কাদের মোল্লার মামলায় রিভিউ বিতর্ক – একরামুল হক শামীম

কাদের মোল্লার মামলার আপিলের রায়ের পর বিভিউ আবেদন করা যাবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর সংক্ষিপ্ত রায়ে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি প্রমাণিত হওয়ার সুবাদে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ৩ মার্চ কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ দণ্ড চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।১ এপ্রিল থেকে শুরু হয় আপিল শুনানি। ২৩ জুলাই পর্যন্ত এই আপিল শুনানি চলে। এরমধ্যে দুইটি আইনি প্রশ্নে ৭জন অ্যামিকাস কিউরির মতামত গ্রহণ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। চূড়ান্ত রায়ে ৪:১ মতামতের ভিত্তিতে কাদের মোল্লাকে ৬ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে আপিল বিভাগ। ট্রাইব্যুনালের রায়ে ৫টি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা বলা হলেও, আপিল বিভাগের রায়ে ৬টি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে জানানো হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পর এর বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করা যাবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রিভিউ অর্থাৎ রায় পর্যালোচনার সুযোগ নেই বলে মত দেন। একই রকম মত দেন আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন করার কথা জানান। এ নিয়েই বিতর্কের সূচনা হয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন,আব্দুর কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আপিল বিভাগ যে রায় দিয়েছে,তা পুনর্বিবেচনার কোনো আবেদন জানানোর সুযোগ নেই। আপিলের রায় হওয়ার পর আইন প্রক্রিয়া শেষ। এখন কাদের মোল্লার সামনে শুধু রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা ভিক্ষার সুযোগ রয়েছে। সংবিধান সংশোধন করে এই আইন করা হয়েছে। এটি একটি বিশেষ আইন। এই আইনে বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল বিচার করবে। বিচারের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করা যাবে। এর বাইরে আইনে আর কোনো কিছুর সুযোগ দেয়া হয়নি। তাই রিভিউর কোনো সুযোগ নেই।

আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেছেন, কাদের মোল্লার আপিল করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে। যেহেতু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিধান অনুযায়ী আপিল শুনেছেন (আপিল বিভাগ), তাই এই রায় রিভিউ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্য দেশে এ ধরনের অপরাধে আপিলেরও সুযোগ থাকে না। বিচার বিভাগ বিশেষ আইনে না চললেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আপিল হয়েছিল।

আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে আমরা রিভিউ আবেদন করব। রিভিউ করা কাদের মোল্লার সাংবিধানিক অধিকার। এই সুপ্রিম কোর্টও সৃষ্টি হয়েছে সংবিধানের দ্বারা। আইসিটি অ্যাক্টে এই সুপ্রিম কোর্ট সৃষ্টি হয়নি।

কাদের মোল্লার মামলায় রিভিউ আবেদনের প্রসঙ্গে এরইমধ্যে বেশ কয়েকজন আইনজ্ঞ নিজেদের মতামত দিয়েছেন। এ বিষয়ে আলোচনার সুবিধার্থে সেই মতগুলো তুলে ধরা যাক।

ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম মত দিয়েছেন, সংবিধানের ৪৭ক(২) অনুচ্ছেদের কারণে কাদের মোল্লা রিভিউর সুযোগ পাবেন না। (একাত্তর টিভি, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩)

সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিকের মত, রিভিউ অধিকার নয়। এটি কোর্টের এখতিয়ার। (review is not a matter of right “in the sense that a convict cannot claim a review”. Rather, he said, it is a matter of the court’s discretion.) (ডেইলি স্টার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩)

ফৌজদারিআইন বিশেষজ্ঞ আনিসুল হক মত দিয়েছেন, সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিলপুনর্বিবেচনার আবেদন করার অধিকার কাদের মোল্লার আছে। এ অধিকার যদি দেওয়া হয়, তাহলেএ রায়ের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো দিন প্রশ্ন উঠবে না। (প্রথম আলো, ১৭ সেপ্টেম্বর২০১৩)

ব্যারিস্টার রফিকুল হক বলেছেন, কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদন করার সুযোগ নেই একথা ঠিক নয়৷ আর এই রিভিউ আবেদন করা যাবে আপিল বিভাগেই৷ যে বিচারপতিরা রায় দিয়েছেন, রিভিউ আবেদন বিবেচনা করার এখতিয়ার তাদেরই৷ (ডয়েচে ভেলে, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩)

সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান প্রথম আলোতে রিভিউ’র পক্ষে একটি কলাম লিখেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, রিভিউর অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। ৪৭(ক) অনুচ্ছেদ নির্দিষ্টভাবে কাদের মোল্লাসহ যেকোনো অভিযুক্তও দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীর জন্য সংবিধানের ৩১, ৪৪ ও ৩৫ অনুচ্ছেদের ১ ও ৩ দফায় নিশ্চিত করা অধিকারসমূহ প্রযোজ্য হবে না বলেছে। ১০৫ প্রযোজ্য হবে না তা বলেনি। ওই অনুচ্ছেদের ২ দফা অবশ্য বলেছে, ‘এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের ৩ দফায় বর্ণিত কোনো আইন (১৯৭৩ সালের আইন) প্রযোজ্য হয়, এই সংবিধানের অধীন কোনো প্রতিকারের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করিবার কোনো অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবে না।’ এর মানে ‘সংবিধানের অধীনে কোনো প্রতিকার’ বলতে ১০৫ অনুচ্ছেদটিও পড়বে। কিন্তু আমি তা মনে করি না। (রিভিউ আইনসম্মত, বিএনপি কৌশলগত, প্রথম আলো ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩)

রিভিউ করা যাবে কি যাবে না তা একটি আইনি বিতর্ক। আইন বিশ্লেষণের মাধ্যমেই তার সমাধান হওয়া উচিত। প্রথমেই দেখে নেওয়া যাক, রিভিউ’র অধিকার কীভাবে এসেছে। সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদে রিভিউর কথা বলা আছে।

সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী – ‘সংসদের যে কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে এবং আপীল বিভাগ কর্তৃক প্রণীত যে কোন বিধি-সাপেক্ষে আপীল বিভাগের কোন ঘোষিত রায় বা প্রদত্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা উক্ত বিভাগের থাকিবে।’

এই অনুচ্ছেদটির দিকে লক্ষ্য করলে এটি স্পষ্ট হবে যে রিভিউ ‘পরম অধিকার’ (absolute right) নয়। ২টি সুনিদিষ্ট

শর্ত সাপেক্ষে এই অধিকার পাওয়া যাবে।

১.সংসদের যে কোনো আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে

২.আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রণীত যে কোনো বিধি সাপেক্ষে

কারও রিভিউর অধিকার রয়েছে এটি বলার আগে অবশ্যই এই দুইটি শর্ত পূরণ হচ্ছে কিনা তা বিচার করতে হবে। দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করেছি, বেশ কয়েকজন আইনজ্ঞ এই শর্তের ব্যাপারটি এড়িয়ে গিয়ে রিভিউকে ‘পরম সাংবিধানিক অধিকার’ হিসেবে দেখিয়েছেন। এর মানে যে কোনো পরিস্থিতিতেই রিভিউর অধিকার পাওয়া যাবে। কিন্তু ১০৫ অনুচ্ছেদের ২টি শর্ত ভিন্ন কথা বলে।

১০৫ অনুচ্ছেদে শর্ত দুইটির ব্যাখ্যা করা যাক।

প্রথম শর্ত : সংসদের যে কোনো আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে

সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদের প্রথম শর্তই হলো সংসদের যে কোনো আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে রিভিউ করা যাবে। জাতীয় সংসদে ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই পাশ হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের বিধান এক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে। এই আইনের ২১ ধারায় আপিলের অধিকার দেওয়া হয়েছে। রিভিউ’র ব্যাপারে এই আইনে কোনো বিধানের উল্লেখ নেই। আইনে অনেক বিষয়ই উল্লেখ থাকে না। উল্লেখ থাকে না বলে তা নীরব অবস্থায় আছে এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক না। সেক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়া হবে অভিযুক্ত অপিরাধীরা, ভিকটিমের স্বার্থ সেখানে ক্ষুণ্ন হবে। একজন আইনজ্ঞ বলেছেন, যেহেতু ট্রাইব্যুনালের আইনে রিভিউর ব্যাপারে কিছু উল্লেখ নেই, তাই রিভিউ করার ব্যাপারে বাধাও নেই। এ এক আজব যুক্তি। যেখানে রিভিউ করার বিধানই নেই,সেখানে করার ব্যাপারে বাধার প্রসঙ্গ আসে কীভাবে?

