনেক কিছুই চাপা পড়ে যায়। সরকারও সেই সুযোগটা নিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।

বিতর্কিত তিনটি কাজ সরকার এই অস্থির সময়ে চুপেচাপে এগিয়ে নিচ্ছে। যারা এসব কাজকে দেশের স্বার্থবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে এতদিন আন্দোলনের মাঠে থেকে বা মতামত দিয়ে সরব ছিল, এখন তারা চাইলেও খুব বেশি কিছু করতে পারছেন না। তারা মাঠে নামলেও এ সময় জনতার সাড়া দেয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ রাষ্ট্রে জনগণের জীবনের নিরাপত্তা বলে কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নাই। সরকারের বাহিনী গুলি চালাচ্ছে। যারা ক্ষমতায় আসতে চায় তারা বোমা ফাটাচ্ছে। ফরহাদ মজহারের মতো বুদ্ধিজীবিরা সাংবাদিকদের বোমা মারাটাকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে হাজির করেছেন। আগামীতে এই কর্তব্যের আওতায় আরো অনেক কিছু চলে আসতে পারে।

সরকার অস্থির রাজনৈতিক অবস্থার এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে! অস্থিরতার ডামাডোলে এগিয়ে নিচ্ছে সুন্দরবন ধ্বংসকারি রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ, বিদেশি কোম্পানিকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে, আগের সব রেকর্ড ভেঙে অত্যধিক সুযোগ সুবিধা দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য দরপত্র আহবান করা হয়েছে, দেশের অর্থনীতিকে মার্কিনের হাতে বেঁধে ফেলার ভয়ঙ্কর চুক্তি টিকফা সম্পন্নকরণের কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। বিতর্কিত এই পদক্ষেপগুলো সবই বিদেশিদের তোষণমূলক কাজকর্ম। অনেক ইস্যুর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে এই খবরগুলো। দেখা যাক সরকার কি করছে।

১.
উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) সংশোধন করার পর গভীর সমুদ্রে ১২, ১৬ ও ২১ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আবারো দরপত্র আহ্বান করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য সংশোধিত পিএসসিতে বিদেশি কোম্পানিকে বেশ কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে। আগামী ১২ জানুয়ারি দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন।

নতুন পিএসসিতে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। যাতে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে বিরাটাকারে। আগের পিএসসি অনুযায়ী বিদেশি কম্পানি কস্ট রিকভারি বা উত্তোলন ব্যয় মেটানো বাবদ মোট গ্যাসের ৫৫ শতাংশ নিজেদের জন্য রাখতে পারত। নতুন পিএসসি অনুযায়ী ব্যয় মেটানো বাবদ তারা পাবে প্রাপ্ত গ্যাসের ৭০ শতাংশ। কস্ট রিকভারি সাধারণত বাড়তেই থাকে। আছে আরো ফাঁক ফোঁকর। বাংলাদেশ এই চুক্তির অধীনে গ্যাস পেলে ২০ ভাগ গ্যাসও পাবে না। এছাড়া গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। আগে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ছিল সাড়ে পাঁচ ডলার। এখন তা বেড়ে হয়েছে সাড়ে ছয় ডলার। প্রতিবছর এ দাম ২ শতাংশ হারে বাড়ানো হবে। আগের পিএসসি অনুযায়ী বিদেশি কম্পানিকে আয়কর দিতে হতো। সংশোধিত পিএসসিতে আয়কর মওকুফ করা হয়েছে।

২.
প্রস্তাবিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুরক্ষা কাঠামো চুক্তি (টিকফা) স্বাক্ষরের জন্য তারিখ ও স্থান ঠিক করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ জানাচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি মাসেই বাংলাদেশ এ চুক্তি স্বাক্ষরে আগ্রহী। মার্কিনের সঙ্গে সম্পর্কের দুরাবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য এই চুক্তিকে আওয়ামী লীগ খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। দ্রুতই তারা চুক্তিটি সেরে ফেলতে চায়। এই চুক্তির ফলে নির্বাচনী রাজনীতিতে মার্কিন ব্লককে আরো বেশি পাশে পাওয়ার আশা করছেন তারা।

সরকার বলছে, পণ্যের মেধাস্বত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে টিকফা চুক্তির খসড়ায়। বাংলাদেশ ও যক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত এ চুক্তিতে ঘুষ-দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বচ্ছতা এবং উন্নত শ্রমপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ও রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বাণিজ্য বৃদ্ধিতে দুই দেশ অশুল্ক বাধাগুলো দূর করবে। যে কোনো দেশ এ চুক্তি বাতিল করতে পারবে। কেউ বাতিলের নোটিশ দিলে ৬ মাস লাগবে তা কার্যকর করতে।

কিন্তু বারবার আমরা বলে আসছি, টিকফায় অসংখ্য জাতীয় স্বার্থ হানিকর অনুচ্ছেদ আছে। এগুলো হলো-
১) বাজার উন্মুক্তকরণ এবং সেবা খাতের ঢালাও বেসরকারিকরণ
২) উভয় রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য উদারনৈতিক নীতি গ্রহণ করবে
৩) বেসরকারি খাতের বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে
৪) দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমিশন’ প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল ও পরামর্শ সরবরাহ করবে
৫) যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যে বিনিয়োগ করবে, তা শুধু সেবা খাতেই। তারা কোনো পণ্য এ দেশে উৎপাদন করবে না
৬) যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য দেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক বাধাসমূহ দূর করতে বাধ্য থাকবে বাংলাদেশ
৭) নিজস্ব দেশীয় শিল্প বা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা প্রদানকারী বাণিজ্য সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ নীতি বাতিল করতে হবে
৮) যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মুনাফা বা পুঁজির উপর কোনো কর আরোপ করা যাবে না
৯) বিনিয়োগের বিশেষ সুরক্ষা দিতে হবে এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়া হলে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে
১০) দেশের জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর, টেলিযোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ইত্যাদি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে
১১) কৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্ত ও কৃষি থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে হবে
১২) মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে

