একটি মেয়ে ও একটি প্রশ্ন

আমি যখন কোন মেয়ের সাথে কথা বলতে গেলে তার বাহ্যিক চেহারার প্রতি গুরুত্ব দেই তখন প্রচুর অপরাধবোধে ভুগি। এই অপরাধবোধ থেকে সামান্য মুক্তি পাওয়ার জন্য এ গল্পটা লিখা।

কিছুক্ষণ ধরেই বর্ষার মা একটানা ডেকে যাচ্ছে। বর্ষা তাতে খুব একটা সাড়া দিচ্ছে না। বর্ষা বিরক্ত হচ্ছে। বর্ষা জানে এ ডাকের বিশেষ কোন উদ্দেশ্য নেই। ওনার কাছে কোন একটা কারনে মনে হয় ফেসবুক বলতেই জীবননাশক একটা ব্যাপার। যেটা অবশ্যই বিকৃত ধারনা। অন্তত বর্ষার তাই মনে হয়।

বর্ষা বসেছিল ল্যাপটপের সামনে। ঝড়ের মত আঙ্গুল চালাচ্ছিল কী-বোর্ডে। তার মায়ের বিরক্তমাখা কথা আসছিল অন্য কোন একটা ঘর হতে। বর্ষা তাতে খুব একটা সাড়া দিল না। বর্ষা লুকুতে চায়। ঠিক এরকম একটা সময়ে বর্ষা ফেসবুকে ম্যাসেজ পেল।
“Virtual life isn’t real life”
এর রিপ্লাইয়ে সে সাধারনভাবে একটা কিছু লিখতে গিয়েও লিখল না। সে কী-বোর্ডে হাত রেখে স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে রইল ফোকাসহীনভাবে। সে ভাবতে লাগল। সে মনে মনে একটা কথা আওড়াল, ভার্চুয়াল লাইফ কেন হবে না একটা বাস্তবতা?
বর্ষা রিপ্লাই দিল, ‘হুম। কিন্তু কেন?’। এর উত্তরে খুব নির্বোধ একটা রিপ্লাই এল, ‘কারন এটা ভার্চুয়াল’
বর্ষা এই নির্বোধের সাথে কথা বলার আগ্রহ হারাল। ‘Virtual life isn’t real life’ কথাটা সে মুখস্ত করে এসেছে। সেভাবে বলতে গেলে, ‘Real life isn’t a real life also’। বাস্তবতা প্রমাণ করা যায় কি?

বর্ষা বিচরণ করে অনলাইন জগতে। একটা বনে যেভাবে এদিক ওদিক তাকিয়ে তাকিয়ে হাঁটে কৌতুহলীরা। স্নিগ্ধভাবে হাঁটে, ধরে, আবার হাঁটে। একটা কারনে ভার্চুয়াল লাইফ বর্ষাকে প্রবলভাবে কাছে টানে। বর্ষা এখনো জানে না যারা ভার্চুয়ালি এডিক্টেড তাদেরও একই কারন কিনা। বর্ষা বাস্তবতাকে হারাতে চায়। মানে আমরা সাধারণেরা যেটাকে বাস্তবতা বলি। বর্ষা কিভাবে নিশ্চিত হল, সে বাস্তবতাকে হারাতে এসেছে; বাস্তবতায় হেরে নয়? বর্ষা তেমন কোন কাজ না থাকলে যা করে তাই করল। মাইক্রোসফট ওয়ার্ড অন করল। নিজের মনের মত লিখতে শুরু করল।

“বাস্তবতা আমাদের কিভাবে দেখে? বাস্তবতায় আগে অগ্রাধিকার থাকে আমাদের শরীরের তারপর মনের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মন বিচারের মাপকাঠি হিসেবে থাকেই না। আর সেটা যদি একটা মেয়ে হয় তাহলে তো কথাই নেই। আর যদি আমার মত কুৎসিত হয়? আমি সুন্দর করে ভাবতে পারি, চিন্তা করতে পারি দ্রুত, মনও পরিস্কার রাখতে চেষ্টা করি। কিন্তু সেই আমি যখন একটা পার্টিতে যাই অথবা যাই বিয়ের অনুষ্ঠানে অথবা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এর কোনকিছু মূল্যায়িত হয় না। হবেও না। কারন আমরা প্রথমে দেখিই শরীরটাকে। তাই বিচার করতে চাই সেটা দিয়েই। ”

