কোন এক অজানা অচেনা মুক্তিযোদ্ধাকে লেখা চিঠি___

তুমি,

তুমি,
তোমাকে কী নামে ডাকবো, ঠিক বুঝে ওঠতে পারছি না- তাই তোমাকে তুমি বলে ডাকলাম। রাগ করলে না তো? তুমিতো আবার খুব অভিমানি। সেই অভিমানটুকু লুকিয়ে রাখার জন্য তুমি চুপচাপ সব হজম করে যাও। কিন্তু তুমি জানবে না, কিছু জানলেনা, আমার মত অনেকেই তোমাকে মনে করে নিরবে বা সরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আমি চোখ বন্ধ করে তোমাকে মনে মনে আঁকতে চেষ্টা করলে মনের ক্যানভাসে কোন ছবিই ভেসে ওঠে না- শুধু দুটি চোখ আর শক্ত করে রাইফেলে ধরে রাখা দুটি হাত দেখতে পাই। যে চোখ একদা কোন এক পরিচিত মেয়েকে দেখলে ছলছলিয়ে ওঠত, মায়ের বকুনি খেয়ে যে চোখে নিরবে দু ফোটা অভিমানি জল গড়ে পড়ত আর আজ সে চোখ ইউনিফর্ম পরা কয়েকটা জীব খুঁজে ফেরে যাদের জন্ম হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের কোনো এক আদিম গুহায়! জানি, সময় তোমার চোখের দৃষ্টিকে পরিবর্তন করে ফেলেছে। আর যে হাত দুটি দিয়ে সোনাবৌ কিংবা প্রেয়সির উজ্জ্বল মুখ খানা জড়িয়ে ধরে অনিন্দ্য এক আনন্দে হারিয়ে যেতে, ছোটোবেলায় মায়ের হাত ধরে হেঁটে বেড়াতে,- আজ সেই হাত রাইফেলের ট্রিগার খুঁজে ফেরে।

সারাদিন ব্যস্ত থাকার পর যখন বাংকারে শুয়ে শুয়ে একদৃষ্টিতে চাঁদ দেখতে তখন কি খুব করে তোমার সেই ছোট্ট আঙিনা মাঠ পরিচিত রাস্তার কথা মনে পড়ত না? মনের অজান্তেই কি তোমার ছোট্ট বোনটির কথা ভেবে ভেবে আকুল হতে না যার সাথে একদা তুমি অনেক অন্যায় আচরণ করেছিলে? অথবা, সেই দুঃখিনী মা কে ভেবে কি উতলা হয়ে যেতে যাকে তুমি কতদিন দেখো না! অথচ, সেই মায়ের অন্যায় বকুনি খেয়ে রাগে যা তা বলে দিতে মুখের উপর একদিন; আর আজ অনেক অনেক দূরে চলে এসে মায়ের ছোট্ট মুখটি মনে করে অজান্তে চোখের দু কোণে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ছে। তারা আজ কোথায় তাও জানো না, তাদের কথা ভেবে অজানা এক আশংকায় তুমি কি শিউরে ওঠোনি?… হয়তো সারাদিনের কর্মক্লান্ত শরীর নিয়ে বাংকারে এসে সবে মাত্র বসেছো, খিদায় পেট মুচড়ে আসছে, পিপাসায় ঠোঁট শুকিয়ে গেছে- কিছু একটা খেতে যাবে, ঠিক সেই সময়ই ক্যাপ্টেনের নির্দেশ পেলে অপারেশনে যেতে হবে; তখন তখনই ছুটতে হলো সতীর্থদের সাথে… তারপর অপারেশনে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোথা থেকে যে একটা বুলেট তোমাকে এফোঁড় ওফোঁড় দিয়ে কোথায় যে চলে গেল, তুমি টেরই পেলে না। আচ্ছা, তখন কার কথা খুব করে মনে পড়ছিলো তোমার? মার? বোনের? ভায়ের? ছোট্ট ঘরটির, যেখানে তুমি রোজ শুতে? নাকি প্রেয়সি, বাংগারে শুয়ে শুয়ে যাকে যুদ্ধ শেষে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখে দেখে এই দুঃসময়েও চাপা একটা আনন্দ পেতে? নাকি, কাউকে না! ধীরে ধীরে গভীর এক অবসন্নতায় নিশ্তেজ হতে হতে একসময় ঘুমিয়ে পড়তে?… যুদ্ধে তোমার সতীর্থদের কাউকে কাউকে যখন পাক ক্যাম্পে হাত পা গুড়িয়ে দিয়েও মুখ থেকে কথা বের করতে পারত না তখন কি তুমি নিশ্চিন্ত ঘুমের ঐপার থেকেও তার মুথখানি দেখতে পেতে কিংবা ক্যাম্পে অজস্র মা কিংবা বোনকে গরুর পালের মত লাত্থিয়ে গুঁতিয়ে কামড়িয়ে ধর্ষণের ধর্ষণ করত- তখন কি তাদের আর্তনাদ শুনতে পেতে? জানতে খুব মন চায়!

