অনন্য সুভাষ (১)

[এই লেখাটি আমার ধারাবাহিক লেখা, প্রথম কিস্তি আজ প্রকাশে মনস্থির করছি এবং সেই সাথে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই আমার এই ধারাবাহিক লেখা আমি উৎসর্গ করছি আমার আদরের ছোটো বোন আমি যাঁর কাছে অনেকটা ঋণী সেই ক্যামেলিয়া কামাল (ফড়িং ক্যামেলিয়া)’কে]

সুভাষ বসুর জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি তাঁর বাবার কর্মস্থল উড়িষ্যার কটক শহরে। বাবা জানকীনাথ বসু, মা প্রভাবতী দেবী। সুভাষ বসু ছিলেন বাবা-মায়ের নবম সন্তান। সুভাষদের পৈতৃক নিবাস পশ্চিম বাঙলার চব্বিশ পরগণার চাংড়িপোতা গ্রামে। সুভাষ পূর্ব-পুরুষের দিক দিয়ে দুইটি ভূস্বামী গোষ্ঠীর উত্তরসূরী ছিলেন, পৈতৃকসূত্রে মাহিনগরের বসু পরিবারের আর মায়ের দিক দিয়ে হাটখোলার দত্ত পরিবারের। সুভাষের বাবা জানকীনাথ বসু ছিলেন পেশায় একজন আইনজীবী, তিনি কটক শহরের স্বনামধন্য আইনজীবী ছিলেন। আর বাবা জানকীনাথ বসুর আইন ব্যবসার সূত্রেই সুভাষদের বসতি উড়িষ্যার কটক শহরে।
অন্যদিকে সুভাষের বাবা এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, তিনি ১৯০১ সালে কটক শহরের প্রথম নির্বাচিত মেয়র। জানকীনাথ বসু ১৯০৫ সালে কটকের শহরের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিযুক্ত হন, কিন্তু ওই সময় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে বিবাদ সৃষ্টির কারণে ১৯১৭ সালে জানকীনাথ বসু পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯১২ সালে জানকীনাথ বসু বেঙ্গল লেজিজলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময়ই ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রায় বাহাদুর খেতাবে ভূষিত করে। সুভাষের আইসিএস থেকে পদত্যাগে তিনি খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন, তবে পরবর্তীকালে সুভাষের দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি খুবই গৌরববোধ করেছিলেন সুভাষের মতো সন্তানের পিতা হতে পেরে। ভারতের স্বাধীনতার দাবিতে ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া রায় বাহাদুর খেতাব বর্জন করেন জানকীনাথ বসু।

সুভাষের বাল্যশিক্ষা শুরু হয় কটক শহরের র‌্যাভেন’শ কলেজিয়েট স্কুলে। প্রধান শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী বেণীমাধব দাস। বেণীমাধব ছিলেন দেশপ্রেমিক এবং আদর্শবান একজন শিক্ষক। ছাত্রদের দেশপ্রেমিক ও আদর্শ চরিত্র গঠন এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধকরণে বিপ্লবী বেণীমাধব দাসের অবদান ছিলো অপরিসীম। সুভাষ বসুর জীবনে মূলত এই বিপ্লবীর প্রচ্ছন্ন ছায়া শেষদিন পর্যন্ত ছিলো।
সুভাষ ১৯১১ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজে ওটেন সাহেব নামে একজন ইংরেজ অধ্যাপক ভারত বিরোধীতায় মুখর হয়ে উঠতেন শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের সময়। এই কারণে ওটেন সাহেব বিপ্লবী অনঙ্গমোহন, বিপ্লবী সতীশ দে ও সুভাষ বসুর দ্বারা প্রহৃত হন। এই অপরাধে ১৯১৬ সালে অন্যদের সাথে সুভাষ বসুকেও কলেজ থেকে বহিস্কার করা হয়।

এরপর কিছুদিন ঘোরাঘুরি করে কাটানোর পর ১৯১৭ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সহায়তায় সুভাষ স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯১৯ সালে দর্শন শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে অনার্সসহ বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এই সময় সুভাষ ইউনির্ভাসিটি অফিসার্স কোর-এ যোগ দিয়ে সমরবিদ্যায় জ্ঞান অর্জন করেন।
বাবা জানকীনাথ বসু ও পরিবারের সিদ্ধান্তে আইসিএস পড়ায় মনস্থির করলেন সুভাষ। ১৯১৯ সালের শেষের দিকে আইসিএস পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে যান সুভাষ। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই চতুর্থস্থান অর্জন করে আইসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন সুভাষ। ১৯২১ সালে ক্যামব্রিজ থেকে গ্রাজুয়েট সম্পন্ন করেন সুভাষ।