১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১ ধারার আপিলের বিধানের সঙ্গে রিভিউ’র অধিকার অবিচ্ছেদ্য নয়। লক্ষ্য রাখতে হবে সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদের অধীনে থাকা আপিলের বিধান অনুযায়ী কাদের মোল্লা আপিল বিভাগে আপিল করেনি।

১৯৭৩ সালের আইনে কোন প্রেক্ষাপটে আপিলের সুবিধা দেওয়া হয়েছে তা বুঝতে সহায়তা করবে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য উত্থাপিত বিলের উপর তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরের ভাষণ। জাতীয় সংসদে তিনি যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন –

‘তারা যদি দোষী সাব্যস্ত হয় এবং বিচারে দণ্ডিত হয়, সেই দণ্ডের বিরুদ্ধে তারা আপিল করতে পারবে- আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্টে। কাজেই এটা কম কথা নয়। যে জাতি এতটা দুর্ভোগে ভুগলো, ঐতিহাসিক নজিরবিহীন অত্যাচারের শিকার হলো, এতোসব জ্বালা-যন্ত্রণা ভোগার পরও যাতে ঐসব নরপিশাচের ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত হয়, আইনের মাধ্যমে আমরা তার ব্যবস্থা করেছি।’

মনোরঞ্জন ধর তার বক্তব্যের কোথাও রিভিউ সুবিধা নিয়ে আলোচনা করেননি। বরংচ যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে আপিলের অধিকার দেওয়া হবে কিনা তা নিয়ে তখন বিতর্ক হয়েছিল।

সংবিধানের কোথাও উল্লেখ নেই যে, রিভিউ আপিলের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য অধিকার। বরংচ ১০৫ অনুচ্ছেদের ১ম শর্ত বলে, এটি সংসদের আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে নির্ধারিত হবে।

দ্বিতীয় শর্ত – আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রণীত যে কোনো বিধি সাপেক্ষে

দ্য সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ (আপিল বিভাগ) রুলস ১৯৮৮ এর অর্ডার ২৬, রুল ১ এ রিভিউ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। এই রুল অনুযায়ী-

Subject to the law and the practice of the Court, the Court may, either of its own motion or on the application of a party to a proceeding, review its judgment or order ina Civil proceeding on grounds similar to those mentioned in Order XLVII, rule 1of the ‘Code of Civil Procedure and in a Criminal proceeding on the ground of an error apparent on the face of the record.

এক্ষেত্রেও যে পরম অধিকার নেই তা দুটি শর্ত থেকেই স্পষ্ট হয়। শর্ত দুটি হলো-

১. আইন সাপেক্ষে (Subject to the law)

২. কোর্টের চর্চা সাপেক্ষে (the practice of the Court)

প্রথম শর্তের কথা বলতে গেলে আবার প্রাসঙ্গিকভাবে ১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনাল আইনের কথা চলে আসে। এই আইনে রিভিউ’র প্রসঙ্গ উল্লেখ নেই।

দ্বিতীয় শর্তে কোর্টের প্র্যাকটিসের কথা বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে মাহমুদুল ইসলাম তার কন্সটিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ বইয়ে লিখেছেন –

‘As the review jurisdiction has been made subject to the practice of the court and the court was reluctant to exercise the jurisdiction except in case of substantial injustice, in seeking review, it is not sufficient to bring the case within the fold of rule 1 of Order XLVII of the Code; it has to be shown that unless the judgment is reviewed a substantial injustice would be done.’ (পৃষ্ঠা ৬৪১)

মাহমুদুল ইসলামের এই বক্তব্য থেকেই এটি স্পষ্ট যে রিভিউ জুরিসডিকশন কোর্টের চর্চার উপরনির্ভর করে এবং কোর্ট তা করতে খুব বেশি আগ্রহী থাকে না। বড় রকমের অবিচার হবে মনে হলেই রিভিউ জুরিসডিকশন ব্যবহৃত হয়।

ফলে এটি খুব স্পষ্টভাবেই বলা যায়, রিভিউ করার অধিকার একটি সাংবিধানিক অধিকার হলেও এটি কোনো ‘পরম সাংবিধানিক অধিকার’ নয়। বেশ কিছু শর্তপূরণ সাপেক্ষে এই অধিকারের চর্চা করা হয়।

মাহমুদুল ইসলামের বইয়ে বেশ কিছু মামলার রেফারেন্স দেওয়া হয়েছে। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় তা উল্লেখ করা হলো-

1. The Review jurisdiction cannot be utilized for re-hearing of the matter. [Zobaida Nahar v. Khairunnessa, 3 BLC (AD) 170; Idris Ali v. Enamul Huq, 43 DLR (AD) 12; Nurul Hossain v. Bangladesh,1 BLC (AD) 219]

2. A decision of the court should be re-opened with the very greatest hesitation and only in a very exceptional circumstance. [Akbar Ali v. Iftekhar Ali, PLD 1956 FC 50; Lily Thomas v. India, AIR 2000 SC 1650 (Power of review is not to be exercised to substitute a view)]

