রাষ্ট্রর নাস্তিকতা ভিন্ন সমাধান নাই

আমার প্রতি অভিযোগ আমি নাকি ধর্ম নিয়ে লিখি। কথাটা আমি স্বীকার করি না। ব্লগে ধর্ম নিয়ে যে ধরনের পোস্ট আসে আমি সেরকম লেখার যোগ্যতা রাখি না। আমি কোরআন-হাদিস, বেদ-বাইবেল বিষয়ে কোন জ্ঞান রাখি না। কাজেই এইসব গ্রন্থে কোথায় কি গন্ডগোল, কোন অবতার বদমাশ আর ভন্ড সেসব নিয়ে সরাসরি আমার কোন লেখা নেই। তবু যেহেতু সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, মৌলবাদীতার বিরুদ্ধে লিখি কাজেই ধর্ম নিয়ে লিখি এই সরলীকরণে পড়তে হবে জানা কথাই। আমি সব সময় সাম্প্রদায়িকতার মূল কোথায় চিহ্নিত করতে চেষ্টা করি, তালেবান উৎপাদনের কারখানাকে দেখানোর চেষ্টা করি। বলতে চেষ্টা করি, বেড়ায়ই ধান খাচ্ছে…। এই লেখাটির ট্যাগেও ধর্ম লেখা আছে। এই সাম্প্রদায়িক হামলা আর নির্যাতনের সময় আমাকে বলতেই হবে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া ধর্ম তার সাম্প্র্র্রদায়িকতা ছড়াতে পারে না। ধর্ম ও তার সমস্ত অনুসঙ্গ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপ্রষকতা ছাড়া বাড়তে পারে না। রাষ্ট্রকে নাস্তিকতা গ্রহণ ব্যতিত এর ভিন্ন সমাধান নেই।…

ধরুন আপনি হঠাৎ করে বলা শুরু করলেন আপনি অবতার, নতুন একটা ধর্মমত আপনি প্রচার করতে চান, লোকে এতকাল যা মেনে এসেছে তা মিথ্যা ও শয়তানের দেখানো পথ, ব্যাপারটা তখন কি দাঁড়াবে? প্রথমে আপনাকে পাগল-ছাগল বলে হাসিঠাট্টা করবে। তারপরও আপনি আপনার কার্যক্রম চালিয়ে গেলে ধমক ধামক, চড়চাপর মেরে আপনাকে লাইনে আনার চেষ্টা করবে। কিন্তু তারপরও আপনি এসব চালিয়ে যেতে শুরু করলে এবং বাড়াবাড়ি শুরু করলে, যেমন প্রচলিত বিশ্বাসের জিনিসগুলোকে হেয়, অকার্যকর প্রমাণে চেষ্টা, প্রচলিত উপাসনালয়ে গিয়ে সেখানে নিজের নতুন প্রচারিত ধর্মমত পালন করা শুরু করলে তখন কিন্তু ব্যাপারটা খুব সিরিয়াসভাবে লোকে নিতে শুরু করবে। আপনার যদি প্রভাবশালী চাচা-মামা থাকে তাহলে হয়ত একদম জানে মারা যাবেন না কিন্তু ভবিষ্যতে এটা একটা রক্তক্ষয়ি সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যাবে। পৃথিবীর সমস্ত ধর্ম যখন হাঁটিহাঁটি পা পা করে চলে তখন সেটা প্রচলিত ধর্মমতকে আঘাত করেই এগুতে থাকে। আজকে খুব শুনি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার কথা। মক্কা-মদিনার ও এর আশেপাশে সেই ১৪০০ বছর ও তারও আগে এই অনুভূতির আঘাতের মাধ্যমে একেকটা ধর্মমত প্রচার শুরু হয়েছিল। ইব্রাহিম তার একেশ্ববাদ প্রচার শুরু করেছিল বহু ঈশ্বরবাদ ও তাদের মূর্তিগুলোকে হেয় আর অপমান করা থেকে…।