ফেসবুকে একটা ম্যাসেজ এল। বর্ষা টাইপিং রেখে ম্যাসেজ দেখতে গেল।
– কি অবস্থা জনাবা?
এটাই ছিল একটা ম্যাসেজ। চ্যাট ট্যাবে এসেছে। বর্ষা একটু হাসল। ছেলেটাকে তার ভাল লাগে। কথার ভেতর গভীর একটা চিন্তার ছাপ পাওয়া যায়। যখন মজা করে তখনও ছাপটা থাকে। বর্ষা রিপ্লাই দিল,
– অবস্থা ভাল। আপনার?
– জ্বি। ভাল। 
বর্ষা এমনিতেই তাকে লিখা বাক্যটাকে ছেলেটিকে কপি করে দিল
– Virtual life isn’t real life
– মানে কি?
– তোমার ইংরেজি বুঝার কথা।
– অর্থ তো বুঝলাম। শানে নুযূল কি?
– এটাই। একটা বিবৃতি বলতে পার।
– ও আচ্ছা।
– :/
– পুরোপুরি ঠিক না বাক্যটা। ভার্চুয়াল লাইফটা রিয়েল লাইফেরই বিস্তৃত একটা ভার্সন। ভার্চুয়াল লাইফে তুমি রিয়েলিটি ধারন করেই ঢুকো। অথবা সেভাবেই নিজেকে তুলে ধরো।
– হুম।
– আমাদের একটা কথা মুখস্ত হয়ে গেছে। এমন ভাব করি ভার্চুয়াল লাইফ মানেই অগুরুত্বপূর্ণ এবং অবাস্তব। কিন্তু সেটা বিশ্বাস করি না। আমাদের কাছে যেটা লাইফ সেটাই রিয়েলিটির অংশ।
– স্বপ্ন?
– তুমি ঘুমের ভেতর যে স্বপ্ন দেখ সেটা রিয়েলিটির অংশ না। রিয়েলিটিও না। সেটা লাইফের একটা অংশ তবুও লাইফ না। তবে জীবন নিয়ে যে কল্প স্বপ্ন দেখবে সেটা রিয়েলিটির অংশ।
বর্ষা একটা হাই তুলল। গ্লাসে পানি ঢালল। স্ক্রীনের দিকে ভ্রু কুচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। ছেলেটাকে তার এজন্যই ভাল লাগে। কথা বলে একটা আনন্দ পাওয়া যায়। এখন ফেসবুক ভরে গেছে ‘হাই, হ্যালো’ মানুষে। ছেলেটা তাকে আরেকটা টেক্সট দিল।
– তোমার প্রোফাইলে একটাও ফটো নেই কেন?
– এমনি। চেহারা কি গুরুত্বপূর্ণ?
– নাহ। একদম না।
– তাহলে?
– আমরা একটা রুপ দিতে চাই। কল্পনা করতে চাই। এজন্যই।
– ফেসবুকে কেউ আমার ফটো দেখতে চাইলে তাকে আমার ছোট মনের মানুষ মনে হয়।
– আমি সরি।
ছেলেটি অফলাইনে চলে গেল। রাগ করল? এই ছেলেটা রাগ করলে বর্ষার খারাপ লাগবে। কারন ছেলেটা ভাল। বর্ষা তাই জানে আপাতত। বর্ষা আবার মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে ঢুকল।
“বাস্তবতায়…”
বর্ষা কেটে ফেলল শব্দটা। লিখল,
“অবয়বভিত্তিক বাস্তবতায় মন হয়ত প্রথম দেখায় দেখা যায় না কিন্তু সেটাই দেখার চেষ্টা করা উচিত না? আমি আর তৃণ যখন কোথাও যাই গুরুত্ব পায় সেই তৃণ-ই। আমি মোটেও তাকে হিংসা করি না। কিন্তু আমি মাঝে মাঝে কষ্ট পাই। কোন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার আগে আগে ফোন পাবে সে। আমি তৃণকে অপমান করছি না। যা দেখছি তাই বলতে চাইছি।
আমি ক্লাস নাইনেই বুঝতে পেরেছি কিশোর-কিশোরীর, যুবক-যুবতীদের মাঝে বন্ধুত্বে যতটা না থাকে স্বতস্ফুর্ততা এর চেয়ে বেশি থাকে অবদমিত যৌনতা। নারী পুরুষের সম্পর্কে প্রচ্ছন্ন হলেও যৌনতাবোধ থেকে যায়। কারন নারী পুরুষকে দেখে পুরুষ-ই এবং পুরুষ নারীকে দেখে নারী-ই। আমাদের চোখ শুধু মানুষ কখনোই দেখে না। আমাদের প্রবৃত্তি সেটা দেখতে প্রস্তুত নয়। একটা অচেনা ছেলে যখন আমাকে ম্যাসেজে ‘হাই’ লিখে এর এক শতাংশ জুড়ে হলেও থাকে যৌনসঙ্গি খোঁজার প্রবনতা। শুনতে খারাপ লাগুক, কিছু করার নেই।
আমি ফেসবুক পছন্দ করি যখন আমাকে দেখতে হলে দেখে আমাকে-ই। আমাকে মূল্যায়ন করা হয় আমি যেটা দিয়ে মূল্যায়িত হতে চাই। তাই আমি একটা ফটোও আপলোড করি নি”।