সুভাষের বাল্যকাল ও কৈশোর কেটেছে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের উত্তপ্ত পরিবেশে। এই আন্দোলন সারা ভারতবর্ষেও রাজনৈতিক অঙ্গন প্রকম্পিত করে তুলেছিলো। স্কুলে যখন পড়তেন তখন সুভাষ বিপ্লবী গুরু অরবিন্দ ঘোষকে দেখেছিলেন বিপ্লবী প্রচেষ্টায় অক্লান্ত পরিশ্রম করতে। দেখেছিলেন প্রফুল্ল চাকী ও প্রফুল্ল চক্রবর্তীর আত্মাহুতি; ক্ষুদিরাম বসু, কানাই লাল দত্ত, সত্যেন বসু, চারু বসু, বীরেন দত্তগুপ্তকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে দেখেছেন। কলেজে পড়াকালী সময়ে দেখেছেন প্রখ্যাত বিপ্লবী নেতা রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বে দিল্লীতে লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর উপর বোমা নিক্ষেপ করতে, সেই রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বেই দেখেছেন ভারতবর্ষে সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ সংঘটিত করতে; দেখেছেন বিপ্লবী বাঘা যতীনকে তাঁর চার সহকর্মী চিত্তপ্রিয় চৌধুরী, নীরেন দাশগুপ্ত, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত এবং যতীশ পালসহ ব্রিটিশ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে শহীদ হতে।

১৯১৯ সালে সুভাষ যখন আইসিএস পড়তে গেলেন ইংল্যান্ডে, তার পরই জালিওয়ালানবাগের পাশবিক হত্যাকাণ্ড ঘটে। ১৩ এপ্রিলের ওই হত্যাকাণ্ডে দুই হাজারের বেশি নিরস্ত্র মানুষ হতাহত হয়েছিলো। সারা ভারতবর্ষ তখন প্রতিবাদে ও নিন্দায় সরব হয়ে উঠেছিলো, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নাইট উপাধি বর্জন করেছিলেন ওই ঘটনার পরে। ওই ঘটনা প্রতিবাদী সুভাষকে প্রবলভাবে ব্যথিত করে তুলেছিলো।
সেই সময় সারা ভারতবর্ষে যেভাবে ব্রিটিশ বিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি সুভাষ যে বিপ্লবের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ প্রত্যক্ষ করেছেন তা তাঁর বিপ্লবী মনের উপর প্রচণ্ডভাবে প্রভাব বিস্তার করে। তখন ভারতবর্ষে দেশাত্ববোধ ও জাতীয়তাবোধের যে উন্মেষ ঘটেছিলো তা তিনি অবলোকন করেছেন, উপলব্ধি ও আত্মস্থ করেছেন। ওই ঘটনাগুলোর মাধ্যমেই তিনি দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের সাথে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে ফেলেন; যা পরে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর প্রচণ্ডভাবে প্রভাব ফেলে।
ইংল্যান্ডে থাকাকালে পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি সেখানকার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানগুলো অবলোকন করেন এবং ইউরোপ সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বিশেষ করে আয়ারল্যান্ডের জাতীয় আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের উপর প্রচুর জ্ঞান অর্জন করেন।

১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধী কর্তৃক যখন ভারতবর্ষব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছিলো ঠিক সেই সময় জাতীয়তাবোধে সিক্ত, বিপ্লবী চেতনায় বিশ্বাসী সুভাষ বসুর মন চলে গেলো ভারতের রাজনীতির মাঠে। সুভাষ আইসিএস-এর লোভনীয় চাকুরি ও বিলাসবহুল জীবন পরিত্যাগ করে বিপ্লবের টানে ও মুক্তির তাড়নায় স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্য মনস্থির করলেন।
১৯২১ সালের ২২ এপ্রিল সুভাষ আইসিএস থেকে পদত্যাগ করে ভারতের উদ্দেশে রওয়ানা হন। ১৩ জুলাই বোম্বে পৌঁছে তিনি সোজা মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে যান। গান্ধী তাঁকে উৎসাহ দিয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাথে দেখা করতে বলেন। কোলকাতায় ফিরে সুভাষ দেখা করলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে; সুভাষ দেশবন্ধুর সাথে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। এই সময় থেকেই দেশবন্ধু তাঁকে রাজনৈতিক শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।
১৯২১ সালের আগস্ট মাসে সুভাষ বসু অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। চৌরিচেরার সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে গান্ধী সেইবারের মতো আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাথে সুভাষও গান্ধীর এমন কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন। ওই বছরেই সুভাষ ব্রিটেনের যুবরাজের ভারত ভ্রমণ বয়কট আন্দোলনে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। ওই বয়কট আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে সুভাষকে গ্রেফতার করা হয়।

বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুভাষ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন। সুভাষ দেশবন্ধুর আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে কোলকাতা কংগ্রেস-এর কর্মকাণ্ডের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে নেন। সুভাষকে জাতীয় কলেজের অধ্যক্ষ, প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির পাবলিসিটি বোর্ডের ও স্বরাজ পত্রিকা এবং জাতীয় ভলান্টিয়ার গ্রুপের দায়িত্ব দেওয়া হলো। একজন অনভিজ্ঞ লোকের হাতে এতো দায়িত্ব দেয়ার জন্য অনেকের ঈর্ষার কারণ ও সমালোচিত হয়েছিলেন দেশবন্ধু। কিন্তু সুভাষ বসু একজন অভিজ্ঞ লোকের মতো তাঁর সমস্ত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে তাঁর রাজনৈতিক গুরুকে সঠিক প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। এ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সম্পাদিত কোলকাতার স্টেটস্ম্যান পত্রিকা তাঁর উদ্যম আর কর্মক্ষমতার প্রশংসা করে বলেছিলো,

