ভালোবাসার ঘ্রাণ # ২য় পর্ব

“সুপ্রিয় সৈকত,

“সুপ্রিয় সৈকত,

আপনাকে কি খেতাব দেওয়া যায় চিন্তা করছি। রমণী বিশেষজ্ঞ খেতাবটাই যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে। রমণীদের চরিত্র সম্বন্ধে যার এত গবেষণা তাঁর জন্য এর থেকে ভাল বিশেষণ আর হতে পারে বলে আমার মনে হচ্ছে না। খুব তো মেয়েদেরকে যা তা বললেন। আসল ঘটনা কি? ক্যাম্পাসে কি বড় ধরনের ছ্যাকা খেয়েছেন নাকি? ছ্যাকা না খেলে শুনেছি ছেলেরা কাব্য লিখতে পারে না। যাক এ নিয়ে এখন না, পরে আপনার সাথে আরও কথা হবে যদি আপনার আপত্তি না থাকে। আমার মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে দিচ্ছি। দয়া করে একটু ফ্রি হতে পারলে আমাকে ফোন দিবেন। পার্লামেন্টারি ডিবেটের পয়েন্ট অব পারসোনাল প্রিভিলেজ এর ব্যাপারটা আমি খুব একটা ক্লিয়ার না। ব্যাপারটা জানা দরকার। আমার নাম্বার হচ্ছে ০১৯২৫……। ফোন দিলে খুশি হব। আরও খুশি হব যদি আমার নাম্বারটা আর কাউকে না দ্যান।
ভাল থাকবেন.

নিশাত”

চিরকুটটা পর পর তিনবার পড়ল সৈকত। হাতের লেখা খুবই সুন্দর। শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। মেয়েটা এই হলরুমেই কোথাও আছে। সে পিছনে ফিরে তাকাল। ১০০০ জন মেয়ে এই কর্মশালায় অংশ নিচ্ছে। সবাই এখন বিরিয়ানির প্যাকেট খুলে খাচ্ছে। পত্রলেখিকা নিজে থেকে দেখা না দিলে তাঁর পক্ষে সম্ভব না খুঁজে বের করা। সে মাথা ঝাঁকিয়ে আরেকবার চিরকুটটা পড়ল। অদ্ভুত সুন্দর কিন্তু অচেনা একটা ঘ্রাণ পাচ্ছে সে। এটা কোন পারফিউমের ঘ্রাণ যে না এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। কিংবা বলা যায় না নতুন কোন পারফিউম হয়ত বাজারে এসেছে। সৈকত চোখ বন্ধ করে অচেনা এই সুবাসের স্বাদ নিতে নিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, আজ রাতেই সে নিশাতকে ফোন দিবে।

****
ডানপাশে সেতু আর বামপাশে রাহাকে রেখে মাঝখানে বসে বিরিয়ানি খাচ্ছিল নিশাত। সে যারপরনাই বিরক্ত। প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছিল। কিন্তু বিরিয়ানিটা তেমন ভাল হয় নাই। কস্তুরির বিরিয়ানি তো ভালই হয় সে জানত। ইদানিং মনে হয় খাবারের মান পড়ে গেছে। নাহ কস্তুরিতে আর খাওয়া যাবে না। তাঁর হাত আর মুখ ব্যস্ত খাওয়াতে কিন্তু চোখগুলো ব্যস্ত ভঙ্গিতে দুইনম্বর লাইনের ছেলেটাকে লক্ষ্য করছে। সৈকত নামের ছেলেটা নিজেকে খুব বড় কিছু ভাবে বলে মনে হচ্ছে। কি ভাব রে বাবা। একটা প্যারোডি গান গাইল। তারপরেই একটা ফালতু কবিতা আবৃত্তি করল। তবে কবিতাটা যে ভাল হয়েছে সেটা অস্বীকার করা যাবে না। ছেলেটা বেশ ট্যালেন্ট। কেন জানি ছেলেটাকে তাঁর ভাল লাগছে। একটু বাজিয়ে দেখা দরকার। সৈকত যখন স্টেজে ছিল তখন সে চুপি চুপি তাঁর জ্যাকেটের পকেটে একটা চিরকুট রেখে এসেছে। কোন ছেলে যে মেরুন রঙের জ্যাকেট পড়তে পারে সেটা ভাবতেই পারে নি। কি হাস্যকর। কেন জানি এই হাস্যকর কাজটাকেও তাঁর আপত্তিকর মনে হচ্ছে না। সৈকত এখন তাঁর চিরকুটটা দেখছে আর চারপাশে তাকিয়ে তাঁকে খুঁজছে। কেন জানি নিশাতের হাসি পেয়ে গেল। সে দ্রুত তাঁর চোখ নামিয়ে নিল খাবারের দিকে। সৈকত যদি তাঁর দিকে তাকায় তাহলে সন্দেহ করতে পারে।