3. A wrong decision on interpretation of certain provisions of law or principle laid down in a decision relied upon by the court is no ground for review. [Zenith Packages v. Labour Appellate Tribunal, 52 DLR (AD) 160]

4. Review will not be allowed on a new ground which was not urged in the appeal. [Bangladesh Bank v. Abdul Mannan, 46 DLR (AD) 1,7]

5. The judgment delivered by the court will not be disturbed except where glaring omission or patent mistake or grave error apparent on the face of the record has crept in the earlier decision by judicial fallibility. [Northern India Caterers v. Governor, AIR 1980 SC 674, 678; G.M.Jamuna Oil Co. Ltd v. Chairman, Labour Court, 2000 BLD (AD) 240]

এই মামলাগুলোর সিদ্ধান্ত পর্যবেক্ষণ করলে এটি স্পষ্ট হবে যে রিভিউ ‘পরম সাংবিধানিক অধিকার’ নয়। সুপ্রিম কোর্টের (আপিল বিভাগের) বিধিতেও বলা হয়েছে ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে ‘on the ground of an error apparent on the face of the record’ শর্তে রিভিউ করা যাবে। ফলে যারা একে অবিচ্ছেদ্য অংশ কিংবা পরম সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে দেখাতে চাচ্ছেন তারা নিশ্চিতভাবে কিছু তথ্যকে লুকাচ্ছেন।

সংবিধানে ৪৭ক(২) অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গ

সংবিধানের ৪৭ক(২) অনুচ্ছেদে রয়েছে –

‘এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়, এই সংবিধানের অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবে না।’

সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে বর্ণিত আইন হচ্ছে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন। যেহেতু কাদের মোল্লার মামলা ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে হয়েছে সুতরাং সংবিধানের ৪৭ক(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি ১০৫ অনুচ্ছেদের জন্য প্রতিকারের জন্য আবেদন করতে পারবেন না। ব্যারিস্টার আমীরউল ইসলাম এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত। কিন্তু সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের মনে হচ্ছে ৪৭ক(২) অনুচ্ছেদের বাধা ১০৫ অনুচ্ছেদের জন্য প্রযোজ্য হবে না। তিনি মনে হওয়ার ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌছেছেন। পাশাপাশি তিনি লিখেছেন, যেহেতু রিভিউ সাংবিধানিক অধিকার, তাই এই অধিকার দিতে হবে। কিন্তু তিনি সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদের শর্তগুলোর কথা বললেন না। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ) বিধিমালার আদেশ ২৬, বিধি ১ এর শর্তগুলোর কথাও বললেন না।

সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অর্থাৎ ৪৭ক অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লার পক্ষে রিট করা হয়েছিল। বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা ও বিচারপতি কাজী রেজাউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চে এর শুনানি হয়। ১৭ আগস্ট থেকে শুনানি শুরু হয়। যারা গণহত্যা করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও সংবিধানের মৌলিক অধিকার প্রযোজ্য কি না- শুনানিতে সে প্রশ্ন তুলেন হাইকোর্ট। আদালত বলেন, মনে রাখতে হবে, এটা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের অংশ। আদালত আরও বলেন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসহ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অপরাধের বিচারের জন্য সংবিধানে মৌলিক মানবাধিকার স্থগিতের কথা বলা হয়েছে। যারা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের জন্য এ আইন। এটা সাধারণ নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য নয়।

পরবর্তীতে ২৩ আগস্ট রিট আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক রিট আবেদনটি ফেরত নেওয়ার আবেদন জানায়। এর কারণ অজানা থেকে যায়। আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা ও বিচারপতি কাজী রেজাউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটটি উপস্থাপন করা হয়নি বিবেচনায় খারিজ করে দেন।

আজকের প্রেক্ষাপটে, রিটের শুনানিকালে হাইকোর্ট বিভাগের সেই পর্যবেক্ষণ আবারও সামনে আনা উচিত – ‘গণহত্যা ও মানবতা বিরোধী অপরাধসহ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অপরাধের বিচারের জন্য সংবিধানে মৌলিক মানবাধিকার স্থগিতের কথা বলা হয়েছে। যারা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের জন্য এ আইন। এটা সাধারণ নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য নয়।’

সমাধানের পথ কী?

