মির্জা জোওয়ারদার বখতের একঘেয়েমি

মির্জা জোওয়ারদার বখত স্কুলঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন কোমড়ে হাত দিয়ে। দূর থেকে দেখতে পেলেন জমির আল বেয়ে তার দুই অপদার্থ সান্ত্রী এইদিকেই এগিয়ে আসছে। সান্ত্রী দুটোর সামনে পিছে দুজন স্থানীয় দালাল। এদের হাবভাবে মনে হয় কোন ব্যাপারে তারা খুব উত্তেজিত। স্কুলঘরটা উঁচু জমিতে। ক্যাম্প ফেলা হয়েছে এখানে আজ দুইদিন। এখনো জায়গাটা ভাল বুঝে উঠতে পারেননি। স্থানীয় মুসলিম লীগের নেতাকর্মীরা চোখ-কান হয়ে কাজ করছে। যদিও এই বেজন্মা জাতটাকে তার পুরোপুরি বিশ্বাস হয় না। কে যে জয়বাংলার লোক বুঝবে কি করে?

মির্জা জোওয়ার্দারের ভুরু কুঁচকে রইল। বাংলা মুল্লুক আসা অব্দি তার দু’ভুরু মাঝখানটা ভাজ হয়ে আছে। এ জায়গা তার পছন্দ হয়নি। এর মধ্যে শুরু হয়েছে বর্ষাকাল। বাংলার গ্রাম যে বর্ষায় কি চেহারা নেয় মির্জা জোওয়ারাদারের কোন ধারনাই ছিল না। সে মুলতানের লোক। ছাত্র জীবনে এবোটাবাদের কাকুল মিলিটারি একাডিমিতে লেখাপড়ার সময় যে বাঙালি ছেলেটা তার ব্যাচমেট ছিল তার কাছে কিছু কিছু শুনেছিল বটে, কিন্তু নিজের চোখে এখানকার নদীগুলো দেখে ভীষণভাবে নিজের ভেতর দমে গেছে। এত পানি তার দলের কোন সৈন্যই জীবনে দেখেনি! এসব নদীতে নাকি কুমিরও আছে! বর্ষাকাল বলে প্রচুর বিছে আর সাপের উপদ্রপ। সব মিলিয়ে জঘন্ন একটা জায়গা। সেই বাঙালি অফিসারটার বাড়ি এখানেই কোথায় যেন বলেছিল…।

মির্জা জোওয়ারদার বখতের বাঙালি অফিসারটির কথা মনে পড়ায় নিজের অজান্তে ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটে উঠেলো। এ হাসি আসলে জীবনের সামগ্রিক অর্থহীনতার। দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের ঠুংকতা দেখে। ৬৫ সালে তারা দুজন শিয়ালকোট সেক্টরে কাঁধে কাঁধে রেখে ভাই ভাই হয়ে ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। মেজর ইলিয়াস তার সেই ব্যাচমেট ছুটিতে মার্চ মাসে নিজের দেশে চলে আসে। মির্জা বখত জানে সে এখন নিশ্চিত করে জয়বাংলার লোক। সে এ-ও জানে দুজনই দুজনকে দেখে টিগার চাপতে এখন আর দুবার ভাববে না!

বাংলার নদীগুলো বর্ষায় সাগড় মহাসাগড়ে রূপ নেয়। এই বৃষ্টি, জলকাঁদা আর বুক হিম করা নদীর জলতরঙ্গ মির্জা জোওয়ারদারকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। এখানকার মানুষগুলোও বড় আজব লাগে তার। কাল একটা শয়তান নয় বছরের একটা ছুকরিকে ধরে নিয়ে এসেছিল ক্যাম্পে। মেয়েটা দালালটার পা ধরে কাঁদছিল মামা মামা বলে। এর মানে এরা পরস্পর পূর্ব পরিচিত…। মানুষ তো ঘরের পালা গরুকে কোরবাণি দিতেও চোখ ভেজায়! আর এই শালা… থুতু ফেললো মির্জা জোওয়ারদার বখত।

মির্জা জোওয়ারদার বখত মন শক্ত করে। তার যখন মনে পড়ে সে এসেছে ইসলামকে রক্ষা করতে তখন এই যুদ্ধটা তার কাছে একটা অর্থ হয়ে ধরা দেয়। এই একঘেয়ে বিরক্তিকর দিনগুলোকে তখন পার করে দিতে একটা সান্ত¦না পায় মনে। বাঙালিরা হচ্ছে কাফের। এরা প্রকৃত মুসলমান নয়। এরা হচ্ছে হিন্দুদের একটা শংকরজাত। লেঃ জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী বলেছেন, ম্যায় ইস হারামজাদী কওম কি নাসল বদল দুঙ্গা (আমি এই জারজ জাতির বংশগতি বদলে দেব)। পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষার জন্য মির্জা জোওয়ারদার বখত্ বিশ্বাস করে নিয়াজীর তত্ত্ব প্রয়োগ আশু জরুরী। বাঙালিকে প্রকৃত পাকিস্তানী বানাতে এছাড়া দ্বিতীয় পথ নেই। এদের দিলে ইসলামী জোসই নাই! আল্লাহ আকবর ধ্বনি শুনলে তার শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। এই জয় বাংলাকে বুটের তলায়, ঐ কালকের ছুকরিটার ইয়েটাকে যেভাবে থেঁতলে দিয়েছিল সেভাবে… মির্জা জোওয়ারদার বখত ফের থুতু ফেললো শব্দ করে।

