ফতোয়ার খঁড়গ

খবরটা শুনে একাব্বর মিয়া মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।

– ‘ইশশ্‌! দ্যাশের বড় আদালত একদিন আগে যদি এইরাম একখান রায় দিত, তাইলে একমাত্র দুধের গাইটা আর বেচতে অইত না।’ খেদোক্তি করে উঠে একাব্বর- ‘ম-রা, খালে যখন নামলি, লুঙ্গি ভিজায়া নামলি ক্যান? আর লুঙ্গি যখন ভিজাইলি, ন্যাংটা অইলি ক্যান?’

গৃহস্থালী সংসার একাব্বরের। পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত জমি-জিরাত যাই আছে, খেয়েদেয়ে কোন রকম চলে যায়। স্বচ্ছলতার অংকে সুখে না থাকলেও অসুখী বলা যায় না একাব্বর মিয়াকে। শুধুমাত্র একটি সন্তানের আশায় মনের মধ্যে অপ্রাপ্তির দুঃখবোধ খচ্‌খচ্‌ করে সব সময়। সন্তান দানে ব্যর্থ বাঁজা মাগিটাকে বহু বুদ্ধি করে খেঁদিয়েছিল একাব্বর। বিয়ের পনর বছরের মধ্যে যে একটি সন্তান দিতে পারেনি, এ সংসারে তার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে করে না সে। বাঁজা স্ত্রীকে বিদায় করতে তার বেশী বেগ পেতে হয়নি। বুদ্ধিমান একাব্বর বুদ্ধির জোরে বড় মসজিদের ইমাম সাহেবের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে তার ইচ্ছার কথা জানাল। ব্যাস, ফতোয়ার কাফ্‌ফারা পেয়ে ইমাম সাহেব একাব্বর আর তাঁর স্ত্রীর মধ্যে ঝামেলাহীন বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিল। বিদায় হল আপদটা।

সঙ্গীহীন পশুও এই সমাজে বেমানান। আর সেতো জলজ্যান্ত মানুষ। রাতে ঘুমাতে গেলে সারা শরীরের রক্তের উষ্ণতা যখন জমাট বেঁধে নিম্নগামী হয়ে বিশেষ অঙ্গে হিস্‌হিস্‌ জাগায়, তখন বড়ই বিচলিত বোধ করে একাব্বর। এদিকে বংশের প্রদীপের প্রয়োজনীয়তা মূখ্য হয়ে উঠে। একমাসের মাথায় এক চপলা তন্বী ষোড়শীকে বধু করে ঘরে উঠায় একাব্বর।

বিধিবাম! একি হল একাব্বরের!! ষোড়শীর উষ্ণ রক্তের চপলতায় প্রতিদিন খেঁই হারিয়ে ফেলে সে। নতুন বধুর উষ্ণতা এতই তীব্র, এ যেন আজন্ম শীতল হওয়ার নয়। মাঝ দরিয়ায় প্রতিদিন হাবুডুব খেতে খেতে ক্লান্ত একাব্বর। বধুর অতৃপ্তির গোদ্‌গোদ্‌ ‘লু’ হাওয়া বয়ে যায় দিনভর একাব্বরের উপর দিয়ে। প্রতিদিনের এই অতৃপ্তির খেঁদ বিন্দু বিন্দু দাঁনা বেঁধে সিন্ধূতে পরিণত হতে থাকে।

‘বুড়া ভাম! মাটি কাঁটতি জানিস নাতো, কোঁদাল ধরিস ক্যান’? প্রতিদিনকার বউয়ের তাচ্ছিল্য ভরা এই উক্তিটা যেন একাব্বরের পৌরষত্বকে নিদারুন উপহাস করে। তারপরও নিজের অক্ষমতায় বউয়ের উপহাসকে নিয়তি বলেই মেনে নিয়েছে সে। তার প্রয়োজন বংশের আলো।

ভেবে পায়না একাব্বর। প্রদীপে এত তেল ভরে সে, কিন্ত সলতে ভিজে না কেন? তবে কি তারই অক্ষমতা। এ বড়ই কষ্টের অনুভুতি। অব্যক্তেয় কষ্টে তার বুকটা সারাক্ষণ খচ্‌খচ্‌ করে। কষ্টের ভোতা অনুভূতি নিয়ে সলতে ভেজার অপেক্ষায় দিন গুনছে একাব্বর। এই অপেক্ষার কাছে বউয়ের ‘মাটি কাটা, কোঁদাল ধরতে না পারা’র উপহাসকে সে ম্লান করে রাখে; স্বেচ্ছায়, অবলীলায়।