‘যখন কংগ্রেস একজন সামর্থ লোক পেলো, তখন সরকার হারালো তার একজন সুদক্ষ কর্মকর্তা।’১

১৯২২ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে উত্তরবঙ্গে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিলো সেখানে বন্যাপীড়িতদের সেবা করে মানবতার যে স্বাক্ষর রেখেছিলেন সুভাষ তা তাঁর ভবিষ্যত রাজনীতির জন্য সহায়ক হয়েছিলো।
সুভাষ বসু বিশ্বাস করতেন যে, আবেদন-নিবেদন ও তোষামোদ করে স্বাধীনতা আদায় করা সম্ভব না, স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হয় সংগ্রাম করে, যুদ্ধ করে, রক্তের বিনিময়ে। তাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই কংগ্রেসের পাশাপাশি বাঙলার সশস্ত্র বিপ্লবীদের সংগঠিত করতে থাকেন। এই সময় থেকেই তিনি একদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে অপরদিকে বাঙলার বিপ্লবী সংগঠনগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। বিপ্লবীগণও তাঁকে নিজেদের নেতারূপে কংগ্রেসের রাজনীতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। ১৯২১ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত সুভাষ কোলকাতা ও ঢাকাসহ বাঙলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপ্লবী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্কের সৃষ্টি করেন।

তাঁর গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন হিন্দু-মুসলিম মিলনের নিবেদিতপ্রাণ সমন্বয়কারী। দেশবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন বাঙলাকে অখণ্ড রেখে শান্তিপূর্ণভাবে জীবন-যাপন করতে হলে হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতার প্রয়োজন, প্রয়োজন একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের। তাই ১৯২৩ সালে সিরাজগঞ্জে প্রাদেশিক সম্মেলনে দেশবন্ধু তাঁর বিখ্যাত হিন্দু-মুসলিম চুক্তি (বেঙ্গল প্যাক্ট) সম্পাদন করেন। এই চুক্তিতে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠার শর্ত নিবদ্ধ ছিলো। এই চুক্তিতে ছিলো আইনসভাগুলোতে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ এবং চাকুরির সংখ্যানুপাতিক বিন্যাস, এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের শতকরা ৫৫ ভাগ এবং হিন্দুদের শতকরা ৪৫ ভাগ নির্ধারণ হয়। এই চুক্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়, মসজিদের সামনে বাজনা বাজিয়ে শোভাযাত্রা করা চলবে না এবং মুসলমানদের ধর্মীয় অনুশাসনের জন্য গো-হত্যা হলে তাতে বাঁধা দেয়া চলবে না। হিন্দুদের মনে আঘাত লাগে এমন স্থানে গো-হত্যা করা চলবে না।২ এই চুক্তিটি তৈরি করেন সুভাষ বসু। এরই মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মতিলাল নেহেরুর সাথে ‘স্বরাজ্য দল’ নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, সুভাস বসুর সাংগঠনিক নেতৃত্বে যা ভারতবর্ষে একটি শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে অবস্থান লাভ করে।
১৯২১ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত সুভাষ বসু তাঁর রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পাশে থেকে তাঁর সমস্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুভাষ ছিলেন দেশবন্ধুর যোগ্য উত্তসূরী।

সুভাষ ১৯২১ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই পুরো ভারতবর্ষে বিভিন্ন যুব সংগঠনের সভা-সমিতিতে যোগ দিয়ে তাদের ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়ে বক্তব্য রাখেন এবং পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখেন। ১৯২২ সালের মে মাসে তরুণদের স্বাধীনতা সংগ্রামে উৎসাহ দিয়ে একটি প্রবন্ধ লিফলেট আকারে প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধে তিনি লেখেন :