আইনি বিতর্ককে আইনের বিশ্লেষণের মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে। মিডিয়ায় বিতর্ক করে আইনি বিতর্কের সমাধান করতে গেলে কেবল সময়ক্ষেপনই হবে। সমাধানের পথ এরইমধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল বাতলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার অভিমত আমি দিয়েছি। রাজ্জাক সাহেব তার অভিমত দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে রিভিউ করা যাবে কি-না, সেটি সিদ্ধান্ত নেবে আদালত।’ রিভিউ করা যাবে কি-না সে ব্যাপারে আপিল বিভাগের কাছ থেকেই ওপিনিয়ন নেওয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে আপিল বিভাগের মতামত নেওয়ার জন্য পূর্ণাঙ্গ রায়ের সার্টিফায়েড কপি পাওয়ার পর থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করার বাধ্যবাকতা নেই। ধারণা করি এ ব্যাপারে আসামিপক্ষ সহসা আবেদন করতে চাইবে না। তারা সময়ক্ষেপনই আগ্রহী হবে। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। ‘কাদের মোল্লার মামলায় রিভিউ করা যাবে কি-না’ সে ব্যাপারে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত জানতে অ্যাটর্নি জেনারেল দ্রুততম সময়ের মধ্যে পিটিশন করতে পারেন। আশা করছি আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপে অল্প সময়ের মধ্যেই রিভিউ বিতর্কের অবসান ঘটবে।

– একরামুল হক শামীম

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৫ thoughts on “কাদের মোল্লার মামলায় রিভিউ বিতর্ক – একরামুল হক শামীম

  1. রিভিউর কোনো সুযোগ নাই।পারে
    রিভিউর কোনো সুযোগ নাই।পারে রাস্ট্রপতির কাছে প্রান ভিক্ষা।কিন্তু কুকুরের ছানার তাও জোটার অধিকার নাই।বিজয়ের মাসেই ওরে লটকানো হোক।

    1. কসাইয়ের পরিবার বলেছে, তারা
      কসাইয়ের পরিবার বলেছে, তারা প্রান ভিক্ষা করবে না। তারা জানে ভিক্ষা চাইয়া লাভ নাই।
      সহমত কারাগার ভাইয়ের সাথে বিজয়ের মাসেই লটকানো হোক।

  2. যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জারজ
    যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জারজ শুয়োরটাকে লটকে দিতে হবে… :জলদিকর: বহুত হইছে, আর সময়ক্ষেপন করার সময় নাই… :ভাবতেছি: বিজয়ের মাসে আরেকটা বিজয়ের অপেক্ষায় … :অপেক্ষায়আছি:

  3. অংকে আমি খুব বেশি কাঁচা তায়
    অংকে আমি খুব বেশি কাঁচা তায় এই রকম অঙ্কীয় টাইপের কথাবার্তা খুব একটা বুঝিনা বুঝি শুধু একটায় সব রাজাকারের ফাঁসি চাই ………

  4. আমি তো বলি… সব রাজাকারদের
    আমি তো বলি… সব রাজাকারদের ধরে টি এস সি -র মোড়ে নিয়ে আসা হউক। অতপর আমরাই বুঝব… কিছু মুলি বাঁশ আগের থেকে জোগাড় করে রাখবো আর ২-৩ কেজি মরিচ। সরকার
    টরকার… আহা… এইসব কি দরকার। তাদের ফাঁসি হলে কম হয়ে যায়। মুলি বাঁশের মাঝে কাঁচা মরিচ ডলে তাদের পশ্চাদপদ দিয়ে ঢুকিয়ে মুখ দিয়ে বের করে আনব… ব্যাস মামলা খতম…। আহ… সরকার যদি একবার অনুমতি দিত। :মাথাঠুকি:

    1. শাহাবাগের আন্দোলনের সময় এমন
      শাহাবাগের আন্দোলনের সময় এমন একটা পোষ্টার চিল,

      কাদের মোল্লার কোন অপরাধ নাই তাকে চেরে শাহবাগে চা খাওয়ার জন্য আসতে দেওয়া হোক, বাকিটা আমরা বুঝবো।

  5. একটা জিনিস সবাই খেয়াল করবেন,
    একটা জিনিস সবাই খেয়াল করবেন, জামাতিরা বরাবর সবসময় বলে আসছে এই ট্রাইব্যুনাল অবৈধ, বিতর্কিত। কিন্তু তাদের আইনজীবীরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তারা প্রত্যেকটা বিষয় নিয়ে সমস্যা বাজায়।
    এদের এসব সুযোগ না দিয়ে দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করা হোক।

  6. আমার জানা মতে ১৯৭৩ সালের আইন

    আমার জানা মতে ১৯৭৩ সালের আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের মামলায় রিভিউ এর কোন সুযোগ নেই। এমনকি এসব মামলার শাস্তি কার্যকরের ক্ষেত্রে কোন জেল কোডও প্রযোজ্য হবে নাহ্।

    এই মাসেই কসাই কাদেরর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হোক। :রাজাকার:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2