অপরাধ এবং অপরাধী…

[ইহা একটি এই সময়কার ব্যক্তিগত ভাবনা।]
.
.
রেফারেন্স মনে নেই; কোথায় যেন পড়েছিলাম, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগারে বন্দী থাকা দাগী অপরাধীদের উপর গবেষণা করে একটা চাঞ্চল্যকর তথ্য পান বিজ্ঞানীরা; সেইসব অপরাধীদের ভেতর অধিকাংশেরই সেই অপরাধ প্রবণতা জিনগত ছিল। আমরা সাধারণত মনে করে থাকি যে, কোনো মানুষ অপরাধী হয়ে ওঠার পেছনে থাকে তার বেড়ে ওঠার চারপাশের ক্রুয়েল প্রতিবেশ এবং পরিস্থিতি, অর্থাত্‍, সে নিজে থেকে অপরাধী হয়ে ওঠে না- তার যাপিত জীবন তাকে অপরাধী করে তোলে। নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে তাকে এমন সব কাজ এবং পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয় যা তাকে পরবর্তীতে সমাজবিরোধী এবং মানব বিরোধী কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করে। ঐটাই তখন তার কাছে স্বাভাবিক আচরণ বলে মনে হতে থাকে। এটা ফেলে দেবার মত যুক্তি নয় মোটেও। আমাদের স্বাভাবিক বোধ-বুদ্ধি এটাই মেনে নেয়। কিন্তু এই যুক্তিকে ঢালাওভাবে সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, এটা হয়ত ভেবে দেখার সময় এসেছে।

যে ধনীর দুলালিদের বা মধ্যবিত্তের যে সন্তানদের খাওয়া পরার কোনো সমস্যা নেই, নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে কঠোর জীবন সংগ্রামে নামতে হয় না, তাদের ভেতর থেকে কোনো অপরাধী বের হয়ে আসে না কি? তাদের কি সবাই সুস্থ নির্মল স্বাভাবিক জীবন যাপন করে? না। কারোর জিনে যদি অপরিমিত লোভ উচ্চাশা নিজেকে উগ্রভাবে জাহির করার কুটিল বাসনা এবং মানুষের আবেগ অনুভূতি ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীলহীনতা থাকে, আর সেই সাথে অপরকে কষ্ট দিয়ে নিজে একপ্রকার পৈশাচিক আহ্লাদ অনুভব করার মত জিনগত প্রবণতা যদি কারোর রক্তে লুকিয়ে থাকে তবে তার পক্ষে অপরাধী হয়ে ওঠার খুবই স্বাভাবিক;- এর জন্য তার জীবনে নিষ্ঠুর অতীতের উপস্থিতির প্রয়োজন হয় না। ‘ধর্ষকামী’ বলে যে একটা টার্ম আছে, যারা তাদের সঙ্গীকে নানা উপায়ে মানসিক কিংবা শারীরিক শাস্তি দিয়ে আনন্দ পায়, তা পরিস্থিতির কবলে পড়ে কেউ হয় তা নয়, এটা মানুষের জিনগত ব্যাপার। আর্থার কোনাল ডয়েলের একটা গল্পে পড়েছিলাম, কোনো পরিবারের একটা বাচ্চা ছেলে পোষা প্রাণী এবং পোকামাকড় পাখির উপর নৃশংসতা দেখিয়ে খুব মজা পাচ্ছিল, তার সেই ক্রুয়েলটি সে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিল, তা থেকেই শার্লক হোমস সেই পরিবারের গৃহকর্তার অপরাধ প্রবণতাকে শনাক্ত করে ফেলে। এবং দেখতে পায় তার বাবা [হয়তো মা-ও] বড় ধরণের অপরাধী সংঘের সাথে জড়িত! এটা রেফারেন্স হিসেবে নিশ্চয় নির্ভরযোগ্য সোর্স নয়, শুধু, এমনটাও যে হতে পারে সে ব্যাপারে ভাবনাকে উস্কে দেয় এবং এই ব্যাপারে গবেষণালব্ধ কোনো তথ্য আছে কিনা- তা খুঁজতে উত্‍সাহিত করে। গবেষণা দেখা গেছে, যারা সবসময় মিথ্যা বলাতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে, তাদের মগজে বিশেষ ধরণের উপাদান থাকে। বড় বড় অপরাধীরা যে শুধু পরিস্থিতির শিকার হয়ে অপরাধী হয়ে ওঠে না, তা তাদের জিনগত, বড় মিথ্যুকদের উপর এই গবেষণা সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে।