একটা ম্যাসেজ এল। বর্ষা চ্যাক করতে ফেসবুকে ঢুকল।
– এরকম কোন কারন নেই তোমার চেহারা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যার কথা শুনি তাকে ঠিকভাবে কল্পনা করার ইচ্ছে আমাদের সবারই হয়।
– Don’t be offended । আমি ঠিক তোমাকে উদ্দেশ্য করে বলিনি কথাটা। you are my good friend।
– থ্যাংকস। তুমিও।
– সত্যি কথা বলতে কি, চেহারার প্রতি আমার একটা হীনমন্যতাবোধ কাজ করে। আমি তো সুন্দর না !
– তুমি তেমন তুমি যেমন। এটাই। তোমার ইনার সাইডটা ভাল তো?
– চেষ্টা করি ভাল রাখার 
– তোমার ফটো আমি আর চাইব না।
– দিব একদিন।
– যখন তোমার ইচ্ছে হয়। আমি যাই। একটা কাজ সেড়ে আসি।
– কি কাজ?
– 😉
– ?
– 😉 ত্যাগ
– 😀 গো কুইকলি।
বর্ষা আবার চলে গেল তার ওয়ার্ড ডকুমেন্টে।

“আমি এটা কখনোই বলব না যে ছেলে মেয়ের মধ্যে প্রচ্ছন্ন যৌনতাবোধ খুব খারাপ। এটাই প্রবৃত্তি। ব্যাপারটা অবচেতনেই থাকে সবসময়। এই বন্ধুত্বটা ভাল-পরিচ্ছন্ন থাকে কারন এর ভেতরেই থাকে নির্মোহ বন্ধুত্ব, মানবিকতা…… এগুলো ওগুলো। তখনই আমার কাছে খারাপ লাগবে যখন সচেতনভাবেই কাজ করবে যৌনতাবোধ কাজ করবে আর এটিই হবে মূল চালিকাশক্তি। যদিও জানি না ঠিক কোন কারনে খারাপ মনে করব”

