রাজীবকে যারা হত্যা করেছে তারাই কাফের! পেশাদার খুনী মুসলিম হতে পারে না!

আমাদের স্থানীয় মসজিদে জুমা’র নামায পড়তে গিয়েছিলাম। যদিও জানতাম ঐ দিন সমস্ত মসজিদে ভাষা শহীদ আর মুক্তি শহীদদের জন্য দোয়া করা হবে, কিন্ত ইমাম সাহেব করলেন উল্টোটা। উনি ব্লগে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর সামাজিক ওয়েব সাইটে লেখার মর্মস্পর্শী বর্ণণা দিলেন আর কেঁদে ফেললেন। দুই-চারজন দেখলাম উঃ উঃ জাতীয় শব্দ করে তাল মেলালেন। সন্দেহ হল একটা প্রিপারেশন নিয়েই তারা এসেছে। তবে এই এলাকায় বেশীর ভাগ লোকই শিক্ষিত আর বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন বলে সুর মেলালেন না আবার বাধাও দিলেন না। কেউ আজকাল ঝুঁকি নিতে চায়না, আমিও তার ব্যতিক্রম নই। এ এলাকায় কে কোথায় থাকে সবাই জানে! কোন সময় রাস্তায় ধরে জবাই করে দেয়, তার ঠিক নাই!

আমার এক মামা আর এক চাচা আছেন এবং ছিলেন। তাঁরা যৌবনে প্রবল ধর্মবিদ্বেষী ছিলেন। ধর্ম নিয়ে তাঁরা বিভিন্ন নিগেটিভ কথা বলতেন। ৫০ পার হওয়ার পরে এমন নামাযী হলেন যে, আমরা মুগ্ধ হলাম কারণ আমাদের পরিবারে আমরা সবাই ধর্মভীরু মুসলিম। আমাদের সুপ্রীম কোর্টে একজন অত্যন্ত সম্মানিত সিনিয়র আছেন, সংবিধানের উপর যার লেখা বই হাতে না নিলে কোন মামলা পরিচালনা করা যায়না। ধর্ম সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভংগিও ছিল নেতিবাচক; অন্য একজন সিনিয়র (এই সিনিয়রের আবার আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচন করার কথা ছিল) যখন হজ্জ করতে যান, তখন নাকি তাঁর হজ্জ করাকে নিয়ে তিনি টিপ্পনী কেটে বলেছিলেন, ‘এটা রাজনৈতিক হজ্জ’। তো তিনিও হজ্জে গেলেন, যাবার সময় বলে গেলেন, ‘মাহরিম (স্বামী বা ভাই) পুরুষ ছাড়া হজ্জ হয়না তাই তাঁর স্ত্রী’র চাপে বাধ্য হয়ে তিনি হজ্জে যাচ্ছেন’। এখন তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নাময পড়েন এবং প্রবল বিশ্বাসী। জামাতসহ সাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদরা অনেক সময় জাতীয় কবি নজরুল ইসলামকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অপনেন্ট হিসেবে দাঁড় করিয়ে ফায়দা লুটতে চায়। সেই নজরুলের যৌবনের কবিতা ছিল, ‘ভুলোক গোলক দোলক ভেদিয়া…খোদার আসন আরশ ছেদিয়া’…সেই নজরুল পড়ন্ত বেলায় আবার বলেছেন, ‘মসজিদের পাশে আমায় কবির দিও ভাই, যেন কবরে থেকেও মুয়াযযিনের আজান শুনতে পাই…’

এত কথার অবতারণা এই জন্য যে, রাজীব যদি নাস্তিক হয়ে থাকেন তাঁর তো জীবনে পরিবর্তন আসতে পারতো যেমন এসেছে অনেকের জীবনে। তাকে হত্যা করে ঐ লেবাসধারী মুসলিম কাফেরের কাজ করলো। ঐ হত্যাকারী ইসলামের লেবাসধারীদের কে বলেছে যে, আমাদের ধর্মবিশ্বাস এতোই দুর্বল যে, কোন নাস্তিকের কথায় আমরা ঈমান হারিয়ে ফেলবো? আমাদের নবী করিম (সাঃ) এর আহবানে বিনা প্রশ্নে যে দুজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা হলেন তাঁর বাল্যবন্ধু হযরত আবু বকর (রাঃ) আর তাঁর স্ত্রী বিবি খাদিজা (আঃ)। হযরত আলী (রাঃ), হযরত হামজা (রাঃ) এঁরা সবাই ইসলামের শত্রু থেকে পরে মুসলমান হয়েছেন। তাঁদের যদি আগেই হত্যা করা হত তবে তো আমরা হযরত আলী সহ ইসলামের কোন বীর সৈনিককেই পেতাম না। এই জামাত শিবির রাজাকাররা যারা কথায় কথায় ধর্ম রক্ষার নামে মানুষ হত্যা করছে তাঁরা বরং মানুষকে ইসলামের পথে আসার পথই রুদ্ধ করছে। ইসলামে কেবল মাত্র হত্যার বদলা হত্যা’র কথা বলা আছে তাও রাষ্ট্রীয় বিচারের মাধ্যমে। তাও আমার নিহতের পরিবার যদি তাকে ক্ষমা করে দেয় তবে সে এই দুনিয়ায় অন্ততঃ ক্ষমা পেতে পারে। আরেকসময় হত্যা যায়েজ, তা হল যুদ্ধকালীন সময় সম্মুখ যুদ্ধে। যুদ্ধ পরবর্তীতে শত্রু ধরা পরলে তাকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার বিধান আছে। রাজীব কাকে হত্যা করেছিল? রাজীবকে কোন যুদ্ধে হত্যা করা হল, ২০১০ সালে লেখা (আমি জানিনা আর পড়িওনি) তাঁর ‘ধর্ম বিরোধী’ লেখার পর তাকে কতবার ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিল জামাতীরা?