মোটকথা, পুরোপুরি মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশকে টেনে নেয়ার ব্যবস্থা হবে এ চুক্তির মাধ্যমে। এর ওপরে থাকবে মেধাস্বত্ব নিশ্চিতকরণের জুজু। মেধাস্বত্ব ভঙ্গ করে পাইরেটেড কিছু ব্যবহার হওয়ার অভিযোগ তুলে তারা বিনিয়োগ আটকে দিবে। বা শুল্ক কর চাপিয়ে দেয়ার মতো ব্যবস্থা নিতে পারবে। আর এখনই যদি আমরা মেধাস্বত্ব অনুযায়ী এগোতে যাই, তাহলে সব কিছুর উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়বে ওষুধ ও আইটি খাতে। আইটি পণ্য ও ওষুধের দাম বেড়ে যাবে। আর তা না মানলে চুক্তি ভঙ্গের জন্য বাংলাদেশকে কঠোর পরিস্থিতির মুখোমুখি করাটা তাদের পক্ষে কঠিন নয়।

৩.
সুন্দরবন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের এত বক্তব্যের পরও সরকার থামছে না। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অনেকেই বলছেন, এই প্রকল্পে দেশের কোনো ক্ষতি হবে না। এই প্রকল্প তারা যেভাবেই হোক করবেন। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি লাল ক্যাটাগরির শিল্প। এটা শিল্পাঞ্চলের বাইরে লোকালয়ে বা বনের ধারে করার অর্থ হচ্ছে ওই এলাকাকে ধ্বংসের মুখে ফেলা। আর সরকারের মন্ত্রী, আবুল মাল আবদুল মুহিত বলছেন, পাইপ ২০০ মিটার করা হবে। এতে নাকি কয়লা পোড়া ছাই বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে গিয়ে পড়বে।

স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, সরকার অস্থির অবস্থার মধ্য দিয়ে এসব প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। স্বাভাবিক সময়ে এসব কাজ করা তাদের জন্য অনেকটা কঠিন ছিল। বারবারই সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সরকারের কিছু কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতনদের ব্যক্তিগত লাভালাভের ব্যবস্থার বদৌলতেই বিদেশিরা এসব সুবিধা পাচ্ছে। সুন্দরবন, পিএসসি বা টিকফায় পুরো লাভ বিদেশি কোম্পানির। তাদের লাভের ব্যবস্থা করার আগ্রহ আমাদের সরকারের কেন? এখানে লাভালাভের হিসাবটা খুবই স্পষ্ট।

কিন্তু সরকারকে পূর্বাপর বিবেচনা করতে হবে। দুনিয়ার অন্যান্য দেশের ঘটনাবলীর দিকেও নজর রাখা দরকার। যারাই এরকম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছে, তারা পরে এর ফল পেয়েছে। জনতা তার শত্রুদের ঠিকঠাক জবাবটা দিয়ে দিবেই। সরকার কি সেই হিসাবটি করছে? নাকি সেই একই ইতিহাস! ইতিহাস থেকে কেউ শেখে না!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “রাজনৈতিক অস্থিরতার ফাঁকে বিদেশ তোষণের চুক্তি!

    1. অন্যায় সবসময় অন্যায়। আমি
      অন্যায় সবসময় অন্যায়। আমি আওয়ামী লীগের সাফাই গাইছি না। কিন্তু সা.কা. চৌধুরী, কাদের মোল্লারা এদেশে আবার আরো বেশী দর্পের সাথে ঘুরে বেড়াবে, তা কি মেনে নেওয়া যায়? যেকোন চুক্তিই বাতিল করা যাবে। কিন্তু ১৯৭১ এ ফাকিস্তানের দোসর জামাতের পাশবিকতা কি ক্ষমা করা যায়? রাজাকার, আল-বদরের কুকুরগুলোর শাস্তির বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কি বলে?

  1. অনেক সময়োপযুগী একটা
    অনেক সময়োপযুগী একটা লেখা।সরকার তথা মহাজোট ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য প্রানপন চেষ্টা করে যাচ্ছে,তারই ধারাবহিকতায় খুব সম্ভবত এই বিদেশী তোষন চুক্তি করতে যাচেছ।এর বিরুদ্ধে সচেতন তথা দেশদরদী জনগনকে সোচ্চার হতে হবে।ধন্যবাদ ভাল থাকবেন।

  2. কি বলবো বুঝতে পারছি না।
    কি বলবো বুঝতে পারছি না। উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি), টিকফা কিংবা রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এগুলো সম্পর্কে আমরা সবাই কম বেশী জানি। কিন্তু আমরা যারা স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি, তাদের এখন শ্যাম রাখি না কূল রাখি অবস্থা। উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি), টিকফা কিংবা রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র যেমন আমাদের অর্থনীতি কিংবা পরিবেশগত ভারসাম্যকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তেমনি পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ভিন্ন অন্য রাজনৈতিক শক্তির উত্থান জামায়াত-শিবির আর হেফাজতের মত হায়েনাদের উত্থানের পথ সুগম আশংকা সৃষ্টি করছে। তবে একটা কথা, এবার যদি জামাতের হায়েনাগুলোকে নির্মুল করা না যায়, তাহলে জাতি আর এই ঐতিহাসিক গ্লানির অন্ধকার কেটে বের হতে পারবে না, এবং এর দায়ভার বহন করে বেড়াতে হবে আমাদের প্রজন্মকেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 1 =