ক্রিকেট আপনার কাছে শুধুই ব্যবসা, আর আমার কাছে অক্সিজেন

লেখাটা এডিট করতে হল, কারণ লেখাটা লিখেছিলাম আইসিসির বিগ-৩ এর ক্রিকেট ব্যবসা দখল আর বাংলাদেশ জিম্বাবুয়েকে টেস্ট ক্রিকেট থেকে বহিস্কার সিদ্ধান্ত ফাঁস হবার কিছুদিন আগেঃ

গত ক’বছরে বাংলাদেশের উন্নতি উর্ধমুখী। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে টেস্ট আর ওয়ান ডে সিরিজে হারানোর মাধ্যমে তরুন বাংলাদেশের জয়ের ধারা শুরু হয়, কিন্ত যেহেতু এই সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুল খেলোয়াড়রা ধর্মঘটের কারণে অনুপস্থিত ছিলেন সে কারণে অনেক সমালোচকের কাছে এই রেজাল্ট বাংলাদেশের উন্নতির উর্ধ্বমুখীতার স্বীকৃতি পায়নি। এরপরে বাংলাদেশ ঘরের মাটিতে নিউজিল্যান্ডকে ৪-০ তে হোয়াইট ওয়াশ করে। এটাও বাংলাদেশ বিদ্বেষীদের ভাল লাগেনি; তারা একে পীচের সমস্যা, নিউজিল্যান্ড ভাল খেলেনি, হালকাভাবে নিয়েছিল, ইত্যাদি বিভিন্ন অজুহাতে বাংলাদেশকে কৃতিত্ব দিতে চান নি।



লেখাটা এডিট করতে হল, কারণ লেখাটা লিখেছিলাম আইসিসির বিগ-৩ এর ক্রিকেট ব্যবসা দখল আর বাংলাদেশ জিম্বাবুয়েকে টেস্ট ক্রিকেট থেকে বহিস্কার সিদ্ধান্ত ফাঁস হবার কিছুদিন আগেঃ

গত ক’বছরে বাংলাদেশের উন্নতি উর্ধমুখী। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে টেস্ট আর ওয়ান ডে সিরিজে হারানোর মাধ্যমে তরুন বাংলাদেশের জয়ের ধারা শুরু হয়, কিন্ত যেহেতু এই সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুল খেলোয়াড়রা ধর্মঘটের কারণে অনুপস্থিত ছিলেন সে কারণে অনেক সমালোচকের কাছে এই রেজাল্ট বাংলাদেশের উন্নতির উর্ধ্বমুখীতার স্বীকৃতি পায়নি। এরপরে বাংলাদেশ ঘরের মাটিতে নিউজিল্যান্ডকে ৪-০ তে হোয়াইট ওয়াশ করে। এটাও বাংলাদেশ বিদ্বেষীদের ভাল লাগেনি; তারা একে পীচের সমস্যা, নিউজিল্যান্ড ভাল খেলেনি, হালকাভাবে নিয়েছিল, ইত্যাদি বিভিন্ন অজুহাতে বাংলাদেশকে কৃতিত্ব দিতে চান নি। তারপরে, এলো ক্রিস গেইল আর অন্যান্য সেরা ক্যারিবীয় খেলোয়াড়দের ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল। তারা সিরিজ হারলো ৩-২তে। নিউজিল্যান্ড এসে দুই টেস্ট সিরিজ ড্র করলো আর ওয়ান ডে তে আবার হোয়াইট ওয়াশ হল। এবার বাংলাদেশ আসার আগে তারা আগে ভাগে ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল যে তাদের এবার অন্য রকম প্রস্তুতি আছে, যার মধ্যে আছে শ্রীলঙ্কায় দেড় মাস খেলে আসা, গতবারের মত বাংলাদেশকে সহজভাবে না নেয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। এর পরেও তারা হোয়াইট ওয়াশ হল। এশিয়া কাপে ভারত শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে পাকিস্থানের কাছে দুই-দুবার জিততে জিততে হেরে গিয়ে রানার্স আপ হল বাংলাদেশ। শহীদ আফ্রিদী পাকিস্থান ফেরত গিয়ে বললেন, ‘মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ না, আমরা অস্ট্রেলিয়া-সাউথ আফ্রিকার সাথে খেলছি’। এর মধ্যে আবার শ্রীলঙ্কার মাটিতে মুশফিকের ডাবল সেঞ্চুরী আর আশরাফুলের ১৯০ এর উপর ভর করে আমরা টেস্ট ড্র করলাম আর প্রথম বারের মত টেস্টে এক ইনিংসে ৬০০ রান পার করলাম।