‘আমরা এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়াছি একটা উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে, একটা বাণীর জন্য। আলোক জগৎ উদ্ভাসিত করিবার জন্য যদি গগনে সূর্য উদিত হয়, গন্ধ বিতরণের উদ্দেশে, বনমধ্যে কুসুমরাজি যদি বিকশিত হয়, অমৃতময় বারিদান করিতে, তটিনী যদি সাগরভিমুখে প্রবাহিত হয়, যৌবনের পূর্ণ আনন্দ ও ভরা প্রাণ লইয়া আমরাও মর্ত্যলোকে নামিয়াছি একটা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য, স্বাধীনতা।
এই দুঃখসঙ্কুল, বেদনাপূর্ণ নরলোকে আমরা আনন্দ-সাগরের বান ডাকিয়া আনিবো। আশা, উৎসাহ, ত্যাগ ও বীর্য লইয়া আমরা আসিয়াছি। আমরা আসিয়াছি সৃষ্টি করিতে কারণ, সৃষ্টির মধ্যেই আনন্দ। তনু, মন-প্রাণ, বুদ্ধি ঢালিয়া দিয়া আমরা সৃষ্টি করিবো। নিজের মধ্যে যাহা কিছু সত্য, যাহা কিছু শিব আছে-তাহা আমরা সৃষ্ট পদার্থের মধ্যে ফুটাইয়া তুলিবো। আত্মদানের মধ্যে যে আনন্দে আমরা বিভোর হইবো, সেই আনন্দের আস্বাদ পাইয়া পৃথিবীও ধন্য হইবে।
আমরাই দেশে দেশে মুক্তির ইতিহাস রচনা করিয়া থাকি। আমরা শান্তির জল ছিটাইতে এখানে আসি নাই। বিবাদ সৃষ্টি করিতে, সংগ্রামের সংবাদ দিতে, প্রলয়ের সূচনা করিতে আমরা আসিয়া থাকি। যেখানেই বন্ধন সেখানেই গোঁড়ামি, যেখানেই কুসংস্কার সেখানেই সঙ্কীর্ণতা-সেখানেই আমরা কুঠার হস্তে উপস্তি হইবো।
আজ পৃথিবীর সকল দেশে বিশেষত, যেখানে বার্ধক্যের শীতল ছায়া দেখা দিয়াছে, তরুণ সম্প্রদায় মাথা তুলিয়া প্রকৃতস্থ হইয়া সেখানে দণ্ডায়মান হইয়াছে। কোন দিব্য আলোকে পৃথিবীকে তাহারা উদ্ভাসিত করিবে তাহা কে বলিতে পারে…! ওগো আমার তরুণ জীবনের দল তোমরা ওঠো, জাগো, ঊষার কিরণ যে দেখা দিয়াছে।’৩

১৯২২ সালের ডিসেম্বর মাসে আর্যসমাজ হলে নিখিল বঙ্গ যুব সম্মিলনীর অধিবেশনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির ভাষণে সুভাষ ভরাট কণ্ঠে বলেন :

‘যেখানে জীবনের লীলাখেলার আনন্দের লুট হতো, যেখানে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের উৎসগুলির প্রাচুর্য্যে আমাদের ভাণ্ডার উপচে পড়তো, যেখানে জলে সুধা, ফলে অমৃত, শস্যে দেশের অনন্ত প্রাণদায়িনী শক্তি ছিলো, সেখানে আজ বিরাট শ্মশান খাঁ খাঁ করছে। প্রেতের ছায়া দেখে অর্ধমৃত প্রাণ শিউড়ে উঠেছে। এক বিন্দু জল নেই, এতোটুকু জীবন নেই। তোমরা জাগো ভাই, মায়ের পূঁজো শঙ্খ বেজেছে, আর তোমরা তুচ্ছ দীনতা নিয়ে ঘরের কোণে বসে থেকো না। এমন সুন্দর দেশ, এমন আলো, এমন বাতাস, এমন গান, এমন প্রাণ, আজ মা সত্যিই বুঝি ডেকেছেন। ভাই, একবার ধ্যাননেত্রে চেয়ে দেখো, চারদিকে ধ্বংসের স্তুপীভূত ভষ্মরাশির ওপর এক জ্যোতির্ময়ী মূর্তি। কী বিরাট! কী মহিমায়! শ্যামায়মান বনশ্রীতে নিবিড় কুন্তলা, নীলাম্বর-পরিধানা, বরাভয়বিধায়িনী, সর্বাঙ্গীন, সদা হাস্যময়ী, সেই তো আমার জননী।
সেখানে রাজনৈতিক মতদ্বৈধের কোনো স্থান নেই। সমাজ পদ্ধতির কোনো বিশিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানকে গোঁড়ামির দ্বারা বড় করে দেখা হবে না। বিভিন্ন ধর্মের পার্থক্য কোনো বাঁধা সৃষ্টি করবে না। সেখানে সমস্ত দেশবাসী জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে একই আদর্শে বিশ্বাসী, একই লক্ষ্যে, একই পথে আপন মনুষ্যত্বকে পাথেয় হিসাবে গ্রহণ করে আমরণ চলতে থাকবে।
অন্তর থেকে কর্মশক্তি আমাদের উদ্বুব্ধ করবে, যে নৈতিক বল আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে চালিত করবে সেই শক্তি, সেই বলকে আহুতির অগ্নির মতো চিরন্তনের জন্য উদ্দীপ্ত রাখতে হবে। আশা চাই, উৎসাহ চাই, সহানুভূতি চাই, প্রেম চাই, অনুকম্পা চাই, সবার উপরে মানুষ হওয়া চাই। মানুষের মধ্যে দেবতার প্রতিষ্ঠাই আমাদের সাধনা। জীবনব্যাপী এই সাধনার মধেই আমাদের মুক্তি নিহিত।’৪

১৯২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’তে সুভাষের একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় এই প্রবন্ধে সুভাষ লেখেন :