এখন কথা হচ্ছে, কারোর মাঝে অপরাধপ্রবণতা জিনগত থাকা সত্ত্বেও যদি সে সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তার মাঝেও কি একদিন সেই ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ ঘটবে? নাকি তা ব্যক্তিটির মাঝে সুপ্ত অবস্থায় থাকবে? যা অনুকূল পরিবেশ পেলেই জেগে ওঠে? জানা যায়, অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে যেসমস্ত দ্বীপ রয়েছে, সভ্য দেশের দাগী আসামীগুলোকে সেইসব দ্বীপে পাঠানো হত এবং এভাবেই ঐসব দ্বীপের গোড়াপত্তন হয়; সেই হিসেবে তো সেইসব দেশ আজ অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠার কথা! অথচ তারা আজ ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডের সভ্য জাতি হিসেবে পরিগণিত। আবার সাইদী নিজামী আজম রা খুনী হয়ে ওঠে কেন? সম্ভবত, জিনে ব্যাধি বীজ লুকিয়ে থাকে এবং একদিন অনুকল পরিবেশে অঙ্কুরিত হয়। মানুষ যেমন নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে অপরাধের পথ বেছে নেয় তেমনি লোভ লালসা এবং ভোগবাদিতার প্রতি তীব্র আকর্ষণ থেকেও অপরাধী হয়ে ওঠে। এই দুই শ্রেণীর ভেতর ১ম শ্রেণীর অপরাধীরা পরিস্থিতির শিকার এবং দ্বিতীয় শ্রেণী অপরাধীদের অপরাধ প্রবণতা জিনগত।

2.
অনটপিকে একটা অফটপিকঃ
[এক বন্ধুর বয়ফ্রেন্ডের কর্মকান্ড দেখে আমার যা অনুধাবণ]

ধর্ষকামী প্রবণতা হচ্ছে জিনগত সেই সমস্যা, যা কোনো পুরুষের ভেতর থাকলে সে তার সঙ্গিনীকে মানসিকভাবে কিংবা শারীরিকভাবে আঘাত করে এক ধরণের পৈশাচিক আহ্লাদ অনুভব করে। এটা যাদের থাকে তাদের জিনগতই থাকে, পরিস্থিতির কবলে পড়ে কারোরটা হয়তো বিকশিত হয় ভালোভাবে অথবা কারোরটা দমিত হয়ে থাকে, যা সেই নৃশংসতা বিকশিত হবার সুযোগ পেলে একদিন সেও পিচাশসম ধর্ষকামী হয়ে ওঠতে পারে।

আমাদের সমাজে চারপাশেই লুকিয়ে আছে এমন হাজার হাজার পুরুষ। প্রাথমিক কথাবার্তায় বা দেখায় যাদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এরা কোন একজনকে অথবা একাদিক জনকে টার্গেট করে ভালোবাসার ফাঁদ পাতে। ভালোবাসা হয়ে যাবার পর বা মিশনে জয়ী হবার পর, ভাবতে থাকে, মেয়েটা তার একান্ত কুক্ষিগত ‘মাল’ হয়ে গেছে, এখন যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে তাদের উপর চাষাবাদ করা যাবে, তখন এদের বাইরের লেবাস খুলে পড়ে এবং ভেতরের সেই আদিম অসভ্যতা বেরিয়ে আসে। মেয়েটির ব্যক্তিগত জীবন, তার প্রিয় অপ্রিয়, তার চাওয়া পাওয়া, আর আবেগ অনুভূতি- পুরুষটির কাছে কোনো মূল্য থাকে না বরং, মেয়েটির ঐসব স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে তার কোমল অনুভূতি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে মনে মনে প্রশান্তি পায়। এইসব মানুষেরা যেকোন ধরণের অভিনয়ে অত্যন্ত পটু। প্রেমিকা বানানোর আগে দক্ষ সংবেদনশীল, আবার প্রেমিকা ছুটে যাবার পর দক্ষ দুঃখকাতর প্রেমিকের অভিনয় করতে পারে। মাঝখানে কারোর আবেগ অনুভূতি নিয়ে খেলার টুর্নামেন্টে প্রেমিকাকে জেতার পর তার আসল চরিত্রটি বেরিয়ে আসে। এবং তার অভিনীত জীবন নাট্যে এটাই তার সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্স। কেননা, সেই সময়কার এই ধর্ষকামিতা প্রকাশের মুহূর্তে একদম নিজেকে প্রকাশ করে ফেলে।

এটা তাদের জিনগত… 😀

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 + = 19