কিন্ত এতে ঘুম হারাম হল তথাকথিত ক্রিকেট এলিটদের; এই কিছুদিন আগেও যাদের সাথে খেলতে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া নাক ছিটাকাতো, তারা নিজদেশে ক্রিকেটের ব্যপক বাণিজ্যকরণ আর ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেটের নিম্নগামী জনপ্রিয়তায় সুযোগে টাকার জোড়ে ‘এলিট’ পদবী ধারণ করলো। তারা দেখতে পেল ফুটবল-টেনিস কিংবা অলিম্পিক-এশিয়াডে বিশ্ব স্ট্যান্ডার্ডের ধারে কাছে আসার সুযোগ তাদের না থাকলেও এই এক খেলায় তাদের হিরো হওয়ার সুযোগ আছে। স্যটেলাইট চ্যানেলের কারণে আর প্রতিবেশী হিসেবে নৈকট্যের কারণে তারা আমাদের হিরো হিসেবে আবির্ভুত হল। টেন্ডুলকার, আজহারউদ্দিন, গাঙ্গুলী কিংবা ওয়াসীম আকরাম, ইঞ্জামাম, আফ্রিদীদের দেখার জন্য আমাদের রক্ষনশীল মেয়েরাও সোনারগাঁ হোটেল হামলে পড়তে লাগলো। তারা ব্যনার টাঙ্গিয়ে আহবান জানায়, ‘আফ্রিদী! আমায় বিয়ে কর!’।

কিন্ত এই ধারায় প্রথম কুঠার পড়লো যখন এক দুর্বিণীত যুবক তার ক্রিকেট ব্যাটটাকে তরবারী বানিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ক্রিজ ছেড়ে জহির খান, প্রবীণ কুমারদের আছড়ে ফেললো প্যাভিলিয়নের দোতালায়, তার নাম তামিম ইকবাল; এরপরে সাকিব আল হাসান, মুশফিক এরা থু থু দিল ঐ তথাকথিত এলিটদের মুখে। বাঙ্গালীর হিরো এখন আর কোন ভারতীয় পাকিস্থানী ক্রিকেটার না, বাংগালীর হিরো তার প্রতিবেশী সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহীম, নাসির হোসেন, কিংবা সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ মমিনুল ইসলাম। এটা ভাল লাগেনা, তথাকথিত এলিটদের! তাদের প্রতিনিধি ক্রিকইনফোডটকমে এই ক্ষোভ, এই বিদ্বেষ, এই হতাশা ঝরে পরে বাংলাদেশের খেলাগুলোর মন্তব্য কলামে।

সৌরভ গাঙ্গুলীকে অকৃত্রিমভাবে ভালবেসেছিল বাংলাদেশীরা আর সেই দাদা ভারতের অধিনায়ক থাকাকালীন বাংলাদেশকে টেস্ট ক্রিকেটের দ্বিতীয় স্তরে নামিয়ে দেয়ার পক্ষে শক্ত ওকালতি করেন। তাদের মতে বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড, আফগানিস্থান, নেপাল, স্কটল্যান্ডকে নিয়ে দ্বিতীয় গ্রেডের টেস্ট চালু করলে নাকি বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নতি হবে, সাথে সাথে অন্যদের নাকি উন্নতি হবে। আসল কথা ছিল, সৌরভ আর অন্য ভারতীয়রা বুঝতে পেরেছিল আকরাম বুলবুলরা তাদের সেলিব্রিটি মর্যাদা দিলেও পরের প্রজন্ম তাদের সেই মর্যাদা আর দিবেনা; ক্রিকেট নামে এই একটা খেলায় ‘ইংরেজ সাহেব’দের সাথে খেলে তারা যে ‘সাহেবদের বন্ধু’ মর্যাদা পাচ্ছিল, তা যেতে বসেছে বাংলাদেশ টেস্ট খেলায়, আর তারা এটা ভাল করে জানতো আমাদের আগের জেনারেশনের খেলোয়াড়রা, ওয়াসিম-টেন্ডুলকারের বিপরীতে খেলতে পারার কারণে শিহরিত-বিহবলিত হলেও নতুন জেনারেশনের তামিম-সাকিবরা তাদের পাত্তা দেবেনা তখন তাদের ‘দাদাগিরি’ আর থাকবে না।

বিগ-৩ এর প্রস্তাবনা আর হীনমন্য বিসিবির ভাবনাঃ

বিসিবির কিছু ‘ব্যবসা বিশেষজ্ঞ’ ডাইরেক্টর বলছে ভারত-ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া তথা, তথাকথিত বিগ-৩ এর প্রস্তাব মেনে নিয়ে টেস্ট ক্রিকেট থেকে বহিস্কার হওয়ার আইসিসির সিদ্ধান্ত মেনে নিলে নাকি অনেক ব্যবসায়িক ফায়দা হবে। খালেদ মাহমুদ সুজন বললেন, আইসিসির আয় তিনগুন বেড়ে যাবে আর তাতে শতকরা হিসেবে বাংলাদেশের আয় কমলেও মোট আয় অনেক বেড়ে যাবে! আর কে না জানে, যখন টেস্ট পুর্ব যুগ আর টেস্ট পরবর্তী যুগের খেলোয়াড়দের মধ্যে যে ব্যপক ফারাক, কিংবা বাংলাদেশের খেলার এত উন্নতির মুলে আছে নাকি শুধুই টাকা! কি অদ্ভুত যুক্তি!!! আবার আমাদের প্রেসিডেন্ট পাপন ভাই বলছেন, যদি বাংলাদেশ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আর এর পরেও প্রস্তাবটি পাশ হয়ে যায় তবে বিগ-৩ আমাদের ‘বেয়াদপী’ ক্ষমা করবেনা! পাপনভাই এটা বুঝতে পারছেন না যে, বিসিবির সমর্থনে যদি বাংলাদেশের টেস্ট খেলা বন্ধ হয়, তবে সেই ‘বেয়াদপী’র শাস্তি তিনি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের হাতেই পাবেন! সুজনের মত বিসিবি’র বেশীরভাগ ডাইরেক্টরের মতে, জগতের সকল সুখের উৎস হচ্ছে টাকা! তবে বিসিবি না বুঝলেও বাংলাদেশের সাধারণ দর্শকরা ঠিকই বুঝেছে, তাই তারা বলছে, ‘ আইসিসি! ক্রিকেট তোমাদের কাছে শুধুই ব্যবসা! কিন্ত আমাদের কাছে অক্সিজেন! এই অক্সিজেন কেড়ে নিওনা!” ‘