এবার লিখা রেখে বর্ষা ক্ষাণিক্ষণ চিন্তা করল। একটা সময় যখন সে ফ্রয়েড পড়লো এর অনেক কিছুই মানতে পারত না। আর এখন অনেক কিছুই অস্বীকার করতে পারে না। এর অনেক কিছুই এখন সে বিশ্বাস করে এবং সেগুলো দিয়েই জীবন ব্যাখা দেয়। বর্ষার খুব ঘুম পেল। বর্ষা ল্যাপটপটা অফ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

রাত দুইটা।
ল্যাপটপের কী-বোর্ডে বর্ষার আঙ্গুল চলছিল ঝড়ের মত। রাতে ইউজার বেশি থাকে অনলাইনে। সারাদিন কাজ করা একটা ব্যাস্ত মানুষ রাতে এসে ফেসবুকটা উকি মেরে যায় বাস্তবতাটাকে হারাতে চায় বলে। বর্ষার বিচিত্র ধরনের মানুষ ভাল লাগে। সবার মনোজগতে একটা উকি মারতে চায়। বর্ষা যদি সুন্দরী হত তাহলে অনেকের সাথে দেখা করত। অপরিচিতদের সাথেও। ‘তখন ২৩’ সিনামাটার একটা চরিত্রের মত। যখন খুব নিঃসঙ্গতায় ভুগবে কেউকে ম্যাসেজ দিবে, ‘would you meet me within ten minutes?’ এর ভেতরই থাকবে হাজার ধরনের মানুষ। ভাল-খারাপ-দার্শনিক-বখাটে-ক্ষ্যপাটে-খুনী-সন্ত্রাসী-বুদ্ধিমান-বোকা……। বর্ষার মনে হল আমি এদের সাথে দেখা করছি না কারন আমি কুৎসিত। বর্ষার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কেন এটিই কারন হবে? আমি কেন হীনমন্যতায় ভুগবো? আমি কি হেরে যাচ্ছি? নাকি মেনে নিচ্ছি?

– আপনি ঘুমান না কেন শুনি জনাবা?
ম্যাসেজটা এল সেই ছেলেটার কাছ থেকে। বর্ষা কয়েকটা ট্যাব বন্ধ করে রিপ্লাই দিল,
– আমার ঘুম কম। তুমি কি করছ?
– কী-বোর্ড প্রেস করছি।
– 
– 
– শোন।
– বল।
– আমি আমার একটা ফটো পাঠাচ্ছি তোমায়।
– 
– তাতে তোমার কল্পনা করতে সুবিধা হবে 😀
– হু হবে 😛
কিছুক্ষন পর……

– এই একটাই আছে।
– চশমা পড়ো তুমি? জানতাম।
– হুম পড়ি।
– স্কুল শিক্ষিকা। :p
– :/ আমি সুন্দর না জানি।
– নাহ, তোমার চেহারায় একটা পবিত্রতা আছে।
– বাদ দাও।
এরপর দিন……

বর্ষা ছেলেটিকে একটি ম্যাসেজ পাঠাল
“কোথায় আপনি জনাব?”
এর তিনঘন্টা পর রিপ্লাই আসল, “বাইরে। কি অবস্থা আপনার জনাবা?”
বর্ষা সাথে সাথেই আবার রিপ্লাই পাঠাল, “অবস্থা ভাল”
এরপর আর কোন প্রতুত্তর আসল না। বর্ষা অপেক্ষা করল সে আর কোন প্রশ্ন করে কিনা তার জন্যে। প্রশ্ন ছাড়া চ্যাট শুরু হয় না।

রাত দুইটা,
বর্ষা ম্যাসেজ করল,
“ঘোরাঘুরি শেষ তো? নাকি এত রাতেও ঘুরাঘুরি?”
সাথে সাথেই এর রিপ্লাই,
– নাহ, খুব ক্লান্তিকর একটা দিন গেল। এখন শুয়ে। কি করো?
– আমিও শুয়ে।
………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………
অনেক্ষন পর বর্ষা আবারও টেক্সট দিল,
– ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?
……………………………………………………………………………………………………………… ……………………………………………………………………………………………………………… ……………………………………………………………………………………………………………… ………………………………………………………………………………………………………………
– ওহ! রিপ্লাই দিতে দেরী হল। মোবাইল রেখে একটা কাজ করছিলাম। এখুনি ঘুমিয়ে পড়ব।
– ও আচ্ছা। আমার তো আবার ইনসোমনিয়া ! :p
বর্ষা কয়েক সেকেন্ড স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে চলে গেল অন্য ম্যাসেজিং-এ। সে ছেলেটার কাছ থেকে সে রাত্রে আর কোন রিসপন্স পেল না।

