ওরা আসবে চুপিচুপি।

১৯ শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৫২…
মা,
কেমন আছো তোমরা সবাই ? তোমার শরীরটা ভালো তো ? বেশিদিন আর কষ্ট করতে হবে না তোমাকে। আর কিছুদিন তারপরই চাকরি পেয়ে যাবো, মুছে দিবো কষ্টগুলো। অনেকদিন হয়ে গেলো তোমাদের দেখি না। ক’দিন পরই বাড়িতে আসবো আমি । খুব দেখতে ইচ্ছা করছে তোমাদের। মা, তোমার রান্না কতদিন খাই না । এবার এসে পেট ভরে খাবো । ভালো থেকো তোমরা সবাই ।
ইতি
তোমার( )

২১শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৫২…..

সকাল ১০টার দিকে ওরা সবাই মিলিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাম্পাসের সামনে। সবাই মিছিল সাজাতে শুরু করে। সময় বাড়ার সাথে মিছিলও বড় হতে থাকে। পুরো মিছিল জুড়ে ” রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ” , ” উর্দু ভাষা নিপাত যাক ” সহ নানা ধরনের প্ল্যাকার্ড। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা জুড়ে উত্তেজনার স্পর্শ ।

ওদের অনেকেই মিছিলের একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে যায়। মিছিল শুরু হতে হতে প্রায় ঘণ্টা খানেক লেগে যায়। এরপর শ্লোগানে মুখরিত হতে থাকে চারিপাশ। প্রতিটি সারি চিৎকার করে বলে ” রাষ্ট্রভাষা রাষ্ট্রভাষা।” তারপর বাকিরা একসাথে চিৎকার করে বলে ওঠে, ” বাংলা চাই, বাংলা চাই।” সবাই একই ছন্দে তাল মেলাতে থাকে ।

মিছিল আস্তে আস্তে এগিয়ে যায়। সবার মাঝেই অসম্ভব দৃঢ়তা কাজ করতে শুরু করে । ১৪৪ ধারা ভাঙ্গতে সবাই হয়ে ওঠে বদ্ধপরিকর ।

মিছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে আসতেই কিছু মিলিটারি জিপ এসে থামে । মিলিটারিরা টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ে। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় । মিলিটারির সাথে ছাত্রদের সংঘর্ষ বাঁধে । শুরু হয় ভাষার জন্যে যুদ্ধ।

ওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুলেটসিক্ত বেদনা ওদের অনেকের সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে ওদের অনেকেই। তারপর নিস্তেজ দেহ বুটের তলায় মাড়িয়ে দেয় হায়েনার দল। দুপুরবেলার পিচঢালা পথটি রক্তিম সূর্যের ন্যায় এক লাল দিগন্তের সৃষ্টি করে।

ওদের কারো নাম রফিক, সালাম, বরকত, কারো নাম কেউ কোনদিন জানে নি!! জানবেও না। ওরা এসেছিল চুপিচুপি, ওরা আসবেও চুপিচুপি , ওরা এই দেশটাকেই ভালবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ।
ওরা পায় নি মায়ের ভাঙা হাতের লেখা শেষ চিঠির উত্তর, ওরা পায় নি শেষ কৃত্যের আয়োজন, ওরা পায় নি মায়ের ভালোবাসা।

বিনম্র শ্রদ্ধা ভাষা আন্দোলনের সকল মহান সৈনিকদের প্রতি, যাদের জন্যই আজ আমরা বাংলায় কথা কই, বাংলায় সুর বাঁধি, বাংলায় স্বপ্ন দেখি, আজও স্বপ্ন দেখি সালাম-বরকতের লাল-সবুজের মাটি হবে রাজাকার মুক্ত।
ধন্য মা জন্ম আমার, তোর বাংলায় জন্মেছি মা।

( একটি পরিচিত গল্পের ছায়া অবলম্বনে)
3Like · · Unfollow Post · Share

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “ওরা আসবে চুপিচুপি।

  1. ওরা আসবে চুপিচুপি
    এই কথাটাতে

    ওরা আসবে চুপিচুপি

    এই কথাটাতে আমার তীব্র আপত্তি আছে।

    বীরেরা চুপি চুপি আসবে কেন?
    তাদের আসার পথে প্রলয়ের দামামা বাজবে,
    তাদের পদশব্দে পথের বুকে বজ্রাঘাতের চিহ্ন দেখা যাবে,
    তাদের অভ্রভেদী গগণবিদারী বিজয়ধ্বনিতে পৃথিবী চমকে তাকাবে।

    তাঁদেরকে চুপি চুপি আসতে হবে কেন?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 7