তুমি কি জানো, তোমার এই মৃত্যু দিয়ে কেনা দেশটা এখন অন্যরা দখল করে নিয়েছে। একদল বলছে, তাদের পিতা দেশটা কিনছে আরেকদল দোহায় দিচ্ছে তাদের স্বামীর। আর তাদের তৈরি করা বিশেষ বিশেষ কিছু দিনে তোমার কবরে তারা মোমবাতি আগর বাতি জ্বালাচ্ছে! কৌশলে মুছিয়ে দিচ্ছে তোমার কৃতিত্ব। তুমি যখন ক্ষুধার্ত ক্লান্ত শরীর নিয়ে শত্রুর দিকে গুলি ছুটিয়েছিলে কিংবা অসতর্ক মুহূর্তে শত্রুর দিক থেকে ছুটে আসা কোন এক বুলেট তোমাকে মাটির বুকে স্তব্ধ করে দেয় তখন হয়তো সেইসব পিতা আর স্বামীরা ঘরের কোমল বিছানায় গড়াগড়িতে ব্যস্ত কিংবা ক্যাম্পে রঙ্গ তামাশায় মশগুল- কিংবা, নতুন একটা চাল তৈরিতে সময় কাটাচ্ছে অথবা, চিলেকোঠায় বসে দেশ স্বাধীনের স্বপ্নে বিভোর, যাতে ক্ষমতাটা অতিসত্বর হাতের মুঠোয় নিতে পারে।

তুমি জানো না, জানলেও না, তোমার স্বপ্নের দেশ আজ আবার দুঃস্বপ্নের নগরী হয়ে গেছে। তোমার সতীর্থরা এখানে ভিক্ষা করেদিন যাপন করে, কেউ কেউ হয়তো না খেয়েই মারা যাচ্ছে। আর তুমি যা জীবন দিয়েও পাও নি তা দেশ স্বাধীন হবার পরে কত লোকে কয়েকটা টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছে! তুমি যখন মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ে ব্যস্ত তারা হয়তো তখন ঘরের কোণে গুঁটিসুটি মেরে বসেছিল অথবা তোমাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তোমার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে- অথচ, দশ টাকার এক কাগজের বদৌলতে তারাও আজ মুক্তিযোদ্ধা! আর তারাই আজ তোমার লাশের উপর দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত চোখ রাঙাচ্ছে! আমরা অসহায় হয়ে তা মেনে নিচ্ছি।

আচ্ছা, তুমি তখন কেন পরিবার পরিজন ছেড়ে জীবনের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলে- আমাকে একটু বলবে কি? দেশপ্রেম? ছেলেমানুষি আবেগ? নাকি নিজের জন্য? নাকি “সময়ের প্রয়োজনে”? হয়তো তা ই! না হলে তোমরা কেমনে পারলে ভয়াবহ কষ্টে পাওয়া স্বাধীন পতাকাটিকে অন্যকে মাড়িয়ে যেতে দিতে; আর তোমাদের এই অমূল্য অবদান আমরাই বা এক লহমায় কেমনে ভুলে গিয়ে চুপচাপ থাকি কিংবা পিতা / স্বামীদের স্তব করি?

তুমি তো জানো না, তোমার স্বপ্নের দেশ আজ পরাবাস্তব নগরিতে পরিণত হয়ে গেছে। আর আমরা এখানে প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম জন্তু হয়ে গুহায় বাস করছি। যুদ্ধে যেমন তুমি প্রতি মুহূর্তে অনিশ্চয়তার ভেতর কাটাচ্ছে হচ্ছে, তেমনি আমাদেরও এখানে জীবনের বিশাল এক অনিশ্চয়তার ভেতর দিন যাপন করতে হয়; পার্থক্য হচ্ছে, পাহাড় সমান দুঃস্বপ্নের মাঝেও তখন তোমার চোখে একটা স্বপ্ন ছিলো, কোনো কিছু গড়ে তোলার স্বপ্ন। আর আমাদের চোখে আজ শুধু দুঃস্বপ্ন- কেননা, মিথ্যে স্বপ্ন দেখতে দেখতে আজ আমরা ক্লান্ত বিধ্বস্ত অসহায় হয়ে গেছি! এখন শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকিয়ে থাকা ছাড়া আর বেশি কিছু করার স্বপ্ন দেখার সাহসটুকু হারিয়ে ফেলেছি!

ইতি-
দুঃস্বাপ্নিক

প্রকাশকালঃ 27 Mar 2012

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “কোন এক অজানা অচেনা মুক্তিযোদ্ধাকে লেখা চিঠি___

  1. তুমি তো জানো না, তোমার

    তুমি তো জানো না, তোমার স্বপ্নের দেশ আজ পরাবাস্তব নগরিতে পরিণত হয়ে গেছে। আর আমরা এখানে প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম জন্তু হয়ে গুহায় বাস করছি। যুদ্ধে যেমন তুমি প্রতি মুহূর্তে অনিশ্চয়তার ভেতর কাটাচ্ছে হচ্ছে, তেমনি আমাদেরও এখানে জীবনের বিশাল এক অনিশ্চয়তার ভেতর দিন যাপন করতে হয়; পার্থক্য হচ্ছে, পাহাড় সমান দুঃস্বপ্নের মাঝেও তখন তোমার চোখে একটা স্বপ্ন ছিলো, কোনো কিছু গড়ে তোলার স্বপ্ন। আর আমাদের চোখে আজ শুধু দুঃস্বপ্ন- কেননা, মিথ্যে স্বপ্ন দেখতে দেখতে আজ আমরা ক্লান্ত বিধ্বস্ত অসহায় হয়ে গেছি! এখন শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকিয়ে থাকা ছাড়া আর বেশি কিছু করার স্বপ্ন দেখার সাহসটুকু হারিয়ে ফেলেছি!

    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 78 = 79