এরপর দিন……
এরপর দিন……
এরপর দিন……
এরপর দিন……

বর্ষা পেল একটা ম্যাসেজ,
“কেমন আছেন জনাবা? আপনাকে দেখা যায় না !
বর্ষা সাথে সাথে রিপ্লাই করল,
– আমাকে দেখা না যাওয়ার কোন কারন নেই। সারাদিন থাকি।
– ও… আমি ইদানিং ব্যাস্ত হয়ে পড়েছি।
– ও আচ্ছা। তো আমাকে বললে কেন যে আমাকে দেখা যায় না?
– এমনিতেই। একটা কিছু দিয়ে শুরু তো করতে হয় !
– এজন্য একটা ব্লেইম দিয়ে?
– এটাকে ব্লেইম হিসেবে দেখছ কেন? নরমালি নাও !
– আমরা তখনই দুষ্টুমীর ছলে অন্যকে ব্লেইম দেই যখন আমরা কিছু একটা (নিজের ত্রুটি মূলত) ঢাকতে চাই।
– মানে কি?
– তুমি তোমার কৃত্রিম আগ্রহটা প্রকাশ করনি?
– আজব !
– আজব কিছুই না। তুমি খুব বুদ্ধিমান ছেলে। তোমার খুব দ্রুতই বুঝার কথা আমি কি বলতে চাচ্ছি। আর আমি জানি তুমি ঠিকই বুঝে ফেলেছ।
– তোমার সমস্যাটা কি জান? তুমি বেশি সিরিয়াসলি নাও।
– নাহ, আমি জিনিসটা যেরকম মূলত সেরকমই দেখতে চাই। ঠিক না?

বর্ষা টাইপ করা থামিয়ে দিল। ব্যাপারটা এভাবে বলা উচিত হয়নি। বর্ষা খুব সূক্ষভাবে রেগে গিয়েছিল। যদিও তার রাগার কোন অধিকারই নেই এখানে। কি দরকার ছিল রিএক্ট করার? বর্ষার মনে হচ্ছে এটা অভদ্রতা হয়ে গেছে। বর্ষার হয়ত ভাল লাগেনি আগে যিনি আগ বাড়িয়ে কথা বলতেন তার এখন ব্যাস্ততার কৈফিয়ত। বর্ষা মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে লিখল,

“শুনলে খারাপ লাগবে কিন্তু এটা বোধয় মিথ্যে হবে না যে, মানুষের ভেতর জীবনসঙ্গী খোঁজার তাগিদ একেবারে ভেতর থেকে। আরো খোলামেলাভাবে বলতে গেল ‘যৌনসঙ্গি’ খোঁজার তাগিদ। আমিও হয়ত খুঁজি। দুঃখিত, হয়ত বলছি কেন? আমি খুঁজছি সবারই মত। চেতনে – অবচেতনে।
যেই ছেলেটাকে ফটো দিলাম, কিছুদিন আগেও বলেছিল যে চেহারা গুরুত্বপূর্ণ না। সে অবশ্যই এটা বিশ্বাস করে। কিন্তু তার গভীরের প্রবৃত্তি কি সেটা মেনে চলে? ছেলেটার কথা হয়তো তার চেতনার আদর্শ কিন্তু প্রবৃত্তির আদর্শ তো নয়। ফটো পাঠানোর আগে সে আমাকে কিরকম কল্পনা করেছিল? তাতে তার মিশে ছিল কামনা। হতে পারে শব্দটা আরো বিস্তৃতভাবে কামবোধ। পাউলো কোয়েলহো তাঁর একটা উপন্যাস ‘এলিভেন মিনিটস’-এ বলেছিলেন, “আমরা যা দেখি তা কামনা নয়, আমরা যা কল্পনা করি তা কামনা”। কল্পনার সময় কুৎসিত জিনিসটাও সর্বোচ্চ সুন্দর হয়ে আসে। আমি কামনা ছিলাম দেখার আগে। পরে নয়”।
বর্ষা লিখা বন্ধ করল। যা লিখতে চাইছে তা পারছে না। সরে সরে যাচ্ছে মূল জিনিসটা থেকে। বর্ষা অবশেষে একটু বড়ো করে বোল্ড হরফে লিখল,