‘দেড়শত বছর পূর্বে বাঙালি বিদেশিকে ভারতের বক্ষে প্রবেশের পথ দেখিয়েছিলো। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত বিংশ শতাব্দীর বাঙালিকে করতে হবে। বাঙলার নর-নারীকে ভারতের লুপ্ত গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে। কি উপায়ে এই কার্য সু-সম্পন্ন হতে পারে এটাই বাঙলার সর্বপ্রধান সমস্যা। বাঙালি জাতীয় জীবনের অন্য সব ক্ষেত্রে অগ্রণী না হলেও আমার স্থির বিশ্বাস যে, স্বরাজ সংগ্রামে বাঙলার স্থান সর্বাগ্রে। আমার মনের মধ্যেও কোনো সন্দেহ নেই যে, ভারতবর্ষে স্বরাজ প্রতিষ্ঠিত হবেই এবং স্বরাজ প্রতিষ্ঠার গুরুভার প্রধানত বাঙালিকেই বহন করিতে হইবে। অনেকে দুঃখ করে থাকেন, বাঙালি মাড়োয়ারি বা ভাটিয়া হলো না কেনো? আমি কিন্তু প্রার্থনা করি বাঙালি যেনো চিরকাল বাঙালিই থাকে। বাঙালিকে এই কথা সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, শুধু ভারতবর্ষ কেনো সারা পৃথিবীতে তার একটি স্থান আছে, এবং সেই স্থানের উপযোগী কর্তব্যও তার সামনে পড়ে রয়েছে। বাঙালিকে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে, আর স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভারত গড়ে তুলতে হবে। সাহিত্য, বিজ্ঞান, সঙ্গীত, শিল্পকলা, শৌর্য-বীর্য, ক্রীড়া-নৈপুণ্য, দয়া-দাক্ষিণ্য, এই সবের ভিতর দিয়ে বাঙালিকে নতুন ভারত সৃষ্টি করতে হবে। জাতীয় জীবনের সর্বাঙ্গীন উন্নতি বিধান করবার শক্তি এবং জাতীয় শিক্ষার সমস্বয় করবার প্রবৃত্তি একমাত্র বাঙালিরই আছে।
গত দুই তিন বৎসর ধরে বাঙলাদেশে যে জাগরণের বন্যা এসেছিলো সে বন্যা এখন ভাঁটার দিকে চলেছে বটে, কিন্তু জোয়ারের আর বেশি বিলম্ব নাই। বাঙলাদেশে জাতীয়তার স্রোতে আবার প্রবল বন্যা আসবে। সে বন্যার স্পর্শে বাঙলার প্রাণ আবার জেগে উঠবে। বাঙালি সর্বস্ব পণ করে আবার স্বাধীনতার জন্য পাগল হয়ে উঠবে, দেশ আবার স্বাধীনতা লাভের জন্য বদ্ধপরিকর হবে।
ভাই তোমরা সকলে কি আত্মবলির জন্য প্রস্তুত আছো? এসো, হে আমার তরুণ জীবনের দল, তোমরাই তো দেশে দেশে মুক্তির ইতিহাস রচনা করেছো। আজ এই বিশ্বব্যাপী জাগরণের দিনে স্বাধীনতার বাণী যখন চারিদিকে ধ্বনিত হচ্ছে তখন কি তোমরা ঘুমিয়েই থাকবে?
ওগো বাঙলার যুব সম্প্রদায়, স্বদেশ সেবার পূণ্যযজ্ঞে আজ আমি তোমাদের আহ্বান করছি। তোমরা যে যেখানে যে অবস্থায় আছো, ছুটে এসো। চারিদিকে বাঙলা মায়ের মঙ্গল শঙ্খ বেজে উঠেছে।’৫

১৯২৪ সালে কোলকাতা পৌর কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মেয়র নির্বাচিত হন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরেই তিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকতা নিয়োগ দিবেন। এই পদে থেকে বাঙলার বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা সহজ হবে ভেবেই দেশবন্ধু প্রধান নির্বাহী পদে সুভাষ বসুকে নিয়োগ প্রধান করেন।
কর্পোরেশনের দায়িত্ব নেয়ার কয়েক মাস যেতে না যেতেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮১৮ সালের ৩নং ধারার বলে ১৯২৪ সালের অক্টোবর মাসে সুভাষকে বন্দি করা হয়। পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তরের নথিপত্র থেকে জানা যায় :

‘১৯২৪ সালে স্বরাজ্য দলের বিপ্লবী সদস্যগণ কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী পদের জন্য সুভাষ বসুকে সমর্থন করেছিলেন এবং এটা লক্ষ্যণীয় যে, তাঁর ওই পদের নিয়োগের পর কর্পোরেশনে অগণিত বিপ্লবীদের চাকুরি দেয়া হয়েছিলো। এই সময় সুভাষ বসু ও বিপ্লবীদের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিলো যে, সুভাষ তাঁন নির্দেশ মতো বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস পরিচালনা করবেন।’৬

বিপ্লবীদের সঙ্গে সুভাষের এই ঘনিষ্ঠতার কিভাবে সেদিন পুলিশের পক্ষে জানা সম্ভব হয়েছিলো তাও পুলিশের গোপন নথিতে উল্লেখ করা আছে :