এঁদের দেখে একজন অন্যধর্মী মানুষের কি মনে হবে? এঁরা খুব ঈমানদার? সৎ? ধার্মিক? সাহসী? এদেরকে দেখে অমুসলিম দূরে থাক মুসলমান হয়ে আমিই আতঙ্কিত হই! রাতের অন্ধকারে সেই ৭১ সালে শত-হাজার মুসলমান নর-নারীকে তাঁরা হত্যা করেছিল, শত কিশোরী-তরুনীকে করেছিল ধর্ষণ। এদের ধার্মিক আর মুসলমান বললে আমার পবিত্র ধর্ম ইসলাম আর রাসুলকে অপমান করা হয়।

এতক্ষন লিখেছিলাম রাজীব বা অন্য নাস্তিকের ইসলামে ফিরে আসতে পারে এই পারস্পেক্টিভ থেকে। এখন ধরে নিলাম সে আসতোই না বা আসবেই না! তাহলে ইসলামের কি গেলো কি এলো তাতে??? সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি অমুসলিম আর নাস্তিক ছড়িয়ে আছে! সেখানে গিয়ে তারা যেহাদ করেনা কেন? সাহস আছে? রাসুল (সাঃ) কি তরবারী ঘুড়িয়ে লক্ষ লক্ষ কাফেরকে মুসলিম বানিয়েছিলেন নাকি ধর্ম আর মানবতা প্রচার করে তাদের মন জিতেছিলেন? একজন পেশাদার খুনীর পক্ষে একজন মানুষকে হত্যা করা খুবই সোজা! কিন্ত সেই একজন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে ইমানের পথে আনা আরেকজন প্রকৃত মুসলিমই পারে, পেশাদার খুনী পারে না! জামাত-শিবির-সঙ্ঘ সেই পেশাদার খুনী, প্রকৃত মুসলমান না! তাই তারা ১৯৭১’এ যে পথ বেছে নিয়েছিল আজ ২০১৩’তেও সেই একই পথ বেছে নিয়েছে! তারা তাদের নতুন প্রজন্মের কর্মীদের সেই একই রগ কাটা আর জবাই করা শিখিয়েছে।

আজ তাই ধর্মভীরু মুসলমান ভাইদের বলি, আপনারা জামাতের উস্কানীতে সামিল হবেন না! এরা কেবল আপনাদের ব্যবহার করছে। আপনি নিজের বুকে হাত দিয়ে বলেন, কারো ইসলাম বিরোধী লেখায় আপনি কি ধর্মান্তরিত হবেন? আপনি কি রগ কেটে আর জবাই করে অন্যের মন জয় করবেন নাকি আপনি আপনার সততা, মাহাত্ম্য অন্যান্য গুন দিয়ে অন্যের চেয়ে আপনার ভালোত্ব প্রকাশ করবেন, যে গুন আপনি মনে করেন আপনি মুসলিম বলেই অর্জন করেছেন।

আজ তারা নাস্তিকতার ইস্যু আনছে শ্রেফ যুদ্ধাপরাধীদের বাচানোর জন্য আর তাদের পেশাদার খুনী সংঘঠনকে যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে বাচানোর জন্য। এই মেজোরিটি মুসলিমকেই তো তারা ৭১’এ হত্যা করেছিল! তাহলে মুসলমান হয়ে আপনি আমি বিচার চাইবো না কেন?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “রাজীবকে যারা হত্যা করেছে তারাই কাফের! পেশাদার খুনী মুসলিম হতে পারে না!

  1. আজ তারা নাস্তিকতার ইস্যু আনছে

    আজ তারা নাস্তিকতার ইস্যু আনছে শ্রেফ যুদ্ধাপরাধীদের বাচানোর জন্য আর তাদের পেশাদার খুনী সংঘঠনকে যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে বাচানোর জন্য। এই মেজোরিটি মুসলিমকেই তো তারা ৭১’এ হত্যা করেছিল! তাহলে মুসলমান হয়ে আপনি আমি বিচার চাইবো না কেন?

    আপনার পুরো পোস্টের মুল বক্তব্য শেষ লাইনে আছে। আমি একটা কথা বুঝি- ধর্ম যার যার, রাস্ট্র সবার। রাজিব যদি সত্যিই নাস্তিক হয়ে থাকেন এবং নাস্তিক্যবাদ নিয়ে লিখে থাকেন, তার জবাব কি অস্ত্র দিয়ে দিতে হবে? কলমের জবাব কখনো অস্ত্র হতে পারেনা। আর ধর্ম কি এতই ঠুনকো জিনিস? কেউ কিছু লিখলেই মড়মড় করে ভেঙ্গে যাবে? জামায়াতের প্রপাগান্ডায় কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। ধর্ম কখনই রাজনৈতিক খাতে ব্যবহার করা উচিত না। ধর্ম চর্চার বিষয়। নিজেকে শুদ্ধ করার জিনিস। পৃথিবীর সকল ধর্মেই শান্তির কথা বলা হয়েছে। যারা ধর্মের নামে অশান্তি করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্য অবশ্যই খারাপ।

    সুন্দর এই পোস্টের জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

52 − 44 =