একঘেয়েভাবে দিনগুলো কাটছে। এখানে আসার পর ক্যাম্পে বসে থাকা ছাড়া কোন কাজ নেই। নদী পেরিয়ে আরেকটা দল আসবে ক্যাপ্টেন আবদেল শামসের নেতৃত্রে। এসে তার সঙ্গে যোগ দিবে। কাজ শুরু হবে মূলত তারপর থেকে। মির্জা জোওয়ারদা আর তার দলবলের এখন তাই বসে থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। আশপাশটা ঘুরে দেখা দরকার। মুক্তি বাহিনীর খুঁজে লোক লাগানো হয়েছে। রাজাকার আল বদররা কাজ করছে। সরেজমিনে দেখে এসেছে পুরো গ্রামটা মানুষ শূন্য। পাকিস্তানী বাহিনী আসার খবর শুনেই সব ফেলেটেলে মানুষজন পালিয়েছে। গৃহস্তের হাস মুরগীগুলোকে ধরে এনেছে শূন্য বাড়িগুলো থেকে। চাল-ডাল শুকনো খাবার সব নিয়ে এসেছে ক্যাম্পে। স্থানীয় দালালগুলো সব জানে। তারা পথ দেখিয়ে দেখিয়ে নিয়ে গেছে অবস্থাসম্পন্ন গ্রহস্থর বাড়িগুলিতে। হিন্দু আর আওয়ামী লীগের লোকজনের বাড়িগুলো লুটপাট শেষে গান পাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে এসেছে। এই ক্যাম্প থেকেও দূরের দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনের লেলিহান শিখাগুলো দেখা যায়। মির্জা জোয়ারদার বখত কফি খেতে খেতে দেখেন টকটকে লাল আগুনের শিখা। সন্ধ্যার আকাশের পটভূমিতে দেখতে দারুণ লাগে!

সাস্ত্রী দুটো সামনে এসে সামরিক কায়দায় স্যলুট করে উত্তেজিত ভঙ্গিতে মির্জা জোওয়ারদারের ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াল। একজন কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কথা বললো। শুনতে শুনতে মির্জা জোওয়ারদার বখতের মুখের রেখাগুলো পাল্টে গিয়ে টানটান হয়ে উঠলো। সে চেয়ারে বসা ছিল, এখন সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তীক্ষè দৃষ্টিতে সামনে তাকিয় রইল কিন্তু কিছুই দেখছিল না। সে গভীরভাবে ভাবছিল। আঙ্গুলের ফাঁকে সিগারেট জ্বলছিল। টানতে ভুলে গেলো। আকাশে ভেজা মেঘ বিকেলটাকে অসময়ে বুড়োটে করে তুলেছে। দিনের আলো দ্রুত পড়ে যাচ্ছে। মির্জা জোওয়ারদারের আঙ্গুলে সিগারেটের তাপ লাগায় স্বম্বিৎ ফিরে এলো যেন। ছুড়ে ফেলো দিল সিগারেটের টুকরোটা। সান্ত্রীদের দিক অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। ওরা জানে এখন কি করতে হবে। সবাই প্রস্তুত হলো…।

গ্রামের শেষে পুরোনো ভাঙ্গা কবরস্থানটা। বুনো ঝোঁপে জঙ্গল হয়ে আছে বহুকাল। আজ দুটো দিন এখানে মানুষগুলো আশ্রয় নিয়ে আছে। পঁচিশ জনের একটা দল। মিলিটারি আসার খবর পেয়ে এই মানুষগুলো সব ফেলে ভয়ে আতংকে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। জোয়ান ছেলেদের বেশির ভাগই মুক্তিযুদ্ধে। রাজাকারদের ক্ষোভ তাই এদের প্রতি বেশি। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পুরুষদের একটা দল কাল রাত থাকতে বেরিয়ে পড়েছে। হয়ত আজ সন্ধ্যার পর তারা সেখানেই চলে যেতো। কিন্তু তার আগেই পুরো দলটা ধরা পড়ে যায় দালালদের চোখে।