“কিরে নিশাত, তোকে দেখে ফেলেছে নাকি?” সেতু পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল।

“না দেখতে পায় নি। তোদের কি মনে হয়, ফোন দিবে?”

“Definitely দিবে। বাঙালি ছেলেদের মাজার জোড় এখনো এতটা স্ট্রং হয় নি যে কোন মেয়ে নিজে থেকে তাঁকে চিঠি লিখে ফোন নাম্বার দিবে আর সেই ছেলে মেয়েটাকে ফোন দিবে না। তুই অপেক্ষা কর, আজকেই ফোন পাবি আমি বাজি ধরে বলতে পারি।“

“ফোন না পেলে আমার খারাপ লাগবে।“

“কেন, খুব বেশি ভাল লেগেছে?”

“হুম।“

“বললাম তো পাবি। কত দেখলাম। আব্বু তো প্রথম আলোর সাংবাদিক এবং এডভোকেট। মন দেয়া-নেয়া জনিত কত গল্পই তো আব্বুর কাছে শুনি। নিজে কি কম দেখি নাকি? তুই তো এখনো পিচ্চিই আছিস তাই এসব একটু কম বুঝিস। ব্যাপার না, আমরা আছি না। তোকে ভুল করার কোন সুযোগই দিব না। সৈকত ছেলেটা যদি সুবিধার না হয় তাহলে সরে গেলেই হবে। ফোন দিলে কথা বলিস। কারো সাথে নিয়মিত কথা বলতে থাকলে তাঁর ভেতরটা পড়া যায়। এক দুইদিন কথা বললে সবাই ফর্মালিটি মেইনটেইন করে। কিন্তু নিয়মিত কথা হতে থাকলে নিজের ভেতরের মানুষটাকে আর আটকে রাখা যায় না। সো কথা শুরু হলে চালিয়ে যাবি।“

“সেটাই করব। আজকের খাবারটা কি জঘন্য হয়েছে দেখেছিস? কস্তুরিতে আর কখনও খেতে যাব না রে।“

“প্রথম প্রথম সবাই কোয়ালিটি মেইনটেইন করে। একটু মার্কেট পেলেই কমার্শিয়াল হয়ে যায়। চল হাত ধুয়ে আসি।“

****
“খুলনায় উঠেছিস কোথায়?”

ফয়সাল ভাই এর ডাকে আবারো বাস্তবে ফিরে আসল সৈকত। চিরকুটটা পাবার পর থেকেই সে আনমনা হয়ে আছে।

“এখনো উঠি নি, তবে উঠবো। নিরালায় আমার মামা থাকেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার। তাঁর বাসায়ই উঠবো। কাল চলে যাব রাজশাহীতে। আপনারা কবে ফিরবেন ঢাকায়?”