এরকম মনে করার কোন কারণ নেই যে নতুন একটা মতবাদ প্রচার শুরু হলো আর ওমনি লোকে টপাটপ তা পেড়ে খেতে শুরু করে দিল। ঈশ্বর নামের এক অগাধ ক্ষমতার অধিকারী নেপথ্যে থাকার পরও ধর্মাবতারদের প্রায় সবাই বলতে গেলে ব্যর্থ হয়েছেন তাদের জীবদ্দশায়। তারা তাদের চর্মচোখে তাদের ধর্মের এত অনুসারী ও রমরমা অবস্থা দেখে যেতে পারেননি। তাদের মৃত্যুর বহু পরে রাজাদের অর্থ ও ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সেই মহাপুরুষের ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করেছেন তার অনুসারীরা। রাষ্ট্রীয় প্রভাব খাটিয়ে নানারকম পুরুষ্কার, লোভ-ললসা দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে, ব্লাকমেইল করে, অত্যাচার করে সেই ধর্মমতকে বিশ্বাস করানো হয়। বৌদ্ধ ধর্মের আজকের এত জনসংখ্যা ও প্রসার গৌতম বুদ্ধ দেখে যাননি। তার মৃত্যুর বহু বছর পর স¤্রাট অশোক যখন এই ধর্ম গ্রহণ করেন তখন তার অর্থ ও প্রভাবে বৌদ্ধ ধর্ম দিকে দিকে প্রচারের তোড়জোড় শুরু হয়। রাজার ক্ষমতা ছাড়া বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারের অন্য কোন ঐশ্বিরিক কারণ আছে বলে জানা নেই।

যদি ইহুদী আর খ্রিস্টানদের কথা বলি সেখানেও একই কথা বলা চলে। রোমানদের শাসনামলে থাকা ইহুদীরা যীশুকে ক্রুশে চড়িয়ে তো তাকে মেরেই ফেলে। অবস্থটা একবার ভাবুন, রাতের বেলা চুপি চুপি যীশুর লাশটা তার কোন ভক্ত এসে নিয়ে যায় ক্রুশ থেকে নামিয়ে। মানে খ্রিস্টান মতবাদ বা যীশুর আদর্শ মুখ থুবড়ে পড়ে রীতিমত। এই ধর্মই পরে কালক্রমে ইউরোপের ছড়িয়ে পড়ে। যখন রাজশক্তি খ্রিস্টীয় মত গ্রহণ করে (ধরা যাক ব্রিটিশ রাজ পরিবার) এর প্রসার ও ক্ষমতা হুহু করে বেড়ে চলে মাত্র এক শতকের মধ্যেই।

ইসলামের কথা আরবের লোকেরা যখন প্রথম মুহাম্মদের মুখে শুনে তখন লোকে হাসাহাসি করেছে। কিছু ছিন্নমূল, সমাজ বিতারিত, ভবঘুরে, ফকির-মিসকিন মুহাম্মদের এই নতুন ধর্মকে গ্রহণ করে প্রথম দিকে। মুহাম্মদের আল্লাহ যতই তাকে ভরসা ও অভয় দেন না কেন প্রকৃতপক্ষে আবু বকরের মত ক্ষমতাবান, ধনী ও প্রভাবশালী মানুষ ইসলামকে গ্রহণ করার পর মুহাম্মদ শক্ত একটা ভিত্তি পান। আরো পরে ওমর যখন ইসলাম গ্রহণ করে তখন মুহাম্মদ মুটামুটি একটা অবস্থায় যায়। ওমর ইসলাম গ্রহণ করায় আল্লাহ তার বাণীকে প্রকাশ্যে নির্ভয়ে প্রচারে সুযোগ পায়। মনে রাখতে হবে মুহাম্মদকে ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য মক্কা থেকে মদিনায় যেতে হয়েছিল। সেখানে গিয়ে তিনি শক্তি সঞ্চয় করে নিজস্ব বাহিনী গঠন করেন। মক্কা-মদিনায় তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠা করেন নানা গোত্রে বিভিক্ত আরবদের নিয়ে রাষ্ট্র। তিনি হন সেই রাষ্ট্রের প্রিন্স। তারপর আর তার ইসলামকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ইসলাম হচ্ছে একমাত্র ধর্ম যা স্বয়ং প্রফেট দ্বারা রাজনৈতিকভাবে প্রচারিত ও সম্প্রসারিত ধর্ম। অন্য ধর্ম ও তাদের প্রবর্তকদের সঙ্গে এখানেই ইসলাম ও তার প্রবর্তকের পার্থক্য।

