ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং গ্ল্যামারপ্রিয় ফেসবুকীয় নাস্তিকগণ

ভার্চুয়াল জগতে প্রগতিশীল এবং মানবতাবাদী হবার সহজ এবং শর্টকাট পথ হচ্ছে ধর্মকে পোন্দানো। পোন্দানো শেষে আয়েশ করে সিগারেটে সুখটান দেবার মাঝে যে সুখ- সাথে নাম কামাবার যে সুযোগ,- তা ধৈর্য ধরে, পড়াশোনো করে, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় পাওয়া যায় না এত তাড়াতাড়ি। শর্ট টাইমের দুনিয়ায় যা করার সাত তাড়াতাড়ি করে ফেলতে হয় যাতে সমাজের অথবা সভ্যতার কল্যাণ [যেটা তাদের উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করে] হোক বা না হোক, গ্ল্যামারটা যেন আসে!

ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটাকে হাসি ঠাট্টা তামাশা করে উড়িয়ে দেবার মত বিষয় নয়। সেই আদিমকাল থেকে এটি মানুষের রক্তের সাথে মিশে আছে। কেননা, এটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে আছে মানুষের স্বপ্ন সাধ ভয় আর শ্রদ্ধা। এমনকি এক শ্রেণীর নিরীহ মানুষের প্রতিদিনের চিন্তা চেতনায় এই ধর্ম বুড়ো বটগাছের শিকড় বাঁকড়ের মত আকঁড়ে ধরে আছে। তাই ধর্মকে এক কথায় উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। যে মুর্খ কৃষকটার আল্লা রাসূল ভগবান ইশ্বরে অগাধ বিশ্বাস, যে যুক্তিবোধের চেয়ে হুজুগে চালিত হয় বেশি- তার সামনে যদি তার ঐসব শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিটিকে অশ্লীল এবং উগ্রভাবে উপস্থাপন করা হয় তবেই কী তার মাঝে বিরাট কোনো পরিবর্তন আসবে? হাঁ আসবে, নিশ্চিতভাবেই আসবে; আর তা হচ্ছে, তার উগ্রবাদী জঙ্গি হয়ে ওঠতে বেশি সময় লাগবে না। যে ছেলেটি ধর্ম নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায় না, কে যথাযথভাবে ধর্ম পালন করল আর কে করল না সে বিষয়ে যার বিশেষ মাথাব্যথা নেই- সে যদি ধর্মকারীর মত সাইটের সন্ধান পায় কিংবা তার সামনে ধর্ম পোন্দানো হলে বা সরাসরি ফান্ডামেন্ডালি বিশ্লেষণমূলক সমালোচনা করা হয় তাহলে সেও উগ্রবাদি হয়ে ওঠতে পারে নিশ্চিতভাবেই। ধর্মকারীর মত অনেক সাইট পশ্চিমে আছে, তা ঠিক; আমাদের সমাজকে আগে পশ্চিমা সমাজের মত উন্নত আর শিক্ষিত করে গড়ে তোলা হোক তারপর ওমন ধর্মকারীর মত হাজারটা সাইটের জন্ম দেওয়া যাবে, নো প্রবলেম। কিন্তু আমাদের মত এমন গোঁড়া সমাজে ঐসব সাইট উগ্রতাকে উস্কে দেওয়া ছাড়া বিশেষ ভুমিকা রাখেনা। আপনার খুঁড়িয়ে চলার প্রবণতাকে আমি ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে আপনার মাঝে সহনশীলতা তৈরি করতে পারব না; পারব আমার প্রতি আপনার প্রচন্ড রাগ ঘৃণা আর জিঘাংসাকে উস্কে দিতে। স্মরণীয় যে, বিদ্যাসাগর যদি সেকালে হিন্দু ধর্মকে পুন্দিয়ে তথা কৃষ্ণের লুলিত যৌন জীবনের পেছনে লাগতেন, মহাভারত রামায়ণের কাহিনীগুলো নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল, ব্যঙ্গ বিদ্রূপে মেতে ওঠতেন তাহলে আর সমাজ সংস্কার করতে পারতেন না বরং সাধারণের মাঝে উগ্রতা জাগিয়ে তুলে জন্ম দিতেন অসংখ্য হিন্দু মৌলবাদী।

আমাদের জানতে হবে ধর্মের জন্ম আর বিকাশের ইতিহাস। জানতে হবে এর মনস্তাত্ত্বিক আবেদন, সেই সাথে বুঝতে হবে নিজ সমাজের মানুষগুলোর সাইকোলজি আর তাদের চাওয়া পাওয়া এবং সীমাবদ্ধতাগুলোও পাঠ করতে হবে নিবিড়ভাবে। পাঠ করতে হবে, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের ধারাটা কীভাবে বিকাশ ঘটলো এবং কীভাবে এখনো ব্যবহার করেই যাচ্ছে।