“কাল রাজশাহী যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল কর। আমরা সবাই মিলে কাল করমজল যাব সুন্দরবন দেখতে। তুইও চল আমাদের সাথে।“

“ঠিক আছে, চললাম না হয় আপনাদের সাথে। কাল কখন কোথায় আসব সেটা বলুন।“

“আমরা হোটেল ক্যাসেল সালামে উঠেছি। মাইক্রো ভাড়া করা হয়ে গেছে। ঠিক সকাল ৮ টায় হোটেলের সামনে থেকে ছেড়ে যাবে। মিস করবি না। পরে কান্নাকাটি করে কোন লাভ হবে না।“

“ওক্কে বস। সকালে দেখা হচ্ছে ইনশাল্লাহ। এখন যাই।“

হল গেট দিয়ে বের হয়ে আসল সৈকত। শীতের দিন তাই বিকেলটা খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে যায়। শেষ বিকেলের আলোয় চারপাশটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। গাছগুলোর দিকে তাকালে বসন্তের আগমন ধ্বনি স্পষ্ট শোনা যায়। খুলনায় শীত এখনো ভালই আছে। জ্যাকেটটা ভাল করে গায়ে চাপিয়ে ব্যাকপেকটা কাঁধে ঝুলিয়ে সে কলেজ গেট দিয়ে বের হয়ে আসল। জ্যাকেটের পকেটে হাত দেওয়া মাত্রই আবারো সে চিরকুটটার স্পর্শ পেল। অদ্ভুত কিন্তু মিষ্টি সুবাসটা তো আছেই। একদম মন ভাল করে দেওয়া এই ঘ্রাণটা সত্যিই অসাধারণ।

রিক্সা নিয়ে সোজা নিরালা আবাসিক এলাকার দিকে যাত্রা করল সৈকত। খুলনা শহরটা তাঁর দারুন লাগছে। খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন শহর। রাস্তাগুলো অনেক প্রশস্ত। ডিভাইডারগুলোতে বিভিন্ন গাছ লাগানো হয়েছে। এই নিয়ে সে দ্বিতীয়বার আসল খুলনায়। প্রথমবার এসেছিল ৪ বছর আগে খুলনা ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে। চান্সও পেয়েছিল ফার্মেসিতে কিন্তু ভর্তি হয় নি। কারণ ততদিনে সে রাজশাহীতে একই সাবজেক্টে ভর্তি হয়ে ক্লাসও শুরু করে দিয়েছে। ৪ বছর আগের খুলনা আর বর্তমানের খুলনার মাঝে আকাশ পাতাল পার্থক্য।

শিববাড়ি মোড় পার হবার সময় হঠাত করেই অদ্ভুত সেই ঘ্রাণটা তীব্রভাবে তাঁকে আলিঙ্গন করল। সৈকত চমকে গেল। এই ঘ্রাণের উৎস কোথায়? চারপাশে তাকিয়ে সে কিছুই বুঝতে পারল না। শহরের অন্যতম ব্যস্ত এই জায়গায় অনেকেই আছে। এই মুহূর্তে রিকশায় বসে উৎস খুঁজে পাওয়াটা কঠিনই হবে। থাক, আজ রাতেই সে ফোন দিয়ে রহস্যভেদ করবে।

****
“ওই দ্যাখ নিশাত, তোর প্রাণপাখি তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যা পাখিটাকে খাঁচায় বন্দী করে নিয়ে আয়।“

সেতুর কথায় চমকে গেল নিশাত। হ্যাঁ, ওইতো সৈকত। চারপাশে তাকিয়ে কি যেন খুঁজছে। চট করে রিক্সার হুড তুলে দিল সে।

“এই, হুড তুললি কেন? তোকে দেখলে কি চিনতে পারবে নাকি রে গাধী?”