ক্রিকেট আমাদের আত্মমর্যাদা দিয়েছে। আমরা সেই প্রজন্মের, যেই প্রজন্ম খেলা দেখতে না, শুধুমাত্র ভারতীয়-পাকিস্থানী খেলোয়াড়দের দেখতে মাঠে গিয়েছিলাম, ভারত-পাকিস্থানের সাপোর্টার হয়ে টিভিতে চোখ বড় বড় করে তাদের দেখতাম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেনীর কোন ভারতীয় বা পাকিস্থানী দল এলেও তাদের খেলা দেখতে মাঠে ভিড় করতাম। আবার আমরাই সেই প্রজন্ম যারা এখন কোন ভারতীয়, কোণ পাকিস্থানী খেলোয়াড় কখন এলো কখন গেলো খবর রাখিনা, কারন হিরো আর সেলিব্রিটি আমাদের মাগুরা, নড়াইল, চট্টগ্রাম আর রংপুরে পয়দা হয়। আমরা সেই প্রজন্ম যারা আজহারউদ্দিন, সাইদ আনোয়ারদের হিরো মেনে নিজেরা হীনমন্যতায় ভুগেছি, আবার আমরাই সে প্রজন্ম যারা উদ্ধত তামিম ইকবালের ক্রিজ থেকে বেড়িয়ে জহির খানের বল সোজা স্টেডিয়াম পাড় করে মন্দিরা বেদী নামে এক বিগতা যৌবনা ভারতীয় মডেলের মুখে পড়তে দেখেছি, যে কিনা সবসময় তার ধারাভাষ্যে বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করতো। আমাদের মেয়েরা আর আফ্রিদীকে বিয়ে করতে চায় না। আমাদের মেয়েরা আর ভারতীয়-পাকিস্থানী খেলোয়াড়দের দেখতে হোটেলে ভিড় করেনা! ক্রিকেট দিয়ে আমরা উপমহাদেশকে বুঝিয়েছি তোমরা কোন অসাধারণ বস্তু নও! এরপর আমরা তাদের চ্যালেঞ্জ করেছি অর্থনীতিতে, আজ বাংলাদেশের টাকা, পাকিস্থানী রুপীর চাইতে শক্তিশালী, ভারতীয়দের চাইতে আমাদের জীবন-মান এখন অনেক উন্নত! বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এখন আমেরিকান সরকারকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দেশ শাষন করে। এই আত্মসম্মানবোধ, আত্মবিশ্বাস আমাদের দিয়েছে টেস্ট খেলুড়ে নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশ দল।

সুতরাং বাঙ্গালীর আত্মসম্মান নিয়ে, মর্যাদা নিয়ে টানাটানি করলে বাঙ্গালী কাউকে ছাড়বেনা! আওয়ামী লীগ- বিএনপি নিয়ে বাঙ্গালীর বিভক্তি আছে, কিন্ত ক্রিকেট নিয়ে বাঙ্গালীর কোন বিভক্তি নেই! সুতরাং বহুল বিতর্কিত আইসিসি মিটিংএ যদি উলটো পালটা কিছু হয়ে যায় তবে তার দায় বিসিবি এবং সরকার এড়াতে পারবেনা, এজন্য যারা এসকল পদে আছেন তারা এখন থেকেই সাবধান হবেন বলে আশা করি!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “ক্রিকেট আপনার কাছে শুধুই ব্যবসা, আর আমার কাছে অক্সিজেন

  1. বাঙ্গালীর হিরো এখন আর কোন

    বাঙ্গালীর হিরো এখন আর কোন ভারতীয় পাকিস্থানী ক্রিকেটার না, বাংগালীর হিরো তার প্রতিবেশী সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহীম, নাসির হোসেন, কিংবা সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ মমিনুল ইসলাম।

    :bow: :bow: :bow:

  2. পাপনভাই এটা বুঝতে পারছেন না

    পাপনভাই এটা বুঝতে পারছেন না যে, বিসিবির সমর্থনে যদি বাংলাদেশের টেস্ট খেলা বন্ধ হয়, তবে সেই ‘বেয়াদপী’র শাস্তি তিনি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের হাতেই পাবেন! –


    একদম মন থেকে একমত… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 82 = 83