মির্জা জোয়ারদার বখতের নির্দেশে সবাইকে লাইন করে দাঁড় করানো হয়েছে। শক্তসমর্থ কোন পুরুষ দেখা গেলো না। বাচ্চা কোলে লম্বা ঘোমটা দিয়ে মহিলারা দাঁড়িয়ে। হিন্দু নারীদের প্রতি মির্জা জোয়ারদারের দুর্বলতা খুব। লাইনে কোন হিন্দু নারীকে সানাক্ত করা গেলো না। এখানে কোন কাফের আছে কিনা জানতে চাইলো সান্ত্রী। দলের মধ্যে বুড়ো ভাল মানুষ চেহারার একজন উর্দু বলতে পারে। সে এগিয়ে এসে হাতে পায়ে পড়ল মির্জা জোয়ারদার বখতের। বাবা, এখানে সব সাচচা মুসলমান, কোন কোফর নাই! এরা সব নামাজ কালাম পড়া মুসলিম নারী-পুরুষ। এদের তো কোন দোষ নাই…।

-এই বুঢ্ঢা চোপ যা! চিৎকার করে উঠল একজন সৈন্য।

লাইনে দাঁড় করিয়ে ফের গোণা হলো সবাইকে

-মুক্তি কাঁহা?

মহিলারা শব্দ করে কাঁদতে লাগলো। কেউ কান্না জড়ানো কন্ঠে সুরা ইউনুস পড়তে চেষ্টা করলো।

দালালগুলো বলল, অর বেটা মুক্তিযুদ্ধে গেছে। অর দুই ছেলে ইন্ডিায়া গেছে ট্রেনিং নিতে! লাইনে দাঁড়ানো দুজনকে দেখিয়ে বলল দালাল দুটো।

মির্জা জোয়ারদার বখত কোন কথা বলছে না। সে শুধু ভাবছিল। দুদিন ধরে এই মানুষগুলো এখানে কেমন করে তাদের নজর এড়িয়ে ঘাপটি মেরে পালিয়ে ছিল! তাহলে আশেপাশে একটা মুক্তি বাহিনীর গ্রুপ লুকিয়ে থাকা অস্বাভাবিক কিছু না। মির্জা জোয়ারদার বখতের ইচ্ছে করেছ নিজেকেই ফায়ার করে ফেলতে। তার অপদার্থ সান্ত্রীগুলোকে পাছায় দুটো লাত্থি কষাতে খুব ইচ্ছা করলো। পুরো জায়গা যদি চষে ফেলে থাকে তো দুদিন এরা লুকিয়ে ছিল কি করে?

লাইনে দাঁড়ানো আট-ন’মাসের এক পোয়াতীর দিকে চোখ গিয়ে ছিল মির্জা জোয়ারদারের। বড্ড একঘেয়ে লাগছিল সব কিছু তার কাছে। আজকের সন্ধ্যাটা বিচ্ছিরি স্যাঁতস্যাতে আর ভেজা। মন বিষণ্ণ করা আলো আকাশে। জোয়ারদার সাহেব পোয়াতী মহিলাকে ইঙ্গিত করলেন। লাইন থেকে তাকে আলাদা করা হলো। বাকী সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। পাহাড়ায় রাখা হলো সৈন্যদের। আপাতত তিনি ক্যাম্পে যাচ্ছেন।এদের ব্যাপারে ফয়সালা পরে জানাবেন। দালাল দুটোকে সঙ্গে নিয়ে মির্জা জোয়ারদার হাঁটতে লাগলো। পোয়াতীটাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল দালাল দুটো। লাইনের মধ্যে কান্নার রোল উঠল। ধমকাতে লাগলো সৈন্যরা। চাপা কান্না শোনা গেলো তখন। শিশুরা তো কিছু বুঝে না, ওরা শব্দ করেই কাঁদতে লাগলো…।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “মির্জা জোওয়ারদার বখতের একঘেয়েমি

    1. শেষটা তাড়াতাড়ি শেষ করে

      শেষটা তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলেছেন মনে হচ্ছে !!!

      তাই নাকি! নিজের লেখা সম্পর্কে আপনারাই আমার যথার্থ বিচারক। ধন্যবাদ চাষাদা।

  1. এক কথায় দারুন। তবেকি, যুদ্ধের
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    এক কথায় দারুন। তবেকি, যুদ্ধের গল্প এতো বেশি লেখা হয়ে গেছে যে এই প্রজন্মকে নতুন করে লেখার প্রয়োজন নেই… তারচেয়ে বরং সমসাময়িক বিষয়গুলো অনেক বেশি জরুরি!

    1. @সফিক, মুক্তিযুদ্ধ এই জাতির
      @সফিক, মুক্তিযুদ্ধ এই জাতির সেরা লেখাটি এখনো লেখা হয়নি ভাই। এটা একটা মুক্তিযুদ্ধ সাহিত্যর জন্য ধারাবাহিক চেষ্টা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে এখনো লেখালেখি, সিনেমা, সাহিত্য হয়েই চলেছে। সে দিক বিবেচণা করলে আপনিই বলুন আমাদের দশটি মুক্তিযুদ্ধের উপর উপন্যাসের নাম যেগুলো বিশ্ব সাহিত্যতে (যুদ্ধের উপর) দাঁড়াতে পারবে? ধন্যবাদ পড়ার জন্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 3