“চিনুক বা না চিনুক আমি চাইনা সে আমাকে দেখুক।“

“আহা কি ভালবাসা রে। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি আজ রাতেই তুই ফোন পাবি। এখন হুড ফেলে দে, দম বন্ধ লাগছে। আমরা শিববাড়ি মোড় পার হয়ে এসেছি।“

রিকশার হুড ফেলে দিল নিশাত। সৈকতের রিক্সাটা নিরালার দিকে মোড় নিয়েছে। তাঁর মানে নিরালা বা তাঁর আশেপাশে সে থাকবে। ভালই হয়েছে। সেও নিরালায় থাকে। পথে চলতে চলতে দেখা হলেও হতে পারে।

****
মামীর হাতের রান্না খুব ভাল। ভরপেট খেয়ে বারান্দার ইজি চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিয়ে পূর্ণিমা দেখছিল সৈকত। যদিও সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে রাতে নিশাত নামের মেয়েটাকে ফোন দিবে কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ফোন দেওয়াটা ঠিক হবে না। মেয়েটা তাঁকে ছ্যাবলা ভাবতে পারে। কিন্তু তাই যদি হয় তাহলে নিজের নাম্বার কেন দিবে? নাকি তাঁর সাথে ফাজলামো করার জন্য অন্য কারো নাম্বার নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছে? কিন্তু সেটা কেন করবে? ধুর ছাই, সব থেকে ভাল হচ্ছে কল দেওয়া। তাহলেই বোঝা যাবে আসল ঘটনাটা কি । চিরকুটটা পকেট থেকে বের করে হাতে নিল সৈকত। অদ্ভুত মিষ্টি ঘ্রাণটা সাথে সাথেই তাঁকে ঘিরে ধরল। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ঘ্রাণটা অনুভব করে নিল সে। এইবার মোবাইলটা হাতে নিয়ে নাম্বারগুলো চাপল। আরেকবার চিন্তা করে সে ডায়াল করে কানের সামনে ধরল মোবাইলটা। রিং হবার বদলে একটা গান ভেসে আসল। তাঁর মানে ওয়েলকাম টিউন সেট করা আছে মেয়েটার মোবাইলে। চোখ বন্ধ করে গানের কথাগুলো শুনতে থাকল সৈকত।

ভালবাসা তোমার ঘরে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসুক
ইচ্ছেগুলো, তোমার ইচ্ছেগুলো জ্যান্ত হয়ে
বুকের ভিতর তুমুল নাচুক
ভালবাসা তোমার ঘরে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসুক
চোখের কোণে যত্ন করে জমিয়ে থাকা স্বপ্নগুলো
নতুন করে বেঁচে উঠুক
দু’চোখ ভরে দেখবে তখন আকাশ
আকাশ তোমার বাড়ছে কেমন
সেই আকাশে জন্ম নেওয়া সূর্যটার আলো দেয়ার
ইচ্ছে তোমার বুকের জমিন তীব্রভাবে স্পর্শ করুক
ভালবাসা তোমার ঘরে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসুক।

গান শেষ হয়ে গেল কিন্তু কেউ কল রিসিভ করল না। ব্যাপারটা কি? সৈকত সিদ্ধান্ত নিল আর একবার চেষ্টা করবে সে। যদি কেউ রিসিভ না করে তাহলে আর সে ফোন দিবে না। আবারো সে কল দিল। আবারো গান শুরু হল। সৈকত কিছুটা এক্সাইটেড। ফোনটা কেউ ধরবে তো?……… (চলবে)

ভালোবাসার ঘ্রাণ # ১ম পর্ব

ভালোবাসার ঘ্রাণ # ৩য় পর্ব

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “ভালোবাসার ঘ্রাণ # ২য় পর্ব

  1. ফোনটা অন্তত কেউ ধরবে তো? হা
    ফোনটা অন্তত কেউ ধরবে তো? হা হা হা… গল্প গুলো শেষ করার ব্যপারে আপনি চালু মাল। পরের একটা যে পড়বে পরের পর্ব গুলো সে নিজেই পড়তে আসবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

87 + = 90