১৯২৪ সালের প্রথম দিকে কংগ্রেসের একজন বিখ্যাত নেতা জনৈক উচ্চপদস্থ এক সরকারি কর্মকর্তার কাছে স্বীকার করেছিলেন যে, বাঙলাদেশে একটি বৈপ্লবিক আন্দোলনের অস্তিত্ব আছে, যারা স্বরাজ্য দলের মুখোশ পড়ে রয়েছেন। ওই সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের পুরো নিয়ন্ত্রণ করছেন সুভাষ বসু।৭

এর পূর্বেই ১৯২৩ সালে বিখ্যাত বিপ্লবী হরিকুমার চক্রবর্তী, সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ ও ভূপেন্দ্র কুমার দত্তসহ কয়েকজন বিপ্লবীকে একই কারণে গ্রেফতার করা হয়। এই সময় আটককৃত অন্যান্য বিপ্লবীদের সাথে সুভাষ বসুকে বার্মার (বর্তমান মায়ানমার) মান্দালয় জেলে প্রেরণ করা হয়।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ সুভাষ বসু ও অন্যান্য বিপ্লবী নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে এবং মুক্তির দাবিতে তাঁর বাড়িতে নিখিল ভারত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির একটি সভা আহ্বান করেন। এই সভায় দেশবন্ধু তীব্র কণ্ঠে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন :

‘If love of country is crime, i am a criminal. If Mr. Subhas Chndra Bose is criminal, i am a criminal, not only the chief executive officer of the corporation, but the mayor of this corporation is equally guilty.’৮

জেলে থাকাকালে ১৯২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১৯ তারিখে সুভাষ বসু’র একটি প্রবন্ধ ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’তে এই প্রবন্ধে সুভাষ জোড়ালো কণ্ঠে বলে উঠেন, ভারতের প্ররিপূর্ণ স্বাধীনতার কথা :

‘যে জাতির অস্তিত্বের আর সার্থকতা নেই, যে জাতির প্রাণের স্পন্দন একেবারে নিঃশ্বেস হয়েছে সে জাতি ধরাপৃষ্ঠ থেকে লোপ পায়। অথবা কীটপতঙ্গের মতো কোনো প্রকারে জীবন ধারণ করতে থাকে।
ভারতের একটি বাণী আছে যেটা জগৎসভায় শোনাতে হবে। ভারতের শিক্ষার মাঝে এমন কিছু আছে যা বিশ্বমানবের পক্ষে অতি প্রয়োজনীয় এবং যা গ্রহণ না করলে বিশ্ব সভ্যতার প্রকৃত উন্মেষ ঘটবে না। শুধু তাই না, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, সাহিত্য, ব্যবসা-বাণিজ্য এসব ক্ষেত্রেও আমাদের জাতি এই জগৎকে কিছু দেবে, কিছু শিখাবে।
দেশান্তরে কারাবাসে মাসের পর মাস যখন কাটিয়েছি তখন প্রায়ই এ প্রশ্ন আমার মনে উঠতো কিসের জন্য, কিসের উদ্দীপনায় আমরা কারাবাসের চাপে ভগ্নপৃষ্ঠ না হয়ে আরো শক্তিমান হয়ে উঠছি। নিজের অন্তরে যে উত্তর পেতাম তার মর্ম এই যে, ভারতের একটা মিশন আছে, একটা গৌরবময় ভবিষ্যত আছে। সেই ভবিষ্যত ভারতের উত্তরাধিকারী আমরাই। নতুন ভারতের মুক্তির ইতিহাস আমরাই রচনা করছি এবং করবো। এই শ্রদ্ধা এই আত্মবিশ্বাস যার আছে, সেই ব্যক্তি সৃষ্টিক্ষম, সেই ব্যক্তি দেশসেবার অধিকারী।
অনেকে মনে করেন যে, দুঃখের মধ্যে বুঝি শুধুই কষ্ট আছে, কিন্তু এই কথা সত্য নয়। দুঃখের মধ্যে যেমন কষ্ট আছে, তেমনি দুঃখের মধ্যেও আছে অপার আনন্দ।
নীলকণ্ঠকে আদর্শ করে যে ব্যক্তি বলতে পারে আমার মধ্যে আনন্দের উৎস খুলে গেছে, তাই আমি সংসারের সকল দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা-ক্লেশ মাথায় তুলে নিচ্ছি, কারণ এর ভেতর দিয়ে আমি সত্যের সন্ধান পেয়েছি, সেই ব্যক্তির সাধনাই সিদ্ধ হইয়াছে।’৯

১৯২৭ সালে মান্দালয় জেল থেকে লিফলেট আকারে সুভাষের আরেকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে সুভাষ লিখেন :