ঘটনার জট লাগে অন্যখানে। বউ তার অতৃপ্তের বাসনার সলিল রচনা করতে চায় তারই আপন ভাইপো’র সাথে, যে কিনা তাঁর বউয়ের প্রায় সমবয়সী। একাব্বরকে দেখিয়ে দেখিয়ে ভাইপো’র সাথে বালখিল্যতা, আদিখ্যেপনা। বউয়ের হাঁসাহাঁসি, মাতামাতি বড়ই নিষ্ঠুর ঠেকে। হয়তঃ ভাইপো’র মনে নেই কোন হারামীপনা। কিন্তু ভাইপো’র সাথে বউয়ের এই লাস্যময়ী আচরণ শুধু একাব্বর বা তার পৌরষত্বকে উপহাস করছে না। সমাজকেও জানান দিচ্ছে তাঁর কোঁদাল ধরতে না পারার ইতিকথা। বউয়ের এ কাহিনী চাওর হতে থাকে আকাশে বাতাসে। এ বড়ই অপমানের, বড়ই লজ্জ্বার।

সহ্যের সীমা যখন অনতিক্রম্য পাহাড় ডিঙ্গিয়ে যায়, একাব্বর চুড়ান্ত স্বিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলে। আগের ন্যয় বুদ্ধি খাঁটিয়ে আপদ বিদায় করার মানসে ফতোয়ার শানধার খঁড়গটির দ্বারস্থ হতে একাব্বর যায় বড় হুজুরের কাছে।

কিন্তু একি শোনাল বড় হুজুর! সরকারের সদ্য করা নারীনীতির কারণে হুজুরের ফতোয়ার খঁড়গটির শান নাকি নষ্ট হয়ে গেছে। ভোতা এই খঁড়গে একাব্বরের বাসনা পুরণ হওয়ার নয়। অনেক বলে কয়েও হুজুরকে সে রাজী করাতে পারল না। ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজটি না করে হুজুর জেলা শহরে একজন উকিলের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আদালতের সরাণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিল। এ অনেক খরচের ব্যাপার। সমাধানের পথও আবার দীর্ঘ।

হোক খরচ। তারপরও দিনকে দিন এই জোয়ান মাগীটার বেহাল্লাপনা একাব্বর সহ্য করতে পারছিল না। জমির ফসল ঘরে না উঠার কারণে হাতেও নগদ নেই। অনুন্যপায় হয়ে তাঁর দুগ্ধবতী গাভিটি বিক্রি করে আগুন যৌবনা রাক্ষুসীটাকে বিদায় করার মনস্থির করল।

একাব্বর ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে যখন গাভি বিক্রির টাকাগুলো গুনছিল, তখনি দ্যাশের বড় আদালতের ফতোয়া জায়েজ করার খবরটা পেল। খবরটি পেয়ে গাভি হাঁরানোর দুঃখে মাথায় হাত দিয়ে বসে উপরের খেঁদোক্তিগুলো করলেও, মনে মনে সে খুশী। যাক মাগীটাতে অল্পতেই বিদায় করা যাবে।

– ‘রাইতেই বড় হুজুরের ফতোয়ার ছেনিটার ধার দেইখা আসতে অইব’ – একাব্বরের আহাল্লাদ ভরা স্বগোক্তি।

[২০১১ এর মে মাসে ফতোয়া দেওয়ার পক্ষে হাইকোর্টের একটা রুলের জবাবে গল্পটি লিখেছিলাম, যা অন্য একটি ব্লগে ১৫মে, ২০১১-তে প্রকাশিত হয়েছিল। পুরানো কিছু কিছু নিজের কাছে ভাললাগা লেখাগুলো ইস্টিশন’র পাঠকদের জন্য শেয়ার করার অভিপ্রায়ে গল্পটি পোস্ট করলাম।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩৭ thoughts on “ফতোয়ার খঁড়গ

  1. গল্পটা শেয়ার করে ভাল করেছেন।
    গল্পটা শেয়ার করে ভাল করেছেন। গল্প কোনদিন পুরোনো হয় না। পড়ে ভাল লাগছে খুব। চরিত্রগুলো বাস্তব, পরিপাশ্বিক বাস্তব, গল্পে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ধন্যবাদ।