আমাদের বাঙালির জাতীয় ইতিহাসজুড়ে আছে ধর্মকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করার অশ্লীল আর রক্তাক্ত রাজনৈতিক ধারা। সেই মোগল আমলের পর থেকে ব্রিটিশপর্বে শুধু ধর্মকে ব্যবহার করে পাকিস্থানের মত জারজ এক রাষ্ট্রের সাথে আমাদের সহোদর ভাই করিয়ে দেওয়া হয়। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার করে শিবির জমজমাট ব্যবসা করে যাচ্ছে, হিজুরা মুছিয়ে দিতে চাচ্ছে বাঙালি জাতি সত্ত্বাকে। আশির দশকে ভন্ড এরশাদ ধর্মকে পুঁজি করে ক্ষমতায় টিকে ছিল ৮ বছর। সাধারণ মানুষকে বশে রাখতে এবং তাদের উপর কর্তৃত্ব ফলাতে ধর্ম চমত্‍কার এক আফিম। আমি যদি সত্যি সমাজের কল্যাণ চাই, পরিবর্তন চাই- তাহলে, আমার উচিত্‍ হবে ধর্মের অসংগতিগুলো সরাসরি ব্যঙ্গ বিদ্রূপ কিংবা ধর্মের প্রবর্তকদের জীবন নিয়ে তামাশা না করে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের কুফলগুলো সবাইকে সহনশীলতার সাথে অবগত করা। তারা যেমন ধর্মকে ব্যবহার করে কর্তৃত্ব ফলায় তেমনি ধর্ম কেই ব্যবহার করে ধর্মীয় কুসংস্কার দূর করতে হবে ধর্মভীরু মানুষদের মাঝ থেকে। এক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর উত্‍কৃষ্ট উদারণ।

আমরা যদি জামাত শিবির এবং হিজুদের কর্মকান্ড এবং ভন্ডামি সম্পর্কে কৌশলে সাধারণের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে পারি তাহলেই সমাজ শয়তান মুক্ত হবে।

সভ্যতার শুরুতেও ধর্ম ছিল না, শেষেও থাকবে না। এর উপযোগিতা শেষে হয়তো আগামি শতকেই ধর্ম লোপ পেয়ে যাবে অনেকখানি। ব্যক্তি জীবনে এবং সামাজিকভাবে ধর্মের উপযোগিতা নিঃশেষ হয়ে গেছে বহু আগেই আছে শুধু এর রাজনৈতিক প্রভাব। আমরা যদি সমাজকে ধর্মের এই রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করতে পারি তাহলেই সমাজ থেকে ধর্মের অর্গানাইজড হবার সম্ভাবনা একদম কমে যাবে। আর থাকে ধর্মের ব্যক্তিক প্রভাব; একটা ধর্ম যদি অর্গানাইজড হবার সুযোগ না পায়, সীমাবদ্ধ থাকে ব্যক্তিক পর্যায়ে তাহলে তা আর জাতীয় ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না; উপরন্তু, ব্যক্তিক পর্যায়ে বই পড়ার প্রবণতাকে তৈরি করতে পারলে, পড়ুয়া সমাজ গড়ে ওঠলে ব্যক্তি পর্যায়েও ধর্ম আর কারোর বশ করে রাখতে পারবে না। এক্ষেত্রে “বেয়াদপ” পেইজের একটা স্ট্যাটাস স্মরণীয়ঃ

“যেসব ধার্মিক এক বইয়ের পূজা করে আর যেসব নাস্তিক সব কাজ-কাম ফেলে দিনরাত ধার্মিকদের সাথে কুস্তাকুস্তিতে ব্যস্তথাকে, তারা কেউই মুক্তমনা না। মুক্তমনা হল আরজ আলি মাতুব্বরের মত মানুষ, যাঁরা মানুষকে জ্ঞান চর্চায় উৎসাহিত করার জন্য পাঠাগার নির্মাণ করে আর জ্ঞানের আলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে আজীবন চেষ্টা করে যায়।

দেশ ধার্মিকে ছেয়ে গিয়েছে, নাস্তিকের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু মুক্তমনা কয়জন হতে পারছে তাতে আমার সন্দেহ আছে। নাস্তিক আর ধার্মিক একদিকে কামড়া কামড়িতে ব্যস্ত, অন্যদিকে পাঠাগারের বইয়ের উপর ধূলোর স্তর ক্রমশঃ পুরু থেকে পুরুতর হচ্ছে। নাস্তিক না, আস্তিকও না, চাই এমন এক দেশ যেদেশের মানুষ পাঠক হবে; যেদেশের মানুষ নিজ দেশ, পর দেশ, সবদেশের সাহিত্য গোগ্রাসে গিলবে। মন মুক্ত করা তখন হবে কেবল সময়ের ব্যাপার।”

ফেসবুকে প্রকাশঃ November 25, 2012

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং গ্ল্যামারপ্রিয় ফেসবুকীয় নাস্তিকগণ

  1. দেশ ধার্মিকে ছেয়ে গিয়েছে,

    দেশ ধার্মিকে ছেয়ে গিয়েছে, নাস্তিকের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু মুক্তমনা কয়জন হতে পারছে তাতে আমার সন্দেহ আছে। নাস্তিক আর ধার্মিক একদিকে কামড়া কামড়িতে ব্যস্ত, অন্যদিকে পাঠাগারের বইয়ের উপর ধূলোর স্তর ক্রমশঃ পুরু থেকে পুরুতর হচ্ছে। নাস্তিক না, আস্তিকও না, চাই এমন এক দেশ যেদেশের মানুষ পাঠক হবে; যেদেশের মানুষ নিজ দেশ, পর দেশ, সবদেশের সাহিত্য গোগ্রাসে গিলবে। মন মুক্ত করা তখন হবে কেবল সময়ের ব্যাপার।”

    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    চমৎকার বলেছেন। শেয়ার দিলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 1 =