‘নিজের জীবন পূর্ণরূপে বিকশিত করিয়া ভারত মাতার পদতলে অঞ্জলিস্বরূপ নিবেদন করিবো এবং আন্তরিক উৎসর্গের ভিতর দিয়ে পূর্ণতর জীবন লাভ করিবো, এই আদর্শের দ্বারা আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।
আমার এই ক্ষুদ্র অথচ ঘটনাবহূল জীবনে যে সকল ঝড় আমার উপর দিয়া বহিয়া গিয়াছে, বিঘ্ন-বিপদের সেই কষ্টিপাথর দ্বারা আমি নিজেকে সূক্ষ্মভাবে চিনিবার ও বুঝিবার সুযোগ পাইয়াছি।
এই নিবিড় পরিচয়ের ফলে আমার প্রত্যয় জন্মিয়াছে যে, যৌবনের প্রভাবে যে কণ্টকময় পথে আমি জীবনের যাত্রা শুরু করিয়াছি, সেই পথে শেষ পর্যন্ত চলিতে পারিবো। অজানা ভবিষ্যতকে সম্মুখে রাখিয়া যে ব্রত একদিন গ্রহণ করিয়াছিলাম তাহা উদ্যাপন না করিয়া বিরত হইবো না।
আমার সমস্ত প্রাণ ও সারা জীবনের শিক্ষা নিংড়াইয়া আমি সত্য পাইয়াছি, পরাধীন জাতির শিক্ষা-দীক্ষা-কর্ম সকলই ব্যর্থ; যদি তাহা স্বাধীনতা লাভের সহায় বা অনুকূল না হয়। তাই আজ আমার হৃদয়ের অন্তরতম প্রদেশ হইতে এই বাণী নিরন্তর আমার কানে ধ্বনিত হইয়া উঠিতেছে, ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে কে বাঁচিতে চায়?’১০

এই সময় মান্দালয় জেলে থাকাকালে আটককৃত বিপ্লবীদের সাথে সুভাষের সম্পর্ক ঘনিষ্ট থেকে ঘনিষ্টতর হয়। ১৯২৫ সালের ১৬ জুন তাঁর রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মারা যান। এই বিয়োগান্তক ঘটনায় সুভাষ ভেঙে পড়েন।
জেলে থাকাকালেই ১৯২৬ সালে সুভাষ বেঙ্গল এসেমব্লিতে সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭ সালের মে মাস পর্যন্ত সুভাষ মান্দালয় জেলে বন্দি ছিলেন।
জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে তিনি যুব সম্প্রদায়ের নেতা হিসেবে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতৃত্বে আসেন এবং ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে তিনি অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তখন থেকেই বাঙলায় কংগ্রেস রাজনীতিতে দুটি গ্রুপের সৃষ্টি হয়, একটি জে এম সেনগুপ্তের, অন্যটি সুভাষ বসুর। একই সাথে সর্বভারতীয় কংগ্রেসেও সুভাষের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় স্বয়ং গান্ধীর থেকেও বেশি। সেই সাথে সুভাষ যুব সম্প্রদায়ের প্রাণের নেতায় পরিণত হন।
সুভাষ সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাধারণ জনতা তাঁকে সংবর্ধনা দিতে থাকেন। এইসব সংবর্ধনা সভায় সুভাষ যুব সম্প্রদায়কে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আহ্বান জানান। ১৯২৮ সালের ১ মার্চ অ্যালবার্ট হলে ছাত্রদের দেওয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সুভাষ বলেন :

‘বলা বাহুল্য, স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতবর্ষে যুবকদের সাথে আমি একমত। দেশে যারা আশার পাত্র তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত যে কোন আন্দোলনে আমি তাদের চরণে নিজের জীবন দেবো। তরুণদের উপর আমার আস্থা আছে। আমি সুনিশ্চিত যে এই অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে সাফল্যে সঙ্গে তারা উত্তীর্ণ হবেন।’১১

১৯২৮ সালের ২ মার্চ মহীশুর পার্ক প্রাঙ্গণে সুভাষ সভায় আগত মহিলাদের উদ্দেশ্যে সুভাষ জোড় গলায় বলে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার কথা :
‘ভারতবর্ষ একসময় জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, বস্ত্র, জ্বালানী, লবণ, তেল উৎপাদনে গৌরবজনক অবস্থানে ছিলো। তখন নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা যেতো। এমনকি একশ’ বছর আগেও আমাদের সমৃদ্ধ বস্ত্রশিল্প ছিলো।
আমি মায়েদের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি যে, আপনারা ব্রিটিশ পণ্য স্পর্শ করবেন না, এই দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করে আরো একবার প্রমাণ করুন যে হাত শিশুর দোলনায় দোল দিয়েছে সেই হাতই বিশ্ব শাসন করতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, স্বদেশির শপথ আপনারা যদি রক্ষা করেন তাহলে স্বাধীনতা লাভ করতে দেরি হবে না।’১২

১৯২৮ সালের ৪ মার্চ বাকুড়ায় স্থানীয় নারীদের একটি বিশাল সমাবেশে সুভাষ বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলে উঠেন ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের কথা, স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের বলিষ্ঠ ভূমিকার কথাও বলেন সুভাষ :