“আমরা ভাল মনে করি ভাল মনটিকে,
আর ভালবাসি ভাল অবয়বটিকেই”

রাত দশটা।
এসময় বোধ হয় ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি মানুষ অনলাইনে থাকে। বর্ষা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে হীনমন্যতায় ভুগবে না। সে সত্যিকার অর্থে এতদিন নিজেকে নিজেই অবমূল্যায়ন করেছে। না হলে কিসের এত লুকিয়ে থাকা? সেতো পৃথিবীতে লুকোতে আসেনি। সে এসেছে নিজেকে মেলে ধরতে। তার যা আছে তাই সে গর্বের সাথে তুলে ধরবে। সে সবকিছু দেখতেই আসেনি, দেখাতেও এসেছে। কেউ তাকে যদি ভুল কিছু দিয়ে মূল্যায়ন করে সেটা নিশ্চয় তার ব্যার্থতা নয়; অন্যের। সে আজ নিজেকে মূল্যায়ন করবে নিজের মত।

এর প্রথমবারের মত বর্ষা ফেসবুকে নিজের একটা ফটো আপলোড দিয়ে প্রোফাইল পিকচার করল। যে ম্যাসেজে ‘হাই’ দিয়ে ফিরে যাবে ফটো দেখে সে দায় নিজেরই। যে ফিরে যায় সমস্যা তারই।
প্রোফাইল পিকচার বানানোর এক মিনিটের মাঝে একটা ম্যাসেজ পেল বর্ষা। সেই ছেলেটির কাছ থেকে।

“ঠিক এখন থেকেই আমি তোমাকে সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা করি। এবং আমি এটিই চাই”
বর্ষা বেশ কিছুক্ষন ভেবে খুব স্নিগ্ধভাবে কী-বোর্ড টিপে লিখল, “ধন্যবাদ”
ছেলেটির দেয়া শেষ ম্যাসেজটি বর্ষার কাছে হয়ে রইল আধো রহস্যময় ও একটি বিরাট প্রশ্ন। সে তার ফটো তে তাকিয়ে একটি পবিত্র মুখ দেখতে পেল কিংবা দেখতে পেল ছেলেটি কিংবা আমি। কে দেখে না? কে ব্যর্থ? সে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে আমাদেরই এবং আমাদেরই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৮ thoughts on “একটি মেয়ে ও একটি প্রশ্ন

  1. ভাই আপনার লেখার পাঙ্খা হইয়া
    ভাই আপনার লেখার পাঙ্খা হইয়া গেলুম । সত্যিই অসাধারন লেখেন আপনি । :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    1. অনেক ধন্যবাদ। আপনার প্রোফাইল
      অনেক ধন্যবাদ। আপনার প্রোফাইল ফটোর বাচ্চাটাকে দেখলে আমার পা নিশপিশ করে। মনে হয় আমি বলটা লাথি দিতে যাচ্ছি। যাই হোক, আপনি দাদা একটা বই নিয়েই ছাড়বেন দেখা যাচ্ছে । :p হা হা হা হা