ভারতীয় উপমহাদেশে খ্রিস্টান ধর্ম এসে পৌঁছে উপনিবেশ শাসকদের হাত ধরে। ভারতবর্ষ দখলের পর যীশুর বাণী রাষ্ট্রীয় আনুকুল্যে রানীমাতার আর্শিবাদ নিয়ে প্রচার ও প্রসারের কাজ চলতে থাকে। নানা রকম জোরজুলুম, প্রতারণা, দারিদ্রকে নিয়ে ব্লাকমেলিং ইত্যাদির মাধ্যমে ধর্মান্তকরণের কাজ ইংরেজ আমলে চলতে থাকে। যীশুর মহান বাণী কোন অবস্থাসম্পন্ন ভারতীয়কে বলাই বাহুল্য এতটুকু নাড়া দিতে পারেনি। দরিদ্র, নিপীড়িত, নিজ ধর্মদ্বারা নিগৃহ মানুষরা নেহাতই দায়ে পড়ে বাপ-দাদার ঈশ্বরকে ত্যাগ করে অজানা-অচেনা একটা ঈশ্বর ও তার পূত্রকে গ্রহণ করে নেয়।

ভারতবর্ষে মুসলিমদের অনুপ্রবেশ নিছক রাজ্য দখল আর লুটপাটের বাইরে অন্য কোন মহৎ উদ্দেশে ছিল না। প্রথমে মুসলিম শাসকরা এসেছে, তারপর তাদের হাত ধরে এসেছে ইসলাম প্রচারকারী আলেম, দরবেশরা। সুফিরা এসে এখানে যুদ্ধ পর্যন্ত করেছেন স্থানীয় শাসকদের বিরুদ্ধে। সুফিদের এতদিনকার উদার ধর্মপ্রচারের প্রচলিত যে ইতিহাস তার বাইরে তাদের রাজনীতি, প্রতারণা, মিথ্যাচার, যাদু (সুফিদের অনেকে জুয়েল আইচের চেয়ে ভাল যাদুশিল্পী ছিলেন এখন জানা যায়) দেখিয়ে ইসলামকে এখানে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। সমাজচ্যুত নিঁচু শ্রেণীর হিন্দুরা বর্ণশ্রেণীর হিন্দুদের সীমাহীন নিপড়ীনের শিকার হয়ে মুসলিম শাসকের রাজ্যে মুসলিম হয়ে স্বাভাবিকভাবে নানারকম সুযোগ-সুবিধা পেতো। বাড়তি পাওনা, মুসলিম হলে মুসলিম শাসকদের নানা রকম ছাড়ের ঘোষণার সঙ্গে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি তাকে “নিঁচু জাতের” অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়েছিল। দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপ্রষকতায় এহেন নানারকম প্যাকেজ আওতায় ইসলামকে এখানে প্রচার করা হয়েছে। আদৌ ইসলামের মহান বাণী শুনে কেউ দলে দলে এই ধর্মগ্রহণ করেননি। এর বড় প্রমাণ সমাজের উঁচু বর্ণের হিন্দুরা যারা সমাজের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন তারা ইসলাম গ্রহণ করেননি। আল্লাহর হেদায়াতের বাণী “শুকনো মুখে চিড়া ভিজে না” মতন জাগতিক লাভ লোকসানের হিসাবে মানুষের কাছে গ্রহণীয় হয়েছে।

পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মের উত্থানের পিছনে এভাবে রাজশক্তি ও অর্থ একমাত্র নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। তেমনিভাবে রাজশক্তি যখন কোন ধর্মের ব্যাপারে রুষ্ট হয়েছে তার পরিণাম হয়েছে ভয়াবহ। তার অস্বত্বি টিকিয়ে রাখাই হয়েছে কঠিন। এর সবচাইতে বড় উদাহরণ হতে পারে আরব বিশ্ব। এখানে ইহুদী, খ্রিস্টান ধর্মের জন্মভূমি অথচ সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশে ইহুদী খ্রিস্টান ধর্মের কোন অধিকার নেই। সৌদি আরবে কোন চার্চ নেই। খ্রিস্টান-ইহুদীসহ অন্য কোন ধর্মের পালনের কোন অনুমতি নেই। ইসলামী রাজশক্তি অন্য ধর্মের ব্যাপারে এখানে কঠোরতা অবলম্বণ করায় তাদের অবস্থা হয়েছে বিপন্ন। সমস্ত আরব বিশ্বে ইহুদী-খ্রিস্টান জনসংখ্যা এখন আঙ্গুল দিয়ে গোণা যাবে। তেমনি সোভিয়েত রাশিয়ায়, বা মা সেতুং চীনের ধর্ম বিষয়ে বিধি নিষেধ, উদাসিনতা ধর্মগুলোকে কোণঠাসা করে ফেলে। উদাহরণ এরকম আরো দেয়া যাবে…

কোন কিছু নিয়ে জোর-জবরদস্তি কোন ভাল ফল বয়ে আনে না। ধর্মকে জোরজবরদস্তি করে বাধা দিলে জনগণের মধ্য থেকে মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ধর্মকে অধিক পৃষ্ঠপৃষকতা ভয়ংকর মৌলবাদের দৈত্য তৈরি করে যেমন, তেমন কঠোর নিয়ন্ত্রণ একইরকম দৈত্যকে জন্ম দেয়। রাষ্ট্রর শুধু প্রয়োজন ধর্মকে পৃষ্ঠপৃষকতাকে নিয়ন্ত্রণ করা। রাষ্ট্র কোন ধর্মকেই পৃষ্ঠপৃষকতা করবে না। সে থাকবে ধর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসিন। ধর্মর ভেল্কিও তখন নিভতে শুরু করবে আপোষে। সাম্প্রদায়িকতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ণ রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া সম্ভবপর হয় না। রাষ্ট্র নিজেকে সব রকম ধর্ম বিষয়ে নিস্পৃহ হলে ধর্ম ব্যক্তি পালনের মধ্যে গিয়ে সিঁধিয়ে যাবে। আমাদেরও তখন ধর্ম নিয়ে কথা বলতে হবে না…।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “রাষ্ট্রর নাস্তিকতা ভিন্ন সমাধান নাই

  1. ইসলামের কথা আরবের লোকেরা যখন

    ইসলামের কথা আরবের লোকেরা যখন প্রথম
    মুহাম্মদের মুখে শুনে তখন লোকে হাসাহাসি করেছে।
    কিছু ছিন্নমূল, সমাজ বিতারিত, ভবঘুরে, ফকির-
    মিসকিন মুহাম্মদের এই নতুন ধর্মকে গ্রহণ করে প্রথম
    দিকে। মুহাম্মদের আল্লাহ যতই তাকে ভরসা ও অভয়
    দেন না কেন প্রকৃতপক্ষে আবু বকরের মত ক্ষমতাবান,
    ধনী ও প্রভাবশালী মানুষ ইসলামকে গ্রহণ করার পর
    মুহাম্মদ শক্ত একটা ভিত্তি পান। আরো পরে ওমর
    যখন ইসলাম গ্রহণ করে তখন মুহাম্মদ
    মুটামুটি একটা অবস্থায় যায়। ওমর ইসলাম গ্রহণ করায়
    আল্লাহ তার
    বাণীকে প্রকাশ্যে নির্ভয়ে প্রচারে সুযোগ পায়।

    খুব চমৎকার লিখেছেন।

  2. ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে, আপনার
    ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে, আপনার জানার ও বোঝার পরিধি সংকীর্ণ। ব্যাপক তো নয়ই। অবিশ্বাস দুঃস্বপ্নেও মানবতার সমাধান হিসেবে ভাবা উচিত নয়। নিচের লিংকগুলোতে গিয়ে ঘুরে আসতে পারেন। বোঝার ও উপলব্দির আন্তরিক প্রয়াস থাকলে আপনার বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গীই পাল্টে যাবে। বিঃদ্রঃ রাতে পড়বেন না, ঘুম বরবাদ হয়ে যাবে।
    http://chilekotha.com/2016/10/17/p1421/
    http://chilekotha.com/2016/10/28/p1453/
    http://chilekotha.com/2016/11/04/p1468/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

50 − 46 =