  2. অনেক আগে পড়লেও এই ধরণের লেখা
    অনেক আগে পড়লেও এই ধরণের লেখা নিয়মিত পাওয়া হয় না বলে এসব যতই পড়ি ততই নতুন লাগে।
    চমৎকার লেখনীর; এই হাত যদি থেমে থাকে বয়সের অজুহাত দিয়ে, তাহলে আপসুস করা ছাড়া আর কিইবা করার থাকে?
    আমরা চাই মাটি কাটা অব্যাহত থাকুক :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান:

      1. বাংলাদেশের মতো দেশে বসবাস করা
        বাংলাদেশের মতো দেশে বসবাস করা অবস্থায় যদি আপনি বলেন শক্তি নাই তাহলে সেটি পরম দূর্ভাগ্যজনক কথা। বাঙালির অঙ্গে অঙ্গে শক্তি সরবরাহ দিতে ১০০% ভাগ, হালাল, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, রাজা-বাদশাদের হেকিমদের কবিরাজী ঔষধ এখন হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়।

        বিঃ দ্রঃ বিফলে মূল্য ফেরত [ এই রকম সতর্ক বাণীও লেখা থাকে]

          1. আমার অভাব আর বেকারত্বই এসব
            আমার অভাব আর বেকারত্বই এসব জানতে দিয়েছে।

            বাসে চড়ার সময় হঠাৎ করে দেখবেন নীল চিঠি আপনার কোলে।
            বেকার মানুষ অঢেল সময় আর তাই সারাদিন বসে বসে টিভি দেখা ছাড়া আর কিইবা করার থাকে, চ্যানেল ঘুরানোর ফাঁকে ফাঁকে এসব বিজ্ঞাপন অহরহ দেখা যায়।
            আবার পথে হাঁটার ফাঁকে ফাঁকে এসবও নজর এড়ায় না বেকারদের।

            মোদ্দা কথা হলো এইসকল ঔষধের ব্যাপারে আজকাল ১২ বছরের ছেলেপুলেরাও জানে আর সেখানে ….. :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান:

  3. ভাল লিখেছেন ।আমাদের সমাজ
    ভাল লিখেছেন ।আমাদের সমাজ কিছুটা হলেও সভ্যতার দিকেই এগোচ্ছে ।আজকাল আর মোল্লাদের ফতোয়া গণহারে কাজ করে না ।

    1. শাহীন ভাই,
      বাংলাদেশের কত ভাগ

      শাহীন ভাই,
      বাংলাদেশের কত ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে? ….আশাকরি পরিসংখ্যানটা আপনার জানা আছে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটা গ্রামে এখনো গণহারে ফতোয়ার ব্যবহার হয়। এমন কি শিক্ষিত পরিবারগুলোতেও ফতোয়ার চর্চা গণহারে হয়।

      আশাকরি আপনার গণহার আর আমার বলা গণহারের পার্থক্যটা আপনি উপলব্দি করতে পারছেন এখন।

      মন্তব্যের জন্য অশেষ ধন্যবাদ।

  4. অবাক করা ব্যাপার হল, এই গল্প
    অবাক করা ব্যাপার হল, এই গল্প টা আমার পড়া আছে, কিন্তু কোথায় পড়েছি মনে করতে পারছি না। অনেক আগে পড়েছি। পারফেক্ট একটা অনুগল্প এটা। অনেক ভালো লাগল।
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    বাই দ্যা ওয়ে, দুলাল ভাই , আপনার এরকম পুরাতন লেখাগুলা ধীরে ধীরে শেয়ার করেন ইষ্টিশন এর প্লাটফর্মে। অপেক্ষায় থাকলাম।

    1. আগে পড়েছেন জেনে ভাল লাগল।
      আগে পড়েছেন জেনে ভাল লাগল। পুরানো কিছু লেখা ইস্টিশনে শেয়ার করব। এর মধ্যে রাইটার্স ব্লক কেটে গেলে নতুন কিছু লিখব। লেখালিখির ক্ষেত্রে সময়টাও একটা মুখ্য বিষয়। কর্পোরেট লাইফে ক্রিয়েটিভ কাজে সময় বের করা দুরহ! এই যে আপনাদের মন্তব্যের প্রতিউত্তরগুলোও সময় মত দিতে পারছি না। কিন্তু ইস্টিশনে সব সময়ই লগইন থাকি। সময় পেলেই চোখ বুলাই।

      ধন্যবাদ আপনাকে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 4 =