‘আমরা বিদেশিদের শোসনের অসহায় শিকার। যদি পৃথিবীর বুক থেকে ভারতীয় জাতিকে বিলুপ্ত হতে না হয়, তাহলে এই অবস্থার অবসান ঘটাতেই হবে। এই রকম জায়গায় নতুনদের কোনোরকম আত্মত্যাগ করতে কুণ্ঠিত হলে চলবে না। এমন কি, লক্ষ্যবস্তুর অনুসরণ করতে গিয়ে যদি আত্মবিলুপ্তি ঘটে তাও স্বীকার করে নিতে হবে।
আমি আপনাদের কাছে বিদেশি বস্ত্র বয়কটের জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছি। মহিলারা যদি আন্তরিকভাবে বয়কট আন্দোলনের ভারবহন না করেন তাহলে এই আন্দোলনকে সফল করে তোলার পক্ষে যাদের যোগ্যতা সর্বাধিক তাদেরই সমর্থনের অভাবে আমাদের সকল প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যাবে। আপন সংসারে বাঙালি নারী মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত। তাকে অমান্য করে এমন পুরুষ কোথায়…?’১৩

১৯২৮ সালের ৫ মার্চ বাকুড়ায় পৌরসভা, জেলাবোর্ড ও নাগরিক কমিটি আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় উপস্থিত সকলকে ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করতে বলেন সুভাষ। একই দিনে বাকুড়ার অভয়আশ্রমে এক সংবর্ধনা সভায় যুবকদের শারীরিক ও মানসিক গঠন এবং দেশপ্রেমে সিক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে কোলকাতা কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেস উপলক্ষ করে সুভাষ সারা বাঙলার বিপ্লবীদের সংগঠিত করেন এবং বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স নামে একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন, সুভাষ নিজেই এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর জিওসি’র দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এই বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত ছিলো পদাতিক বাহিনী, নারী বাহিনী, মোটরসাইকেল বাহিনী, এবং মেডিকেল কোর বাহিনী। ওই সময় ১৮ ডিসেম্বর ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় এই বিষয়ে সম্পাদকীয়তে বলা হয় :

‘স্বেচ্ছাসেবকদিগের নিয়মানুবর্তিতা প্রশংসনীয়। শ্রীযুক্ত সুভাষ চন্দ্র বসু সর্বদা উপস্থিত থাকিয়া তাহাদিগকে জাতির সেবায় উদ্বুদ্ধ করিয়া তুলিতেছেন, এই জন্য শ্রীযুক্ত বসু ধন্যবাদার্হ। সায়াহ্নের সঙ্গে সঙ্গে কুচকাওয়াজের মাঠে ঢাক ও বিউগল বাজিয়া ওঠে, উহাতে আসন্ন যুদ্ধের একটা উৎসাহজনক ভাব লোকের মনে জাগিয়া ওঠে।’১৪

তথ্যপঞ্জি :

১. দি স্টেটস্ম্যান, কোলকাতা ২০ ডিসেম্বর ১৯২১
২. বেঙ্গল প্যাক্ট চুক্তির খসড়া, ১৯২৩
৩. যুবকদের প্রতি সুভাষ বসুর লিফলেট, মে ১৯২২
৪. আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩ ডিসেম্বর ১৯২২
৫. আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২ ডিসেম্বর ১৯২৪
৬. ব্রিটিশ পুলিশের গোপন নথি, কোলকাতা, ১৯২৪
৭. ব্রিটিশ পুলিশের গোপন নথি, কোলকাতা, ১৯২৪
৮. নেতাজী সঙ্গ-প্রসঙ্গ, নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী, আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা, ১৯৭৩
৯. আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৬
১০. সুভাষের লিফলেট, মান্দালয় জেল, ১৯২৭
১১. আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩ মার্চ ১৯২৮
১২. আমি সুভাষ বলছি, শ্রী শৈলেশ দে, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৭৩
১৩. আমি সুভাষ বলছি, শ্রী শৈলেশ দে, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৭৩
১৪. আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ ডিসেম্বর ১৯২৮

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “অনন্য সুভাষ (১)

  1. ”ভারতের একটি বাণী আছে যেটা
    ভারতের একটি বাণী আছে যেটা জগৎসভায় শোনাতে হবে। ভারতের শিক্ষার মাঝে এমন কিছু আছে যা বিশ্বমানবের পক্ষে অতি প্রয়োজনীয় এবং যা গ্রহণ না করলে বিশ্ব সভ্যতার প্রকৃত উন্মেষ ঘটবে না। শুধু তাই না, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, সাহিত্য, ব্যবসা-বাণিজ্য এসব ক্ষেত্রেও আমাদের জাতি এই জগৎকে কিছু দেবে, কিছু শিখাবে।”

    এর আগে কি বিশ্ব সভ্যতা না খেয়ে মরত ?

    1. জ্বি না এখানে বিশ্ব সভ্যতাকে
      জ্বি না এখানে বিশ্ব সভ্যতাকে হেয় করে কিছু বুঝানো হয়নি, আর নেতাজী বাঙালিদের যে কিছু করার আছে সেটাই বুঝিয়েছেন তাঁর এই কথার মাধ্যমে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 1 =