  2. অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে
    অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে বর্ষার মাঝে আমার ছায়া দেখলাম যেনো
    :তালিয়া: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  3. খাঁটি সোনা চিনতে আমার ভুল
    খাঁটি সোনা চিনতে আমার ভুল হয়নি। আপনি অন্যরকম একজন লেখক। মানুষের মনস্তত্ত্ব আমার আগ্রহের একটা বিষয়। আর বরাবরই আপনি সেই বিষয়টা নিয়েই লিখছেন। আপনার নগন্য এই পাঠকের অভিনন্দন গ্রহন করুন। এই লেখাটা অন্যরকম মাত্রা পেয়েছে। চমৎকার ভাবে একটা চরম সত্যকে তুলে এনেছেন গল্পের এবং প্রবন্ধের মিশেলে।
    শুনতে বাজে লাগলেও এটাই চরম সত্যি- আমরা চেহারা দিয়েই মানুষকে মূল্যায়ন করি বেশী। অথচ এই গুনটা প্রকৃতি প্রদত্ত। যে গুনগুলো মানুষ নিজে নিজে চর্চার মাধ্যমে অর্জন করে সেটার মূল্যায়ন আমরা করি- তবে অনেকটা বাধ্য হয়েই।

    “আমরা ভাল মনে করি ভাল মনটিকে,
    আর ভালবাসি ভাল অবয়বটিকেই”

    1. আতিক সাহেব, একটা সত্যি কথা
      আতিক সাহেব, একটা সত্যি কথা বলি, আপনার একটা কমেন্ট এত ইনকারেজিং যে আপনি না থাকলে আমি হয়তো ইস্টিশনে লিখতামই না। আপনাকে ধন্যবাদের চেয়ে অনেক বড় কিছু দিলাম।

      1. নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। আপনার
        নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। আপনার প্রতি অনুরোধ, আপনি লেখা থামাবেন না। একদিন আপনি খুব বড় মাপের লেখক হতে পারবেন। আপনার মধ্যে সম্ভাবনা আছে, সেটাকে কাজে লাগান। :ফুল:

  4. জানি খুব কমন পড়ে যাবে…
    তবুও

    জানি খুব কমন পড়ে যাবে…
    তবুও বাস্তবতা হচ্ছে- আমি “ঐ ছেলেটার” মধ্যে নিজের ছায়া দেখতে পাচ্ছি!
    যেমনটি “নন্দিনী” আপু দেখলেন বর্ষার মধ্যে…

    এটাই হয়তো একটা লেখার সার্থকতা! ‘শীর্ষেন্দু’কে ভালো লাগে ঠিক যে কারণে!

    তাহলে কি দিন দিন গাজী ফাতিহুন নূর-ও একজন সার্থক লেখক হয়ে যাচ্ছে?
    🙂

    শুভকামনা রইলো।

      1. হোয়াট ডু ইউ মীন বাই “পোংকটা
        হোয়াট ডু ইউ মীন বাই “পোংকটা মার্কা চাহনী”???

        আনাম একটা পোস্ট লিখছো, যার বিষয়বস্তু- চেহারা ব্যাপার না, মনটাই আসল!
        আর কমেন্টে পোংকটা- অপোংকটা বিচার করতেছো!!!
        আজিব!
        :মাথাঠুকি:

  5. ” যৌনসঙ্গি খোঁজার প্রবনতা
    ” যৌনসঙ্গি খোঁজার প্রবনতা ”
    ———— অবচেতনভাবে চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়তো তাই কিন্তু বিষয়টা ” নারী সঙ্গী খোঁজার প্রবণতা ” আমার কাছে যথার্থ । নারী – পুরুষের শাশ্বত যৌন আকর্ষণ এর কথা মাথায় নিয়েই বলছি ।

    ” ছেলেটার কথা হয়তো তার চেতনার আদর্শ কিন্তু প্রবৃত্তির আদর্শ তো নয় ”
    ————————- এইটা আপনি একশত ভাগ ঠিক ধরেছেন ।
    ” আমি কামনা ছিলাম দেখার আগে। পরে নয়”।”
    ————- এটা অস্বাভাবিক না ।
    —- চমৎকার লেখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ !

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 11 = 20